মাঝে মাঝে কাহিনীর প্রয়োজনে চরিত্রের ধরনও বদলে যায়-সেলিনা হোসেন

  আহমেদ বাসার ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বাংলা কথাসাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কারিগর সেলিনা হোসেন
বর্তমান বাংলা কথাসাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কারিগর সেলিনা হোসেন

বর্তমান বাংলা কথাসাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কারিগর সেলিনা হোসেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম তার সাহিত্যে নতুন মাত্রা লাভ করেছে।

বাস্তবতার করাতকলে নিষ্পেষিত মানুষের জীবনযন্ত্রণা তার কথাসাহিত্যে রূপায়িত হয়েছে নতুন ব্যঞ্জনায়। নিরন্তর সৃষ্টিমুখর এই লেখকের শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’, মগ্ন চৈতন্যে শিস, যুদ্ধ, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, হাঙর নদী গ্রেনেড প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য রচনা। অগণিত পুরস্কার ও সম্মাননা তিনি লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮০), একুশে পদক (২০০৯), স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৮), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), রবীন্দ স্মৃতি পুরস্কার (২০১০), অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪)। এ ছাড়া রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেছেন সম্মানসূচক ডি.লিট। শ্যামলীর বাসায় তার সঙ্গে সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন কবি আহমেদ বাসার। সেই আলোচনার অংশবিশেষ পত্রস্থ হল। বি.স

যুগান্তর: সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আপনাকে ডি.লিট উপাধি দেয়া হয়েছে। এর আগে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও একই উপাধি পেয়েছেন। জীবদ্দশায় দুটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাধি পাওয়ার অনুভূতি কেমন?

সেলিনা হোসেন : এটা অবশ্যই অনেক ভালো লাগার বিষয়। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়টা অন্যরকম। এটা আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী শহরকে আমি মনে করি আমার নিজের শহর। যে জায়গাটি একজন লেখক বা যে কোনো শিল্পমাধ্যমের ব্যক্তিকে বড় হয়ে উঠতে সহায়তা করে। রাজশাহী আমার সেই সহযোগিতার শহর।

এখানে আমার শিক্ষাজীবন শেষ করেছি এবং এখানে আমার লেখালেখির হয়ে ওঠার সময়টা কেটেছে। আমি অজস্র গল্প লিখেছি এবং আমার প্রথম বই এখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সবকিছুর পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে হয়েছে এই ডি.লিট উপাধি গ্রহণ আমার জীবনের একটি বড় অর্জন।

যুগান্তর: আপনার প্রথম লেখা ও প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের অনুভূতি কেমন ছিল?

সেলিনা হোসেন : প্রথম প্রকাশিত লেখা ছিল ১৯৬৪ সালে। যে বছরকে আমি লেখালেখির সূচনাবছর বলে মনে করি। রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার একটি আন্তঃকলেজ সাহিত্য প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছিল। আমি রাজশাহী বিভাগের মহিলা কলেজ থেকে সেই প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছিলাম। অবশ্য কলেজ থেকে আমার নামটা পাঠানো হয়েছিল।

প্রতিযোগিতায় আমার গল্পটি প্রথম হয়েছিল। এতদিন পরও বিষয়টি স্মরণ করি। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে অনেক গল্প লিখেছি। এবং রাজশাহী থেকেই আমার প্রথম বই ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয়- উৎস থেকে নিরন্তর। এভাবেই রাজশাহী থেকেই আমি যে জায়গাটি পেয়েছি সেটাই আমার জন্য একটি প্রবল অনুভূতির জায়গা- আনন্দের এবং হয়ে ওঠার।

যুগান্তর: মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন আপনার সাহিত্যে একটি বড় জায়গাজুড়ে থাকে। এর বিশেষ কোনো কারণ আছে কী?

