ইয়াবার নতুন রুট জকিগঞ্জ সীমান্ত

ভারতীয় সীমান্তেও থাকতে পারে কারখানা- বিজিবি * চাহিদাপত্র যায় ফোনে, টাকা যায় হুন্ডিতে- র‌্যাব * পাচারে জড়িত কতিপয় প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধি

  মাহবুবুর রহমান রিপন, সিলেট ব্যুরো ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইয়াবা

চট্টগ্রাম সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পর এবার মিয়ানমার হতে ভারত হয়ে সিলেটে ঢুকছে ইয়াবার চালান। গত কয়েক মাসে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত থেকে বেশ কয়েকটি বড় চালান ধরা পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে এ অঞ্চলে। আর এসব অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।

তবে র‌্যাব ও বিজিবি বলছে, জকিগঞ্জ দিয়ে প্রবেশ করা ইয়াবার উৎস মিয়ানমার নাকি ভারত তা খতিয়ে দেখছে তারা। ভারতীয়রা আসক্ত হওয়ার শঙ্কায় উদ্বেগ রয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীরও। তাই যৌথ উদ্যোগে দু’দেশেই মরণ নেশা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

এ বিষয়ে সীমান্তের ১৯ ব্যাটালিয়ন বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ যুগান্তরকে জানান, জকিগঞ্জ ইয়াবার নতুন রুট তাতে সন্দেহ নেই। তার মতে, তাদের কাছে দু’ধরনের তথ্য আছে- প্রথমত, ইয়াবা প্রস্তুতকারী দেশ মিয়ানমার হতে ভারতের মনিপুর-ইম্ফল-শিলচর হয়ে ঢুকছে সীমান্তবর্তী করিমগঞ্জে।

সেখান থেকেই রাতের আঁধারে নদী পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা। দ্বিতীয়ত, ভারতের এই সীমান্ত এলাকায় ছোট ছোট ইয়াবার কারখানা রয়েছে বলে আরও একটি তথ্য রয়েছে তাদের কাছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষাকারী বাহিনী বিএসএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েকবার বৈঠকও হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে প্রায় ৫৪ কিলোমিটারের সীমান্ত এলাকা। ভারতীয় অংশে পুরো সীমান্তেই কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ অংশে তেমন কোনো সুরক্ষা বেড়াই নেই। এই দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় দুই দেশকে বিভক্ত করেছে কুশিয়ারা আর সুরমা নদী। এই সীমান্ত পাহারা দেয় বিজিবির প্রায় ১৫টি বিওপি।

নদীর তীর ধরে একটি বেড়িবাঁধ রয়েছে বাংলাদেশ অংশে। মূলত সেই বাঁধ ধরেই টহল দেন বিজিবি সদস্যরা। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে সেই বাঁধের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যানবাহন ব্যবহার সম্ভব হয় না। হেঁটেই বিজিবি সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায়। সম্প্রতি এই সীমান্ত দিয়ে বাড়ছে ইয়াবা পাচারকারীদের আনাগোনা। তবে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত তেমন বড় কোনো চালান ধরা পড়েনি এই সীমান্তে। যে কারণে পাচারকারীদের তৎপরতা নিয়ে তেমন উদ্বেগ ছিল না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

২৭ মার্চ হবিগঞ্জ উপজেলার নবীগঞ্জ থেকে ১২ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেটসহ র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী মুহিবুর। র‌্যাব-৯ এর কোম্পানি কমান্ডার মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে জানান, মুহিবুরকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছে প্রথম তারা তথ্য পান জকিগঞ্জ হয়ে ইয়াবার বড় চালান ঢুকছে বাংলাদেশে। এই তথ্যের ভিত্তিতে জকিগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ায় র‌্যাব। সফলতাও আসে, ৮ আগস্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপজেলার খলাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের পাশের একটি রাস্তা থেকে ১৮ হাজার ৩৬৫ পিস ইয়াবাসহ শামীম আহমেদ নামের একজনকে আটক করা হয়।

