বিশ্বকবিতার দশ দিগন্ত

নিরাশা বা নিয়তিচিন্তা এসব কবির রচনার বৈশিষ্ট্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে

  সরকার মাসুদ ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিংশ শতাব্দীতে কবিতা লিখে পৃথিবীজোড়া খ্যাতি লাভ করেছেন যারা তাদের অনেকেই আমার প্রিয় কবি। বিশেষভাবে প্রিয় ডব্লিউ বি ইয়েটস, লোরকা, রাইনের মাবিয়া রিলকে, ফেডারিখ হোল্ডারলিন, রবার্ট ফ্রস্ট, স্য ঝন পার্স, জন বেরিম্যান, কাহলিল জিবরান, সিলভিয়া প্লাথ, চেশোয়াভ মিউশ, ওয়ালেস স্টিভেন্স, মিরোশ্লাভ হোলুভ, ইকবাল, পাবলো নেরুদা, নিকানোর পাররা, অ্যাডোনিস, ডেরেক ওয়ালকট, জীবনানন্দ দাশ, সিমাস হিনি, জন অ্যাশবেরি, বিনয় মজুমদার, টম গান, ডিলান টমাস, জ্যাক প্রেভের, ফিলিপ লারকিন প্রমুখ।

বিশ্বকবিতার মননশীল পাঠকমাত্রই জানেন, ওপরে উল্লিখিত কবিরা রচনারীতিতে ও বিষয়বৈচিত্র্যে একে অপরের চেয়ে কত আলাদা। রিলকে, হ্যেল্ডারলিন, ইকবাল, ফ্রস্ট, জীবনানন্দ, জিবরানরা নিজ নিজ রচনার ভেতর দিয়ে এক ধরনের দর্শনের চর্চা করে গেছেন। এদের কবিতার কোনো কোনো অংশ রীতিমতো দার্শনিকের উক্তি বলে মনে হয়। যেন তাদের কাছে জীবনদর্শনটাই লক্ষ্য আর কাব্যচর্চাটা উপলক্ষ মাত্র। অন্যদিকে ইয়েটস, লোকরা, মিউশ, নেরুদা, হোলুভ, পাস্তেরনাক প্রমুখ কবির মধ্যে পাই তাদের স্বদেশ সংস্কৃতির এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতিভাদীপ্ত পরিচয়। কেবল তাই নয়, এক ব্যাপক আর্থসামাজিক রাজনৈতিক নৈরাজ্যের পটভূমিতে ব্যক্তি-মানুষের সংকট, উদ্বেগ অথবা নির্লিপ্ত কতটা শিল্পশোভনভাবে তুলে ধরা সম্ভব এদের কবিতা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

কল্পনা ছাড়া যেমন কবিতা সম্ভব নয়, তেমনি প্রত্যেক সৎ কবির আছে নিজস্ব দেখার জগৎ। একজন কবি তার অবলোকনের জগতকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়ে একটি দার্শনিক মাত্রা দিতে চান। সে অর্থে কবিমাত্রই দার্শনিক। কিন্তু রিলকে হ্যেল্ডারলিন, কাহলিল জিবরান, ইকবাল, বোরহেস, কাভাফি, টান্সট্রোমার যেসব বিষয়ের ওপর কবিতা লিখেছেন তার অনেকই রীতিমতো দর্শনাক্রান্ত। ওইসব রচনা কেবল জীবন ও জগতের যা কিছু দৃশ্যমান তাই নিয়ে নয়; যা কিছু অদৃশ্য এবং অভাবনীয় তা নিয়েও। সুতরাং এরা দার্শনিক কবি। দার্শনিক বলেই ইকবালের পক্ষে বলা সম্ভব হয়েছে, ‘কোথায় আমাদের জাগ্রত চক্ষুর উৎসমুখ?/ আমাদের দর্শনের আনন্দ নিয়েছে দৃশ্যমান রূপ।/ তিতির পক্ষীর পদযুগল জন্ম নিয়েছে তার চলার অপরূপ ভঙ্গি থেকে,/ বুলবুলের চঞ্চু সৃষ্টি হয়েছে তার সঙ্গীতের আনন্দ থেকে...’। অন্যদিকে দেখুন, লোরকারচিত পঙ্ক্তিমালা কীভাবে ধারণ করেছে দেশজ সংস্কৃতির নির্যাসকে- ‘আ, ভালোবাসা গজিয়ে উঠছে কমলালেবু গাছের নিচে/ সূর্যকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে বহতা জল/ছোট্ট অলিভ গাছে শোনা যায় একটি চড়–ইয়ের কিচিরমিচির!’