সেলিনা হোসেন :: আমি মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন- এই দুটো জায়গাকে নিজের ঐতিহ্য নির্মাণের জায়গা থেকে দেখেছি। শুধু এ দুটো বিষয় নয়, আমি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছি। যে সময়টায় তিনি শিলাইদহ শাহজাদপুরে ছিলেন। সেই দশ বছরের পটভূমিতে। আমার মনে হয়েছে যে, এই পটভূমি রবীন্দ্রনাথের একটি বিশাল জায়গা।

এই জায়গাটি না পেলে হয়তো রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের মাঝে নিজের অবস্থানটি দেখতে পেতেন না। ছিন্নপত্রের একটি চিঠিতে তিনি বলেছেন, শুধু কলকাতায় থাকলে আমার এ বাংলার মানুষকে দেখা হতো না।

আরেকটি বিষয় আমি ধরেছি ‘ভূমি ও কুসুম’ উপন্যাসে, যে সাতচল্লিশের দেশভাগের পর ছিটমহলগুলো ছিল সেখানকার মানুষের জীবনের যে দুর্দশা, বঞ্চনা, হতাশা, বেদনা সবকিছু মিলিয়ে যে বিষয়গুলো ছিল সেগুলোকেও আমি উপন্যাসে এনেছি। এভাবে আমি চিন্তা করেছি। আরও বেশকিছু বিষয় আমার উপন্যাসে এসেছে যা আমার ইতিহাস ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের অংশ। যে ঘটনাগুলো দিয়ে আজকের বাঙালি ও বাংলাদেশ, সে জায়গাগুলোকে ধরার জন্য শুধু ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নয় সামগ্রিক দিকটি বিবেচনায় আমি তৈরি করেছি আমার লেখাগুলো।

যুগান্তর: ইতিহাস ও সাহিত্য দুটি ভিন্ন বিষয়। ইতিহাস যখন সাহিত্যে রূপায়িত হয় তখন একজন লেখকের কৌশল কী হয়? এ ক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

সেলিনা হোসেন :: আমি প্রথমেই ঘটনাগুলো নিয়ে অনেকভাবে গবেষণা করি। যেমন- ‘সোনালি ডুমুর’ উপন্যাসটি যখন লিখি দেশভাগের পটভূমিতে। তখন ১৯৪৬ সালে মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালিতে গিয়েছিলেন। আমি সে জায়গাটা ধরেছি। কী অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ছিল মানুষের। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের জীবনে। এভাবে জিনিসটাকে ধরা।

পরবর্তীকালে পাকিস্তান সরকার শত্রু সম্পত্তি আইন করে হিন্দুদের বিতাড়িত করেছিলেন। এটাও একটা বিষয় ছিল সে সময়ে। আমার ‘সোনালি ডুমুর’ উপন্যাসটি এভাবে লেখা। আমার ‘কাঁটাতারে প্রজাপতি’ উপন্যাসটি আমি লিখেছি ছেচল্লিশ সালে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল সে পটভূমিতে। আমি ‘ভালোবাসা প্রীতিলতা’ লিখেছি স্বদেশি আন্দোলনের পটভূমিতে।

প্রীতিলতা কীভাবে জীবন দিল। এগুলো যখন আমি লিখি তখন আমার মনে হয়েছে ইতিহাস আমার বিষয় আর লেখার সময় মনে হয়েছে এর সঙ্গে আমার সৃজনের জায়গাটা, কল্পনার জায়গাটা আমার নিজস্ব যেখানে ইতিহাসের সত্যটুকু থাকবে কিন্তু গল্প নির্মাণ হবে, চরিত্র সৃষ্টি হবে কল্পনার শক্তি দিয়ে। এটাই একজন লেখকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

যুগান্তর: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখনও পূর্ণাঙ্গ কোনো উপন্যাস রচিত হয়নি- এরকম একটি অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকে শোনা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আপনার বক্তব্য কী?

সেলিনা হোসেন :: এ ধরনের অভিযোগ মানুষ আসলে না পড়েই করে। আমি যখন ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ উপন্যাস লিখি, তখন ১৯৪৭ থেকে শুরু করে ১৯৭৫ পর্যন্ত যত আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ঘটনাগুলো ঘটেছে তার প্রেক্ষিতে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনা পর্যন্ত এসেছি। আমি তো সামগ্রিক জায়গাটিকে ধরার চেষ্টা করেছি।

