পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক

  মযহারুল ইসলাম বাবলা ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক

আমাদের দেশে পাকিস্তানি আমল থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা এবং কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সেটা মোটামুটি বলবৎ থাকলেও পরবর্তীতে ওই কার্যক্রম ক্রমেই স্থবির হয়ে যায়।

ভারতে কিন্তু জন্মনিয়ন্ত্রণের সক্রিয় ও ব্যাপক কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাবে সেখানকার সব শ্রেণীর মানুষের ওপর প্রবল প্রভাব ফেলেছিল। তাদের মধ্যে সেই সচেতনতার সুফল ঘরে ঘরে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পৌঁছে গেছে।

সে কারণে পশ্চিম বাংলায় প্রতিটি পরিবারে একটি বড়জোর দুটির অধিক সন্তান কারও নেই। কলকাতাসহ কলকাতার শহরতলী এবং জেলাগুলোয় প্রতিটি পরিবারে এটি দৃশ্যমান।

আমাদের এখানে তো যৌথ পরিবার ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও টিকে আছে। পশ্চিম বাংলায় যৌথ পরিবার অনেক আগেই ভেঙে গেছে। সেখানে পরিবার মাত্রই ব্যক্তি এবং তার স্ত্রী-সন্তানরা। এর বাইরে ভাইবোনরা তো পরের কথা বাবা-মায়েরা পর্যন্ত পরিবারভুক্ত নয়। তারা সন্তানদের সঙ্গে একত্রে থাকার অধিকার হারিয়েছে। বয়ঃবৃদ্ধ বাবা-মায়েরা শত প্রতিকূলতায় পৃথক বসবাস করছেন।

বিয়ের পর সন্তানরা পিতা-মাতার দায়-দায়িত্ব উপেক্ষা করে একত্রে বসবাস করে না। স্ত্রীর তাগিদে বা চাপে বাধ্য হয় তাৎক্ষণিক পৃথক হতে। ব্যতিক্রম থাকলেও সেটা অতি নগণ্য। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রভাব সেখানে এতটাই সক্রিয় যে, সেসব ঘটনা দেখেশুনে আমাদের হতবাক হতে হয়। আমাদের এখানেও তার প্রভাব ক্রমান্বয়ে পড়ছে বটে, তবে অত ব্যাপক আকারে এখনও বিস্তার লাভ করেনি।

আমাদের এখানে বিত্তবান শ্রেণীর সন্তানরা বিদেশে থাকায় তাদের বৃদ্ধ পিতা-মাতাদের শেষ আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রম। বিত্তহীনদের তো দুরাবস্থার অন্ত নেই। চলতি বছর বেশ ক’বার কলকাতায় যাওয়া হয়েছিল। কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায়ও গিয়েছিলাম। সর্বত্রই একই দৃশ্য। বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা সন্তানহীন দুর্বিষহ একাকিত্বে প্রবল প্রতিকূলতায় জীবন সায়াহ্নের সময়গুলো পার করছেন।

এবারে আমার ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক মুক্তিযোদ্ধা মো. জয়নাল আবেদীন ভাই। বিক্রমপুরের ক’জন পশ্চিমবঙ্গবাসী পরিচিতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি সাক্ষাৎ করেছেন। তারা সবাই জয়নাল ভাইয়ের থেকে বয়সে আট-দশ বছরের বড়। প্রত্যেকের বাসায় গিয়ে দেখি প্রৌঢ়ত্বের শেষ সীমায় থাকা স্বামী-স্ত্রীতে বসবাস করছে।

দুজনে মিলেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘরকন্না করছেন। অসুস্থ স্ত্রী কিংবা স্বামীর সেবা-শশ্রূষার পাশাপাশি ঘরকন্নার কাজেও ব্যস্ত দেখেছি। তাদের সবারই এক বা দুই সন্তানের অধিক সন্তানাদি নেই। প্রায় সবারই এক ছেলে কিংবা এক ছেলে-এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।