রবার্ট ফ্রস্টকে বলা হয়ে থাকে আমেরিকার ওয়ার্ডসওয়ার্থ, তার অবিচ্ছিন্ন নিসর্গপ্রীতি ও নিগূঢ় জীবনভাবনার জন্য। কিন্তু কৈশোরিক মুগ্ধতা থেকে জাত গভীর অনুভব এবং প্রকৃতিবন্দনা যেখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থের অগণন কবিতার মূল কথা, ফ্রস্ট সেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নানা মাত্রা নানারকম সাযুজ্য ও বৈপরীত্য খুঁজেছেন। আর এটা করতে গিয়ে জীবনের অনেক রহস্যের আলোছায়ার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি যা তাকে পৌঁছে দিয়েছে গভীর গভীরতর উপলব্ধির জগতে। ফ্রস্ট যে কেবল স্রষ্টা কবি নন, বিশেষ অর্থে দ্রষ্টা কবিও তার অজস্র প্রমাণ ছড়িয়ে আছে তারই রচিত পঙ্ক্তিমালায়- ‘সেদিন সকালে দুটি পথ একই রকম/ পাতা ঢাকা আর পদচিহ্ন পড়েনি তাতে/প্রথমটি রেখে দিই অন্য কোনো দিনের আশায়/ অথচ একটি পথ অন্য পথে মিশে যায়/ জেনে, কোনোদিন ফিরবো কি না জাগে সংশয়!’ (যে পথে হাঁটিনি; অনুবাদ লেখক)।

