কবিতার স্ববিরোধিতা

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  জাহেদ সরওয়ার

একজন কবি সেই সর্বগ্রাসী অস্তিত্ব, আপাত চোখে যার সবকিছু দরকার অথচ যাকে কারও দরকার নেই। সত্যিকারের একজন কবি তার সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে ধারণাতীত ক্ষমতাবান। এ জন্য জনসাধারণের রুচি থেকে তার রুচি অনেক তফাতে। জনসাধারণের কাছে মাঝে-মধ্যে সে হাস্যকর।

হ্যাঁ, কবি হয়তো তার লম্বাচুল, হয়তো তার উদাসী স্বপ্নালু চোখ, হয়তো সে মদ খায়, হয়তো সে মাতাল, হয়তো সে ঈশ্বর আর ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী, বা নাস্তিক। ততক্ষণ সে নিরাপদ জোকার যতক্ষণ তার স্বধর্ম সে জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দিতে চায় না।

আর সত্যিকার অর্থে যখন তা ঘটে তখন সে জনগণ, ধর্ম আর প্রথার শত্রু। কবি এমন এক স্বৈরাচারী আত্মা যার কোনো লোকজন নেই। ফলে রাষ্ট্রীয়-ধর্মীয়-প্রথাবাদী সন্ত্রাসের কাছে সে হয়ে পড়ে অসহায়। ফলে সে নিহত হতে পারে, তার মতামতের জন্য। যদি তা নাও হয় তবুও সে নির্বাসিত কিংবা পলায়নবাদী।

সত্যিকারের একজন কবি গ্রামে বা নগরে আত্মনির্বাসিত। কবিদের নিরাপদ বাসস্থান হিসেবে চিহ্নিত কোনো জনপদ দুনিয়াতে নেই। তার নিবিষ্টতা দরকার, প্রয়োজন আত্মমগ্নতা। আমার বিশ্বাস হট্টগোলের ভেতর কবিতা তৈরি হতে পারে না।

একজন কবি অনেক কিছুরই সমীকরণ করতে জানে, কিন্তু সে বলতে পারে না সে কী কী জানে আর কী কী জানে না। মহত্তর কোনো কবিকেও যদি জিজ্ঞেস করা হয় ‘কাকে বলে কবিতা’। তাহলে আমার বিশ্বাস সেন্ট অগাস্তিনের মতো সেও বলবে যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয় তো আমি জানি না, না হয় জানি।

যদি কুড়িজন কবিকেও একই প্রশ্ন করা হয়, মনে হয় কুড়িজনের উত্তর হবে কুড়ি রকম। ‘কাকে বলে কবিতা যদি তা না বাঁচায় দেশ কিংবা মানুষকে’, এভাবেই চেশোয়াভ মেউশ বিস্মিত হয়েছিলেন তার প্রথম দিকের এক কবিতায়।

গত শতকে তিনি তখন নাজিবিরোধী প্রতিরোধ কমিটির সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে। প্রায় একটা ব্যাপারে ভেবেছি যে, পৃথিবী যেমন পরিবর্তিত হয় নিরন্তর, যেমন গত একশ’ বছর আগেকার মানুষের পোশাক দেখে আমাদের হাসি পাবে হয়তো এ সময়ে বসে- একজন কবির চিন্তাও এভাবে পরিবর্তত হয়। তার চিন্তা প্রসারিত হতে হতে তার ধারণাগুলো বদলাতে থাকে।

