মঞ্জু মৃত্যুভীতু এক ঈশ্বর

  হিজল জোবায়ের ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চলতি মাসের ১৭ তারিখ সন্ধ্যায় ফুসফুসের ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ৪৮ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে মৃত্যুবরণ করেন দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সেখানেই জীবনযাপন করছিলেন। মঞ্জু কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্য ও সমালোচনার কাজও করেছেন। অনিয়মিতভাবে সম্পাদনা করেছেন ‘ধীস্বর’ নামে একটি ছোটো কাগজ। প্রকাশিত গ্রন্থ ১০-এর অধিক। আটটি কাব্যগ্রন্থের সংকলন নিয়ে কিছুদিন আগেই ‘বিদ্যুতের বাগান সমগ্র’ নামে একটি বই প্রকাশ পেয়েছে। ‘কাফের’ এবং ‘জ্যোৎস্নার বেড়াল’ নামে তার দুটি উপন্যাসও আছে।

কাফকার যুগান্তকারী উপন্যাস মেটামরফোসিসের নায়ক গ্রেগর সামসার হুট করে একদিন তেলাপোকা হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ইউরোপ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে এসেছে বলে অভিযোগ করেছিলেন চেক উপন্যাসিক মিলান কুন্ডেরা। সমগ্র ইউরোপ এমনকি সারা দুনিয়ায় গ্রেগর সামসাকে অসামাজিক আর বিচ্ছিন্নতাবাদী এক চরিত্র হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। জগতের সবকিছুর ব্যাপারে নাস্তি মানসিকতা পোষণকারী, অস্তিত্বের ভারে পর্যুদস্ত, হতাশ এক সত্ত্বা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে গ্রেগর সামসাকে। যে কিনা মানুষের সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। তার মানুষ থেকে তেলাপোকার রূপান্তরের পেছনে সেই প্রত্যাখ্যানই চিহ্নিত হয়েছে। এ ব্যাখা নিয়েই আপত্তি তোলেন কুন্ডেরা। কুন্ডেরা বলেন, ইউরোপের এমন একটি সময়ে কাফকা জন্মান এবং এ উপন্যাস লেখেন যখন সারা সমাজে মেগালোম্যানিয়াক এক আমলাতান্ত্রিকতা বিরাজ করছে। এমনভাবে তা জেঁকে বসেছিল যা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল ব্যক্তি মানুষের জীবনে। স্বৈরাচারী একটি শাসন ব্যবস্থাতেও আমরা তাই দেখতে পাই। রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমাজ পরিবার এমনকি প্রত্যেক ব্যক্তি মানুষ তার প্রত্যক্ষ গ্রাসের শিকার হয়। কেউ বাকি থাকে না ওই সিস্টেমের ভুক্তভোগী হওয়া থেকে। ইউরোপে সে সময় ওই আমলাতান্ত্রিকতার এক ব্যবস্থা গেড়ে বসেছিল। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। যা এতটাই বিকৃত হয়ে উঠেছিল যে- তা প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তি জীবনেও নাক গলাত। রাষ্ট্রে, সমাজে, পরিবারে কিংবা যে কোনো দুইয়ের সম্পর্কের ভেতর সেই জটিলতা এমন আপত্তিকর অনধিকার চর্চা করত যে সেখানে ব্যক্তি সত্তার কোনো জায়গা ছিল না। ছিল না একা হয়ে যাওয়ার মৌলিক অধিকার। নিজের নিঃশ্বাস নিজে টেনে নেয়ার অবসর ছিল না। সেই লম্বা নাকের নাক গলানো সমাজে একটু একার হয়ে, একার আনন্দে বাঁচার অভিপ্রায়েই মানুষ থেকে তেলাপোকা হয়ে যায় কাফকার নায়ক। সেটা জীবনের প্রতি অনাস্থাজনিত নেতিবাচকতা বা হতাশা থেকে নয়, বরং জীবনকে উদযাপনের জন্য যে মৌলিক অভিনিবেশ দরকার সেটি নিশ্চিত করতে। তেলাপোকা হলে অন্তত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মানব সমাজ তার যাপনে বাধা দিতে পারবে না। নিজের মতো বাঁচার জন্যই ওই রূপান্তর ঘটেছিল গ্রেগর সামসার। সেটা অস্তিত্বের ভারকে প্রত্যাখ্যান করা সমাজবিচ্ছিন্নতা নয়। সমাজের অসুখটাকে দেখিয়ে দেয়া বরং। এই ছিল মেটামরফোসিস নিয়ে কুন্ডেরার বক্তব্য। যা আমাদের গ্রেগর সামসার তেলাপোকা হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ভিন্নভাবে আবিষ্কার করতে সাহায্য করে।

কিন্তু ওই যে অস্তিত্বের দুর্বহ ভার, তা তো জগতে আছে, একে মানুষ কী করে বইবে? ধর্মের যুগের অবসান হয়ে নতুন দর্শন আর বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর যুদ্ধ মানুষকে জীবন মূল্যায়নের যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে সেখানে অমরতা নেই। আছে শুধু এই লৌকিক জীবন। এ সংকট মানুষকে নতুন বাস্তবতার মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। অস্তিত্ববাদী দর্শনের স্কুলগুলো নানা এ সীমাবদ্ধ লৌকিক জীবনেরও অনেক মরমী সৌন্দর্য উপহার দিয়েছে বটে, কিন্তু তাতে কী অধিবিদ্যার মানুষের পোষাবে? হয়তোবা পোষাতেও পারত কিন্তু গত শতকের ভয়াবহ দুই বিশ্বযুদ্ধ আর তারও পরের আজ পর্যন্ত বহমান সভ্যতার রূপরেখা মানুষকে অস্তিত্বের এক ভয়াল সংকটে ফেলে দিয়েছে। ফলে সভ্যতার নতুন কালপর্বে বাস্তব ভেঙে পরাবাস্তবতার উত্থান ঘটেছে। বস্তু ফেটে বিমূর্ততায় ছড়িয়ে পড়েছে। সমাধানহীন অমীমাংসিত মানুষ শুধু পালাচ্ছে, ভাগছে, কোথায় ভাগছি আমরা! নিজের ভেতরে। আসলে কী নিজের ভেতরে? সেই গ্রেগর সামসাকে ইউরোপ যেভাবে ব্যাখ্যা করেছিল, সেই ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে আমাদের বিশাল অংশের যাত্রা, কেননা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কখনও তাও আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। আমাদের সে রকম সত্ত্বাতেই পর্যবসিত হতে হয়েছে। অস্তিত্বের ভার আমাদের ভীষণ। বয়ে নেয়া যায় না। কিন্তু মানুষ তো অমরতাও চায়। আস্থা পায় না অমরতায়, তবুও যে চায়। এই দ্বিধার বিন্দু সঙ্গে করে যারা যাত্রা করে কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু তাদের একজন। তার কবিতায় আমরা সেই ঈশ্বরের অমরতার বাসনা দেখতে পাই, কিন্তু তিনি যেন আস্থা পান না। ফলে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন, ফেটে যান, বস্তু থেকে বিমূর্ততায়, বাস্তব থেকে ক্রমে পরবাস্তবতার আড়ালে। এতটাই আড়ালে যে তিনি রূপককেও আড়াল করেন আরও আরও স্তরীভূত রূপকের ভেতর। অর্থ হারিয়ে যায়, শুধু আভা থাকে। সে আভার কোনো মানে নেই। প্রবণতা আছে, আছে মুহূর্তের উদ্ভাস। আর সেই উদ্ভাসে যে ধারণা পাওয়া যায় তাকে মনে হয় অস্তিত্বের ভার লাঘব করতে না পারা চিরন্তন মানব সত্তার ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ আসলে হাহাকার। জীবন এত ছোট কেনে? সেই হাহাকার। মঞ্জু প্রেম চান, কিন্তু প্রেমে থিতু হতে পারেন না। কেন না তিনি জানেন অমরতা নাই। দেহ ঝরে, ঝরে যায় মন তারও আগে। কোথাও স্থির হতে না পারা তার এক অস্থির চারিত্র্যই আমাদের উপহার দেয় পরবাস্তাব, অন্ধকার ভরা আরেক বাস্তবের ইশারা। সে বাস্তবে হাহাকার আছে, আছে মর্মবেদনা। আছে ক্ষোভ। সে ক্ষোভ থেকে নিজেকে ঈশ্বর ঘোষণা করেন মঞ্জু। কিন্তু নিজেকে ঈশ্বর ঘোষণা করলেও আমরা তার কবিতায় দেখতে পাই তিনি মৃত্যু ভয়ে ভীত। একাকী এক মৃত্যুভীতু ঈশ্বর!

ক্যান্সার আক্রান্ত কবিতা

৭.

ঘুমোতে চাচ্ছিলাম। কোথাও চোখ জোড়া খুঁজে পাচ্ছি না। সম্ভবত তোমার পায়ের পাশেই ফেলে এসেছি দরজা খোলা রেখেছি। তুমি কি একবার অনুগ্রহ করে আসবে! চোখ জোড়া ফেরত দিয়ে সন্তর্পণে ঢেলে যাবে মরফিন অন্ধকার আমার শতবর্ষের ঘুম

৮.

পাখিটা কানের পাশ দিয়ে ফুড়ুত করে যাওয়া আসা করে

দোয়েল পাখিটা ধরতে পারিনি

মৃত্যু, তোমায় ধরে ফেলেছি

৯.

সিংহ শিকার না করেও প্রতিটা মানুষ এক একটা শিকারি

মানুষ এক অনবদ্য মৃত্যুশিকারি

১০.

ঘুমিয়ে পড়ব বলে তোমার বুকে কবর খুঁড়েছি, সিন্দুকি কবর

দেবী দক্ষিণ, এত রাগ করছ কেন

তুমি কি জানতে না, আমার পূর্বপুরুষ কোনো জমিদার ছিল না

গোরখোদক ছিল গোরখোদক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×