স্টালিনের কবিতা

প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রবিউল হুসাইন

তারুণ্যের কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন এ বছর ছাপ্পান্ন বছরে পা দিলেন। গত বছর তার শ্রেষ্ঠ কবিতা বেরিয়েছে তরুণ শিল্পী মুস্তাফিজ কারিগরের আঁকা প্রচ্ছদ আকর্ষণীয়, স্টালিনের কবিতার মতোই সুরুচিসম্পন্ন ভূমিকা লিখেছেন চিন্তাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এই গ্রন্থে রেজাউদ্দিন স্টালিনকে পাওয়া যাবে বিধায় আমি খুঁজেছি আদ্যোপান্ত এই সমগ্রতে কবির নানা ধরন, বিষয়, বৈশিষ্ট্য ও চিন্তার শাব্দিক প্রতিফলন ঘটেছে। এখানে উল্লেখ নেই কোন কবিতা কোন বই থেকে নেয়া হয়েছে, নাকি শ্রেষ্ঠ কবিতা বিবেচনায় কবি এই বইয়ের জন্য বিশেষভাবে সব কবিতা রচনা করেছেন। সাধারণত প্রকাশিত বই থেকে যাচাই-বাছাই করে শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলনে কবির পছন্দ অনুযায়ী কবিতা স্থান পায়। অবশ্য এরকম হতেই হবে এমন নয়। কবি স্টালিন যেমন করেছেন তাও হতে পারে, এতে কোনো আপত্তির কারণ নেই। আবার বিষয়ভিত্তিক বিভাজনেও হতে পারে, এতে পাঠকদের বাছ-বিচারে সুবিধা হয়, এটুকু বলা যায়। আর পাদটিকা দিয়ে প্রকৃত প্রস্তাবে বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্র বা ঘটনা সম্পর্কে জানান দিলে পাঠকের সুবিধা বাড়ে।

কবিতা কী, এর সর্বগ্রাহ্য কোনো সংজ্ঞা তৈরি হয়নি, যেমন হয়নি প্রেম, সঙ্গীত, সৌন্দর্য ও শূন্যতার। বলা হয় সেটিই শিল্প বিচারে সর্বমান্য যেটিকে কোনো সংজ্ঞার বন্ধনে আবদ্ধ করা যায় না। যে কবি পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ যত নিপুণ ও আপন করে তৈরি করতে পারবেন তিনিই সফল হবেন। না পারলে হবেন না, তাতে কোনো আক্ষেপ থাকতে নেই, যেহেতু শিল্প সর্বদা রহস্যময়, কুয়াশাঘেরা ও আলো-আঁধারিতে আবৃত। শিল্প, সঙ্গীত- সব এ রকমই, কবিতা তো বটেই। তা না হলে কবি স্টালিন কীভাবে উচ্চারণ করতে পারেন নিুোক্ত পঙ্ক্তিমালার বা ‘নতুন কাব্য গঠনরীতি’ শীর্ষক কবিতায়।/বাক্যটা এইভাবে সাজাতে চাই : হাঁটছিলাম সবুজ ঘাসের উপর/কিন্তু প্রচলিত প্রথাগত বাক্য বিন্যাসে আমার অরুচি/বরং যদি আমরা বলতে অভ্যস্ত হই ঘাসই হাঁটছিল আমার উপর, অথবা নাগরিক : এভাবে পথ খুঁজতে খুঁজতে আমাদের বাড়ি হবে।

কবি স্টালিন প্রকৃত কবির মতো সব উল্টেপাল্টে দেখেন, ভিতর থেকে বাইরে এবং বাইরের থেকে ভিতরে, ওপর থেকে নিচে আবার নিচের থেকে উপরে। নিজের সৃষ্টিশীল নির্মাণের জন্য প্রেম প্রকৃতি, মানুষ ঈশ্বর থেকে দেশ, দেশের ইতহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, লৌকিক সংস্কার, লোকগাঁথা, নদী, পাখি, মাটি, ফল, ফুল, ফসল, সবকিছুকে স্পর্শ করতে চান শব্দের বিশাল বিভূতি দিয়ে, নির্বিশেষে। তার বিশেষ পক্ষপাতিত্ব পৌরাণিক গ্রিক রোমান পুরনো অন্ত্যমিল ও মাত্রাযুক্ত ছন্দ প্রয়োগ এবং আর রামায়ন-মহাভারতের বিভিন্ন আখ্যান দিয়ে নতুনভাবে পরীক্ষণ নিরীক্ষাপ্রসূত নতুনত্বকে আবিষ্কার করার সাবলীল প্রয়াস যা তাকে পৃথক পরিচয়ে পরিচিতি দিয়েছে। তাই তিনি অনায়াসে ডেমোক্লিসের তরবারি’তে বলেন : এতকিছু দেখে-শুনে আর কত নত হতে পারি মাথায় নৃত্যরতে ডেমোক্লিসের তীব্র তরবারি।

আবার ভাঙ্গা দালানের স্বরলিপি কবিতায় বলেন : দশদিগন্ত মহাভারতের রথে/উড়ে আসে কারা গরুড়ের সৈকতে? এই বসন্তে চীবর দানোৎসব/বদলে কি দেবে, তাদের সে অনুভব?

