বাংলাদেশি খেদাও অভিযানে ভারত?

আসামের তালিকা থেকে ৪০ লাখ বাদ * উড়িষ্যায় প্রায় ৪ হাজার বাঙালি ভোটার তালিকা থেকে বাদ হচ্ছে

  সালমান রিয়াজ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসাম
প্রতীকী ছবি

তলে তলে জলঘোলা কম হচ্ছে না। সম্পর্কের ওপরটা ঝাঁ-চকচকে দেখালেও ভেতর ভেতর ফাঁকটা থেকেই গেছে। অনেকটা বুকে টেনে পিঠে থাপ্পড়ের মতো। স্বার্থের বেলায় ষোল আনা। একদিকে বলছে, বন্ধু অন্যদিকে ‘বাংলাদেশি খেদাও’ স্লোগানকে পথে পথে প্রচার করছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।

গ্রামে গ্রামে মিছিল, জেলা শহরে সেমিনার ও লিফলেট বিলি শুরু হয়েছে। কখনও আবার অবৈধ অভিবাসী তাড়াও কর্মসূচি বাস্তবায়নের ইতিকর্তব্যের ব্যাখ্যাও শুনিয়ে দিচ্ছেন নেতারা। নতুন নাগরিক তালিকার (এনআরসি) নামে আসামের ‘বাঙালি তাড়াও’ তালিকার পর ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোও ‘বাঙাল তাড়াও’ দাবিতে সোচ্চার হয়েছে।

দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৮টি রাজ্যের মধ্যে ৬ রাজ্য তোড়জোড় শুরু করেছে। এনআরসি’র অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘বাঙালি হঠাও’ অভিযানের খুঁটিনাটি ঘেটে দেখছে মধ্যপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ড রাজ্য বিজেপি। জাতীয় রাজনীতির স্বার্থে মমতা ব্যানার্জি পক্ষে থাকলেও ক্ষমতাসীন বিজেপির কট্টর শক্তির সঙ্গে পেরে উঠছেন না। উল্টো পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি খেদাও জোয়ার তুলেছে নরেন্দ্র মোদির দল।

গত সপ্তাহে জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে ভারতের শাসক দল বিজেপির দলীয় সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন সভাপতি অমিত শাহ। দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আসামের এনআরসি প্রক্রিয়া ও অনাগরিকদের ফেরত না।’ এছাড়া গত মঙ্গলবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিজেপিশাসিত রাজস্থানের জয়পুরে দলীয় কর্মীদের এক সভায় অমিত শাহ বলেন, ‘বিজেপির সংকল্প হল, ভারতের মাটিতে একজনও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে থাকতে দেবে না। তাদের বেছে বেছে এখান থেকে বিতাড়িত করা হবে।’

তার একদিন আগে গত সোমবার (১০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় দিল্লিতে এনআরসি বিষয়ক এক সেমিনারে বিজেপির প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব বাঙালি তাড়ানোর ‘থ্রি-ডি’ ফর্মুলার কথা উল্লেখ করেন। প্রথম ‘ডি’ হল ‘ডিটেকশন’, অর্থাৎ বাঙালিদের চিহ্নিত করা। দ্বিতীয় ‘ডি’র অর্থ ‘ডিলিট’।

অর্থাৎ, ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম কেটে যাবতীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, যাতে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পায়। তৃতীয় ‘ডি’ হল ‘ডিপোর্টেশন’। অর্থাৎ, নাগরিকপঞ্জিতে যাদের নাম বাদ পড়বে, সেই বাঙালিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। এই প্রক্রিয়ায় আসামের এনআরসি তালিকায় বাদ পড়া ৪০ লাখ বাঙালিকে বাংলাদেশে খেদিয়ে দেয়া হবে বলেও হুশিয়ারি দিয়েছেন রাম মাধব।

