২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা

আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে আসামিপক্ষ

রায়ের সার্টিফায়েড কপি চেয়ে বাবর, পিন্টুসহ ১২ আসামির আবেদন * রায় পর্যালোচনা শেষে তারেক রহমানের সাজা বাড়াতে আবেদনের সিদ্ধান্ত -অ্যাটর্নি জেনারেল * কারাগারে থাকা সরকারি ৭ কর্মকর্তার প্রায় অর্ধেক সাজা ভোগ হয়ে গেছে

  মিজান মালিক ও হাসিব বিন শহিদ ১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে আসামিপক্ষ

‘একুশ আগস্ট’ গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১২ আসামি রায়ের সার্টিফায়েড কপি চেয়ে আবেদন করেছেন।

বৃহস্পতিবার আসামিদের পক্ষে তাদের আইনজীবীরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য বিচারিক আদালতে এসব আবেদন করেন।

জানতে চাইলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর স্টেনোগ্রাফার ওলিউল ইসলাম বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, মামলার সার্টিফায়েড কপি চেয়ে ইতিমধ্যে ১২ আসামির পক্ষে আবেদন দাখিল করা হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে রায়ের সার্টিফায়েড কপির জন্য মৌখিকভাবে আবেদন করা হয়েছে।

এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমানের পক্ষে আইনজীবী আকরাম উদ্দিন শ্যামল আদালতে মামলার কেস ডকেট (সিডি) জমা দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল বলেছেন, রায়ের সার্টিফায়েড কপির জন্য আমাদের লিখিত আবেদন করতে হবে না। রায়টি সুপ্রিমকোর্টে পাঠানোর আগে আমরা এমনিতেই কপি পেয়ে যাব। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, পুরো রায় পর্যালোচনা শেষে তারেক রহমানের সাজা বৃদ্ধির জন্য আবেদনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। একই সঙ্গে আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ছাড়া যেসব আসামির পক্ষে রায়ের সার্টিফায়েড কপি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে তারা হলেন- মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এনএসআইয়ের (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা) সাবেক দুই মহাপরিচালক (ডিজি)- মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, দণ্ডবিধির ২১২ ও ২১৭ ধারায় পৃথকভাবে ২ বছর করে ৪ বছর সাজাপ্রাপ্ত সাবেক দুই আইজিপি- মো. আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হক, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বিএনপির সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত জঙ্গি নেতা মাওলানা আবু তাহের, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হোসাইন আহমেদ তামীম, মো. জাহাঙ্গীর আলম ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক।

বুধবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফজ্জমান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১১ জন সাবেক সরকারি কর্মকর্তাকে ২ থেকে ৪ বছরের সাজা দেয়া হয়।

২ থেকে ৪ বছর সাজাপ্রাপ্ত সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিনসহ ৪ জন মামলার শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। অপরদিকে কারাগারে থাকা অপর ৭ কর্মকর্তার কারও কারও প্রায় ওই সাজাভোগ শেষ পর্যায়ে। আর বাকিদের প্রায় অর্ধেক সাজাভোগ হয়ে গেছে বলে তাদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন। আরও জানা গেছে, সাজাপ্রাপ্তদের ৩১ আসামি কারাগারে ও ১৮ আসামি পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিদের রায়ের সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করার সুযোগ নেই। কারণ তাদের প্রথমে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এরপর রায়ের কপি তারা চাইতে পারবেন।

এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে গ্রেনেড হামলা মামলার প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, আমরা এখনও রায়ের বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। তবে সবাই বসে এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি। বসে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেব। তখন আপনারা জানতে পারবেন। মামলার বিশেষ কেঁৗঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল যুগান্তরকে বলেন, সরকারিভাবেই আমরা রায়ের কপি পাব। কপি পেলে আমরা তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী ও মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের সাজা বৃদ্ধির জন্য আপিল করব।

এদিকে অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, রায়ের সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করেছি। তা পাওয়ার পর আপিলের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।