এ জন্য একজন কবির প্রথম দিকদার কবিতার সঙ্গে পরিণত বয়সের কবিতার চিন্তার তফাত হতে পারে। ঘটতে পারে স্ববিরোধিতাও। তার মধ্য বয়সে রচিত আর এক কবিতায় তিনি বলেছেন ‘কোনো দেশকে ভালোবেসো না : দেশগুলো চট করে উধাও হয়ে যায়... মানুষকে ভালোবেসো না : মানুষ চট করে ধসে যায়।’ এখানে মিউশের স্ববিরোধিতা লক্ষণীয়। প্রথমার্ধে তিনি বললেন, কবিতাকে হতে হবে দেশ ও মানুষের বাঁচার উপায়। দ্বিতীয়ার্ধে তিনি বলছেন মানুষ আর দেশকে ভালোবেসো না। এভাবেই কবির ধারণাগুলো বদলাতে থাকে। কবি স্ববিরোধী হতে পারেন, তিনি দার্শনিক নন। এ ব্যাপারে পার্টিজান রিভিউতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তার জবানবন্দি :

‘আমি স্ববিরোধিতায় পূর্ণ মানুষ। সেটা অস্বীকারও করব না। আমি ফরাসি দার্শনিক ওয়েইল সিমঁর লেখাপত্র অনুবাদ করেছি, তিনি তো পরস্পর বিরোধিতার সমর্থক। আমার দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় রয়েছে, এরকম ভান করা আমি পছন্দ করি না।’

এটা ছিল আসলে পরিবর্তনের সমস্যা। যে কোনো ক্ষমতা অনেকটা নারীর মতো। যখন মানুষ সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্ন দেখে সেটা প্রেমে পড়ার মতো ব্যাপার। তখন সে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার আদর্শ সমাজের বাস্তবায়নে, আর যখন সেটা বাস্তবায়িত হয়ে যায় তখন সৃজনশীলরা বিশেষ করে কবিরা গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে আসেন।

তাদের পরিণতি হয় দাগা খাওয়া প্রেমিকদের মতো। হয়তো পালিয়ে যায় তারা দেশ থেকে হয়তো কেউ বেছে নেয় আত্মহনন। এটা দেখা গেছে, কম্যুনিস্টশাসিত প্রায় সব দেশেই। সাবেক সোভিয়েত থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা তা অনুধাবন করতে পারি। এ ব্যাপারে পোল্যান্ডের আরেক কবি ভিসুয়াভা সির্ম্বোসকা তার এক সাক্ষাৎকারে জবান দিয়েছিলেন।

তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল :

‘কমিউনিজম পছন্দ করতেন আপনি, লিখতেন বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনও কি তাই?’

সির্ম্বোসকা বলেছিলেন, ‘খুব মুশকিলে ফেললেন। এ সময়ের মানুষ সেই সময়টাকে বুঝতে পারে না। মানবতাকে রক্ষা করতে চাইছিলাম আমি। কিন্তু আমি বেছে নিয়েছিলাম ভুল পথ। মানবজাতির প্রতি ভালোবাসার কারণে এটা করেছিলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম পরে যে মানবজাতিকে ভালোবাসা উচিত নয়। আপনি বরং তাদের পছন্দ করতে পারেন। পছন্দ, তবে ভালোবাসা নয়। মানবতাকে আমি ভালোবাসি না, আমি ব্যক্তিসত্তাকে পছন্দ করি। আমি মানুষকে বোঝার চেষ্টা করি, তবে তাদের কোনো সমাধান দিতে পারি না।

তিনি আরও বয়ান করেছিলেন, ‘সেটা ছিল আমার জন্য খুবই কঠিন কাজ। এটা ছিল আমার তারুণ্যের এক ভুল। ভালো বিশ্বাস থেকে এটা হয়েছিল। এবং দুর্ভাগ্যবশত প্রচুর কবিই এ কাজটি করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাদের আদর্শ পরিবর্তনের জন্য তাদের জেলে যেতে হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমি ওই নিয়তি থেকে রেহাই পাই, কারণ প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মীর স্বভাব আমার কোনদিন ছিল না।’

এরপর স্বভাবতই পোলিশ কবি-সাহিত্যিকরা ঝুঁকেছিলেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের দিকে। তবে এ দফায় মিউশের ব্যাপারটা আলাদা। মিউশের প্রথম দিকের কবিতায় উচ্ছ্বাস থাকলেও মধ্য ও শেষ পর্বে তার কবিতা খাঁটি দার্শনিকতায় ঋদ্ধ। তার প্রথম দিকের একটি কবিতা।