ছেলের বিয়ের আগ পর্যন্ত একমাত্র ছেলেকে নিয়েই ছিল তাদের সংসার। ছেলে যেমন সংসার চালানোর দায়িত্ব পালন করত পাশাপাশি সংসারের সামগ্রিক কাজও তদারকি করত। ছেলের বিয়ে উপলক্ষে ছেলের জন্য পিতামাতারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা উপযোগী ঘর নির্মাণ করেছেন।

যাতে যুগোপযোগী আধুনিক আবাসে বৌমার কষ্ট না হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি বাবা-মাই নিজেদের সঞ্চিত সব অর্থ এবং রাষ্ট্রীয় ঋণদান সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে ছেলের আবাসন পরিপাটি করে দিয়েছেন। কিন্তু বিধিবাম।

ছেলের বিয়ের ছয়মাস-এক বছরের মাথায় বৌমার প্ররোচণায়, জেদ ও কৌশলে ছেলেকে নিয়ে দূরের ভাড়া বাসায় কিংবা ক্রয়কৃত ফ্ল্যাটে বাবা-মাকে একলা ফেলে চলে যাওয়ার অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বৃদ্ধ বয়সে রেশন তোলা, বাজার করা, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাসের সিলিন্ডার আনা, সেবা খাতের বিল পরিশোধসহ সামগ্রিক কর্মযজ্ঞ অসহায় বৃদ্ধ পিতাকেই করতে হয়। পিতা অসুস্থ থাকলে মাকেই বাধ্য হয়ে সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়। তাদের সেই কষ্টকর অমানবিক জীবনযাপন দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছি কলকাতায়।

নদীয়ার ফুলিয়াতে গিয়েও দেখেছি আমাদের কথাসাহিত্যিক হরিপদ দত্তের পরিবারের অভিন্ন দশা। রোগে ভুগে বার্ধক্যে হরিপদ দাদা নিরুপায়ে দেশ ছেড়ে পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন ক’বছর আগে। তার পরিবার ওখানে থাকলেও তিনি ভিসা নিয়ে বছরের দু-তিনবার পরিবারকে দেখতে যেতেন। শেষে নিরুপায়ে স্থায়ীভাবে চলে যান। বাংলাদেশে সাহিত্যিক হিসেবে তিনি খ্যাতিমান।

বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক হরিপদ দত্ত এখন গ্রাম-মফস্বল ফুলিয়ায় সামাজিক জীবন বিচ্ছিন্ন একজন অতিসাধারণ মানুষ মাত্র। সেখানে তার কোনো সামাজিক জীবন নেই।

তাকে পরিবারের সব কাজকর্মে ব্যস্ত জীবন কাটাতে হয়। সেখানকার পত্রপত্রিকায় লেখালেখি তো পরের কথা তিনি যে সাহিত্যিক এ পরিচয়টুকু পর্যন্ত কেউ জানে না। পূর্ববাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রত্যাগতরা পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সমাজে পুরোপুরি ব্রাত্য। হরিপদ দাদার একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সে স্বামীর সঙ্গে বহরমপুরে থাকেন। তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করেন।

একমাত্র ছেলে সেও পিএইচডি সম্পন্ন করে শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত। ক’বছর আগে কৃষ্ণনগর থেকে পারিবারিক উদ্যোগে ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন। বৌমাও সরকারি স্কুলের শিক্ষক। ছেলের বিয়ের আগে ধারদেনা করে একতলা বাড়িতে দোতলা তুলেছেন। অত্যাধুনিক সেই দোতলায় বিয়ের পর ছেলে ও বৌমা বসবাস করতেন। এখানেও বিধিবাম।

মাত্র এক বছরের মাথায় কৌশলী অজুহাতে বৌমা স্বামীকে নিয়ে কৃষ্ণনগর চলে গেলেন। এখন প্রৌঢ়ত্বের কিনারে থাকা হরিপদ দাদা ও বৌদি মিলে কষ্টে-সৃষ্টে জীবনের অবশিষ্ট সময় পার করছেন।