কবি গদ্যছন্দ, অন্ত্যমিল বা নিজস্ব কাব্যধারা নির্মাণে সচেষ্ট এবং তীক্ষ্ম। রেজাউদ্দিন স্টালিন তার সময়কে ধারণ করেছেন অনেক কবিতায়। কোনো কোনো কবিতায় সময়ের খণ্ড চিত্র, আবার কোনো কোনো কবিতায় সময়ের পূর্ণচিত্র ফুটে উঠেছে শৈল্পিক সৌন্দর্যে, পরোক্ষে, ইঙ্গিতে সংকেতে। ফলে সে সব কবিতা সময়ের চালচিত্র হয়েও, সময়োত্তীর্ণ শিল্পীত বয়ান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি তার সময়কে এভাবে ভাষারূপ দিয়েছেন : ‘আমার সময় গো-ক্ষুরের মতো বিভাজিত/মুহূর্তগুলো কালো-কৃষকের পায়ের মতো ফাটা,/এখানে গ্রামজীবনের অর্থাৎ লোকমানুষের উৎপাদক শক্তির সহায়ক, হাজার বছর এই জনপদের গো শক্তির ক্ষুরকে সময়ের বিভাজন মাত্রায় সমুপস্থিত করা হয়েছে এবং অভিজ্ঞতাকে কী কৌশলে না কবি ব্যবহার করেছেন তার সময়ের রূপ-স্বরূপ-উপস্থাপনায়। এ থেকে স্পষ্ট এ কবি বৃক্ষের মতো মাটি থেকে রস গ্রহণ করে অতিবাস্তবতায় বিস্তার করেন শাখা-প্রখাশা, যা কিনা সজীব, সতেজ ও পত্র-পুষ্পে সুশোভিত, সুরভিত। এ সূত্রে সমকালীন বিষয়-আশয়ও তার কোনো কোনো কবিতায় শিল্পরূপ লাভ করেছে; যেমন- ‘ফেলানী বৃন্তান্ত’ কপোতাক্ষ, ‘তদন্ত রিপোর্ট’ প্রভৃতি। তার যাত্রা ‘স্বপ্নময় সুন্দরের দিকে’, তিনি সেই যে যাত্রা করেছেন তা এখনও অব্যাহত আছে। তিনি নিজেও এ ব্যাপারে সচেতন; তাই তিনি বলতে পারেন ‘ফিরিনি অবাধ্য আমি’। তিনি কোথায় যাবেন? তার কথাতেই শোনা যাক : ‘আমি যাবো পথের চেয়েও দূরে/দিগন্তের কাছাকাছি আরশিনগরে/ যেখানে পথের পাশে নীলকণ্ঠ মেঘের কলস/জীবন জীবন রক্তমুখ উবু হয়ে আছে’/‘ফিরিনি অবাধ্য আমি’। তার এ যাত্রা ‘বিরুদ্ধ স্রোতে যাত্রা’। তিনি সুস্পষ্ট করে বলেছেন- তার যাত্রা স্বর্গের দিকে নয়, নরকের দিকেও নয়; তৃতীয় কোনো দিকে; যাকে আমরা বলতে পারি শিল্পের দিকে, সৌন্দর্যের দিকে। ‘প্রত্যাবর্তনের সব শর্ত ছিঁড়ে ফেলে’ ‘আর কোনো দিন পেছনে না-ফেরা’র দৃঢ় অঙ্গীকার করে তিনি নিরন্তর ছুটে চলেছেন আপন গন্তব্যে। বাংলাদেশ কবির কাছে ফিনিক্স ভূমি। এ দেশের লয় নেই, ক্ষয় নেই, বার বার ধ্বংস থেকে জেগে ওঠার অফুরানা ক্ষমতা আছে এ দেশের মানুষ আর মাটির। কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন তার কবি জীবনের মশালে যেন সব সময় সৃষ্টিশীল ফুঁ দিতে এবং কাব্যের শামাদান প্রজ্বলিত রাখতে প্রয়াস পান সেই কামনা করি।