আমি মনে করেছি যারা গবেষণাগন্থ পড়বে না অথবা কোনো প্রজন্ম যদি প্রবন্ধ পড়ে নিজের ইতিহাস জানার চেষ্টা না করে, তারা এ উপন্যাসটি পড়লে ইতিহাস তাদের কাছে উঠে আসবে গল্পের মধ্য দিয়ে। আমি ‘যুদ্ধ’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছি। শুরু করেছি তারামন বিবিকে দিয়ে। তারামন বিবির স্বামী তাকে খুব অত্যাচার করতেন এবং তালাক দিয়ে দেন। মৌখিক তালাক ছিল সে সময়। বাবা গেছেন তারামন বিবিকে আনতে। তিনি ফিরেছেন এবং ফেরাটা হচ্ছে আনন্দের। এই যে একটা বন্ধন থেকে মুক্তি পাচ্ছেন।

তিনি নাচতে নাচতে ফিরছেন। বিষয়টাকে আমি প্রতীকী হিসেবে দেখেছি। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তানকে ফেলে দিয়ে পূর্ববাংলার লোকজন আনন্দের সঙ্গে চলে যাচ্ছে। এভাবে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি আমি ‘যুদ্ধ’ উপন্যাসে ১১ নম্বর সেক্টরকে ধরেছি। এ উপন্যাস আমি শেষ করেছি এভাবে- দু’জন প্রেমিক প্রেমিকার কথা আছে।

প্রেমিকটি যুদ্ধে গেছে কিন্তু প্রেমিকা যেতে পারেনি। সে পাকিস্তান আর্মির হাতে নির্যাতিত হয়ে গর্ভবতী হয়েছিল। ছেলেটি যখন স্বাধীনতার পর ফিরে এল তার একটি পা ছিল না। মেয়েটির পোড়াভিটায় এসে ছেলেটি যখন মেয়েটির দিকে তাকালো তখন মেয়েটি বললো- তুমি দিয়েছো পা আর আমি দিয়েছি জরায়ু। স্বাধীনতা আমাদের সবকিছু চায়। এভাবে আমরা সবকিছু দিয়ে অর্জন করেছি আমাদের স্বাধীনতা। এই যে এগার নম্বর সেক্টর, বায়ান্নর একটা ক্যারেক্টার যেখানে অপেক্ষা করে আছে একজন নারী।

বায়ান্ন সালে তার বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু শহিদ হয় তার স্বামী। তবু সে সিঁথির সিঁদুর মোছে না। বলে যতদিন ও ফিরে না আসবে, যতদিন আমি ওর খবর না পাব ততদিন সিঁথির সিঁদুর মুছবো না। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময়কেন্দ্রিক আমি একটি লোককাহিনীর ক্যারেক্টর তৈরি করেছি যে সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। এটা ছিল আমার মুক্তিযুদ্ধ ও চেতনাগত জায়গাটা।

যে লোকটি সব জায়গায় যাচ্ছে কিন্তু প্রকৃত অর্থে শারীরিক মানুষ নয়। যখন মিলিটারি আসছে তখন সে মেয়েটিকে বলছে তোমার সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলো, না হলে আমাদের পুরো পরিবারকে মেরে ফেলবে। ওরা ভাববে আমরা হিন্দু।

মেয়েটি তখন হাত দিয়ে সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলে। এটাও স্বাধীনতার জন্য তার একটি ত্যাগ বলে আমি মনে করি। এভাবে ছোট ছোট অজস্র জিনিস দিয়ে আমি ‘যুদ্ধ’ উপন্যাসটি নির্মাণ করেছি। যেখানে জনজীবনের সঙ্গে যুদ্ধের একটি দিক আছে। জনজীবনের মূল্যবোধের একটি জায়গা আছে, যুদ্ধকে নারী-পুরুষের সমতায় দেখার একটি দিক আছে।

তিরিশ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে আর দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যে স্বাধীনতার কথা বলা হয়, সে ক্ষেত্রে আমি বলবো যে, মা-বোন ইজ্জত দেয়নি তারা যুদ্ধের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে। এভাবে যুদ্ধে নারীর অবদানকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র দিক আমি উপন্যাসে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

যুগান্তর: বাংলাদেশের বহু সাহিত্য তাৎক্ষণিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিষয় ও শিল্পের সমন্বয় কতটা ঘটেছে বলে আপনি মনে করেন?

