চাকরি প্রতারণা

আড়াই মাসের অফিসে দেড় কোটি টাকা আয়

আদালতে ১৪ প্রতারকের জবানবন্দি

  তোহুর আহমদ ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সিআইডি

কেউ স্কুলের গণ্ডি পার হননি। কেউ আবার রাজধানীতে করতেন দিনমজুরি। কেউ নিরাপত্তা প্রহরী। কিন্তু তাদের কাছেই চাকরির ইন্টারভিউ দেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, উচ্চপদস্থ ব্যাংকার থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত।

এমনকি তাদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিতে দ্বিধা করেননি। এভাবে চাকরি দেয়ার নামে মাত্র আড়াই মাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্রের সদস্যরা।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, সমাজের উচ্চশিক্ষিত এই শ্রেণীর ব্যক্তিদেরও বোকা বানাতে সক্ষম হয় ঝানু প্রতারক চক্রটি। আর তাদের ফাঁদে পা দিয়েই তারা ক্ষান্ত হননি, অনেকে মোটা অঙ্কের গচ্ছিত অর্থও খুইয়েছেন।

অতঃপর চাঞ্চল্যকর এমন ঘটনার আদ্যপ্রান্ত বের করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধানে নেমে দীর্ঘ চেষ্টার পর একে একে প্রতারক চক্রের প্রায় সব সদস্যকেই গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় সংস্থাটি। পরবর্তীকালে গ্রেফতারকৃতদের আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসে তা সিনেমেটিক কাহিনী কিংবা এ যুগের অপরাধবিষয়ক টিভি সিরিয়ালকেও হার মানাবে।

মোটা অঙ্কের বেতন : রাফিউল আলম নামের এক অতিরিক্ত সচিব চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর অলস সময় পার করতে একটি টিপটপ চাকরি খুঁজছিলেন। জানতে পারেন তার সিনিয়র ব্যাচের কেউ কেউ বড় বড় কোম্পানিতে সম্মানজনক পদে চাকরি করে বেশ ভালোই আছেন।

এমন চিন্তা থেকেই তিনি পত্রিকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চোখ রাখতেন। একদিন শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় দৈনিকে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখতে পান। কোম্পানির নাম সানলাইট গ্রুপ। অফিসের ঠিকানা ৫০/১ শান্তিনগর রিজ আহমেদ স্কয়ারের ১৩ তলা। তিনি ফোন করে সোজা সেখানে চলে যান।

পরিপাটি অফিসের চোখ ধাঁধানো ডেকোরেশন দেখে কনে দেখার মতোই প্রথম দর্শনে তিনি মুগ্ধ। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পরদিনই তিনি বায়োডাটা নিয়ে সেখানে হাজির। যথারীতি তার ইন্টারভিউ নেয়া হল। কয়েকদিনের মধ্যে কোম্পানির উপদেষ্টা পদে নিয়োগপত্রও পেয়ে যান।

বেতন নির্ধারিত হয় ৪ লাখ টাকা। সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত গাড়িও দেয়া হয়। কিন্তু মাত্র এক মাসের মধ্যেই কোম্পানি উধাও হয়ে গেলে রাফিউল আলমের মাথায় হাত পড়ে। কারণ ইতিমধ্যে অভিনব কৌশলে তার কাছ থেকে প্রতারক চক্র হাতিয়ে নেয় ২০ লাখ টাকা।

পরে তিনি জানতে পারেন তিনি শুধু একা নন, প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া এমন ব্যক্তি শতাধিক। আছেন বহু উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

এদের মধ্যে বিপুল পরিমাণ টাকা খুইয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, প্রাইম ব্যাংকের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) কাজী এএসএম আনিসুল কবির, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল একেএম মাকসুদুল হক, অবসরপ্রাপ্ত লে. মোহাম্মদ মোস্তফা, ডাক্তার ফিরোজ ফারুক, আরগন স্পিনিং লিমিটেডের সাবেক কোম্পানি সচিব গোপাল চন্দ্র দেবনাথসহ আরও অনেকে। ভুক্তভোগীরা একেকজন ৫০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত খোয়ান।

প্রতারণার অভিনব কৌশল : পুলিশ জানায়, প্রতারকরা অভিনব কৌশলে টাকা হাতিয়ে নেয়। তাদের টার্গেটে থাকে সরকারি-বেসরকারি অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। যাদের কাছে প্রচুর নগদ অর্থ জমা আছে। কিন্তু এখনও মোটা অঙ্কের বেতনের চাকরি খুঁজছেন। এজন্য প্রথমে তারা জাঁকজমকপূর্ণ সাজসজ্জানির্ভর অফিস ভাড়া নেয়।