‘প্রথম যে আন্দোলন, সে হল গান করে উঠা/ অবাধ এক কণ্ঠস্বর, গিরি প্রান্তর ভরাট করা/ প্রথম যে আন্দোলন সে উল্লাস/ কিন্তু তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ সব কবিতার সঙ্গে যে কোনো কবি একাত্ম হয়ে যেতে পারে। একজন কবির অভ্যন্তরীণ বিবর্তন এসব লাইনে প্রখর হয়ে ওঠে।

‘আর এখন বছরগুলো রূপ বদল ঘটিয়েছে আমার রক্তের/ আর হাজার হাজার নিহারীকার জন্মমৃত্যু হয়েছে আমার দেহে/ আমি বসে থাকি ধূর্ত আর রাগী এক কবি/ অভিশাপে কুঁচকে যাওয়া চোখে প্রতিশোধের।’

তবুও তিনি আশাবাদী থাকতে চান:

‘কেউ কেউ আশ্রয় খোঁজে নিরাশায়, যা কিনা/ কড়া তামাকের মতো মিষ্টি/ যেন বিনাশের সময় পান করা এক গেলাশ ভোদকা’

এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন :

‘কিন্তু আমার হাতে বর্তেছে এক বিশ্বনিন্দুকের আশা/ কারণ আমি চোখ মেলেই দেখেছি, শুধু আগুনের ঝলক, নিধন আর ধ্বংস/ শুধু অবিচার লাঞ্চনা আর হামবড়াদের হাস্যকর লজ্জা/ আমারি ওপর বর্তেছে অন্যদের উপর প্রতিশোধ নেবার দায়, আর নিজের ওপরও।’

আর কবি নিজের পরিচয় দিচ্ছেন এভাবে :

‘কারণ আমিই ছিলাম সেই লোক যে সব জানত/ কিন্তু সেই জ্ঞান থেকে যে নিজের জন্য কোনো মুনাফা নিঙড়ে নেয়নি।’

একজন কবিকে বুঝতে হলে বস্তুত তার জীবনকেও বুঝতে হবে। কারণ সেই কবিই মহৎ যার জীবনের সঙ্গে তার কবিতার সখ্য আছে। জীবনবোধ কবিতার ইতিহাসে অনেক মূল্যবান। আর এই জন্য পৃথিবীর অধিকাংশ মহৎ কবিদের জীবন হচ্ছে দুর্দশা আর লাঞ্ছনার ইতিহাস।

রিলকে বলতেন, ‘প্রতিভা হচ্ছে যন্ত্রণা সহ্য করবার ক্ষমতা’। এক অবর্ণনীয় দুঃখবোধ পুরো জীবনের আবরণ ছিল গিওকোমো লিওপার্দির। এ ব্যাপারে দার্শনিকরাও কবিদের ওপর কম ক্ষ্যাপা ছিলেন না। প্লাতোনীয় সক্রাতেস সিদ্ধান্ত করেছিলেন :

‘কবির সৃষ্ট সত্যর মূল্য অতি নগণ্য। কবির আবেদনও আমাদের আত্মার অধম অংশেরই নিকট। এবং এ কারণে আমাদের সুশাসিত রাষ্ট্রে কবির প্রবেশ নিষিদ্ধ করলে আমরা সঠিক কাজই করব। কারণ যুক্তির বিনিময়ে কবি আমাদের আত্মার অধম উপাদানগুলোকে উত্তেজিত করে তোলে। এগুলোকে সে উৎসাহিত এবং শক্তিশালী করে তোলে। আত্মার অধম অংশকে প্রবল করার অর্থ রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং পরিচালনার ভার নিকৃষ্টতম চরিত্রের হাতে তুলে দেয়া। এবং রাষ্ট্রের উত্তম চরিত্রের ধ্বংস সাধন করা।’

