গল্প

দ্বিতীয় নরক অথবা মধ্য দুপুর

  মারিয়া সালাম ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দ্বিতীয় নরক অথবা মধ্য দুপুর

টুকটুকি তীব্র ব্যথায় ছটফট করছে, প্রসবব্যথা। অন্ধকারে হাতড়ে কুপি-বাতিটা খোঁজার চেষ্টা করতে করতে কিছু একটার সঙ্গে হোঁচট খেল। ভারী শরীর নিয়ে মেঝেতে হুড়মুড়িয়ে পড়ল।

আতঙ্কে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে টুকটুকির, সাবধানে তলপেটে হাত দিল। ভয়ানক ব্যথা হওয়ার কথা, অথচ হঠাৎ ব্যথাটা আর নেই।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে যে নিকষ কালো অন্ধকারে নিজেকে পেয়েছিল, তার অনেকটাই কেটে গেছে। তলপেটের ওপর থেকে হাত না সরিয়েই অনেক কষ্টে উঠে বসে সে। পায়ের কাছে সাদা কাপড়ে মুড়ানো হাতখানেক লম্বা একটা বস্তু পড়ে আছে, এটার সঙ্গেই হোঁচটটা খেয়েছে কিছুক্ষণ আগে।

জিনিসটা কাফনে মোড়ানো লাশের মতো, একটা নবজাতকের লাশ হবে বড়জোর। কাঁপা কাঁপা হাতে মাথার দিকের কাপড়টা সরাতেই দেখল সদ্যজাত একটা বাচ্চার মুখ। টুকটুকি বেশ বুঝতে পারছে, এটা তার মেয়ের লাশ, যে মেয়েটা এইমাত্র পেটে ছিল। চিৎকার দিয়ে বাড়ির সবাইকে ডাকতে চেয়েও পারছে না। শুকনো গলা দিয়ে একটাও শব্দ বের হচ্ছে না।

এপাশ ওপাশ ছটফট করে ও লাফিয়ে উঠে বসল মশারির ভেতরে। ঘুমানোর সময় কুপিটা জ্বালানই ছিল, কিন্তু এখন চারদিকে অন্ধকার। আতঙ্কে সারা শরীর কাঁপছে ওর, ঘামে ভিজে জবজব করছে ব্লাউজটা। নিজের অবস্থানটা ঠিক ঠাহর করতে পারল না সেই মূহূর্তে, বুঝতে একটু সময় লাগল।

শাড়িটা সরিয়ে বুকের ওপর থুথু ছিটিয়ে নিল। এতক্ষণ যে দুঃস্বপ্ন দেখছিল সেটা ভেবে বুকভরে লম্বা একটা শ্বাস নিল। এই দুঃস্বপ্নটা ও ইদানীং প্রায় দেখছে। ঠিক এই একই দুঃস্বপ্ন না, কিন্তু একই রকম প্রায়। আলগোছে একবার হাত বুলিয়ে নিল পেটে।

আট মাস চলছে ওর, আর বেশি সময় বাকি নেই, এ সময় এ রকম স্বপ্ন সবাই কম বেশি দেখে, তাই বলেছিল সালেমা কবিরাজ।

একটা তাবিজও দিয়েছিল। তাবিজের কথা মনে পড়তেই গলায় হাত দিল টুকটুকি। বুকটা ধড়াস করে উঠল, তাবিজ কই? পাগলের মতো তাবিজ খুঁজতে গিয়ে ভুলেই গেল পাশে আমজাদ শুয়ে আছে।

অসাবধানতাবশত আমজাদের গায়ে হাত পড়ে গেল। কিরে হারামজাদি? আবার কী নাটক শুরু ক্যোরলি র‌্যাতের বেলায় শুয়্যাও আরাম নাই তোর জোন্নে, শুয়োরের বাচ্চা, লাত্থি দিয়্যা বিদায় না করলে আমার নাম আমজাদ না।