সরকারি কর্মকর্তাদের কারাদণ্ড ও সাজাভোগ : দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর কর্মকর্তা ওলিউল ইসলাম জানিয়েছেন, সাবেক সরকারি ১১ কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, পুলিশের সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান, সাবেক পুলিশ সুপার মো. ওবায়দুর রহমান খান মামলার শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। আর উপস্থিত আসামিদের মধ্যে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক ছাড়া বাকি ৬ কর্মকর্তাই (সাবেক তিন আইজিপি ও সাবেক তিন তদন্ত কর্মকর্তা) সম্পূরক চার্জশিট দাখিলের পরদিন ২০০৮ সালের ৪ জুলাই ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর প্রায় ৯ মাস পর তারা এ ট্রাইব্যুনাল থেকে জামিন পান। তবে চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তিতর্ক শেষে এদের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউকের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. হাসান রাজিব প্রধান যুগান্তরকে বলেন, ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক গ্রেফতার হন। এরপর ২০১২ সালের ২৫ জুন তিনি জামিন পান। এ মামলায় তিনি দীর্ঘ ২২ মাস কারাভোগ করেছেন। এ আসামির ২ বছর সাজা দিয়েছেন আদালত। আর জেলকোড অনুসারে ১৮ মাসে ২ বছর হয়। সে অনুসারে তার সাজাভোগ হয়ে গেছে। তবে আদালত সাজার পাশাপাশি অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। সে কারণে অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সাজা ভোগের আদেশ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব। কারণ সাজাভোগ প্রায় শেষ হয়ে গেলেও এ কলঙ্ক তার জীবনে থেকেই যাবে। এ কলঙ্ক মোচনের লক্ষ্যে ও জরিমানা স্থগিত চেয়ে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব। এরপর উচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দিলেই তিনি কারামুক্ত হবেন।

সাবেক দুই আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হকের আইনজীবী এম নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এ দু’জনের পক্ষে ইতিমধ্যেই রায়ের সার্টিফায়েড কপি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। অধিকতর চার্জশিট দাখিলের পর তারা বিষয়টি টেলিভিশনে দেখেন। এর পরদিনই এ দু’জন আসামি ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। ওই সময় আদালত তাদের জামিন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। দীর্ঘ ৯ মাস ৮ দিন কারাভোগের পর তারা এ ট্রাইব্যুনাল থেকে জামিন পান।

অ্যাটর্নি জেনারেল যা বললেন : একুশে আগস্ট মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে এলে দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। বৃহস্পতিবার দুপুরে অ্যাটর্নি জেনারেল তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের একথা বলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পুরো রায় দেখে পর্যালোচনা করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাজা বৃদ্ধির জন্য আবেদনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

মাহবুবে আলম বলেন, রায়ে যাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে তাদের আদালত থেকে বিনা খরচে রায়ের কপি দেয়া হয়। আর তারা যদি আপিল ফাইল করেন তবে সেটাও ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসবে। সেক্ষেত্রে আমরা রাষ্ট্রপক্ষ যত দ্রুত সম্ভব শুনানির জন্য পদক্ষেপ নেব। তবে এটাতে পেপারবুক তৈরি করার বিষয় রয়েছে, সেগুলো আদালতের বিষয়। মামলার আপিল শুনানিতে আমাদের পদক্ষেপগুলো আমরা নেব। তিনি বলেন, এ মামলায় তারেক রহমানকে যদি নাটের গুরু বলা হয়ে থাকে, তবে সেটা রায় পর্যালোচনা করে দেখব। রায় পড়ে যদি দেখি তারও মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল তবে তার দণ্ড বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল করব। কিন্তু সবটাই নির্ভর করবে রায়টি পড়ার পর।

তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গে মাহবুবে আলম বলেন, মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে বাইরের দেশে পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম (রাজনৈতিক আশ্রয়) দেয়া হয়। তবে তারেক রহমানের তো যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধীকে আশ্রয় দেয়া সমর্থন করে না। তাই তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনা কষ্ট হবে না বলেও জানান তিনি।

রায়ের কপি কারাগারে : ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রায়ের কপি আদালত থেকে কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছেছে। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ ও ২ এর (ভারপ্রাপ্ত) সিনিয়র জেল সুপার সুব্রত কুমার বালা জানান, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের কপি বুধবার সকালে ঘোষণার পর রাত সাড়ে সাতটার দিকে কাশিমপুর কারাগারে এসে পৌঁছায়। পরে বৃহস্পতিবার ভোরে তাদের কয়েদি পোশাক পরানো হয়। বন্দিদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এ বন্দি রয়েছেন। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় তিনি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি থাকায় তিনি আগেই কয়েদির পোশাকে ছিলেন।

তিনি আরও জানান, দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ আছেন সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৩ আসামি। এর মধ্যে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ৩ জন, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৩ জন ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত ৭ জন আসামি। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় (গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে) এবার প্রথম পিন্টুর নাম যোগ হল। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের পৃথকভাবে কনডেম সেলে রাখা হয়েছে। এ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের সবাইকে ভোরে কয়েদি পোশাক পরানো হয়েছে।

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার বিকাশ রায়হান জানান, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় এ কারাগারে ১৭ জন বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে ১৩ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এবং ৪ জন যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত।

ঘটনাপ্রবাহ : ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×