আ’লীগ-বিএনপিতে প্রার্থীজট জিততে চায় জাতীয় পার্টি

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শাহ সামসুল হক রিপন ও সরকার আবদুল আলীম, গাজীপুর

ছবি-যুগান্তর

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ১ থেকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ড ও কালিয়াকৈর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা নিয়ে গাজীপুর-১ আসনে নির্বাচনী ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা তৃণমূলকে রাজি খুশি করাতে মাঠে সক্রিয়।

আসনটি মূলত আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হলেও আগামী নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আসনটি দখলে নিতে নানা কৌশলে মাঠে আছে বিএনপি। প্রার্থীদের রঙিন পোস্টারে গোটা এলাকা ছেয়ে গেছে। প্রার্থীরা যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় ও সামাজিক সব অনুষ্ঠানে।

গত ১০ বছর ধরে আসনটি আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হকের দখলে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য তানভির আহমেদ সিদ্দিকিকে (বহিষ্কৃত) হারিয়ে বিজয়ী হন।

মোজাম্মেল হক পেয়েছিলেন ২ লাখ ৬১ হাজার ভোট এবং তানভির আহমেদ পেয়েছিলেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ভোট। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। বিশেষ করে নব্বইয়ের পট পরিবর্তনের পর অনুষ্ঠিত ৬টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ছাড়া বাকি ৫টি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হন।

১৯৯১, ১৯৯৬-এর ১২ জুন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট রহমত আলী। ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন তানভির আহমেদ সিদ্দিকি।

৬ লাখ ৭০ হাজার ২৫২ জন ভোটার অধ্যুষিত গাজীপুর-১ আসনটি শিল্প অধ্যুষিত হওয়ায় আসনটি বরাবরই বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় জাতীয় নির্বাচনে। আসনটি একসময় জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থান ছিল।

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির আমলে এ আসনে দু’বার বিজয়ী হন দলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মতিউর রহমান।

২০১৪ সালে জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার আবদুস সালাম মনোনয়নপত্র জমা দিলেও শেষ মুহূর্তে তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিলে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে গাজীপুর সদরের বাসন, কোনাবাড়ি ও কাশিমপুর ইউনিয়নকে যুক্ত করে আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। পরে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও আরেক দফা গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ১ থেকে ১৮নং ওয়ার্ড নিয়ে আসনের সীমানা ফের বিন্যাস করা হয়।

বর্তমান এমপি মোজাম্মেল হক ছাড়াও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হচ্ছেন- গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম বাবুল, কালিয়াকৈর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন সিকদার, আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানব সম্পদ সম্পাদক ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রাসেল। এ

কাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী রেজাউল করিম রাসেল বলেন, কালিয়াকৈরবাসী পরিবর্তন চায়। দীর্ঘদিন ধরে এ উপজেলার কোনো নেতা সংসদ নির্বাচনের সুযোগ পাননি। এলাকাবাসী আগামী নির্বাচনে এলাকার প্রার্থী চাচ্ছে, এটা তাদের প্রাণের দাবি। মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইব এবং পেলে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

কথা হয় অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম বাবুলের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, জননেত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা নৌকার ভার যাকে দেবেন তিনিই এ আসনের প্রার্থী হবেন। এলাকার মানুষের কাছে যাচ্ছি, প্রচার কাজ পুরোদমে চলছে। উপজেলার প্রতিটি গ্রামে, সিটি কর্পোরেশনের ১৮টি ওয়ার্ডে ঘুরে বেরাচ্ছি। মানুষের সাড়া পাচ্ছি। শেখ হাসিনার উন্নয়নের মহাসড়কে নিজেকে যুক্ত করতে কাজ করে যেতে চাই। কামাল উদ্দিন সিকদার এলাকার উন্নয়নে কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে দলের হাল ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে কথা হয় কামাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আগামী নির্বাচনে ভোটাররা কালিয়াকৈর থেকে প্রার্থী চাচ্ছেন। ভোটারদের কাছে যাচ্ছি, তাদের সুখ দুঃখে ছিলাম, আগামীতেও থাকব। অতীতে প্রতিটি নির্বাচনেই নৌকার পক্ষে ছিলাম। আগামী নির্বাচনেও নৌকার পক্ষে কাজে করে যাব।

