বিশ্বসাহিত্যে মোস্তফা কামাল

  আল মনসুর ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বসাহিত্যে মোস্তফা কামাল

বাংলা সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় লেখক মোস্তফা কামাল। তার বইয়ের সংখ্যা একশ’র কাছাকাছি। সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই বিচরণ করেন মোস্তফা কামাল।

গল্প, কবিতা, সায়েন্স ফিকশন, শিশুসাহিত্য, গোয়েন্দা কাহিনী, রম্য রচনা এবং সর্বোপরি উপন্যাস লিখেছেন অনেক। লেখক মোস্তফা কামালের সঙ্গে তার সাংবাদিক সত্তা সমান্তরালে চলছে অভিজ্ঞতার ঝুলি বোঝাই করতে করতে। তিনি আন্তর্জাতিক বিষয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়েছেন দীর্ঘ সময় ধরে।

নেপালে রাজতন্ত্রবিরোধী গণঅভ্যুথ্যান, যুদ্ধপরবর্তী আফগানিস্তানের অবস্থা, পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো হত্যাকাণ্ড এবং শ্রীলঙ্কায় তামিল গেরিলা সংকট সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের উদ্দেশে তিনি ভারত, ভুটান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, জাপান, বেলজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করেন। বাংলাদেশের সংবাদপত্র পাঠকদের কাছে মোস্তফা কামাল একটি প্রিয় নাম। কালের কণ্ঠে ‘সময়ের প্রতিধ্বনি’ এবং ‘রঙ্গ ব্যঙ্গ’ নামে দুটো কলাম প্রতিনিয়ত লিখে চলেছেন।

গত মাসের মাঝামাঝিতে মোস্তফা কামালের তিনটি উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ‘থ্রি নভেলস’ নামের বইটি প্রকাশ করেছে ভারত সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াভিত্তিক প্রকাশনা নোশনপ্রেস।

বিশ্বব্যাপী নিজেদের প্রকাশিত বই বিপণনের কাজে নোশনপ্রেস আরও কতিপয় বিপণনী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একযোগে কাজ করে থাকে। ‘থ্রি নভেলস’-এর বেলায়ও এ প্রতিষ্ঠানটি আমাজনসহ আরও কয়েকটি বিশ্ব বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে সারা বিশ্বে বিপণন কর্ম পরিচালনা করছে।

বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পাঠকদের আগ্রহ থাকা খুব স্বাভাবিক। এছাড়া সম্প্রতি অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি পাঠক এবং প্রকাশকদের আগ্রহ লক্ষণীয় বটে। ইংরেজি অনুবাদে তার বইয়ের প্রকাশনা সম্পর্কে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমাদের সাহিত্য অন্যান্য দেশের, অন্যান্য ভাষার সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য উঠে আসে আমাদের সাহিত্যে। যে কোনো দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতি অন্যদের আগ্রহ থাকে। সে আগ্রহের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত সাহিত্যের প্রতি তাদের আগ্রহের বিষয়টি। তাদের আগ্রহের প্রতি সারা দেয়ার চেষ্টা করেই আমার উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের চেষ্টা করেছি। আশা করি এক সময় বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে বাইরের দেশের পাঠকদের ধারণা ক্রমান্বয়ে আরও স্পষ্ট হবে।’

ইংরেজিতে অনূদিত তিনটি উপন্যাসের নাম যথাক্রমে ‘তালিবান পাক কান্ল অ্যান্ড আ ইয়াং লেডি’, ‘ফ্লেমিং ইভেনটাইড’ এবং ‘দ্য ফ্ল্যাটারার’। আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের প্রথম সমর্থক ছিল পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। যথা নিয়মে পাকিস্তানের ওপর তালেবান উত্থানের প্রভাবও পড়ে।

একুশ শতকের শুরুর দিকের পাকিস্তানে তালেবানদের প্রভাব কেমন ছিল তা বাংলাদেশের যুবক সাকিবের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে প্রথম উপন্যাসটিতে। সাকিবের অপরিকল্পিত বোহেমীয় জীবনের এক পর্যায়ে টোকিওতে দেখা হয় পাকিস্তানি মেয়ে মাহাভেস জোগেজাইয়ের সঙ্গে। প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ে যায় সে।

মাহাভেসও তার প্রেমে পড়ে যায়। বেশ কয়েক বছর ধরে চলে বিয়ের জন্য অপেক্ষা করা। অপেক্ষার এক পর্যায়ে পাকিস্তানে গিয়ে তালেবানদের হাতে ধরা পড়ে নিরীহ সাকিব। অনিশ্চিত সময় পার করার পর সে অবশ্য ফিরে আসতে পারে। মাহাভেসের সঙ্গে পুনরায় দেখা হওয়ার মধ্য দিয়েই উপন্যাসে সমাপ্তি।