এসব কথায় টুকটুকির কিছু এসে যায় না এখন, বিছানা থেকে তাবিজটা কুড়িয়ে নিয়ে গলায় বাঁধতে বাঁধতে উঠে কলপাড়ের দিকে হাঁটা দিল ও। ফজরের আজান হয়ে গেছে। ওজু করতে হবে, নামাজে বসে পাঁচ ওয়াক্ত আল্লাহর কাছে খালি একটা দোয়াই করে যাচ্ছে আজ আট মাস ধরে, এবার যেন একটা ছেলে হয়।

এ ছাড়া এ বাড়িতে ওর আর থাকা হবে না এটা বুঝে গেছে ও। চাহিদা মতো যৌতুক দিতে পারেনি ভাইয়েরা, তারপরও খুব একটা খারাপ ছিল না এ বাড়িতে। বিপদটা হয়েছে মেয়েটা হওয়ার পর।

এখানে মেয়ে কেউ চায়নি, তারপর থেকে কথায় কথায় মার-গাল এসব প্রতি দিনের ব্যাপার। আল্লাহর কাছে তাই দিন রাত বলে যাচ্ছে, এবার যেন একটা ছেলে হয়।

২.

আপনাখে আল্লাহর কির‌্যা লাগে, আমাখে মেডিক্যালে লিয়্যা যান, সকাল থেকে এই একটা কথায় বলতে পারছে কষ্ট করে টুকটুকি। ওর চোখেমুখে কী গভীর আকুতি! মেঝেতে শুয়ে এক হাতে আমজাদের লুঙ্গির কোনা খামচে ধরে ও।

আরে, তুই লুঙ্গি ছাড়, আমি দেখি কী করা যায়, আমজাদ ব্যস্ত পায়ে ঘর থেকে বের হতে গিয়ে করুণ চোখে মায়ের দিকে তাকায়।

কদদিন থেকেই স্বামী আর শাশুড়িকে বলে আসছিল, তার পেটটা ভার ভার লাগছে, যে কোনো সময় ব্যথা উঠবে। তাতে কাউকে তেমন কোনো গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি। আমজাদ তবু একবার ভেবেছিল হসপিটালে নেয়ার কথা।

কিন্তু, ফিরোজা বেগমের এক কথা, আমরা যে বাড়িতে ছেল্যা জন্ম দিয়্যাছি, তো কি মোর‌্যা গেছি?

দাইকে বুলা আছে, অ্যাজ না হলেও কাল অ্যাস্যা পোরব্যে, তুই ওর কথায় কান দিস ন্যা, ছেলেকে বুঝায় ফিরোজা বেগম।

আপনি ইকটু ভ্যান ডাকেন, চলেন মেডিক্যালে যাই, আমি মুনে হয় আর ব্যাচপো না আম্মা, ব্যথার তীব্রতায় টুকটুকির গলার স্বর ক্ষীণ হয়ে আসে।

রক্তশূন্য শরীরটা হলুদ হয়ে ফুলে উঠেছে, ঠোঁটগুলো নীল থেকে ক্রমশ গাঢ় নীল হয়ে উঠছে। ভেতরে ভেতরে অনেক বিরক্ত থাকলেও ছেলের বউয়ের এই করুণ অবস্থা দেখে ফিরোজা বেগমের কিছুটা মায়া হয়।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে রান্নাঘরের দিকে যায় ফিরোজা, ফিরে আসে এক বাটি গরম দুধ নিয়ে।

টুকটুকির মাথায় বাতাস করতে করতে বলল, চুপ কর বেহায়া মাগী। পাড়ার সব ভাতারকে জ্যানাতে হবে যে ছেল্যা পয়দা করবি?

