সুষ্ঠু কর ব্যবস্থায় চাই রাজনৈতিক অঙ্গীকার

ইশতেহারে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকা উচিত : ড. কামাল * জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে হবে : ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম * করহার বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি সুষম হতে হবে : ড. ইফতেখারুজ্জামান

  শাহ আলম খান ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুষ্ঠু কর ব্যবস্থায় চাই রাজনৈতিক অঙ্গীকার

‘শুধু উন্নয়ন চায়, কিন্তু কর দিতে চায় না’ ভোটের মাঠে ভোটদাতা, করদাতা বা জনগণের এ ধরনের মানসিক দৈন্যতার পরিবর্তন জরুরি। পাশাপাশি স্বচ্ছল সব নাগরিককে করের আওতায় এনে দেশে দরিদ্রবান্ধব কর ব্যবস্থা নিশ্চিত করারও প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। সেটি সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। কোনো একটি দলের পক্ষেও নয়, এজন্য দরকার বৃহত্তর স্বার্থে দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

আশার কথা হচ্ছে, এ বাস্তবতা এখন রাজনৈতিক দলগুলোও অনুধাবন করতে শুরু করেছে। সরকারে যাওয়ার আগে থেকেই তারা দেশের কর ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে চায়। এজন্য দলগুলোর ভেতরেও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমে করবিষয়ক কর্মপরিকল্পনা ও পরিচর্চায় সম্মতির কথা জানিয়েছেন দলগুলোর শীর্ষ রাজনীতিবিদরা।

এ প্রসঙ্গে গণফোরাম সভাপতি, সংবিধান প্রণেতা ও বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। দলের ভেতরেও করবিষয়ক ভাবনা থাকতে হবে। নির্বাচনী ইশতেহারে রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা উচিত। সম্পদের সুষম বণ্টন ও দরিদ্রবান্ধব কর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাসহ ইশতেহারে দেয়া উন্নয়ন প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এ বিষয়ে দলগুলোর কাজ করা খুব জরুরি। এটি সময়েরও দাবি। আমরাও সেটি করতে চাই।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, দেশে করের যে নেটওয়ার্ক আছে এটা দিয়ে ভবিষ্যতে দেশ চালানো কঠিন হয়ে যাবে। শুধু সারা বিশ্বে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও বাংলাদেশে কর আদায় হয় সবচেয়ে কম। সো ইউ হ্যাভ মাস্ট বিল্ডআপ দ্য নেটওয়ার্ক। এই কর তো আর আকাশ থেকে পড়বে না। কর দেবে দেশের জনগণ। এই কর রাজস্ব দিয়েই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হবে। ফলে যাদের করের আওতায় আসা উচিত, যারা কর দেয়ার যোগ্য এমন স্বচ্ছল নাগরিকদের অবশ্যই করের আওতায় আনতে হবে। নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির সময় নিশ্চয়ই বিএনপি এ বিষয়টি গুরুত্ব দেবে। তবে এ রাজস্ব ব্যবহারের ক্ষেত্রে যাতে কোনো লুটপাট না হয় সেই ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার বিষয়টিও জরুরি।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক যুগান্তরকে বলেন, আসন্ন নির্বাচনী ইশতেহারে কর ভাবনার বিষয়গুলোতে জোর দেয়া হবে। এর ওপর আমাদের অবশ্যই বক্তব্য থাকবে। সেখানে কর ব্যবস্থাকে যুক্তিসঙ্গত ও সুষম রাখা, স্বচ্ছল ও সামর্থ্যবান নাগরিকদের করজালে আনার মাধ্যমে করের আওতা বাড়ানো ও ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হবে। কারণ এতে ভয়ের কিছু নেই। অন্যায়ভাবে কিছু তো করব না। আমরা সাহসীভাবেই বলব- যারা কর ফাঁকি দেয়, কর দেয়া থেকে দূরে থাকে, তাদের করের আওতায় আনা হবে এবং রাজস্ব খরচে স্বচ্ছতার বিষয়টিও প্রতিশ্রুতিতে থাকবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নয়ন ও পরিবর্তনের চাহিদা আগামীতে যত বাড়বে, রাষ্ট্রের আয়ের ক্ষুধাও তত জোরালো হবে। এ পরিস্থিতিতে ঘাটতি দূর করে প্রয়োজনীয় রাজস্বের জোগান নিশ্চিতে রাজনৈতিক দল ও সরকারের মধ্যে থাকা দ্বৈত মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর স্বার্থে যৌথ আলোচনা প্রয়োজন।

এদিকে রাজস্ব আয়ের পর্যালোচনায় বিদ্যমান কর ব্যবস্থার ভয়াবহ দৈন্যতার চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। সর্বশেষ আদমশুমারিতে দেখা গেছে, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ২৩ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ বলছে, এদের মধ্যে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি- যার মধ্যে প্রায় ৩ কোটি লোক অন্তত ন্যূনতম হারে করযোগ্য আয় করছে। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত প্রায়ই দাবি করেন, দেশে প্রায় ১ কোটি লোক কর দেয়ার যোগ্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিবছর কর দিচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ লাখ মানুষ। এ চিত্রের আরও দৈন্যতা প্রকাশ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত হিসাবে। সংস্থাটির দাবি, বর্তমানে টিআইএনধারী আছে প্রায় ৩৩ লাখ- যার ৫০ ভাগই কর দিচ্ছেন না। আবার যারা কর দিচ্ছে (১৩-১৪ লাখ) তাদের মধ্য থেকে ন্যূনতম কর মাত্র ৫ হাজার টাকা দিচ্ছে ৬০ শতাংশ করদাতা। ১ কোটি টাকার ওপরে কর দেয় মাত্র ৫০ হাজার করদাতা।

