কামিনী ফুলের গন্ধ

  সাঈদ আজাদ ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভাতঘুমে যদিও শরীর টলছিল, কিন্তু হাসান জানে, শুলেও ঘুম আসবে না। আসবে না, দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাসটা নেই বলে। বিছানায় এপাশ ওপাশ করাই সার হবে। মাঝখান থেকে মাথা ধরে যাবে। ব্যথাটা থাকবে সারাদিন। কী করে দুপুরটা পার করা যায়, ভাবে হাসান। কাদেরের দোকানে গেলে হয়। কথায়, গল্পে সময়টা যেমনই হোক কাটবে। এখন দুপুর। এ সময় খদ্দের তেমন একটা না আসারই কথা কাদেরের দোকানে।

আয় হাসান। বস। হাসানকে দেখে কাদের বলে। বেশ আন্তরিকতা ওর গলায়।

ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছের তলে কাদেরের ছোট দোকানটা। ছোট হলে হবে কী! চকলেট-বিস্কুট-চাল-ডাল-লবণ-তেল-সাবান-চা-পান-সিগারেট-কোল্ডড্রিংস-খাতা-কলম, সবাই আছে দোকানে। সকালে একবার এসেছিল। তখনই দোকানটা দেখা হয়ে গেছে হাসানের।

দোকানের একপাশে ফালি তক্তার চিকন একটা বেঞ্চ। তাতে বসে হাসান। তেঁতুল গাছের ছায়াতে জায়গাটায় বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা ভাব।

তা তোর জমি বিক্রয় কদ্দূররে হাসান? কাদের জানতে চায়।

কিনতে তো আগ্রহী অনেকেই। কিন্তু মনমতো দামতো কেউ দিতে চাচ্ছে না।

ধরেই রাখ ন্যায্য দাম পাবি না। সবাই জেনে গেছে জমি তুই বেচবিই। তাছাড়া তোর দুই চাচা আছে গ্রামে। ওরা জমি কিনতে চাইলে আর কেউ এগোবে না।

হ্যাঁ, সমস্যাটা আসলে ওখানেই। চাচারাই আসলে অন্যদের দাম বলার সুযোগ দিচ্ছে না। নাকি বাপ দাদার সম্পত্তি তারা অন্যের হাতে যেতে দেবে না।

তা বাপ দাদার সম্পত্তি রাখবে ভালো কথা। তাই বলে তোকে ন্যায্য দামটা দেবে না। তোর দুই চাচারই তো এখন অবস্থা বেশ ভালো। বছর বছর নতুন জমি রাখছে।

নাকি ছোট চাচা একাই সব জমি রাখবে, এমন বলেছিল মোবাইলে। দেখি আজকে রাতে কথা বলে। কেমন দাম টাম দিতে চায়। জমির কাজেই তো আসলে গ্রামে আসা।

তবুও তো এলি। জমিজমা বেচা হলে আর কি আসবি গ্রামে! ...তা চা খাবি নাকি এক কাপ? দিব?

খেতে পারি। তুই কিন্তু কাদের চা-টা বেশ ভালো বানাস। এমন ভালো চা করা শিখলি কীভাবে?

অই করতে করতেই শিখে গেলাম। চায়ের জন্যই তো দোকানটা এখনও উঠিয়ে দেইনি। আমার চায়ের কিছু বাঁধা কাস্টমার আছে। তা না হলে দোকানের বেচা বিক্রি আর তেমন কই এখন! প্রথম প্রথম অবশ্য খুব চলেছিল দোকান। এখন গ্রামে আরও দু দুটো দোকান হয়েছে। কাস্টমার গেছে ভাগ হয়ে।... তা আমি বলি কী, জমিগুলো হুট করে বিক্রি না করে গ্রামের দু-চারজনের সঙ্গে কথা বলে দেখ। দরটা বুঝতে পারবি। জমি তোর। চাচাদের কাছে বিক্রি না করলে তারা তো আর জোর করে তোর জমি রাখতে পারবে না।... নে, চা নে। যদ্দূর জানি, তোর চাকরিটা তো বেশ ভালই। জমি বিক্রি করছিস কেন? জমির দাম তো বছর ঘুরলেই বাড়ে।

বাড়ে, তাতো জানি আমিও। হাসান চায়ে চুমুক দেয়। ...বলতে কী, গ্রামে জমি রেখে আমার যে খুব একটা লাভ হচ্ছে তা কিন্তু নয়। বলতে গেলে চাচারাই জমি ভোগ করে। আর যত যাই বলি গ্রামে তো আর ফিরে আসা হবে না আমার। ফিরতে পারব না ছেলেমেয়েদের জন্যই। ছেলেমেয়েরা জন্মেছে শহরে। সেখানে বড় হচ্ছে। তাদের সবই শহরে। শেষ বয়সে তাদের ছেড়ে আমি কি আর গ্রামে এসে থাকতে পারব?... কিছু টাকা জমিয়ে, কিছু ধারকর্য করে ঢাকায় একটু জমি কিনেছিলাম। এখন গ্রামের জমিগুলো বিক্রি করে যদি সেখানে একটু মাথা গোজার ঠাঁই করতে পারি। সব ভেবেটেবে জমিগুলো বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। অবশ্য ভিটে থাকবে। শত হলেও বাপ দাদার স্মৃতি।

বুঝেছি। দেখলাম তো বেশ ক’জনকে। একবার গ্রাম ছেড়ে গেলে কেউ আর ফেরে না গ্রামে।... ও কি, খালি চা খাচ্ছিস, বয়াম খুলে বিস্কুট নে দুটো।

মাত্র তো দুপুরের খাবার খেয়ে এলাম। চা-টাই খাই।

আচ্ছা হাসান, আঁখিতারাকে মনে আছে তোর?

প্রশ্নটা করেই কাদের হাসানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মনে থাকবে না কেন! হাসান অল্প করে হাসে। পর পর চুমুক দিয়ে চা শেষ করে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, তবে, তুই যে অর্থে মনে থাকার কথা জানতে চাচ্ছিস সে অর্থে হয়তো নেই। জীবনে কে কাকে আর দীর্ঘদিন মনে রাখে বল? জীবনের ব্যস্ততা সব ভুলিয়ে দেয়।

গ্রামে থাকতে তুই কী পাগলই না ছিলি আঁখির জন্য! আর কেউ না জানুক আমিতো জানি।

কাঁচা বয়সে সবারই আবেগ একটু বেশি বেশি থাকে।

হ্যাঁ, কাঁচা বয়স বলেই তো আঁখি জীবনের হিসেব কষতে অমন ভুলটা করেছিল। না হলে, ওতো এ গ্রামেরই মেয়ে। মোস্তাক চেয়ারম্যানের ছেলের চরিত্র কেমন ছিল, তা কি আঁখি জানত না! সব জেনে বুঝেও আঁখি চেয়ারম্যানের ছেলে সেলিমের ফাঁদে পা দিয়েছিল। আহারে, কোথায় তুই আর কোথায় সেলিম!... লোভ। আসলে চেয়ারম্যানের অত সয়সম্পত্তি দেখে আঁখির মনে লোভ জেগেছিল।

আঁখিকে ঠিক দোষ দেয়া যায় নারে, কাদের। বলতে বলতে হাসানের কণ্ঠ কেমন উদাস হয়ে যায়। তুই আমার বর্তমান অবস্থান বিবেচনা করে ভাবছিস আঁখি ভুল করেছিল। কিন্তু আমাদের অবস্থা তখন কেমন ছিল, ভাব একটু। আব্বার যখন ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ল, আকাশ ভেঙে পড়েছিল মা আর আমার ওপর। পানির মতো টাকা খরচ করেও তো আব্বাকে বাঁচানো গেল না। মামা যদি আমাদের ঢাকায় না নিয়ে যেত, এ অবস্থানে আসা সম্ভব হতো না আমার। হয়তো টেনেটুনে এসএসসিটা পাস করতে পারতাম। তারপর গ্রামেই তোদের মতো এটা সেটা করে কোনোরকম দিন কাটত। জানিস, আঁখি কথায় কথায় প্রায়ই আমাকে বলত, গরিবের ঘরে জšে§ছি, গরিবের বউ হয়ে জীবন কাটাতে চাই না। তা ওর এই চাওয়াটা কিন্তু অসঙ্গত ছিল না। একটু সচ্ছল জীবন কে না চায়? গরিব ছিলাম বলেই না আঁখিকে ভালো লাগার কথা শেষ পর্যন্ত আর সাহস করে জানাতে পারিনি।

না জানালেও, আঁখি ঠিকই তোর মনের কথা জানত। না হলে কেন বলত, গরিবের বউ হয়ে জীবন কাটাতে চাই না।

কী জানি, জানত হয়তো!

প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে। কাদের হাসানের হাত থেকে খালি কাপটা নিতে নিতে বলে, চল তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাই।

কোথায়?

চল। গেলেই দেখবি।

তোর দোকান?

ছোট ভাইকে বলে যাচ্ছি। ও দেখবে।

খ.

ক্ষেতের আল ধরে কাদেরের পিছে পিছে হাঁটে হাসান। চারপাশের প্রায় সব জমিতেই ধান। বেশির ভাগ ক্ষেতের ধানই হলুদ হয়ে এসেছে। বিকেলের নরম আলোয় ধানের শীষগুলোকে মনে হচ্ছে যেন সোনার তৈরি। মাথার ওপর মেঘশূন্য নীলাভ আকাশ। হাঁটতে ভালই লাগছে হাসানের।

তোর তো ছেলেটাই বড়, নারে হাসান? হাঁটতে হাঁটতে কাদের জিজ্ঞেস করে।

হাসান একটু যেন অন্যমনস্ক। কাদেরের প্রশ্নের জবাবে ছোট করে বলে, হ্যাঁ।

এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে বেশ আছিস। আমার চার চারটাই মেয়ে। ছেলের আশায় আশায় অত মেয়ে হয়েছে।

আঁখি কেমন আছেরে কাদের? হাসান জিজ্ঞেস করে।

কী জানি। অনেকদিন তো দেখা টেখা হয় না। হয়তো সুখেই আছে।

হয়তো কেন বলছিস?

তা, এক একজনের সুখ তো এক এক রকম। কেউ বিত্তে সুখী হয়, কেউ ভালবাসায়। ...দেখিস, সামনে একটা গর্ত আছে।

ভুল বললি! শুধু ভালবাসায় কেউ সুখী হয় না। গর্তটা ছোট একটা লাফ দিয়ে পার হয় হাসান। ...সুখের জন্য সংসারে অনেকখানি সচ্ছলতাও লাগে। তা তোরা তো কেউ ঢাকায় গেলে ভুলেও আমার অফিসে যাস টাস না। আলম কী কাজে যেন একবার গিয়েছিল আমার অফিসে। ওর কাছে শুনলাম, চেয়ারম্যান বাড়িতেই নাকি বিয়ে হয়েছে আঁখির?

হ্যাঁ। আঁখির বিয়ে নিয়ে কী একটা কাণ্ডই না হয়ে গেল গ্রামে!

দু’জনের আর কোনো কথা হয় না। চুপচাপ হাঁটছে ওরা। হাঁটতে হাঁটতে হাসান ভাবে, আঁখি তাহলে ভুল করেনি। সেলিমকে মানুষ যতটা খারাপ ভাবে ততটা খারাপ ও হয়তো না। এই তো, শেষ পর্যন্ত আঁখিকে নিয়েই তো সংসার করছে সেলিম।

গ্রাম থেকে বেশ খানিকটা দূরে বাড়িটা। চারপাশে কলাগাছের বেড়া। ছোট উঠোনটায় এখানে ওখানে ময়লা আবর্জনা, তরকারির খোসা। চার পাঁচটা মুরগি চরছে উঠোনে। মুরগিগুলো কেমন রুগ্ন, শ্রীহীন। অনেকটা যেন বাড়িটার মতো।... দোচালা একটা টিনের ঘর। পাশে মাটির দেওয়াল আর খড়ের ছাওয়া নিচু রান্নাঘর। ধোঁয়া বের হচ্ছে রান্নাঘর থেকে। বোধহয় রান্না হচ্ছে। উঠোনের একপাশে একটা টিউবওয়েল। টিউবওয়েলের পাশে বেশ ঝোপালো একটা কামিনী ফুলের গাছ। ...গ্রামে থাকতে শোয়ার ঘরের জানালার পাশে একটা কামিনী ফুলের গাছ লাগিয়েছিল হাসান। গাছটায় যখন ফুল ফুটত সন্ধ্যার দিকে-থোকা থোকা সাদা সাদা ফুল-সুবাসে সারা উঠোন, সারা বাড়ি ম ম করত। এবার বাড়ি এসে গাছটা দেখেনি হাসান। হয়তো কেটে ফেলেছে বাড়ির কেউ। হয়তো মরে গেছে।