দার্শনিক প্রতীতি, সংশয়, নিরাশা বা নিয়তিচিন্তা এসব কবির রচনার বৈশিষ্ট্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু মাথার ভেতর বিশ্বাস, অবিশ্বাস বা সংশয় যাই কাজ করুক না কেন (পাঠক স্মরণ করুন অমিয় চক্রবর্তী ও জীবনানন্দ দাশের কবিতা), কবিতাকে অনুভবের পরিচ্ছন্ন ও সুদৃঢ় প্লাটফর্মে শক্ত পায়ে দাঁড়াতে হয়। তাহলেই তার টিকে থাকার সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হয়। নতুবা কেবল শব্দের ঝিলিকে পাঠককে এক মুহূর্তে চমকে দিয়ে অচিরেই তা রঙধনুর মতে মিলিয়ে যায়। বড় বড় বিষয়বস্তুগুলো বড় মাপের ভাবনার আধার। যেমন ধরা যাক সমুদ্র কিংবা স্বাধীনতা। কিন্তু বৃহৎ ব্যাপারগুলো থিম হিসেবে কবিতায় প্রযুক্ত হলেই যে রচনাটা উতরে যাবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বরং একটি ছোট্ট বোতাম কিংবা পরিত্যক্ত পুরনো একটি হাতঘড়ি নিয়ে লিখলেও সে কবিতা বড় আইডিয়া ধারণ করতে সক্ষম, শিল্পঋদ্ধ হতে সক্ষম। তবে তা নির্ভর করছে লেখকের ভাষাবোধ ও লিপিদক্ষতার ওপর। আসল কথা, স্মরণযোগ্য শব্দ এবং উপমা-ইঙ্গিতের সাহায্যে মর্মস্পর্শী গূঢ় জীবনভাবনা উপহার দেয়া চাই কবিতায়। আর এখানেই প্রকৃত কবি ও অকবির মধ্যকার পার্থক্যের সূত্রটি নিহিত। প্রসঙ্গত আরেকটি কথা বলতে চাই। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, উৎপল কুমার বসু, ভাস্কর চক্রবর্তী, আবিদ আজাদ প্রমুখের কবিতা পড়ে আমার মনে হয়েছে এদের কবি-ইমেজ প্রধানত বড় বিষয় নিয়ে লেখা কবিতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং ছোটখাটো, তুচ্ছাতিতুচ্ছ থিমের ওপরই তারা তাদের কবিত্ব পরীক্ষা করেছেন অনেক বেশি। উৎপল-ভাস্কর-প্রণবেন্দুরা বরং ছোট বিষয়ের বড় কবির উদাহরণ হয়ে আছেন এবং এটাই হয়তো তারা চেয়েও ছিলেন। একজন কবি শেষ পর্যন্ত কী লিখে উঠতে পারবেন সেটাই আসল কথা। এ জন্য প্রত্যেক লেখকের উচিত তার প্রতিভার উপযোগী বিষয়-আশয় খুঁজে ফেরা। বড় ধরনের থিম নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন জীবনানন্দ, ইয়েটস, এলিয়ট, কাভাফি, কাজানজাকিস এবং ওয়ালকটের মতো কবিরা। বাংলা সাহিত্যে শামসুর রাহমান, বিনয় মজুমদার, আল মাহমুদ প্রমুখ। রাহমানের আসাদের সার্ট, রূপালী স্নান, সংকটে কবির সত্তা এবং মাহমুদের ভারতবর্ষ, চক্রবর্তী রাজার অট্টহাসি, পিপাসার মুখ, উড়াল কাব্য নামের কবিতাগুলো তার প্রমাণ। অন্যদিকে বিনয় মজুমদার কেবল সাহিত্য ও গণিত নিয়েই ভাবেননি, ভেবেছেন সৃষ্টি রহস্যের মতো বিরাট জিনিস নিয়ে- ঈশ্বর নিয়েও। বলা চলে, তার সমুদয় ভাবনা কবিতার উদ্দেশে সমর্পিত। বিষয়স্তু গভীর কিন্তু তার কাব্যিক উপস্থাপনা সারল্যখচিত। তার হাতে কবিতার পঙ্ক্তি অনায়াসে বাণীর মর্যাদা পেয়েছে। তেমনি আমাদের চোখ এড়ায় না তার ছন্দের সাবলীল প্রয়োগ। জীবনানন্দের পর সম্ভবত তিনিই বাংলাভাষার একমাত্র কবি যাকে ওয়ালকট, অ্যাডোনিস, সিমাস হিনি, অ্যাশবেরি, ট্রান্সট্রোমার প্রমুখের পঙ্ক্তিভুক্ত করা চলে। তার কবিতার মধ্যে আমরা সুস্পষ্টভাবে একটি বিজ্ঞানচেতন, ভূগোলমনস্ক দার্শনিক মনের সাক্ষাৎ পাই।

পৃথিবীতে অনেক রকমের কবিতা আছে; যেমন বিপ্লবের কবিতা, শান্তির কবিতা, যুদ্ধের কবিতা, ভালোবাসার কবিতা, বিরহের কবিতা, অস্থিরতার কবিতা, অন্বেষণের কবিতা। অন্তমুর্খী বিষয় নিয়ে রচিত কবিতাগুলো মৃদু স্বরের হয়ে থাকে। আমার বেশি পছন্দ ওই মৃদু স্বরের কবিতাগুলো, বিশেষভাবে যেগুলো গভীর মর্মজিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে ফেরে। চড়া সুর, কড়া রং, ভারি শব্দ... এগুলোর কোনোটাই আমি ভালোবাসি না। আর চাই না, প্রকরণদক্ষতার নামে কবিতা কণ্টকিত হয়ে উঠুক। সে জন্য পাউন্ড বা ডিলান আমার তত প্রিয় নন যতটা ফ্রস্ট বা ফিলিপ লারনিক। এলিয়েটর ৮-১০টি কবিতার অনুরাগী পাঠক আমি, কিন্তু বেশি প্রিয় ইয়েটস; প্রিয় তার সারল্যের গুণে, বিষয়বৈচিত্র্যের কারণে, আটপৌরে ও কেতাবি ভাষার মিশ্রণ রসের জন্য। ইতিহাসসংলগ্নতাও তার কবিতার এক বড় বৈশিষ্ট্য।