সক্রাতেস নিজেই একজন কাব্যবোদ্ধা ছিলেন। তিনি প্রায়শই আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা টানতে গিয়ে হোমার থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। তাহলে আমরা এই সিদ্ধান্ত করতে পারি যে, কবিকে বুঝতে না পারার অসুখটা আজকের নয়।

‘কবিতা কেন লেখে একজন কবি’ এ ধরনের প্রশ্নে কবিরা রেগে যেতে পারেন। কারণ সাহিত্যের ইতিহাস বস্তুত কাব্যের ইতিহাস- যদিও আমরা মহাকাব্যের যুগ পেরিয়ে কবিতার আরও অনেক স্তর পেরিয়ে এসেছি।

চেশোয়াভ মিউশের কবিতাও সেই ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। মিউশের কবিতার গভীরে এক দার্শনিক নিঃসঙ্গ চেতনা লুকায়িত আছে। তার জবানে:

‘এক সকালে ইউনিভার্সিটির ক্যাফেয় বসে আছি, একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম যেন। এর ফলে কবিতাটা লিখে ফেললাম:

‘আমার বাবা মা, আমার স্বামী, আমার ভাই, আমার বোন/ প্রাতঃরাশ খেতে খেতে একটি ক্যাফেটেরিয়ায় আমি শুনতে পাচ্ছি/ নারীদের কণ্ঠস্বরের মর্মর ধ্বনি, পূর্ণ করছে নিজেদেরকেই/খুব দরকারি এক আচার অনুষ্ঠানে/ আমি তাদের স্পন্দিত ঠোঁটের দিকে পাশ থেকে এক ঝলক তাকাই/ এবং এই পৃথিবীতে আছি বলে উচ্ছল হয়ে ওঠি। এ পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে আর একটা মুহূর্ত থাকতে পারব তার জন্য/ ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র আমিত্বকে উদযাপন করবার জন্য/’।

মানুষ বস্তুত আমিত্বময় একটা প্রাণী। শুধু মানুষই নয়, প্রায় সমস্ত প্রাণী কুলেরই এই বৈশিষ্ট্য আছে। কারণ সেলফিশ জীবন। এ কারণে আত্মরক্ষাটাই হচ্ছে মানুষের প্রধান জৈবিক প্রকরণ। এই আমি বেঁচে আছি, এ অনুভূতিই মানুষকে সচল রাখে। মিউশের নিঃসঙ্গতা অনেকটা অস্তিত্ববাদীদের মতো। শোনা যায় প্যারিসে থাকাকালীন তার সঙ্গে অস্তিত্ববাদী ঔপন্যাসিক আলবেয়ার ক্যামুর বন্ধুত্ব হয়েছিল।

যদিও তার কবিতায় দু’জন প্রাক-সক্রাতেস যুগে দার্শনিকের উল্লেখ পাওয়া যায়। পিথাগোরাস ও হেরাক্লিতস। এদের মধ্যে হেরাক্লিতস তার এক কবিতারই শিরোনাম। ‘সবকিছুই বয়ে চলে’ এটা ছিল হেরাক্লিতসের বিখ্যাত উক্তি।

প্রাক-সক্রাতাস যুগের প্রথম বিবর্তনবাদী দার্শনিক হিসেবে তিনি উল্লেখের দাবিদার। হেরাক্লিতস মনে করতেন ‘নিশ্চয়ই কোনো এক ধরনের বৈশ্বিক প্রজ্ঞা রয়েছে যার নির্দেশনা অনুযায়ী সবকিছু ঘটে। তাকে তিনি ঈশ্বর না বলে বলতেন ‘লোগোস’। এই গ্রিক শব্দটির অর্থ হচ্ছে প্রজ্ঞা। এই প্রজ্ঞা সবকিছুতেই বিদ্যমান। এবং হেরাক্লিতসের আরও একটি বিখ্যাত ধারণা হচ্ছে ‘সবকিছু এগিয়ে যাচ্ছে একটা দ্বন্দ্ব তথা বৈপরিত্যের মধ্য দিয়ে।