এ প্রসঙ্গে শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দেশে করের জাল সম্প্রসারণ করা দরকার। এজন্য আয়কর কিংবা ভ্যাট যে খাতেই হোক কর প্রদানে যোগ্য এমন লোক কিংবা প্রতিষ্ঠানকে করজালে আনতে হবে। তাছাড়া কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বেশি। এ ফাঁকির কারণে শাস্তি খুব একটা হয় না। জনগণ যাতে কর দিতে আগ্রহী হয় সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একটা সচেতনতা তৈরি করতে পারে। এটি তারা নির্বাচনী ইশতেহারে বিস্তৃত পরিসরে এবং জোরালোভাবে রাখতে পারে। যাতে তারা জনগণকে বোঝাতে পারে যে, কর দিলে এবং কর আহরণ বাড়লে সরকার ভালো কাজ করতে পারবে। এর মাধ্যমে এলাকার উন্নয়ন হলে তার দ্বারা জনগণই উপকৃত হবে। আর এ বিষয়টি নিয়ে সংসদ সদস্যরাও নিজ নিজ এলাকায় জনসভার মাধ্যমে জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সভাপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, দেশে কর ব্যবস্থাটি একদম ঠিক নেই। কেউ অনেক সুবিধা পাচ্ছে। কেউ বাড়তি দিচ্ছে। এর সবকিছুরই দায়ভার পড়ছে জনগণের ওপর। কয়েক দিন আগে বাজেট পাস হল। কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রভাবশালী শিল্পোদ্যোক্তা ও খাতকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর জন্য সংসদে কোনো আলোচনা হয়নি। শুধু একটি প্রজ্ঞাপন (এসআরও) জারির মাধ্যমেই সেটি কার্যকর হয়েছে। আবার দেশে বড় বড় কর ফাঁকিবাজ রয়েছে। তাদের ধরা হচ্ছে না। অথচ ওই ফাঁকি দেয়ার কারণে বাজেটের ঘাটতি অর্থ নানা প্রক্রিয়ায় পরোক্ষ কর বাড়িয়ে আদায় করা হচ্ছে। এর দায় বহন করতে হচ্ছে গরিব মানুষকে। আগামীতে নির্বাচনী ইশতেহারে করবিষয়ক এ বৈষম্য দূরীকরণের অঙ্গীকার থাকতে হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা নিয়ে দলগুলোর ভেতর ভাবনা নেই। যে কারণে কর ব্যবস্থা সম্প্রসারণে বলা যায় সহজ উদ্যোগেই হাঁটছে সরকার। এতে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ কর আদায় বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে উচ্চবিত্তরা যে হারে কর দিচ্ছে, নিুতম আয়ের ব্যক্তিটিও সেই একই হারে কর দিচ্ছে। আমাদের করহার বাড়াতে হবে। এটা ঠিক। কিন্তু বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি যাতে সুষম হয়। সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সরকারে আসার আগেই রাজনৈতিক দলগুলোকে এ বিষয়ে ফিল্ডওয়ার্ক করে আসতে হবে।

বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) ছোট-বড় ৩৯টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত আছে। বাস্তবতা হচ্ছে, ‘রাষ্ট্রের স্বার্থে করবিষয়ক সচেতনাধর্মী কোনো কর্মসূচি কিংবা দলগত কর্মপরিকল্পনা এদের কখনোই গ্রহণ করতে দেখা যায় না। যে কারণে দলীয় নেতাকর্মীরা কর বিষয়ে নৈতিক ধারণা পাচ্ছে না। জনগণও কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ হওয়ার মতো কোনো বার্তা পাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, দলের ভেতরে নৈতিক চর্চা ও শুদ্ধাচার না থাকায় কর ফাঁকিবাজ ও দুর্নীতিবাজের সন্ধান ও আশ্রয়-প্রশ্রয়ের দেখা মিলছে। কেউ কেউ দলে উচ্চপদগুলোয়ও আসন গেড়েছে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনও ব্যাহত হচ্ছে। এতে জনগণের কষ্টার্জিত রাজস্বের খরচায়ও নয়-ছয় হচ্ছে। দেখা গেছে, ১০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩০ কোটি টাকা লেগে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শুধু কর আদায় বাড়ালেই হবে না। এর লুটপাটও বন্ধ করতে হবে। তা না হলে রাজকোষে পুঁঞ্জিভূত রাজস্বের পরিমাণ সমৃদ্ধ হবে না। পাশাপাশি আয় বাড়াতে দেশের মধ্যে যে অবৈধ আয় রয়েছে, সেদিকেও নজর বাড়ানো দরকার।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter