প্রাচীন আরবি কবিতা অবলম্বনে চলচ্চিত্র ‘জুদ’

  যুগান্তর ডেস্ক    ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৌদির বিবর্তন বিপ্লবের মুকুটে আরও একটি নতুন পালক যুক্ত হতে যাওয়া সিনেমা ‘জুদ’। এর আগে চলচ্চিত্র দুনিয়ায় তেমন কোনো সাড়া ফেলতে পারেনি তারা। ২০১২ সালে নারী পরিচালক হাইফা আল মানসুর ড্রামাটিক সিনেমা ‘অয়াজদাহ’ নির্মাণ করে সৌদি চলচ্চিত্রে কিছুটা পরিবর্তনের আভাস দিয়েছিলেন। এরপর ‘জুদ’ এসে সৌদি ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে নতুন গল্পের সৃষ্টি করল-

‘জুদ’ কিং আবদুল আজিজ সেন্টার ফর ওয়ার্ল্ড কালচার (ইথ্রা) অর্থায়নে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র। এটি একটি অনন্য মুভি যা কথোপকথনমুক্ত মোশন ধারার চলচ্চিত্র। ছবিটির গল্প এবং এতে বিশষে ধরনের আওয়াজের ব্যবহার দর্শককে এক জীবন চক্রের ভেতের নিয়ে যায়। দর্শককে উপলব্ধি করায় অতীত ও প্রাচীন জীবনের রোমাঞ্চকর আবহ। যেখানে দৃষ্টি ও অনুভূতি একীভূত হয় একটি চিত্রকল্পে।

ছবিটির যথোপুযক্ত ইংরেজি শিরোনাম ‘scarcity in the face of generosity’। নানা আরব্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উল্লেখ এবং বিশেষ করে আরব উপদ্বীপের বেদুঈন সংস্কৃতিকে নির্ভর করেই জুদের নির্মাণ। প্রাচীন আরবি কাসিদা এবং প্রাক-ইসলামী কবিতা উপজীব্য করে নির্মিত হয় চলচ্চিত্রটি। ছবিটিতে গল্প বলার অত্যন্ত শক্তিশালী পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে প্রাচীন সময়ের উল্লেখকে। চলচ্চিত্র নির্মাতারা ‘ancient poem for modern times.’ (আধুনিক সময়ে প্রাচীন কবিতা) করে এটির নামকরণ করেন।

সৌদি আরবের ভিন্ন ভিন্ন ১৫টি অঞ্চল ও ভূখণ্ডে এর শুটিং করা হয়। সৌদি ও আন্তর্জাতিক অভিনয়শিল্পীদের অংশগ্রহণ এবং কলাকুশলীদের দারুণ সব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই নির্মাণ করা হয়েছে জুদ। ছবিটি আরব জাতির অতীতকালীন জীবনের বিভিন্ন পদজুড়ে একটি বিস্তর ভ্রমণের আখ্যান। প্রাচীন এবং আধুনিক সময়ের শব্দ মিশ্রণেই তৈরি করা হয়েছে এটির দারুণ এক সাউন্ডট্র্যাক। মূলত এ সাউন্ডট্র্যাকের ওপরই নির্ভর করে আছে ছবিটি। যে শব্দশৈলীর মাধ্যমে দর্শকের সামনে ফুটে ওঠে আগেকার আরব্য ঐতিহ্যগুলোর অভিজ্ঞতা প্রদর্শন। একইভাবে এ শব্দের ভেতরই একত্রিত হয় দর্শকের দৃষ্টি ও মনোযোগ। পুরনো ঐতিহ্য এবং আধুনিক জনজীবনকে পাশাপাশি স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে জুদে। এর মাধ্যমে সৌদি আরবের অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোও বড় পর্দায় নিয়ে আসা হয়েছে বলে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাচীন আরবীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক অনন্য গল্পই হল জুদ।

সৌদি আরবে চলচ্চিত্র শিল্পকে আরও পোক্ত ও শক্তিশালী করতে এটি একটি বৈপ্লবিক কাজ বলে মনে করছেন নির্মাতারা। এ ছাড়া বৈশ্বিকভাবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া এবং বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত চলচ্চিত্র দৃশ্যে সৌদি চলচ্চিত্র শিল্পের প্রবেশপথ তৈরি করার লক্ষ্যেই জুদ নির্মাণ করা হয়েছে। জুদ নির্মাণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রাচীন স্থাপত্য ব্যবহারের মাধ্যমে এটিই প্রমাণ করা হয়েছে, সৌদি আরব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র তৈরির কেন্দ্র হতে পারে। ঠিক আরেক আরব রাষ্ট্র জর্ডানের মতোই। যেখানে ইন্ডিয়ানা জোন্স এবং দ্য মার্টিয়ানের মতো চলচ্চিত্রগুলো পেত্রা এবং ওয়াদি রুমের মতো বিশেষ পর্যটন স্থানগুলোতে প্রদর্শন করা হচ্ছে। সম্প্রতি যা একটি বিশ্ব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে এবং পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

