সিরাজদিখানের ইসলামী উম্মাহ কর্পোরেশন

মান্নান শিকদারের বিরুদ্ধে কোটি টাকার সম্পত্তি বিক্রির অভিযোগ

  যুগান্তর রিপোর্ট ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মান্নান শিকদারের বিরুদ্ধে কোটি টাকার সম্পত্তি বিক্রির অভিযোগ

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের রশুনিয়ার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান শিকদারের বিরুদ্ধে ইসলামী উম্মাহ কর্পোরেশনের কোটি টাকার সম্পত্তি দখল ও জাল দলিল করে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। ভেন্ডার অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে এ সম্পত্তি তিনি বিক্রি করেছেন।

এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ভয়ভীতি দেখিয়ে ভুয়া দলিল করে সংখ্যালঘু ও নিরীহ মুসলিম পরিবারের জায়গা-জমি লিখে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। উপজেলা ভূমি অফিস ও রশুনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মচারী তার এ অপকর্মের সঙ্গী হয়েছেন।

উপজেলার রশুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই মান্নান শিকদার গোটা উপজেলায় তার থাবা বিস্তৃত করেন। বর্তমানে চেয়ারম্যান না থাকলেও তার দাপট মোটেও কমেনি। রাস্তার নাম করে নিজের নামে জায়গা লিখে নেয়া ও সরকারি জমি বেচাকেনা করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

২০০১ সালের ৩ জুলাই রশুনিয়া ইউনিয়নের তৈয়ব আলী হাওলাদারের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ এবং একই তারিখে দানিয়াপাড়ার রাধা গোবিন্দ নাথের কাছ থেকে ১১১ শতাংশ জমি কেনেন মেজর (অব.) জয়নাল আবেদীন খান।

তিনটি দলিলের মাধ্যমে জমি ক্রয় করে তিনি ইসলামী উম্মাহ কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করেন। কর্পোরেশনের রেজুলেশন ও ভেন্ডার অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে ওই সম্পত্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তবে জয়নাল আবেদীনের মৃত্যুর পর ভেন্ডার অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তন করার মামলাটি আদালত খারিজ করে দেন। এরপর ওই সম্পত্তি আবদুল মান্নান শিকদারের ছেলে তানভির আহম্মেদ শিকদার ও তার নিকটাÍীয় আমির হোসেনের নামে কেনা হয়।

২০০৮ সালের ৮ মে ভেন্ডার অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে ১৮৩২নং দলিলে ১৩৪ শতাংশ এবং ১৮৩৩নং দলিলে সাত শতাংশ জমি কেনা হয়। এরপর দুটি দলিলের মাধ্যমে আমির হোসেনের কাছ থেকে ৩৪ শতাংশ জমি কিনে নেন মান্নান শিকদার।

সরেজমিনে জানা যায়, দানিয়াপাড়ার ইসলামী উম্মাহ কর্পোরেশনের কোটি টাকার সম্পত্তি ভেন্ডার অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে দখল ও জাল দলিল করেন মান্নান। এরপর তা বনিকা ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নিশার খানের কাছে তিনি বিক্রি করে দেন। এর প্রতিবাদ করায় মান্নান শিকদারের রোষানলে পড়েছেন জয়নাল আবেদীন খানের দ্বিতীয় স্ত্রী আসমা বেগম। আসমা বলেন, ইসলামী উম্মাহ কর্পোরেশনের নামে তার স্বামীর কেনা দুই একরের বেশি সম্পত্তি জোর করে লিখে নিয়েছেন মান্নান। আবার ভেন্ডার অ্যাগ্রিমেন্ট করে মান্নান ওই জমি বিক্রিও করে দিয়েছেন। আসমা বলেন, কিন্তু ওই জায়গার প্রকৃত মালিক আমরা। আমাদের কাছে দলিলও আছে।