গভীর দুঃখে হরিপদ দাদার স্ত্রী আমাকে বলেছেন, ‘ছেলেকে জন্ম দিলাম, পরম স্নেহে মানুষ করে তুললাম। আপনার দাদা তো ঢাকায়। আমি একা সন্তান দুটিকে সমাজে যোগ্য রূপে গড়ে তোলার পর যখন বৌমা বলেন, আমরা নাকি আমাদের কর্তব্য করেছি, যেটা সব বাবা-মাই করে থাকেন। কিন্তু বিয়ের পর স্বামী একান্তই স্ত্রীর, অন্য কারও নয়।

স্বামীর প্রতি সব অধিকার একমাত্র স্ত্রীরই। আরও বলেছে অকারণে মায়াকান্না করে আমার স্বামীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবেন না।’ ছেলে চলে যাওয়ার পর থেকে বৌদি প্রচণ্ড রকম ভেঙে পড়েছেন। তবে হরিপদ দাদা বাস্তবতাকে মেনে স্ত্রীর পাশে থেকে সংসারের যাবতীয় কর্তব্য করে যাচ্ছেন।

জয়নাল ভাইয়ের অগ্রজপ্রতীম বিক্রমপুরের ফটিক দে’র নিউ আলীপুরের বাসায় গিয়েছিলাম। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে মওলানা ভাসানীর সংগঠনে সক্রিয়ভাবে যুক্ততার কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর পালিয়ে কলকাতায় চলে যান, তুখোড় ফুটবলার ফটিক দে। দেশে না ফিরে ওখানেই স্থায়ী হয়ে গেছেন।

সরকারি চাকরি করতেন। এখন অবসরে। নিউ আলীপুরে পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাট কিনে একত্রে একটি বড় ফ্ল্যাট করে সেখানেই স্বামী-স্ত্রী বসবাস করছেন। তার বাসা চিনতে অসুবিধা হচ্ছিল, তাকে ফোন করলে তিনি নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়াতে বলে প্রায় ছুটে এসে আমাদের দোতলার ফ্ল্যাটে নিয়ে ওঠেন। ঘরে ঢোকা মাত্র গৃহকর্মী বলে ওঠে, ‘জল নেই, জল ছেড়ে আসো।’

ফটিক দে আমাদের ঘরে ঢুকিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে গেলেন জল ওঠানোর মেশিন ছাড়তে। অল্প পরেই ফিরে এলেন। ওই গৃহকর্মীর ওপর অধিক নির্ভরশীলতার সুযোগেই গৃহকর্মীটি আদেশের সুরে তাকে জল তোলার নির্দেশ দিতে পেরেছে।

তার স্ত্রী অসুস্থ। এক মেয়ে এক ছেলে। মেয়ে স্বামীর সংসারে আর ছেলে বিয়ের পর যৌথ পরিবার ত্যাগ করে স্ত্রীকে নিয়ে পৃথক স্থানে বসবাস করছে। ছেলে এবং বৌমাকে নিয়ে একত্রে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন, সে আশায় দুটি ফ্ল্যাটকে একত্র করে বড় একটি ফ্ল্যাট করেছিলেন। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে, ডাক্তারের কাছে তাকেই ছুটতে হয়। সংসারের সব কাজ নিজেই করেন।

এমনকি রান্নার কাজও। গৃহকর্মীটি কেবল ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, থালা-বাসন পরিষ্কারের কাজ করে। বাকি সব কাজ তাকেই এই বৃদ্ধ বয়সে করতে হয়। ছেলের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছিলাম।

ছেলের প্রশংসা করলেও বিয়ের পর ছেলের ওপর আর তাদের অধিকার থাকেনি। বৌমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছেলের কিছুই করার জো’টি নেই। তাই আক্ষেপে ফটিক দাদা বলেছেন, “আমাদের পশ্চিম বাংলার সিংহভাগ ছেলেই ‘পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক’।”