বস্তুর ক্রম বিন্যাসে ভালো আর মন্দ এই দুয়েরই যার যার স্থান রয়েছে। বৈপরিত্যের এই নিত্য আন্তঃসম্পর্ক না থাকলে জগতের অস্তিত্ব থাকত না। দিন আর রাত, শীত আর গ্রীষ্ম, যুদ্ধ আর শান্তি, ক্ষুধা আর পরিতৃপ্তি এই হচ্ছে লোগোস।

মিউশের মতে ‘সে যেই হোক না কেন। যখন ভোর হয়ে আসে সে দেখছিল ভাঁজখোলা পাহাড়গুলো/....দিনের পর দিন। আর সে খেয়াল করার আগেই বছরের পর বছর/... সে কার জন্য, সে ভেবে ছিল, এমন ঐশ্বর্য? শুধু আমার একার জন্য?/অথচ আমি মরে যাবার অনেক পরেও তা থেকে যাবে /... আমিই যদি সমগ্র মানবজাতি, ওরা কি তবে ‘তারা’ আমাকে বাদ দিয়েই?’

মিউশ রুশ, স্লাভ, পোলিশ না আমেরিকান সেটা কোনো ব্যাপারই নয়। সত্য হচ্ছে যে, তিনিই বিংশ শতাব্দীর মহৎ আধুনিক কবিদের একজন হয়েও আধুনিকোত্তর। কারণ শেষ পর্যন্ত আশাবাদিতাই তার কণ্ঠস্বর। তাকে মহত্তম বলেছেন আর এক রুশ নোবেলপ্রাপ্ত কবি যোশেফ ব্রদস্কি।

সম্ভবত কবিরা ভিন্ন তাদের কণ্ঠস্বরের কারণে, আঙ্গিকের কারণে, নইলে সব মহৎ কবিই এই পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য অথবা ন্যায়ের শাসনে আলোকিত দেখতে চেয়েছেন। বাংলা ভাষার বিষাদাচ্ছন্ন কবি জীবনানন্দ দাশেরও এত যে বিষাদ। তিনিও শেষ পর্যন্ত ঘুম থেকে উঠে বলেছেন ‘আমরা তিমির বিনাশী’।

অনেক পথ পাড়ি দিতে হয় কবিকে। যেন সে কোনো গভীর সামুদ্রিক ইলিশ ঢেউয়ের তরঙ্গ ভেঙে ভেঙে ভয় থেকে দূরে তার ডিমপাড়ার জন্য তাকে খুঁজে নিতে হয় নিস্তব্ধ তরঙ্গবিহীন কোনো নদী। কারণ ইলিশ মাতা চান তার সব সন্তান যেন বেঁচে থাকে। মিউশও তেমনি।

তার সময় তাকে বলে দিয়েছে কোথায় তাকে পালাতে হবে বুকে কবিতা সৃষ্টির ডিম নিয়ে। প্লাতনীয় সক্রাতেসের পরামর্শ সত্ত্বেও কবিতা বেঁচে আছে, যতদিন ভাষা বেঁচে আছে, শব্দ বেঁচে আছে, মানুষ কথা বলছে, কবিদের শেষ নেই, বিনাশ নেই। মিউশ মারা গেছেন ২০০৪ সালের ১৪ আগস্টে। তার কবিতাগুলো খুঁজে নেবে কোনো ইপ্সিত কবিকে। তিনিও হয়তো মিউশের মতো বলবেন :

‘আর তুমি যা কর সেতো একই কথা বারে বারে আওড়ানো/ যদি শুধু যথেষ্ট সময় থাকত/ যদি শুধু যথেষ্ট সময় থাকত/ কোনো মন্দিরের স্তম্ভগুলোর মধ্য দিয়ে শুদ্ধিকরণের উৎসবে/ লোকের জমায়েতকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পছন্দ করতে তুমি/ শুদ্ধিকরণের উৎসব? কোথায়? কখন? কার জন্য?’