আজ সাত দিন হল, মেয়েটার চেহারা দেখে না টুকটুকি। ওর দাদী সরিয়ে রেখেছে। আমজাদও কোনো খোঁজ নেয়নি।

শুনেছে, তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হবে। আপাতত, ওকে রাখা হয়েছে রান্নাঘরের পাশে যে কাঠখড়ি রাখার মাচা আছে তার নিচে।

টুকটুকি শুয়ে শুয়ে ভাবে আসলেই এই বাড়িতে থাকার সব অধিকারই সে হারিয়েছে।

চল্লিশ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বর্ষা কাদার দিনে দাই আসতে পারেনি। বাড়িতে ফিরোজা বেগম নিজেই অনেক চেষ্টা করেছে, তাতে শেষ রক্ষা হয়নি। জন্মের সময় বিলম্বিত প্রসবের জন্য ছোট মেয়েটা মারা গেছে, আর টুকটুকির ওপরে পড়েছে অভিশাপ।

সে নিজেই জানে না, তার কী হয়েছে! প্রসবের রাস্তা দিয়ে অনবরত প্রস্রাব যাচ্ছে আর বাজে দুর্গন্ধে তার কাছে ভেড়ায় মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হারামজাদী, নিশ্চয় এমুন কুনু পাপ কোর‌্যাছে যেড্যা আমরা কেউ জানিন্যা। এখুন তার শাস্তি প্যাছে, ছি! ভালো ম্যায়্যা হ্যোলে এমুন হোত্যো না, ফিরোজা বেগম বারান্দায় বসে চিল্লে চিল্লে বলে।

ওর পাপে পেটের ম্যায়্যাডাও মরা হয়্যাছে। ম্যায়া ব্যাঁচা থ্যাকলেও তো অখে র‌্যাখতাম না, আর এখুন তো এমনিতেও আর র‌্যাখপো না, আমজাদ বেশ দাঁত চিপে চিপে বলে যায় কথাটা।

বাড়ির দুয়ারে রিকশা ভ্যান দাঁড়ানো, আজ টুকটুকিকে তার ভাইরা নিতে এসেছে। তাদের তেমন কোনো ইচ্ছা ছিল না ওকে নিয়ে যাওয়ার।

কিন্তু এ মাসেই আমজাদ আবার বিয়ে করতে যাচ্ছে। তাই এলাকার লোকজনের চাপে বাধ্য হয়েই বোনকে তারা নিয়ে যাবে।

তবে তারা কাঁচা কাজ করেনি। আগেই কথা করে নিয়েছে, সঙ্গে বড় মেয়েটাকে তারা নিতে পারবে না, সে বাপের সঙ্গেই থাকবে।

এতকিছু হয়ে যাচ্ছে অথচ টুকটুকি পড়ে আছে জড়-পাথরের মতো, তার আর কিই বা করার আছে। এখন তার হাতে অফুরন্ত সময়, ঘরের কাজ নেই, নামাজ-রোজার বালাই নেই।

তাই টুকটুকি এ ক’দিনে অনেকবার নিজে নিজে হিসাব মেলাতে চেয়েছে। কেবল ভেবে ভেবে রাতদিন পার করেছে, কিন্তু হিসাব কিছুতেই মেলে না।

নিজে বহুবার প্রশ্ন করেছে, কোন পাপের শাস্তি এটা। যৌতুক দেবে বলে দিতে পারেনি ওর ভাইরা, সেটাই কি বড় পাপ? আচ্ছা, যৌতুক চাওয়া কি পাপ না? মেয়ে জন্ম দেয়া তাহলে পাপ? তাহলে, সংসারে বউ আনা পাপ না? এরচেয়ে বেশি ভাবতে পারে না ও, চিন্তা আটকে যায়।

যে সময়গুলো চিন্তা করতে পারে না, মেয়ের কথা মনে হয়। মাঝে মাঝে লুকিয়ে মেয়েকে দেখে আর বাড়ির কুকুরটার পাশে রাতে শুয়ে শুয়ে আপন মনে বিড়বিড় করে এসব হিসাব মেলায়।

যাওয়ার সময় উঠানে বসে খেলা করা মেয়েটাকে শেষবারের মতো কোলে তুলে আদর করতে যায় টুকটুকি। কিন্তু ফিরোজা বেগম তেড়ে আসে, খবরদার মাগী, ছেল্যার গায়ে হাত দিবি না।