মোস্তফা কামাল আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভিন্ন চিত্র নিজে দেখেছেন বলে তার মধ্যে একরকম আগাম বলার শক্তি চলে এসেছে। এ উপন্যাসে তিনি যে চিত্র তুলে এনেছেন তার বাস্তবায়ন ঘটেছে এটি প্রকাশের পরে। পাকিস্তানে ওই একই রকম পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে ওসামা বিন লাদেনের পাকিস্তানে অবস্থান, ২০১৪ সালে ১৬ ডিসেম্বরে।

সেদিন তেহরিক-ই-তালেবান জঙ্গিগোষ্ঠীর ছয় বন্দুকধারী সশস্ত্র আক্রমণ করে পাকিস্তানের পেশোয়ারে একটি আর্মি পাবলিক স্কুলে। স্কুলে ঢুকে তারা শিশু এবং স্কুলের শিক্ষক কর্মকর্তাদের ওপরে নির্বিচারে গুলি চালায়। ১৩২ জন শিশুসহ মোট ১৪৯ জনকে হত্যা করে তারা।

‘থ্রি নভেলস’-এর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ফ্লেমিং ইভেনটাইড’। বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা বিশেষ অধ্যায় উঠে এসেছে এ উপন্যাসে। স্বাধীনতা যুদ্ধের মাত্র চার বছরের মাথায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। একটি বিশেষ মহলের চক্রান্তে দেশপ্রেমিক মানুষদের হত্যা করা হয়। ক্ষমতা যাদের হাতে আসে তারা নানাভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করে মুক্তচিন্তার মানুষদের।

এ সুযোগে অন্ধকারের আড়াল থেকে বের হয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিতরা। বেশ দ্রুত নানা দিক থেকে তারা অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করতে থাকে। তাদের হাতে নাজেহাল হতে থাকেন ত্যাগী মানুষরা।

ইতিহাসের এরকম এক বাস্তব অবস্থার ওপর ভিত্তি করে কাহিনী তৈরি করা হয়েছে এ উপন্যাসে। প্রধান চরিত্র হুমায়ূন কবিরের ছেলে আকমল কবিরের নামে মামলা করে রাজাকার শরিফুল আজম। পুলিশ হেফাজতে নিহত হয় আকমল কবির। তার মৃত্যুর পর রাস্তায় মিছিল বের করে প্রতিবাদী সাধারণ মানুষরা। তবে ট্র্যাজিক ঘটনার মধ্য দিয়ে উপন্যাস শেষ হলেও প্রতিবাদের চিত্রটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষদের মিছিলের মাধ্যমে প্রতিবাদের শুরু। শেষ পর্যন্ত অপশক্তি বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না- এমন একটি ইঙ্গিত দিয়ে যান ঔপন্যাসিক। ন্যায়ের পক্ষের মানুষ এক সময় জেগে ওঠে।

মোস্তফা কামালের ‘দ্য ফ্ল্যাটারার’ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় এক বিশেষ শ্রেণীর মানুষের স্বার্থপর আচরণ নিয়ে। নামে শিক্ষিত কিছু মানুষ ওপরে ওঠার জন্য বসদের তোষামোদ করে থাকে। বিনিময়ে দুর্নীতিবাজ বসরাও অন্য সুবিধা আদায় করে থাকে। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র তেলাওয়াত এরকম একজন মানুষ। সব সময় তার বসকে খুশি করার চেষ্টায় থাকে।

অফিসে নিজের অবস্থান শক্ত রাখার জন্য অন্যদের স্বার্থ নষ্ট করতে তার বিবেকে আটকায় না। তবে একই অফিসে একজন তেলবাজের ওপরে আরেকজন তেলবাজের প্রভাব পড়তেও দেখা যায়। হাবিবুর রহমানের তোষামোদে তেলাওয়াত নিজেই যখন ভিজে যায় তখনকার চিত্র এরকম :

Telawat embraces Habib saying, ‘‘You will see my blessings, Habib. May you be great! I am surprised to see your honor and respect for me. ‘start doing your work.”

“Yes, sir. You are a man of great heart.”

আর তেলবাজদের জীবনে কখনও শান্তির মুহূর্ত আসে না। তাদের অবিরত সতর্ক থাকতে হয়, কখন কোন কৌশলটি অবলম্বন করতে হয়।

‘থ্রি নভেলস’-এর উপন্যাসগুলোর মধ্যে প্রথমটি অনুবাদ করেছেন দুলাল আল মনসুর। দ্বিতীয়টি মোস্তফা কামাল নিজেই অনুবাদ করেছেন। শেষের উপন্যাসটির অনুবাদক মাছুম বিল্লাহ। হ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×