আঁখিতারাদের বাড়ি এটা। কাদের বলে।

আমিও এমনটাই আন্দাজ করেছিলাম। হাসান বলে। ...কিন্তু গ্রাম ছেড়ে এত দূরে এসে বাড়ি করল কেন সেলিম? বাড়ি ঘরের অবস্থাও তো তেমন একটা ভালো না। মনে প্রশ্ন জাগলেও, কাদেরকে কিছু জিজ্ঞেস করে না হাসান। নিশ্চয়ই বাপের সঙ্গে কোনো কারণে বনিবনা হয়নি সেলিমের। কী জানি, হয়তো আঁখিকে বিয়ে করার কারণেই।

বাড়ি আছিস নাকিরে আঁখিতারা? আঁখি। কাদের উঠোন দাঁড়িয়ে ডাকে।

ডাক শুনে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসে আঁখি। হাতে একটা পোড়া বেগুন। বোধহয় চুলার আগুনে বেগুনটা পুড়ছিল। ওদের দেখে মাথায় ঘোমটা দেয় ও।

আরে, কাকে দেখে ঘোমটা দিচ্ছিস আঁখি! কাদের বলে। ও তো হাসান।

হাসান ভাই! আঁখি তাকায় হাসানের দিকে।

আঁখিকে চিনতে কষ্টই হয় হাসানের। চেহারা কেমন শুকিয়ে গেছে। মুখে এক ফোঁটা লাবণ্য নেই। চোখ দুটো গর্তে। হনু ভেসে উঠেছে। গায়ের রঙটাও জ্বলে গেছে। দেখাচ্ছে যেন ষাট বছরের বুড়ি। অথচ হিসাব করলে ত্রিশও পার হয়নি ওর বয়েস। এই আঁখিরই ডাকের সুন্দরী বলে খ্যাতি ছিল গ্রামে। দারিদ্র্যতা মানুষের যৌবন এমনভাবে কেড়ে নেয়! বুঝতে কষ্ট হয় না, সুখে নেই আঁখি। তা হলেও জিজ্ঞেস করতে হয় বলে জিজ্ঞেস করে হাসান। কেমন আছিস আঁখি?

ভালো। একটু যেন হাসে আঁখি। তুমি কেমন আছ?

ভালই আছি।

গ্রামে কবে এলে?

তিন চার দিন হবে।

ভাবী, ছেলেমেয়েরা ভালো আছে?

আছে, সবাই ভালো আছে।

কত বছর পর এলে! গ্রাম ছেড়ে গেছ বোধহয় চৌদ্দ বছর হয়ে এল।

ওইরকমই হবে।

এসো, ভেতরে বসো।

ভেতরে যাবনারে আঁখি। তুই বরং উঠোনে দুটো মোড়া পেতে দে। এখানে বাতাস আছে, কাদের বলে।

আঁখি উঠোনে মোড়া দিয়ে ভেতরে চলে যায়। ওরা দু’জন বসে।

গ.

আঁখির কিন্তু কোনো ছেলেমেয়ে নেই হাসান। কাদের বলে। হয়নি যে তা না। মেয়ে হয়েছিল একটা। পানিতে ডুবে মারা গেছে। অবশ্য কেউ কেউ বলে, আঁখি নাকি ইচ্ছা করেই পানিতে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল দু’বছরের মেয়েটাকে।

নিজের মেয়েকে পানিতে ফেলে দিল! কী বলিস!

মা আখি হলেও, মেয়েটা আসলে সেলিমের। মোবারকের না। হয়তো সে কারণেই।

তোর কথার আগামাথা কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না আমি কাদের। আঁখির বিয়ে হয়েছে সেলিমের সঙ্গে, তো মেয়ে মোবারকের হতে যাবে কেন!

সেলিমের সঙ্গে আঁখির বিয়ে হয়েছে একথা তোকে কে বলল?

আলম যে বলল। আর আসার পথে তুইও তো বললি, চেয়ারম্যান বাড়িতে বিয়ে হয়েছে আঁখিতারার।

আহা আঁখির বিয়ে তো চেয়ারম্যান বাড়িতেই হয়েছে। আমি কি একথা অস্বীকার করেছি নাকি? তা বিয়ে তো হয়েছে মোবারকের সঙ্গে।

মোবারক! চেয়ারম্যান বাড়ির কালোমতো, সেই কামলাটার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে আঁখির?

আমিতো ভেবেছি মোবারকের সঙ্গে যে আঁখির বিয়ে হয়েছে তা তুই জানিস।

আলম সবকিছু বলেনি, না? রূপ ছাড়া আঁখির আর কী ছিল বল? বাপ দিনমজুর। পিঠাপিঠি বিয়ের উপযুক্ত তিন বোন। ওদের ব্যাপারটা চেয়ারম্যানের কানে যেতে দেরি হয়নি। চেয়ারম্যান শুনে তো আগুন। আঁখির বাপকে গ্রামছাড়া করার হুমকি দিল। আর একরকম জোর করেই মোবারকের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিল আঁখির। বিয়ের দুদিন আগে সন্ধ্যায়, সেলিম আঁখিকে সড়ক থেকে জোর করে ধরে নিয়ে কোথায় যেন আটকে রেখেছিল। ...তুই চাচির সঙ্গে ঢাকা চলে যাওয়ার মাস দুয়েক পরেই এসব ঘটল। এই যে বাড়িটা দেখছিস, বাপের সম্পত্তি থেকে মোবারক এইটুকু জমিই ভাগে পেয়েছিল। মাটি ভরাট করে বাড়ি করেছে। ওর মা ভাই বোন কেউ তো আঁখিকে মেনে নেয়নি। তাই মোবারক গ্রাম ছেড়ে এখানে ঘর তুলেছে।

হাসান কী বলবে ভেবে পায় না। ওর চোখে আঁখির কিশোরী মুখ ভাসে।

আঁখি পাকা পেঁপে আর কলা নিয়ে আসে। বলে, খাও এগুলো। নিজের গাছের। তা হাসান ভাই, গ্রামে কি কোনো কাজে এসেছ, না এমনি?

বেশ কিছু টাকার দরকার পড়েছে। একটু যেন অন্যমনস্ক হাসান। তবু তাকায় আঁখির দিকে। তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নেয়। ... চাষের জমিগুলো বিক্রি করব। তাই আসা।

তাহলে গ্রামের সঙ্গে আর সম্পর্ক রইল না তোমার। অবশ্য গ্রামে তোমার কেইবা আছে। তা আমার সম্পর্কে নিশ্চয়ই শুনেছ সব।

এখন শুনলাম! হাসান আঁখির দিকে ফের তাকায়। গায়ের মলিন শাড়িটার এখানে ওখানে তালি দেয়া। গালের কাছে কালি লেগে আছে। কানের পাশের চুলে পাক ধরেছে।

ও, কাদের ভাই আমার সম্পর্কে সব বলেছে বুঝি।...আমি কিন্তু বেশ সুখেই আছি, জানো! মানুষটা বড় ভালো! এতকিছুর পর আমাকে বিয়ে করেছে। বউয়ের মর্যাদা দিয়ে রেখেছে। ঘর পেয়েছি থাকার। নিজস্ব একটা সংসার পেয়েছি। আমার আর কী চাওয়ার আছে বলো!

মুখে যতই সুখের কথা বলুক, আঁখি সুখে নেই। ওকে দেখামাত্র তা বুঝেছে হাসান। প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য ও জিজ্ঞেস করে, কামিনী ফুলের গাছটা বুঝি মোবারক লাগিয়েছে?

না, আমিই লাগিয়েছি। তুমি সেই যে স্কুল থেকে ছোট্ট একটা কামিনী ফুলের চারা এনে তোমাদের শোয়ার ঘরের জানালার কাছে লাগিয়েছিলে, মনে আছে? তারই বীজের একটা চারা তুলে এনে লাগিয়েছিলাম আমি। কত্ত যত্নআত্তি করি সকাল বিকাল! দেখো না, তবু কেন জানি গাছটায় এখনও ফুল ফুটল না। একটু হাসে আঁখি। কী করলে গাছটায় ফুল ফুটবে বলতে পারো হাসান ভাই?

দেখতে তো গাছটা বেশ সতেজই। কেন যে ফুল ফুটছে না কী করে বলি! ...তা আমাদের বাড়ির গাছটা তো এখন নেই। জানিস তো?