এ বিষয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান শিকদার জানান, তারা জমির মালিকদের কাছ থেকে আইন অনুযায়ী জায়গা কিনেছেন এবং আইন অনুযায়ী তা বিক্রি করেছেন। এতে দোষের কিছু নেই। সিরাজদিখান ইসলামী উম্মাহ কর্পোরেশন লি.-এর জায়গার বর্তমান মালিক নিসার খান বলেন, মান্নান শিকদারের কাছ থেকে জমি কিনেছি। এ জায়গা ইসলামী উম্মাহ কর্পোরেশন লিমিটেডের ছিল কিনা তা জানি না। জায়গার দলিল সঠিক থাকায় কিনেছি। এ ব্যাপারে রশুনিয়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী (অফিসের নায়েব) অনন্ত প্রসাদ মিত্র বলেন, কয়েক মাস হল এ ইউনিয়নে নায়েব হিসেবে যোগদান করেছি। কীভাবে ইসলামী উম্মাহ কর্পোরেশনের কোটি টাকার সম্পত্তি ভেন্ডার অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে নামজারি বা কেনাবেচা হয়েছে তা তিনি জানেন না।

স্থানীয়রা জানান, রশুনিয়া ইউনিয়নের সন্তোষপাড়া গ্রামের রৌশন আলী শিকদারের ছেলে মান্নান শিকদার নামমাত্র মূল্যে ও জোর করে জমি লিখে নিয়ে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রশুনিয়া গ্রামের এক বৃদ্ধ বলেন, চেয়ারম্যান থাকার সময় মান্নান শিকদার তার গুণ্ডা বাহিনী দিয়ে রশুনিয়া, আবিরপাড়া, চোরমর্দ্দন ধামারিয়া গ্রামের বহু নিরীহ হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের জায়গা নিজের কব্জায় নিয়েছেন। প্রাণের ভয়ে অনেকে মুখ পর্যন্ত খুলছেন না। বহু বছর ধরে মান্নানের চেয়ারম্যান না থাকলেও তার ভয়ে এখনও স্থানীয়দের তটস্থ থাকতে হয়। তার হাত থেকে তার আপন মামাতো ভাইয়েরাও রক্ষা পায়নি। সন্তোষপাড়া গ্রামের গৌর নিতাই মন্দিরের জায়গাও রক্ষা পায়নি। ভুয়া দলিল করে ও পেশিশক্তি দিয়ে দেবোত্তর সম্পত্তিতে তিনি মার্কেট নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া পাশের বাড়ির লোকজনের জায়গা দিয়ে রাস্তাও তৈরি করেছেন। সিরাজদিখান বাজারের পাঁচপীর সাহেবের মাজারের পশ্চিম পাশে সরকারি জায়গা দখল করে তিনি গড়ে তুলেছেন বিশাল মার্কেট। জাল দলিল করে বহু সরকারি জমি বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে মান্নান শিকদারের বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিরাজদিখান বাজারের এক প্রবীণ ব্যবসায়ী বলেন, নির্বাচনের সময় বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের সময় সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে মান্নান শিকদার তার স্বার্থ হাসিল করেন। জায়গা-জমি দখলে মান্নানের হাত থেকে রক্ষা পায়নি তার পাশের বাড়ির মালিকও। এ ব্যাপারে তদন্ত করে মান্নান শিকদারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্থানীয়রা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।

মান্নান শিকদারের অত্যাচারের কাহিনী যুগান্তরকে জানান দক্ষিণ তাজপুর (কলাবেড়া) গ্র্রামের কয়েকজন। জমি হারানোর কথা বলতে গিয়ে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। রশুনিয়া ইউনিয়নের চোরমর্দ্দন, পশ্চিম রশুনিয়া তাজপুর, সন্তোষপাড়া, হীরণের খিলগাঁও, দানিয়াপাড়া, আবির পাড়া, ধামালিয়ার গ্রামবাসী জানান, রাজত্ব গড়ে তুলতে ও তা টিকিয়ে রাখতে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছেন মান্নান শিকদার। তাদের ভয়ে এলাকার কারও টুঁ শব্দ করারও শক্তি নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে মান্নান এই অপকর্ম চালিয়ে গেলেও অনেকে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter