চোরাবালি

প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রেজাউল করিম খোকন

কক্সবাজার থেকে প্লেনে ঢাকার শাহজালাল এয়ারপোর্টে পৌঁছতে ৪০ মিনিট লাগে। বর্ষার সময় কক্সবাজার থেকে ঢাকা আসতে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সময় একটু বেশি লাগে। আজও বেশি সময় লাগছে। বৃষ্টির কারণে কক্সবাজার থেকে আকাশে প্লেন উড়তে বেশ দেরি হয়েছে। এসব কারণে অনেকটাই বিরক্ত নাজমা বেগম। ভেতরে ভেতরে অনেকটা অস্থির থাকলেও চেহারায় তা ফুটে উঠছে না। আশ্চর্যজনকভাবে ভেতরের অস্থিরতা, উত্তেজনা ভাবটি লুকিয়ে রাখতে পারছে। তবে প্লেনে চড়ার সময় থেকে মধ্যবয়সী এই নারীর মনে এক ধরনের সংশয়, ভয় চেপে বসেছে। আজ কেন জানি মনে হচ্ছে, সামনে বড় ধরনের বিপদ ঘটবে হয়তো। দেশজুড়ে ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। গত কয়েকদিনে র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে একশরও বেশি মাদক ব্যবসায়ী মারা গেছে। র‌্যাব-পুলিশ গ্রেফতার করেছে কয়েক হাজার। পুলিশ তাদের তালিকায় থাকা মাদক ব্যবসায়ীদের বাড়িতে, আস্তানায় এবং সম্ভাব্য ঠিকানায় সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে।

নাজমা বেগম এমনিতে হাইপ্রেসারের রোগী, ডায়াবেটিসেও ধরেছে তাকে। কিন্তু এগুলো তাকে যতটা কাবু করতে পারেনি তার চেয়ে বেশি দুর্বল করে ফেলেছে গত কয়েকদিনের ঘটনাগুলো। এয়ারপোর্টে নেমেই মজনুকে মোবাইলে ফোন দেয় নাজমা। মজনু গাড়ি নিয়ে আগে থেকেই অপেক্ষা করছে তার জন্য। কক্সবাজার থেকে ঢাকা এলে মজনুর গাড়িতে চলাফেরা করে সে। যুবক বয়সী মজনু রেন্ট-এ কার-এর গাড়ি চালায়। কয়েক বছর আগে তার গাড়ির যাত্রী হয়েছিল কক্সাবাজার থেকে আসা মধ্যবয়সী এই নারী। চটপটে স্বভাবের চৌকশ ড্রাইভার মজনুর ব্যবহার এবং গাড়ি চালনায় খুশি হয়ে বেশ কিছু টাকা আলাদাভাবে বখশিশ হিসেবে দিয়েছিল নাজমা। একসঙ্গে এত টাকা বখশিশ পেয়ে বেশ অবাক হয়েছিল মজনু। সেই থেকে নাজমা বেগমের ভক্ত বনে গেছে সে। ঢাকা এলেই নাজমা তাকে আগেভাগে জানিয়ে দেয়। যে কদিন ঢাকায় থাকে, মজনুর গাড়ি থাকে তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে। ঢাকা শহরের এখানে ওখানে চষে বেড়ায় এই গাড়ি নিয়ে।

রূপনগরে গাড়ি থেকে নেমে নাজমা সোজা বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এ বাড়িতে চার তলায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে তার দুই মেয়ে রুমি ও সুমি। দুজনেই একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। নিজের জীবন নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি, অনুশোচনা, বিব্রতভাব তাকে সব সময় আচ্ছন্ন করে রাখলেও মেয়ে দুটিকে কাছে পেলে সবকিছু ভুলে যায় নাজমা। রুমি ও সুমি তাদের মায়ের ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্ধকার জগৎ সম্পর্কে অনেকটাই জানে। এ নিয়ে মায়ের সঙ্গে অনেক কথা কাটাকাটি, ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে তাদের। মাকে তাদের কাছে আসতেও মানা করেছে। ঢাকায় লেখাপড়া চালাতে মায়ের দেয়া টাকা নেবে না, বলে দিয়েছে বেশ কয়েকবার। প্রয়োজনে নিজেরা চাকরি করে কিংবা কাজকর্ম করে টাকা জোগাড় করে পড়াশোনার খরচ চালাবে জানিয়েছে। মাকে অন্ধকার জগৎ থেকে সব ছেড়ে আসতে বলেছে তারা। তা না হলে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকিও দিয়েছে।

মেয়েরা তাকে পছন্দ করছে না জানার পরও ঢাকায় এলে তাদের দেখতে আসে নাজমা। তাদের একনজর দেখতে পেলে মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। নিজের মধ্যে চেপে থাকা সব দুঃখ কষ্ট, অপরাধবোধ, অনুশোচনা তখন দূর হয়ে যায়। তখন একজন স্নেহময়ী মা হয়ে ওঠে নাজমা বেগম।

চারতলায় লিফট থেকে নামার পর তার মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে। কক্সবাজার থেকে বাঁচা মিয়া ফোন করেছে।

ও প্রান্তে বাঁচার উদ্বিগ্ন গলা শোনা যায়, বড় আম্মা, আপনি এখন কোথায় আছেন, এনডে অনেক বড় বিপদ হই গিয়েদে, গত রাইতে আঁয়ারার ফারইক্ক্যা র‌্যাবের ক্রসফায়ারে শেষ হই গিয়ে, বাড়িতুন ধরি লই তারপর হিমছড়ির পাহাড়ের কাছে রিয়ারে গুলি করি মারি ফালাইয়ে। হিতার লাশ এখন কক্সবাজার হসপিটালে পড়ি রইয়ে। উনদি লেদু, আবু আর রতইন্যারে পুলিশ ইয়াবার প্যাকেটসহ ধরি ফেইল্যে। হোন্ডাসহ হিতারা এখন থানাত আছে। বড় আম্মা, আঁয়ার অনেক ডর লাগের। থানায় মাইরের চোডে আর ক্রসফায়ারের তুন বাঁচনের লাই আঁয়ারার কারবারের ব্যাক কথা কই দিয়ে রতইন্যা। এখন কি হইব দে বড় আম্মা।’

একটানা এতগুলো কথা বলতে গিয়ে ও প্রান্তে বাঁচা মিয়া হাঁপাচ্ছে টের পায় নাজমা। এখন সে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

একজন সাহসী মানুষ হিসেবে এতদিন ধরে দেখে আসা বাঁচা মিয়া এভাবে ভয়ে ভেঙে পড়েছে দেখে বেশ বিচলিত হয় নাজমা। কিন্তু সেটা প্রকাশ না করে অনেকটা ধমকের সুরে বলে, ‘ওয়াডা বাঁচাইয়া, মাইয়া মাইনসের লান কান্দর কিল্লাই, এত্তো ডরাইলে চলিব না? তুই তো অনেক হিম্মতওয়ালা সাহসী মরদ পোয়া, তুই আঁয়ার ব্যাক কারবার এতদিন সামলাই আইসস। আজিয়া এনডইল্যা ডরাইলে চলিব না? তুই এখন কনডে?’

‘বড় মা, আই অনেক কষ্টে পুলিশ আর র‌্যাবের চোখ ফাঁকি দিই চিডাগাং যাইরগুইর। খোদা জানে, শেষ পর্যন্ত কি হইব আঁয়ার। এখন আঁয়ার চিন্তা বড় আম্মা, আওনেরে লই। লেদু আর আবু থানায় পিডার চোডে কই দিয়ে, আওনি এখন ঢাকাত আছন। র‌্যাব আর পুলিশ হেডকোয়ার্টারে খবরগান চলি গিয়ে। আঁয়ার ভীষণ ডর লাগের বড় আম্মা, এখন যদি আওনার কিছু হই যায় আঁয়ারা কেয়েনে বাইচ্চুম। বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে বাঁচা।

রূপনগরে মেয়েদের ফ্ল্যাটে বিছানায় একপাশে কাত হয়ে শুয়ে আছে নাজমা। খুব অস্থির লাগছে ভেতরে। শুয়ে শুয়ে ইয়াবার কারবারে নিজের জড়িয়ে পড়ার পরবর্তী সময়গুলোর কথা ভাবতে গিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায় নাজমা।

টেকনাফের হোয়াইকংয়ের নজু মিয়ার বউ হয়ে তার ঘরে যাওয়ার পর কিশোরী গৃহবধূ নাজমা অল্পদিনেই সংসারী হয়ে উঠেছিল। নজু মিয়া বার্মা থেকে চোরাচালানির মালামাল কেনাবেচার কারবারে জড়িত ছিল। এ ব্যবসায় মোটামুটি ভালো আয় হতো। সংসার চলছিল মোটামুটি ভালোভাবেই। সচ্ছলতা ছিল। কিন্তু দিনে দিনে বার্মা থেকে চোরাচালানির পণ্যে মাদকদ্রব্য প্রাধান্য পেতে শুরু করলে নজু মিয়া ধীরে ধীরে হেরোইন ও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। গৃহবধূ হলেও নাজমা বেগমের বৈষয়িক জ্ঞান ছিল অন্য সবার চেয়ে একটু বেশি। বিশ্বস্ত লোকজনকে ব্যবহার করে সাত আট বছরে ইয়াবা সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞীর আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে সে। প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা উপার্জন তার। দুই মেয়েকে ঢাকায় প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটিতে পড়াচ্ছে। ইয়াবার টাকায় টেকনাফ ও কক্সবাজারে দুটি বাড়ি তৈরি করেছে। সাত আট বছরে অনেক বাধা বিপত্তি প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়েছে নাজমাকে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে অনেক। বেশ কয়েকবার পুলিশ তাকে আটক করলেও বেশিদিন জেলখানায় থাকতে হয়নি তাকে। জামিনে বেরিয়ে আবার আগের মতো ইয়াবার কারবারে সক্রিয় হয়েছে।

এখন কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ইয়াবার বড় চালান নিজেই নিয়ে আসে নাজমা। এ কাজে প্রথম দিকে সড়কপথ ব্যবহার করলেও বাসে করে ইয়াবার চালান আনা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় আজকাল কক্সবাজার থেকে ঢাকায় বিমানে উড়ে এসে ইয়াবার কারবার সারছে নাজমা। কিন্তু পুলিশ-র‌্যাবের বিভিন্ন অভিযানে গত কয়েক মাসে নাজমার সঙ্গে কাজ করা কয়েকজন নারী মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে।

ইয়াবা ব্যবসা সিন্ডিকেটের সবাই নাজমা বেগমকে ‘বড় আম্মা’ বলে ডাকে। নিজের ইয়াবা কারবারে যুক্ত সবার সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার সাথী হিসেবে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা করে সে। ঢাকা চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় কারাগারে আটক থাকা নিজের দলের নারী পুরুষগুলোর একজন স্বজন হিসেবে তাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করে টাকা-পয়সা দিয়ে সহায়তা করা ছাড়াও বিভিন্ন কেনাকাটা করে দিয়ে তাদের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করেছে বড় আম্মা নাজমা বেগম। কারাবন্দি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দ্রুত জামিন করিয়ে কারাগার থেকে বের করে আনার আশ্বাস দেয়া এবং সে অনুযায়ী ছাড়িয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। অনেক ইয়াবা কারবারির মোবাইলে তার নম্বর ‘বড় আম্মা’ নামে সেভ করা আছে। পুলিশ-র‌্যাবের তালিকায় ইয়াবা ব্যবসার সিন্ডিকেটের গড মাদার হিসেবে ‘বড় আম্মা’ নামটি বেশ আলোচিত। তাদের মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীর তালিকায় ‘বড় আম্মা’ নাজমার নামটি উঠলেও সবার চোখে ধুলা দিয়ে নিজের ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে নাজমা বেগম।

এবার দেশজুড়ে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও কক্সবাজার থেকে মাদকের একটি চালান নিয়ে এসেছে নাজমা বেগম। যেখানে মাদক ব্যবসায় জড়িত বিভিন্ন লোকজন প্রতিদিনই ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে- সেখানে ইয়াবার বেশ বড় একটি প্যাকেট এনেছে সঙ্গে করে। নিজের লাগেজে করে এনেছে প্যাকেটটা। মেয়েদের ফ্ল্যাটে লাগেজটি আনলেও ইয়াবার প্যাকেটটি একটি চটের ব্যাগে মুড়িয়ে গাড়িতে রেখে এসেছে।

নিচে মজনু গাড়ি নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে।

তার ঢাকা আসার খবর পুলিশ পেয়ে গেছে। তার মানে যে কোনো সময় পুলিশের মুখোমুখি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। এখানে রূপনগরে মেয়েদের কাছে আসার খবর পুলিশ যদি জেনে যায় তাহলে যে কোনো মুহূর্তে তারা হাজির হতে পারে। আর পুলিশ কিংবা র‌্যাবের অভিযানে আটক হলে এবার আগের মতো পার পাওয়া যাবে না, পরিস্থিতি অনেক খারাপ।

তেমন পরিস্থিতিতে দূরে কোথায় আত্মগোপনে চলে যেতে হবে সিদ্ধান্ত নেয় নাজমা। যেখানে তাকে কেউ চেনে না, তার পরিচয় জানে না তেমন কোথাও চলে যেতে হবে বেশ কিছুদিনের জন্য। পুলিশ, র‌্যাবের চোখ ফাঁকি দিয়ে কয়েকটি দিন আড়ালে নির্বিঘ্নে থাকতে পারলে এ যাত্রা রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

শোয়া থেকে উঠে বসে নাজমা। বাড়ির পার্কিং লটে নিচে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছে ড্রাইভার মজনু। তাকে ফোন দেয় নাজমা মোবাইলে। তারপর বের হয়। সঙ্গে থাকা ইয়াবার চালানের প্যাকেটটা নারায়ণগঞ্জের ডেমরায় ডেলিভারি দিতে হবে আগে।

মজনু এখন ডেমরা যাওয়ার জন্য শহরের ব্যস্ত রাস্তা বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গাড়ি চলাচলকারী রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে নেমে তিনশ ফুট রাস্তা ধরে ছুটে যাচ্ছে গাড়িটি।

সন্ধে হয়ে গেছে কিছুক্ষণ হল। আশপাশের দোকানপাট, ঘরবাড়িতে আলো জ্বলে উঠেছে। রাস্তায় চলা গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। যে কোনো সময় মারাত্মক কিছু ঘটতে পারে- তেমন একটা আশঙ্কা বুকে নিয়ে গাড়িতে বসে আছে নাজমা বেগম। বুকের মধ্যে এক ধরনের চাপ ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। হার্টের সমস্যা বাড়লে নাকি এমন হয়। ডাক্তার দেখানো দরকার। এখনই হুট করে মরে যেতে চায় না নাজমা। আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে চায়। নিজের জন্য নয়, দুই কন্যা রুমি, সুমির জন্য তার আরও কিছুদিন বেঁচে থাকা প্রয়োজন।

গাড়ির গতি হঠাৎ বেড়ে যেতেই নাজমা চমকে ওঠে। জানতে চায়, ‘কি হইছে রে মজনু ?’

‘বড় আম্মা, একটা মাইক্রোবাস আমাগো পিছে পিছে আইতেছে মিরপুর দশ নম্বর থিকা। আমি এতক্ষণ তেমন পাত্তা দেই নাই। এত দূরে আইসা পড়ছি। এখনও দেখতেছি আমাগো পিছে পিছে আছে তারা, অবস্থা ভালো মনে হইতেছে না, এখন কী করমু বলেন?’

মজনু অস্থির গলায় কথাগুলো বলে গাড়ির গতি আরও বাড়াতে এক্সিলেটর চেপে ধরে।

নাজমা গত বেশ কয়েকদিন থেকে তেমনই ভয়ঙ্কর কিছু ঘটার আশঙ্কা করছিল মনে মনে। পেছনে পুলিশ কিংবা র‌্যাবের লোকজন গাড়ি নিয়ে ধাওয়া করেছে। হয়তো সামনেই আরেক দল নাজমার গাড়ি আটকাতে আটঘাট বেঁধে অপেক্ষা করছে। রুমি, সুমির কথা মনে পড়ছে ভীষণ, এ মুহূর্তে।

হঠাৎ সামনে বিপরীত থেকে আরেকটি গাড়ি এদিকে ছুটে আসছে দেখতে পেয়ে ভয় পেয়ে পুরো হাল ছেড়ে দেয় সে। এর মধ্যে গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়েছে সে। এ অবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে পালাতে চেষ্টা করেও কোনো লাভ হবে না। বরং নিজেদের বড় ধরনের বিপদ হতে পারে।

নাজমা বেগমকে উদ্দেশ করে মজনু কান্নাজড়ানো গলায় শুধু বলে, ‘বড় আম্মা, আমারে মাফ কইরা দিয়েন। আমি অনেক চেষ্টা কইরাও কিছু করতে পারলাম না, আপনারে এই বিপদ থিকা বাঁচাইতে পারলাম না। বড় আম্মা, আমারে মাফ কইরা দিয়েন।’

নাজমা নির্বিকার হয়ে গেছে ঘটনার আকস্মিকতায়। ইয়াবার বড় একটি চালানাসহ কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ র‌্যাবের যৌথ অভিযানে ধরা পড়তে যাচ্ছে সে। এরপর কী হবে তার, জানে না নাজমা। কক্সবাজার সমুদ্রের তীরবর্তী উপকূলে চোরাবালিতে ডুবে অনেক মানুষ মারা যায় প্রতিবছর। সৈকতে পথ চলতে চলতে নিজের অজান্তে অনেকে চোরাবালিতে পা রেখে তলিয়ে যেতে থাকে কোনো অতলে। আশপাশে কেউ যদি না থাকে কিংবা তার সাহায্যে এগিয়ে না আসে তাহলে চোরাবালিতে ডুবে মরতে হয়। তখন তার লাশও খুঁজে পাওয়া যায় না। এ মুহূর্তে তার মনে হতে থাকে সাগর সৈকতে সবার অগোচরে লুকিয়ে থাকা কোনো চোরাবালিতে পড়ে গেছে। ক্রমেই সে তলিয়ে যাচ্ছে এক অন্ধকারে অতলে।