বিজেপি নিজেদের এই ‘থ্রি-ডি’ ফর্মুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে রাজি নয়। সভা-সেমিনারে ফেনা তুলে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে বাঙালি বিতাড়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, সেটি অমিত-মোদির দল ঠিকই বোঝে। এজন্য নিজ নিজ রাজ্যে এনআরসি তৈরির দাবিতে সরব হতে আহ্বান জানিয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায়, মাঠে-ঘাটে অতন্দ্রপ্রহরীর ভূমিকা নিতেও বলা হয়েছে। খোদ বিজেপির সদ্য সমাপ্ত জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক থেকেই এ বার্তা দেয়া হয়েছে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বিজেপির পরবর্তী পদক্ষেপের কথাটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আসামে যারা ‘বাঙালি’ বলে চিহ্নিত হবেন, তারা যাতে অন্য রাজ্যে গিয়ে সেখানকার প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের বিড়ম্বনার কারণ না হন, সে জন্য অন্য রাজ্যগুলোতেও এনআরসি তৈরি করা জরুরি।”

এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মুখে কুলুপ এঁটেছেন। মুখ খোলেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও। তবে বিজেপি কাণ্ডারি অমিতকে দিয়েই সব বলিয়ে নিচ্ছেন মোদি। শুধু বাঙালি বা বাংলাদেশি মুসলিমদের টার্গেট করাই যে বিজেপির উদ্দেশ্য তা তার বক্তব্যে সহজেই বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের লোকেরা অবৈধ অভিবাসী নয়, তারা শরণার্থী। তাদের ভারতের নাগরিকত্ব দেয়া হবে।’ মুখে সাম্প্রদায়িকতার ফ্যানা তুললেও বিজেপি নেতাদের কণ্ঠে মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের কথাই উঠে আসছে। বিজেপি নেতারা বলেছেন, যেসব হিন্দু বাংলাদেশ থেকে এসেছেন তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তাদের নাগরিকত্ব দেয়ার জন্য নাগরিকত্ব বিল আনা হয়েছে।’

দলীয় নীতি নির্ধারণী এ সভায় শাসক দলের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর রাজ্যে রাজ্যে বাঙালি হঠাও অভিযান জোরদার হয়েছে। এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানায়, আসাম ছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৮টি রাজ্যের মধ্যে ৫টি রাজ্য নাগরিক তালিকা প্রস্তুত করতে চাইছে।

রাজ্যগুলো হল, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মনিপুর, মেঘালয় ও ত্রিপুরা। আসাম রাজ্যের দেখাদেখি মধ্যপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ড রাজ্য ইতিমধ্যে এনআরসি বাস্তবায়ন নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে।

উড়িষ্যায় ভোটার তালিকা থেকেও বাঙালিদের নাম বাদ দেয়ার কাজ শুরু করেছে বিজেপি। রাজ্যটিতে বসবাস করেন ৩৯৮৭ জন ‘অবৈধ বাংলাদেশি’। এর মধ্যে ১৬৪৯ জন কেন্দ্রাপাড়ায় এবং ১১১২ জন প্যারাদ্বীপ ও জগতসিংহপুরে বসবাস করেন। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উড়িষ্যায় ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ চলবে।

অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতে মমতার রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু করার স্বপক্ষে বিজেপি জনমত সংগঠিত করতে মাঠে নেমে পড়েছে।

রোববার থেকে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় প্রচারাভিযানে নেমেছে দলের নেতাকর্মীরা। রাজ্যের মানুষকে এনআরসির প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে বিজেপির কর্মীরা। গ্রামে গ্রামে মিছিল, জেলা শহরে সেমিনার ও লিফলেট বিলি করছে।

রোববার পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেন, রাজ্যে প্রায় এক কোটি বিদেশি অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। এদের বিতাড়ন করার কথা আমরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছি। বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক রাহুল সিনহা বলেন, বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের জন্য রাজ্যের উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’

ঘটনাপ্রবাহ : আসামে বাঙালি সংকট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×