প্রথম যেদিন হ্যেল্ডারলিন পড়ি, তার মগ্নচৈতন্য থেকে পিচকিরির ঢঙে উঠে আসা অবিরল ভাববর্ণালী, শব্দ সম্পদ আমাকে রীতিমতো গেঁথে ফেলেছিল। নিজের লেখালেখি ও স্মরণীয় হওয়ার বাসনাকে কি তুচ্ছই না মনে হয়েছিল সেদিন। তিনিই তো বলেছেন একটি কবিতায়- ‘যদি অশান্ত হয় মন,/ প্রশ্ন করো না,/ দিকভ্রান্ত মাথা ডুবিয়ে দিয়ো অমল পুণ্যময় জলে!’ ফ্রেডারিখ হ্যেল্ডারলিন এবং হাইনরিশ হাইনে দুজনই জার্মান। আধুনিক কবিতার অমৃত ও গরল পান করেছেন উভয়েই। অথচ দৃষ্টিভঙ্গি, রচনারীতি কত আলাদা। সে জন্য যুদ্ধবিগ্রহ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার প্রসঙ্গও এ শ্লাঘনীয়, প্রতীকী ভাষায় উঠে এসেছে হাইনের কাব্যে- ‘তরবারি আমি, আমি শিখা,/ অন্ধকারের মধ্য দিয়ে আমিই পথ করেছি আলো। আর যখন লড়াই শুরু হলো/ যুদ্ধ করেছি একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে।’ (অনুবাদ : শঙ্খ ঘোষ)।

ফরাসি কবি-শিল্পীরা অনেক আধুনিক ধ্যান-ধারণার উদগাতা। পরাবাস্তববাদের মতো একটি ভাবনা উদ্রেককারী শিল্প ধারণারও জন্মদাতা ওই ফরাসিরাই। শিল্প-সাহিত্যে তাদের অগ্রণী ভূমিকার কথা আজ সুবিদিত।

আধুনিক ফরাসি কবিদের মধ্যে একজন অগ্রপথিকের নাম স্য ঝন পার্স। পার্সকে আমার ভীষণ ভালো লাগে তার বস্তুনিষ্ঠতার কারণে। তিনি শুধু পৃথিবীর বস্তুপুঞ্জ ঘিরে একটির পর একটি অসাধারণ কল্পচিত্রই তৈরি করেন না, বস্তুর অন্তর্লোকও আলোকিত করে তোলেন অদ্বিতীয় মনোলোকের সাহায্যে।