এরপর পত্রিকায় দেয়া হয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। প্রলুব্ধ ব্যক্তিদের চাকরি দেয়ার আগে কথিত ইন্টারভিউ বোর্ডে চাকরি প্রার্থীর সামনে কোম্পানির লাভজনক বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করেন প্রতারকরা। উদ্দেশ্য থাকে চাকরি প্রার্থীকে আরও প্রলুব্ধ করা।

একপর্যায়ে মোটা অঙ্কের বেতন নির্ধারণ করে নিয়োগপত্র দেয়া হয়। এরপর কোম্পানির পেনশন স্কিম, সিকিউরিটি মানি, গাড়ি সুবিধা, ফ্ল্যাটের বুকিং ইত্যাদির কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা নেয়া হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর মেহেদী মাকসুদ যুগান্তরকে বলেন, এমনকি কয়েকজনকে কোম্পানির পার্টনার হওয়ার প্রলোভন দিয়েও টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। বিশ্বাস স্থাপনের জন্য যাদের নিয়োগপত্র দেয়া হয় তাদের অনেকে প্রথম মাসে মোটা অঙ্কের বেতন পান।

ফলে কোম্পানির ওপর আস্থার ভিত শক্ত হয় তাদের। ধরে নেন, যারা মাসের ১ তারিখে এত টাকা বেতন দিতে পারে তাদের সন্দেহ করা বোকামি। এ রকম ভাবনা থেকে অতি লোভে পড়ে তারা পরবর্তী সময়ে আরও বেশি সুবিধা পেতে প্রতারকদের হাতে ৫০ হাজার থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলে দেন।

ভাড়ায় আনা শার্ট-প্যান্ট, কোট-টাই : সানলাইট গ্রুপ নামের ভুয়া কোম্পানি কর্ণধাররা পোশাক-পরিচ্ছদে ছিলেন কেতাদুরস্ত। একেকজন ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দামের বিদেশি জুতা পরতেন। টেবিলে সাজানো থাকত মূলব্যান সুগন্ধি। অফিসে আসতেন প্রাডো, পাজেরো ও ল্যান্ডক্রুজার গাড়িতে।

চোখে বিদেশি ব্র্যান্ডের দামি সানগ্লাস পরতেন। দামি কোট-টাই পরে অফিসের বিশাল কনফারেন্স রুমে মিটিংও করতেন। কিন্তু এসবই ছিল লোক দেখানো।

সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন দোকান থেকে অল্প সময়ের জন্য জুতা, কোট-টাই, সানগ্লাস ভাড়ায় আনা হতো। দামি গাড়ি ভাড়া নেয়া হতো মাসিক চুক্তিতে। এসবই করা হতো চাকরিপ্রার্থীদের প্রলুব্ধ করতে। এমনকি দামি কাগজে কোম্পানির নামে রঙিন প্রজেক্ট প্রোফাইলও ছাপানো হয়।

মিলাদ থেকে গ্রেফতার : মামলার আরেক তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর শামীম আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, সানলাইট গ্রুপ নামের ভুয়া কোম্পানির অফিস খুলে মাত্র আড়াই মাসে দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র।

তবে এটাই প্রথম নয়, এর আগে তারা রাজধানীর বনানীতে লেক্সাস গ্রুপ নামের আরেকটি ভুয়া কোম্পানি খুলে একই কায়দায় প্রতারণা করে। সেখানে পুলিশ অভিযান চালালে প্রতারকদের কয়েকজন গ্রেফতারও হয়।

পরে জেল থেকে বেরিয়ে সানলাইট গ্রুপ নামের ভুয়া কোম্পানি খুলে ফের প্রতারণায় নেমে পড়ে তারা। সানলাইট গ্রুপের প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করলে তদন্ত শুরু হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, প্রতারকরা নতুন আরেকটি মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে।

এবার কোম্পানির নাম দেয়া হয় ম্যাক্স ভিশন। সেগুনবাগিচা এলাকার সামাদ ট্রেড সেন্টারের ৪র্থ তলায় জাঁকমকপূর্ণ অফিসও ভাড়া নেয়া হয়। অফিস উদ্বোধনের দিন মিলাদের আয়োজন করেন প্রতারকরা। কিন্তু এবার প্রতারকদের ভাগ্য খারাপ। মিলাদ অনুষ্ঠানে হানা দেয় পুলিশ।