ছেলে-বৌমা এবং শাশুড়িকে নিয়ে একত্রে বসবাসের পরিবারেও গিয়েছিলাম। বাড়িতে কাজের লোকের সব দায়িত্ব বৃদ্ধা শাশুড়িকেই পালন করতে হচ্ছে। অর্থাৎ ঘরকন্নার সব কাজ। খুব মজা পেয়েছিলাম ভদ্রমহিলা যখন বৌমার উপস্থিতিতে বৌমা প্রসঙ্গে অনর্গল স্তুতি-প্রশংসা করে যাচ্ছিলেন। এবং সেই স্তুতি ও প্রশংসা বৌমা প্রসঙ্গে আলাপে বারবার বলছিলেন। বৌমার উপস্থিতিতে স্তুতির গীত গাওয়া ছাড়া তার অন্য উপায়ও ছিল না। নয়তো বৌমার আশ্রয়ে থাকা তার অসম্ভব হয়ে পড়বে, এই আশঙ্কায়।

কলকাতার হাল আমলের অনেক চলচ্চিত্রে, টিভি সিরিয়ালে বৌমাদের অমানবিক নির্যাতনে শিকার হওয়া শ্বশুর-শাশুড়িদের বিষয়গুলো দেখানো হয়; সেটা যে কেবল করুণ রসের বাণিজ্যিক অভিপ্রায়ে দেখানো হয়, তা নয়। ওইসব ঘটনা পশ্চিম বাংলার পারিবারিক পরিমণ্ডলেরই বাস্তবতার খণ্ডচিত্র। ক্যাবল টিভির কল্যাণে আমরা কলকাতার ক’টি বাংলা ভাষার টিভি চ্যানেল দেখে থাকি।

জি-বাংলা নামক চ্যানেলের ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’ নারীদের কুইজ অনুষ্ঠানেও অনেক নারী তাদের পারিবারিক জীবন অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে চোখের জল ফেলেন। গত ২৯ অক্টোবরে প্রচারিত ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ষাট বছর বয়সী এক নারী তার অভিজ্ঞতায় বলেছেন, তাদের একমাত্র ছেলে সন্তান বিয়ের বছর খানেক পরে স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তাও প্রায় এগারো বছর আগে। এই এগারো বছরে প্রৌঢ় বাবা-মাকে দেখতে আসেনি, কোন খোঁজখবর পর্যন্ত নেয়নি।

অর্থ কষ্টে, রোগেভোগে তারা জর্জরিত। নিরুপায়ে গহনাগাঁটি বেঁচে বাড়ির সামনের ঘরটিতে মুদি দোকান খুলে দোকানের আয় দিয়েই কোনোক্রমে ডাল-ভাত খেয়ে জীবনরক্ষা করছে। মহিলার ষাটোর্ধ্ব স্বামীকে দোকানের সদাইপাতি পাইকারি বাজার থেকে কাঁধে বহন করে আনতে হয়। অথচ ছেলেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে তাদের জীবনের সব সঞ্চয় তারা ব্যয় করেছিলেন।

সেই ছেলে এখন তাদের সংবাদ নেয়ার তাগিদও অনুভব করে না। জীবন অভিজ্ঞতার এসব কথা বলতে গিয়ে মহিলা শিশুর মতো কেঁদেছিলেন। উপস্থাপিকা রচনা ব্যানার্জি পর্যন্ত চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।

পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোকদের এই নিষ্ঠুর অনাচার পশ্চিম বাংলার পারিবারিক সংস্কৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেবল মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের ক্ষেত্রেই নয়। এটা প্রায় সব শ্রেণীর মধ্যেই ছড়িয়ে আছে।

ফুলিয়া রেলস্টেশনে গামছা বিক্রেতা আদি ঢাকার দোহারের একজনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের দোহা আক্রমণের সংবাদ পেয়ে পুরো পরিবার সৈয়দপুর হয়ে কলকাতায় এবং পরে শান্তিপুরে স্থায়ী হয়েছে। তাদের পেশা ছিল তাঁতশিল্পে। শান্তিপুরে গিয়ে তাঁত পেশায় যুক্ত হয়ে স্বাধীনতার পর আর দেশে ফিরে আসেনি। সরকারি খাস জমিতে বন্দোবস্ত নিয়ে সেখানেই স্থায়ী হয়েছে।