প্রেমিক ও বিপ্লবী সত্তার সর্বাঙ্গসুন্দর মিলন ঘটেছিল পাবলো নেরুদার কবিতায়। নৈরুদা পৃথিবীর সেই মহৎ কবিদের একজন যার রচনায় মেলে দেশচেতন ভাবুকের পরিশ্রুত আবেগ আর বিরল জাতের নিরাসক্তি। বিশেষ করে তার প্রেমের কবিতায় বিষয়টি ধরা পড়েছে অভাবনীয় ভঙ্গিতে। যুদ্ধের ময়দানে মাথা-ঠাণ্ডা রাখা সেনাধিনায়কের সঙ্গে তাকে আমার তুলনা করতে ইচ্ছা করে। আবার তার কবিতার সংস্পর্শে এলে বদলে যায় জীবন ও জগতের প্রচল অর্থগুলো। জেরাল্ড মেনলি হপকিনস তার কবিতায় ঈশ্বরের মুখ কল্পনা করেছিলেন। হপকিনস বা গত শতকের মধ্যভাগের মার্কিনি কবি জেমস রাইটের মতো কাহলিল জিবরানের কবিতাও আধ্যাত্মিকতায় ঋদ্ধ। অবশ্য রাইট এবং তার সমগোত্রীয় কবিরা অধ্যাত্মভাবের সঙ্গে দিনানুদৈনিক নানা বিষয়কে যুক্ত করেছেন কবিতায়। সে ক্ষেত্রে জিবরান পরিপূর্ণ প্রত্যয় ও আত্মজিজ্ঞাসার প্রশান্তিময় কাব্য রচনা করেছেন। আত্মনির্জনতা এবং আস্তিকতার ছায়ায় লালিত তার কবিতা অনেক সময়েই প্রায় ধর্মগ্রন্থসুলভ বাণী ও বরাভয় উপহার দেয়। প্রাচীনকালের আস্তিকরা যেমন ছিলেন তিনি সেরকম ত্যাগী নন। তিনি খানিকটা ভোগী; কিন্তু জীবনের সবরকম উত্তরণে অবিচলভাবে বিশ্বাসী। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যেই তিনি ঈশ্বরকে খুঁজেছেন। মানুষের লৌকিক জ্ঞানকে নিজ কবিকল্পনার ঝালাই দিয়ে করে তুলেছেন অমূল্য সম্পদ। জিবরানের পক্ষেই তাই এরকম বলা সম্ভব- ‘যখনই আনন্দে ভরে আছো, চেয়ে দ্যাখো হৃদয়ে গভীর/ যা দিয়েছে দুঃখ একদিন/ তাই দিলো আনন্দ এখন। যখনই দুঃখে ভরা মন, চেয়ে দ্যাখো হৃদয় গভীর। যা ছিল আনন্দ একদিন/ তাই আজ দুঃখ হয়ে গেছে।’ (আনন্দ ও দুঃখ বিষয়ে। অনুবাদ : অজিত মিশ্র)

বছরখানেক আগে পড়েছি ফিলিপ জাকাতোর কবিতা, প্রথমবারের মতো। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি এ ফরাসি কবির উত্থান। বিগত শতকের ফরাসি কবিতাকে ‘পাঠের অযোগ্য’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন অনেক সমালোচক এবং কবিও। সৎ ঝন পার্স, আরি মিশো কিংবা জ্যাক প্রেভেবের মতো কবিরা অবশ্য ওই দলে পড়েন না। বহুরূপী ধাঁধা, সচেতন বুদ্ধিচর্চা, শব্দ নিয়ে খেলা আর প্রখর আঙ্গিকমনস্কতা যেখানে গড়পড়তা ফরাসি কাব্যের কুলক্ষণ, সেখানে জাকাতো এক সত্যিকারের ব্যতিক্রম। শীতের প্রশান্ত নদীর মতো, সন্ধ্যার আগের স্নিগ্ধ মোহনীয় মুহূর্তগুলোর মতো কোমল, নিচু কণ্ঠী তার কবিতা। তার কণ্ঠস্বর ব্যতিক্রমীভাবেই মৃদ্যু- ‘যেখানে রঙের শুরু, যেখানে রূপের শুরু/ সেখানে দৃষ্টি পৌঁছাতে পারে না আর।’ বিশুদ্ধ আলোর মতো (আলো তার কবিতায় ঘুরেফিরেই এসেছে) বিশুদ্ধ এক অনুভূতির প্রসাদ মিলবে তার কবিতায়। একটি লেখায় তিনি বলেছেন, ‘ক্রমশ বয়স বাড়ে, আমি আরও বেশি অজ্ঞ হই।’ এর চেয়ে সরল, প্রতীকী স্বীকারোক্তি আর কি হতে পারে? ‘অজ্ঞ’ শব্দটি যেন এখানে বিজ্ঞর প্রতিরূপ। পাঠক হিসেবে আমি কবিতার ভেতর খুঁজি নির্মল আনন্দ, উন্নত সাহিত্য পাঠের মজা। সেই কবিতা যদি একই সঙ্গে জ্ঞানের কথাও উপহার দেয়, তাহলে সেটা হবে অতিরিক্ত প্রাপ্তি। এ জাতীয় প্রাপ্তি কখনও কখনও জাকাতোর মধ্যেও মেলে। তার কবিতা পড়ার মুহূর্তে আমি গ্রীষ্মের ভোরের বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি টের পাই।