তরুণ ব্যবসায়ী নূরে আলম সিদ্দিকীও এ আসনের প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে প্রচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। একাধিক আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক ও দাতব্য সংগঠনের কার্যনির্বাহীর পদে থাকা নূরে আলম বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

নির্বাচন সামনে রেখে নানামুখী চাপে রয়েছে বিএনপি। নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক নাশকতার মামলা ঝুলছে। ঠিকভাবে দলীয় কর্মসূচিও পালন করতে পারছেন না। এর মধ্যেই মাঠে থাকার চেষ্টা করছেন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তবে বিএনপির নেতাদের মধ্যে কোন্দল বিদ্যমান।

এ আসনে বিএনপি নেতাদের মধ্যে অন্তত তিনটি গ্রুপ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এটি চলে আসছে। কাজী ছাইয়্যেদুল আলম বাবুল ও মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে হুমায়ুন কবির খান ও মজিবুর রহমানের দ্বন্দ্ব কোন্দলে দলকে বিভক্ত করে ফেলেছে। ফলে একসঙ্গে দলীয় কর্মসূচি হতে পারছে না।

এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হচ্ছেন- জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি কাজী ছাইয়্যেদুল আলম বাবুল, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও গাজীপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুরুজ আহমেদ, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সাবেক কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত হোসেন সরকার এবং শিল্পপতি মো. আলাউদ্দিন চৌধুরীর নাম আলোচনায় রয়েছে।

এরা সবাই বিএনপির নতুন মুখ। তবে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হলে তানভির আহমেদ সিদ্দিকিও দলের মনোনয়ন চাইবেন।

কথা হয় কাজী ছাইয়্যেদুল আলম বাবুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে। সিনিয়র নেতাদের নামে একাধিক নাশকতার মামলা থাকায় এলাকায় সেভাবে দলের কর্মসূচি পালন সম্ভব হচ্ছে না। কর্মসূচি দেয়া হলেই পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠাচ্ছে। তবে মানুষ ধানের শীষে ভোট দেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। এতসব সমস্যার মধ্যেও দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছি। ফলে দলের মনোনয়নের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

কালিয়াকৈর পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির খান বলেন, নেত্রীকে ছাড়া দল নির্বাচনে যাবে কিনা তা আগে দেখতে হবে। দেশের গণতন্ত্র রক্ষা ও নির্বাচনের পরিবেশ হলে নির্বাচনের কথা ভাবব। সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ সৃষ্টি হলেই দলীয় মনোনয়ন চাইব।

কালিয়াকৈর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মজিবুর রহমান বলেন, বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইব। দলের জন্য এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা অনেক আগের।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার আবদুস সালাম দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে দলকে চাঙ্গা রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন। আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন নিয়ে তিনি নির্বাচন করতে চাচ্ছেন। নিজেকে প্রচার কাজে নিয়োজিত রেখেছেন।

জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার আবদুস সালাম বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, অবশ্যই নির্বাচনে অংশ নেব। আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এ ছাড়াও জাতীয় পার্টির নির্বাহী সদস্য মো. শরীফুল ইসলামও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) অ্যাডভোকেট আবদুল কাইয়ুম, জেলা জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি সুলতান আহমেদসহ ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা ফজলুর রহমান এবং জামায়াতের গাজীপুর মহানগরের সহকারী সেক্রেটারি মো. হোসন আলীর নাম শোনা যাচ্ছে।

সংশোধনী : ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির হুমায়ুন খান পন্নী। মঙ্গলবার প্রকাশিত টাঙ্গাইল-৮ আসনে নির্বাচনী প্রতিবেদনে ভূলক্রমে আহমেদ আযম খানের নাম ছাপা হয়েছে।