শিয়ালদা-শান্তিপুর লোকাল ট্রেনে গামছা ফেরি করে। তার বয়সও সত্তরের ওপরে। এই বৃদ্ধ বয়সে কেন এত কষ্ট করে যাচ্ছেন, ছেলেরা কী করে? এমন প্রশ্নে তার মুখটি মলিন হয়ে ওঠে। দুই ছেলে এখানে তাঁতশিল্পের কারিগর।

তিনিই তাদের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে তাঁতশিল্পে যুক্ত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিধিবাম। ছেলে দুটি স্থানীয় [তার ভাষায় ঘটি] পরিবারে বিয়ে করে দ্রুতই বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে ত্যাগ করে পৃথক সংসার পেতেছে।

বৃদ্ধ পিতা-মাতা কী খাবে, কীভাবে চলবে সে বিষয়ে সব দায়-দায়িত্ব উপেক্ষা করে আলাদা বসবাস করছে। জীবন রক্ষায় বাধ্য হয়ে তাকে বৃদ্ধ বয়সে গামছার পোঁটলা কাঁধে নিয়ে ঘুরে ঘুরে গামছা বিক্রি করতে হচ্ছে।

পশ্চিম বাংলার পারিবারিক জীবনে আত্মকেন্দ্রিকতার সীমা-পরিসীমা নেই। সেখানে সবাই যার যার তার তার। পারিবারিক দায়িত্ব-কর্তব্য বলে কিছু নেই। পরিবারের দায়িত্ব চরম নিষ্ঠুরতায় এড়িয়ে পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোকেরা জন্মদাতা, প্রতিপালনকারী পিতা-মাতাকে অনিশ্চিত জীবনে ঠেলে কেটে পড়ছে, স্ত্রীর পরামর্শে-জেদে।

পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মানুষের মধ্যকার আত্মকেন্দ্রিকতার বৈপরীত্য অতীতেও ছিল কিন্তু এতটা নিষ্ঠুর-অমানবিক হয়তো ছিল না। বিশ্ব পুঁজিবাদী দর্শন ক্রমাগত বিস্তার লাভ করে মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতার অভিমুখে ঠেলে দিয়েছে। ব্যক্তিগত মুনাফাবাদী এই দর্শন ঘরে ঘরে ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে পর্যন্ত বিস্তার নিশ্চিত করেছে।

তাই ব্যক্তিগত উন্নতির ইঁদুর দৌড়ে শামিল হওয়া, ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে মত্ত হওয়ার ঘটনাগুলো জাজ্বল্যমান। পুঁজিবাদ পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করারই দর্শন। এ দর্শনই পশ্চিম বাংলাজুড়ে ব্যাপক আকারে বিস্তার লাভ করেছে। তাই তার নৃশংস নমুনা দেখে এলাম। পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোকেরা ওই দর্শনেরই শিকার। স্ত্রীর প্ররোচনাও ওই পুঁজিবাদের দীক্ষা।

সে দীক্ষা বিচ্ছিন্নতার, সামষ্টিক ভাবনার বিপরীতে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার অভিমুখে বিরামহীন ছুটে চলা। পুঁজিবাদের প্রবল প্রসারে পশ্চিম বাংলার মতো আমাদের দেশও আক্রান্ত হয়নি, হবে না, পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোকদের আবির্ভাব ঘটেনি, ঘটবে না, তেমন নিশ্চয়তার দাবি আমরা করতে পারব না। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও অনুরূপ ঘটনা আমাদের এখানেও ঘটছে।

স্বল্প মাত্রার কারণে অতটা মোটা দাগে দৃশ্যমান নয়। অপ্রতিরোধ্য পুঁজিবাদকে সম্মিলিতভাবে ঠেকাতে পারলেই আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক সমষ্টিগত মানবিক সংস্কৃতিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া আমাদের সামনে তো বিকল্প পথের আর কোনো সন্ধান নেই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×