সেখান থেকে প্রতারকদের ১৪ জনকে গ্রেফতার করে সিআইডি। বাকিদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

প্রতারণার অকপট স্বীকারোক্তি : পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে এই প্রতারক চক্রের প্রধান ভূমিকায় আছেন আদনান তালুকদার ওরফে আলামিন ও সামুদুর রহমান সুমন ওরফে সায়মন ওরফে ভোটকু সুমন।

তারা দু’জনে সানলাইট গ্রুপ নামের ভুয়া কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেজে প্রতারণার ফাঁদ পাতেন। পুলিশের হাতে গ্রেফতার ১৪ প্রতারকের সবাই আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে বিষয়টি উল্লেখ করেন।

আদনান তালুকদার নিজেই তার জবানবন্দিতে বলেন, তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদী থানার ষোলঘর গ্রামে। তার বাবার নাম ধলু আকন। মায়ের নাম মাহমুদা বেগম। তিনি আগে একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে নীচু পদে চাকরি করতেন।

সেখানে আরেক প্রতারক মাসুদুর রহমান সুমনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারা দু’জনে বনানী এলাকায় লেক্সাস গ্রুপ নামের একটি ভুয়া কোম্পানি খোলেন। নিজেকে আড়াল করতে নাম বদলে তিনি সেখানে নিজেকে আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে ফয়সাল নামে পরিচিত ছিলেন।

লেক্সাস গ্রুপ নামের ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয় তারা। কিন্তু এক পর্যায়ে তাদের প্রতারণার বিষয়টি পুলিশের কাছে ফাঁস হয়ে গেলে তারা বনানী থেকে পালিয়ে যান। পরে শান্তিনগরে খোলেন সানলাইট গ্রুপ। তাদের পরবর্তী মিশন ছিল ম্যাক্স ভিশন গ্রুপ।

সানলাইট গ্রুপের কথিত চেয়ারম্যান প্রতারক মাসুদুর রহমান সুমন জবানবন্দিতে বলেন, তার পিতা-মাতার নাম যথাক্রমে আবদুস সালাম ও মর্জিনা বেগম।

গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শিয়ালখোল শ্যামপুরে। তিনি এইচএসসি পাস করে নিরাপত্তা প্রহরী সরবরাহের ব্যবসা খোলেন। কিন্তু সেখানে লোকসান হওয়ার পর তিনি বেকার হয়ে পড়েন।

এরপর তিনি তার পূর্বপরিচিত সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের কর্মী খন্দকার আলমগীরসহ আরও বেশ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সানলাইট গ্রুপ খোলেন। সেখানে চাকরি দেয়ার নামে তিনি প্রতারণা শুরু করেন।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ থেকে নির্ধারিত হারে সহযোগীদের কমিশন দেয়া হতো। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে আসল পরিচয় আড়াল করে তিনি নিজেকে কখনও সায়মন সুমন, কখনও শফিক তুহিন ওরফে ভোটকা সুমন ওরফে সজিব বলে নিজেকে পরিচয় দিতেন।

আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া অন্যরা হলেন- হাফিজুর রহমান আল মামুন ওরফে মামুন লস্কর, হানিফ কাজী, আবু শাফি তালুকদার ওরফে সৈয়দ শাহরিয়ার সোহাগ ওরফে শাফিন ওরফে মালটুস, ইনসান আলী ওরফে সুজন, আল আমিন সবুজ ওরফে খালেদ মাহমুদ ওরফে সয়মন আনোয়ার ওরফে ছোট আল আমিন, নাদিম উদ্দিন, মামুনুর রশিদ, মোস্তাফিজুর রহমান মাসুম ওরফে খন্দকার আলমগী হোসেন ওরফে আলাউদ্দিন, রহমত উল্লাহ ওরফে সৌরভ, শাহজাহান মিয়া ওরফে জোহরুল হক ওরফে তোফাজ্জল, সাইদুল ইসলাম ওরফে রানা ও সিরাজুল ইসলাম। প্র

তারকরা ট্রেড লাইসেন্স ও সরকারি স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তিপত্রেও ছদ্মনাম ও ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করতেন। সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এ চক্রের প্রায় সব সদস্যকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

তবে রাজধানীতে এ ধরনের আরও কয়েকটি চক্র এখনও সক্রিয়। তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে সিআইডি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×