সে সময় আরও দু’জন দৌড়ে পালিয়ে যায়। এদের মধ্যে একজন ৪নং খলাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৬নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য শাহাবউদ্দিন বলে শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারে র‌্যাব। পরে শামীম আহমেদ, শাহাব উদ্দিন মেম্বার ও পারবার হোসেন নামের তিনজনকে আসামি করে জকিগঞ্জ থানায় মামলা করে র‌্যাব। এখনও পলাতক রয়েছেন শাহাব উদ্দিন মেম্বার।

১১ সেপ্টেম্বর জকিগঞ্জের বটেরতল বাজার এলাকা থেকে ৬৮০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন আসাদ উদ্দিন নামের আরেক ব্যক্তি। অভিযানে নেতৃত্বদানকারী র‌্যাবের কোম্পানি কমান্ডার মনিরুজ্জামান জানান, এ বছরের মার্চ থেকে ধারাবাহিক অভিযানে শুধু জকিগঞ্জ এলাকা থেকেই প্রায় ৬০ হাজার ইয়াবা আটক করেছেন তারা। এই রুটে ইয়াবার চালান আসার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই তারা উদঘাটন করেছেন। সিলেট অঞ্চলের খুচরা বিক্রেতাদের চাহিদা একত্রিত করে ফোনে বড় একটি চালানের অর্ডার দেন প্রভাবশালী বিক্রেতারা।

ভারতে থাকা ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা পাঠানো হয় হুন্ডির মাধ্যমে। টাকা হাতে পেয়েই রাতের আঁধারে কাঁটাতারের উপর দিয়ে ইয়াবা পার করে দেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। আগেই সেখানে অবস্থান নেয়া পাচার কাজে ব্যবহৃত লোকজন তা বাংলাদেশে নিয়ে আসে। তিনি জানান, আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যবসায়ীকে চিহ্নিত করেছেন তারা। শিগগিরই তাদের গ্রেফতার করা হবে বলে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এই সীমান্তের ১৯ ব্যাটালিয়ন বিজিবির অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান টেকনাফে ইয়াবা পাচারকারীদের ত্রাস হিসেবে পরিচিত লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিজিবির হাতে আটক হয় ৫২১ পিস। সেখানে জুলাই মাসেই আটক হয় ৫৫৪৭ পিস ইয়াবা। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আটক হয় ৯৯১৮ পিস। আর এ বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৪৭২২ পিস ইয়াবাসহ ১৭ জনকে আটক করেছে বিজিবি সদস্যরা।

এ বিষয়ে লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ যুগান্তরকে জানান, তিনি যোগদানের পরই বিষয়টি তার নজরে আসে। যে সব স্থান দিয়ে পাচার হতে পারে সেসব স্থানে টহল জোরদার করেন তিনি। পাশাপাশি র‌্যাবকেও এই অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন তিনি।

তিনি জানান, এরই মধ্যে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের একটি তালিকাও তৈরি করেছেন তারা। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে এই এলাকার প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তির ছত্রছায়ায় এই মরণনেশা ইয়াবা ব্যবসা চলছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। পাচার বন্ধে ইতিমধ্যেই দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীই একমত হয়েছে। দুই দেশেই তালিকা তৈরির কাজ প্রায় শেষ। খুব দ্রুতই তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হবে।

এদিকে র‌্যাব-বিজিবি ইয়াবা আটকে সফল হলেও তেমন সফলতা নেই স্থানীয় থানা পুলিশের। ছোট ছোট কয়েকটি চালান আটক করলেও এখনও বড় কোনো চালান ধরা পড়েনি তাদের হাতে। তবে সম্মিলিতভাবে এসব এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানান সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মাহবুবুল আলম। তবে তিনি জকিগঞ্জকে ইয়াবার নতুন রুট হিসেবে এখনই মানতে নারাজ।

ঘটনাপ্রবাহ : মাদকবিরোধী অভিযান ২০১৮

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×