নেই! জানতাম না তো। আসলে বহুদিন এ বাড়ির বাইরে কোথাও যাই নাতো! গ্রামের কোথায় কী হয় কোনো খবরই রাখি না। আর বাড়ি-ঘর, হাঁস-মুরগি সব সামলে সময়ই পাই না কারও কাছে গিয়ে দুদণ্ড গল্প করার।

মোবারক বোধহয় চেয়ারম্যান বাড়িতে? কাদের জিজ্ঞেস করে।

হ্যাঁ, সন্ধের পর ফিরবে।

সারাদিন তুই একা একা থাকিস? হাসান জিজ্ঞেস করে।

অভ্যাস হয়ে গেছে।

তা আমরা এখন যাইরে আঁখি। কাদের উঠে দাঁড়ায়। মোবারক ফিরলে বলিস আমাদের কথা।

বলব। তোমরা এসেছ বলে কী যে ভালো লাগছে। গ্রামের কেউই তো আসে না আমাদের বাড়ি। আমি নাকি পাপী, তাই আমাদের একঘরে করে রেখেছে। তাও চেয়ারম্যান সাহেব দয়া করে মানুষটাকে কাজে রেখেছে বলে বেঁচে আছি। ...কতদিন পর এই তোমরা দু’জন এলে। তা হাসান ভাই, সময় পেলে যাওয়ার আগে আরেকবার এসো। আজকে আর বসার জন্য জোর করলাম না। ঘরে তেমন কিছু নেই যে বসলে তোমার মতো মানুষের সামনে দিতে পারব।

এই তো ফল খেলাম। দুপুরে ভাত খেয়েই তো বাড়ি থেকে বের হয়েছি। ভরা পেটে আর কী খাব!

তোমাকে চোখের সামনে বসিয়ে সেবা করব এমন ভাগ্য তো আমার না। তা হলেও বলি, যদি বেশিদিন থাকো গ্রামে একদিন আমাদের দাওয়াত কবুল করো।

দেখি, যদি সময় করতে পারি। তবে, মনে হয় না আসতে পারব। জমি বিক্রির কথা পাকা করতে পারলেই ফিরে যাব ঢাকা। অইদিকে ওরা একা আছে।

তুমি যে কী বল না। ঢাকার বাসায় তো ভাবী ছেলেমেয়েদের নিয়েই আছে। একা কই! আমার মতো... নাহ, তোমাকে আটকে রাখছি কথায় কথায়। যাও তুমি।

গেলাম। ভালো থাকিস।

আঁখিতারাদের বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছে ওরা। হাঁটতে হাঁটতে একবার পেছনে ফিরে তাকায় হাসান। দেখে, আঁখি বাড়ির সীমানায় দাঁড়িয়ে, ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।

তোর সঙ্গে বিয়ে হলে কত সুখেই না থাকত আঁখি! কাদের বলে। কেন যে মানুষ তার ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না!

পশ্চিম আকাশে লালিমা ছড়িয়ে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। লোকজন, মাঠে চরতে দেয়া খুঁটায় বাঁধা গরু ছাগল নিয়ে বাড়ি ফিরছে। পাখিরা দূর দূর হতে উড়ে উড়ে গ্রামের দিকে যাচ্ছে। কাদের হাঁটছে হাসানের আগে আগে। একটু দ্রুতই হাঁটছে ও। ...কাদেরকে অনুসরণ করতে করতে ফের পেছনে ফিরে তাকায় হাসান। আঁখি কি এখনও দাঁড়িয়ে আছে? ঘণায়মান সন্ধ্যার বিষণ্ণ আলোতে এতদূর থেকে ঠিক বোঝা যায় না, আঁখি আছে কী নেই।

দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নেয় হাসান। নতুন বাড়িটাতে একটা কামিনী ফুলের গাছ লাগাবে। আচ্ছা, সে গাছে ফুল ফুটবে তো? সন্ধ্যার পর পর ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে থাকবে তো সারা বাড়ি? কী জানি, হয়তো ফুল ফুটবে। হয়তো ফুলের গন্ধে ভরে থাকবে সারা বাড়ি। সব ঘর। বাড়ির সবার মন। আবার এমনও হতে পারে, লাগানো সে গাছটাতে কখনোই ফুল ফুটল না। যেমন ফুল ফুটেনি আঁখিতারার লাগানো গাছটাতে। যে কেউ দেখলেই বুঝবে, আঁখি গাছটার খুব যত্ন করে। তা শত যত্নআত্তি করলেও বোধহয় কোনো কোনো গাছে কখনোই ফুল ফুটে না।

তবু নতুন বাড়িতে একটা কামিনী ফুলের গাছ লাগাবে। মনের ইচ্ছেটাকে আর দৃঢ় করে হাসান। গাছটা লাগাবে, বাড়িটার ঠিক গেটের কাছে। যেন বাড়ি থেকে বের হলে বা ভেতরে ঢুকলে গাছটা চোখে পড়ে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×