সেলিনা হোসেন : আমি মনে করি, বিষয় ও শিল্পের সমন্বয় অবশ্যই ঘটেছে। আমরা যদি একুশের সংকলনটা দেখি; ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান যে সংকলনটা সম্পাদনা করলেন সেখানে কবিতা, গল্প, স্মৃতিচারণ আছে।

সেটা আজকের বাংলাদেশের সাহিত্যের ধারাবাহিকতার একটি বড় যোগসূত্র। তখন কবি শামসুর রাহমান যে কবিতা লিখেছেন, কবিতাকে পরবর্তী সময়ে তিনি বড় করে তুলেছেন তার তরুণ বয়সের কবিতা থেকে।

সেই সময় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ যে কবিতাটি লিখেছিলেন- কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা, এরপর তিনি যখন লেখেন- আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, তখন বলতে পারি তাৎক্ষণিক অনুভব থেকে সাহিত্য রচনার পরও তারা বড় সাহিত্য রচনা করেছেন। হাসান হাফিজুর রহমান অসাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর অসাধারণ গানটিও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। তাৎক্ষণিক বিষয়টি যখন আপন অস্তিত্বের চেতনার ভেতর থেকে উঠে এসেছে তখন আর তাৎক্ষণিক থাকেনি।

যুগান্তর: লেখালেখির ক্ষেত্রে নারীদের কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে বলে কী আপনি মনে করেন?

সেলিনা হোসেন : নারীদের প্রতিবন্ধকতা সামাজিকভাবে কিছু তো আছেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষদের আধিপত্যের কারণে সেই জায়গাটি তারা ঠিকমতো পায় না। মাত্র কয়েক মাস আগে উচ্চপদস্থ এক নারী ব্যাংক কর্মকর্তা আমার কাছে এলেন শিশু একাডেমিতে। তিনি বললেন- আমি যে একটু লিখবো আমার স্বামী কিছুতেই এটা পছন্দ করে না। আমি বিস্মিত হয়েছি।

এ সময়েও এমন অবস্থা থাকতে পারে? একজন নারী তার চাকরি, সমাজ, সংসার সবকিছু সামলানোর পরও যখন পুরুষরা এ জায়গাটাতে বাধা দেয় তখন তো খুব খারাপ লাগে। তবে আগের চেয়ে অবস্থা অনেক বদলেছে এটা সত্যি।

যুগান্তর: উপন্যাসের প্লট নির্মাণের ক্ষেত্র আপনার কী কোনো পূর্বপ্রস্তুতি থাকে? নাকি লিখতে লিখতে বিষয়টি দাঁড়িয়ে যায়?

সেলিনা হোসেন : আমার প্রস্তুতি থাকে। আমি গুছিয়ে নিই। গুছিয়ে লিখতে শুরু করি। লিখতে লিখতে অনেক সময় সেটা অন্যভাবে চলে যায়। একটা অংশ লেখার পর যখন মনে হয় অন্যভাবে লিখলে বিষয়টা পূর্ণতা পাবে, তখন ওভাবে লেখার চেষ্টা করি। এভাবে আমার লেখা এগিয়ে যায়। মাঝে মাঝে কাহিনীর প্রয়োজনে চরিত্রের ধরনও বদলে যায়। অন্য চরিত্রের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনেও অনেক সময় কাহিনী ও চরিত্রগত কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়।

যুগান্তর: উপন্যাসের চরিত্রসৃষ্টি ও ভাষাকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে আপনার কী সচেতন কোনো প্রয়াস থাকে? এ ক্ষেত্রে কী ধরনের কৌশল আপনি অবলম্বন করেন?

সেলিনা হোসেন : সচেতন প্রয়াস তো থাকেই। কারণ সচেতন প্রয়াস দিয়ে সূচনাটা হয়। এই যে বললাম একটু আগে যে এরপর লিখতে লিখতে একটু পরিবর্তিত হয়ে যায়। এ চরিত্রটা এমন না হয়ে যদি একটু অন্য রকম হয়, তাহলে কেমন হয় কিংবা চরিত্রের ভাবনার জায়গাটা একটু ভিন্নরকম হলে কেমন হয়, এরকম ভাবনার জায়গা থেকে চরিত্র ও ভাষাকাঠামো তৈরি হয়। কখনোবা বদলে যায়।

যুগান্তর: সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্য সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