জুদ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন অ্যান্ড্রু ল্যানকাস্টার এবং ওসামা আল-খুরাগী। ল্যানকাস্টার একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত অস্ট্রেলিয়ান পরিচালক এবং সুরকার। যিনি সিনেমায় তার দৃঢ় ও চাক্ষুষ গল্প বলার জন্য সুপরিচিত। এবার সংলাপবিহীন একটি নৈঃশব্দ চলচ্চিত্র তৈরি করে নিজের অন্য আরেকটি পরিচয় দাঁড় করালেন তিনি। আল খুরাগী সৌদি পরিচালক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। যার ঝুলিতে রয়েছে বেশ কটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র এবং ডকুমেন্টারি।

পরিচালক আল-খুরাগী বলেন, ‘এটা তেমন সহজ কাজ ছিল না’ আরব সংস্কৃতি সাধারণত মৌখিক যোগাযোগের ওপরই নির্ভরশীল। তাই একটি গল্পের ভেতর আকর্ষণীয় ও চাক্ষুষ বিষয়গুলো খুঁজে পাওয়া এবং সেটিতে আকর্ষণ সৃষ্টি করা একটি দুর্দান্ত চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু আমি গর্বিত। আমরা চলচ্চিত্রের দৃঢ় কাহিনী তৈরি করেছি এমনকি সেই দাগটিসহকারেও যা আমরা নিজেদের দিয়েছিলাম। কারণ শক্তিশালী, কার্যকর এবং প্রতিক্রিয়াশীল কোনো সাউন্ডট্র্যাক শিল্পে কখনও সংলাপের চেয়েও বেশি ভূমিকা রাখে। দর্শককে আরও দৃঢ়ভাবে ঘোরে আটকে রাখতে সক্ষম হয়। তাই কোনো শব্দ ছাড়াই একটি নৈঃশব্দ চলচ্চিত্র পরিচালনা করার চ্যালেঞ্জগুলো স্মরণ করে আমি খুবই আপ্লুত।

প্রযোজক টুড নিমস বলেন, এটি একটি নিঃশব্দ ধ্যানের মতোই। সময় ও জীবন যেখানে স্থির হয়ে মিশে যায়। কো-প্রোডিউসর আবদুল্লাহ আইয়াইফ চলচ্চিত্রটির সাধারণ একটি কনসেপ্ট নিয়ে এসেছিলেন। পরে আমরা জুদকে অন্যরকমভাবে নির্মাণ করতে চেয়েছি। শব্দকে একটি পূর্ণ পরিসীমার ভেতর ব্যবহার করতে চেয়েছি। নিমস মুভিটি নিয়ে তার অনুভূতি সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা আরব্য সংস্কৃতির সার্বজনীনতা ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। সার্বজনীনতা অর্জনে বিভিন্ন বৈচিত্র্য ও গভীরতার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ঐতিহ্যগত এবং আধুনিক সময়কার শব্দের সম্পূর্ণ ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম আমরা।’

জুদের সাউন্ডট্র্যাক পরিচালনা করছেন কম্পোজার জেরি লেন এবং দিয়া আজোনি। যিনি অস্কারের জন্য মনোনীত জর্ডান চলচ্চিত্র ঞযববন-এর কম্পোজ করেছিলেন। অন্যদিকে আজোনি গত তিন বছরে ১৮টিরও বেশি চলচ্চিত্র এবং তথ্যচিত্রের ওপর কাজ করেছেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শব্দগুলোর সমন্বয় আনতে ভিন্ন ধরনের সাউন্ডট্র্যাক তৈরিতে তারা উভয়ই এ দারুণ কাজে অংশগ্রহণ করেন।

সাউন্ডট্র্যাকের মূল সুর ও আবেদন ফুটিয়ে তুলতে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সঙ্গীতশিল্পীদের লাইভ রেকর্ডিং করা হয়। স্থানীয় সঙ্গীতশিল্পীদের সঙ্গে লাইভ রেকর্ডিংয়ের কাজগুলো সম্পন্ন করা হয় জেদ্দাতেই। এ ছাড়া অন্য আরেকটি লাইভ রেকর্ডিং লন্ডন অর্কেস্ট্রাতে সম্পন্ন করা হয়। এ ছবির নিজস্ব সাউন্ডট্র্যাকটি নিজেদের রেকর্ড হিসেবে প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ।

পরিচালক নিমস চলচ্চিত্রটির রেটিং সম্পর্কে বলেন, আমরা মনে করি এটি খুবই সার্বজনীন এবং এটাই আমাদের সাফল্যের পয়েন্ট হিসেবে সামনে আসবে।

চলচ্চিত্র কর্মকর্তাদের মতে, ২০১৮ সালের শেষে বা ২০১৯ সালের শুরুতে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তির জন্য প্রস্তুত ‘জুদ’। এর আগে অবশ্য সৌদির জাতীয় দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে সৌদি থিয়েটারে প্রথম দেখানো হয়েছিল মুভিটি।

তারপর আন্তর্জাতিকভাবে প্যারিস, ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক এবং অন্যান্য শহরেও দেখানো হয়।

আল আরাবিয়্যা অবলম্বনে লিখেছেন কাউসার মাহমুদ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×