যে মহাপ্রাণ কবিদের সম্বন্ধে এতক্ষণ বলা হল, তারা সবাই নিজ নিজ ভাবনার অভিব্যক্তিগুণে খুবই আলাদা। ফলে তাদের সবার রচনাই মাত্রার তারতম্য নিয়েই অভিনিবেশযোগ্য। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে অভিব্যক্তির চেয়ে অভিঘাত বেশি মূল্যবান। বাংলা সাহিত্যে অসংখ্য পাঠযোগ্য কবি আছেন যাদের অনেকেরই রচনা বিশেষভাবে অভিব্যক্তিচিহ্নিত। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের কতজনের লেখা অভিঘাতী সেটা ভাবার বিষয়। কেননা আমাদের ভাব-ভঙ্গি যথেষ্ট আছে কিন্তু পাঠকের তুষ্টি অর্জন করতে পারি কম ক্ষেত্রেই। ফয়েজ আহমদ ফয়েজ তার একটি কবিতায় লিখেছেন, ‘প্রতিটি পথিককে প্রতিটি পথ কী যেন বলছে (অনুবাদ : কমলেশ সেন) ওই লেখাটি পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে, প্রতিটি উচ্চাশী এবং সামর্থ্যবান কবি আসলে এক একজন দূরগামী পথিক। তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে এক একটি ব্যক্তিগত পথ। একজন কবির কাছে তা হয়তো অনেকদিন পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত থাকতে পারে। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত পথটি একবার খুঁজে পাওয়ার পর লেখকের কাজ হচ্ছে ওই পথের অবিকল্প সাধনায় লিপ্ত হওয়া। ভাবনাকল্পনাদীপিত এক সঠিক পথের নিরন্তর সাধনা ব্যতিরেকে, আমরা দেখেছি, প্রতিভাবান ব্যক্তিও মুখ থুবড়ে পড়েছে। অনাগতকালের বিরল সম্মান তোলা থাকে কেবল তার জন্য যার আছে বিশেষ যোগ্যতা, জেদ আর ধারাবাহিক পরিশ্রম।

উঁচু দরের শিল্পকলা আমাকে ভেতরে ভতরে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। অরূপের অপ্রতিরোধ্য টানে আমি ছিটকে পড়ি এক আশ্চর্য জ্যোতির্ময় শাখা থেকে শাখান্তরে। রূপবৃক্ষের এ শাখা একই সঙ্গে চেনা এবং অচেনা। শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোও অনেকটা তাই। পৃথিবীর সেরা কবিতাগুলো পরবর্তী কবিদের স্বপ্নভঙ্গ ঘটিয়েছে বারবার। আবার ক্ষমতাবান তরুণদের মনে তা জাগিয়েছে বৃহৎ স্বপ্ন। বিশ্বের এসব মহান কবির রচনাবলি, তাই পাঠ করি তাদের রসঘন উপলব্ধির ভুবন বুঝে নেয়ার আশায়; বৈপরীত্যময় কাব্যরচির নানারকম চেহারা চিনে নেয়ার গরজে। এর ফলে নিজের কবিতার শক্তি ও দুর্বলতাসমূহ আমি চিহ্নিত করতে পারি ভালো করে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×