সেলিনা হোসেন : আমি খুব অহংকারের সঙ্গে বলি, সাতচল্লিশ পরবর্তী আমাদের যে কথাসাহিত্য সেখানে বাংলাসাহিত্যের মূল ধারার সঙ্গে আমরা একটি নতুন স্রোত তৈরি করেছি।

আমাদের জনজীবনে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, একটু আগে যে ঘটনাগুলোর কথা বললাম- ভাষা আন্দোলন, সামরিক শাসন, বঙ্গবন্ধুর সামনে এগিয়ে আসা, তার ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এ সব যখন সংঘটিত হয়েছে তখন এই পটভূমিতে অনেক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। বিপরীতে প্রেমের উপন্যাস বা সামাজিক অবস্থাকেন্দ্রিক উপন্যাস, ব্যক্তির সংকটকেন্দ্রিক উপন্যাস সবই লেখা হয়েছে। আমাদের বাংলাসাহিত্য একটা নতুন নির্মাণ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

যুগান্তর: আপনার একাধিক উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সাহিত্যের চলচ্চিত্ররূপ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

সেলিনা হোসেন : চলচ্চিত্র একটি ভিন্ন শিল্পমাধ্যম। যেখানে একজন সাহিত্যিক একক ব্যক্তি হিসেবে লেখেন, সেখানে চলচ্চিত্রে যৌথ চরিত্রের মাধ্যমে সেটি রূপায়িত করার মুনশিয়ানা থাকতে হয়।

চলচ্চিত্রে অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, সঙ্গীত শিল্পী- সবকিছু মিলিয়ে এ শিল্পটা তৈরি হয়। সাহিত্যিক উপাদানটা এখানে নতুন মাত্রা লাভ করে। আমরা বর্ণনা করি কিন্তু চলচ্চিত্রে সেটি দৃশ্যমান রূপ লাভ করে। পথের পাচালিতে অপুদুর্গার বেড়ে ওঠা, ট্রেন দেখা, ছুটোছুটি সবকিছু যতটা জীবন্তরূপে দেখা যায় সাহিত্যে বর্ণনার মধ্য দিয়ে সেটা তো সম্ভব নয়। চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে সাহিত্য শিল্পের আরেকটি নতুন মাত্রা অর্জন করে।

যুগান্তর: লেখালেখি নিয়ে আপনার নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে কী?

সেলিনা হোসেন : আমি এ মুহূর্তে যে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি, একটা শহর কীভাবে বিষণ্ণ হচ্ছে- ‘বিষণ্ণ শহরের গল্প’ নামে সেটি একটি দৈনিকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। একটা শহরে যত দুর্ঘটনা ঘটছে, যত বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে সেগুলো আমি এ উপন্যাসে নিয়ে আসছি একে একে। আরেকটি উপন্যাস আমি লিখছি ‘সময়ের ফুলে বিষফোঁড়া’।

সময় হচ্ছে সেই ফুল যখন ফুটছে তখন ফুলটা ঠিকমতো ফুটতে পারছে না। এখানেও নানা অঘটন ঘটছে। এখানে দুটো ক্যারেক্টার আছে। একটা অটিস্টিক আক্রান্ত তরুণ, আরেকটি মেয়ে যাকে ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পেয়েছে তার পালক বাবা। এই যে মানুষের জীবন, সমাজের ক্ষত, এ জন্যই বলেছি সময়ের ফুলে বিষফোঁড়া। সময়টা কখনও মানুষকে রক্তাক্ত করে বিষণ্ণ করে সেটাই ধারণ করার চেষ্টা করছি এ উপন্যাসগুলোতে।

যুগান্তর: নিজের লেখালেখি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? কথাসাহিত্যে কতটা স্বকীয়তার জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন বলে আপনি মনে করেন?

সেলিনা হোসেন : আমি চেষ্টা করেছি। এ বিষয়টার মূল্যায়ন পাঠকই করবে। আমি যা করতে চেয়েছি আমি লিখেছি। আমার উপন্যাস ভারতের বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়েছে। দুটো পিএইচডি হয়ে গেছে। তিনটি এমফিল হচ্ছে আমার লেখা নিয়ে। একজন লেখকের জীবৎকালে এরচেয়ে বড় অর্জন আর কিছু আছে বলে তো আমি মনে করি না। মানুষের যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি তার কোনো তুলনা নেই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×