সুবোধ মেয়ের মতো ও ভ্যানে উঠে বসে, চোখ ফেটে পানি গড়িয়ে পড়লেও মুখে কিছু বলে না। ও এখন মৃত মানুষের মতো, কিছু বলা আর না বলা সমান। ভ্যান গাড়ি চলতে শুরু করে, পেছন থেকে মেয়েটা মা মা করে ডাকতে থাকে।

মা আছেন, মা।

পরিচিত ডাকটা কানে আসতেই টুকটুকি উঠে বসে চটের বিছানার ওপরে। শীর্ণ শরীরে ভর দিয়ে কোনো রকমে বের হয় গোয়ালঘর থেকে।

গত চল্লিশ বছরে এ গোয়াল ঘরেই কেটে গেছে তার জীবন। ওই যে স্বামীর বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে, সেই থেকে বাপের বাড়ির গোয়ালঘরেই তার জায়গা হয়েছে।

ভাবীরা প্রথমে কড়া আপত্তি তুলেছিল। তবে এলাকার লোকজনের ভয়ে বাধ্য হয়েই রাখতে হয়েছে ওকে বাড়িতে। তার বিনিময়ে টুকটুকির ভাগ্যে প্রতি দিনই ছোটখাটো যে কোনো বিষয়ে জুটত নানা গঞ্জনা।

নামাজ প্যড়তে পারিস ন্যা, রোজা কোরতে পারিস ন্যা, আল্লাহ তোখে য্যা কুন দোজখে দিবে! তোর ভাইরা বুল্যা, তাও গুয়ালে থ্যাক্তে দিয়্যাছে।

চল্লিশ বছর অনেক সময়, বিশাল এই সময়ে পৃথিবীর অনেক কিছু বদলে গেছে। ফিরোজা বেগম মরেছে, আমজাদও মরেছে। মেয়েটার বিয়ে হয়েছে।

ভাইদের কুঁড়েঘরের জায়গায় দালান উঠেছে। শুধু, তার জগতে কোনো পরিবর্তন নেই।

আসলে মৃত মানুষের জন্য পৃথিবীটা যেমন, তেমনই, আলাদা কিছু না। এ চল্লিশ বছরে, এই গরু-ছাগলের সঙ্গেই তার জীবন কেটে গেল।

কখনও কখনও গ্রামে অন্য বাড়িগুলোয় বেড়াতে যেত প্রথম প্রথম। অনেকেই মুখের ওপরে মানা করে দিত, কেউ কেউ আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিত, সে অভিশপ্ত, অচুৎ।

কেবল, এই গরু-ছাগলগুলোই ছিল নির্বিকার, এ সহাবস্থানে কেবল ওদেরই কিছু যায় আসে না। অথবা টুকটুকি ওদের ভাষা বোঝে না বলে ওদের আপত্তি শুনতে পায় না।

মা, আপনি কেমন আছেন?

টুকটুকির চোখগুলো আবেগে টলমল করে ওঠে, আঁচলের কোণায় চোখ মুছতে মুছতে বলে অনেক ভালো আছিগো বাবা।

তুমি অ্যাসলে আমি ভাল হোয়্যা যাই, আমাখে লিয়্যা যাবা বুল্যাছিলা তুমার সঙ্গে, অ্যাজ লিব্যা?

তমাল ঘাড় নেড়ে বলে, হ্যাঁ মা, আজকেই নিব।

স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে অনেক ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীকে সে সেবা দিয়েছে। কিন্তু, টুকটুকি বেগমের মতো হতভাগা একজনও দেখেনি।

আঠারো বছর বয়সের এক তরুণী কেবল মাত্র অজ্ঞতা আর হিংসার শিকার হয়ে গোয়ালঘরে ঠাঁই নিল আর সেখানে পার করে দিল জীবনে চল্লিশটা বছর!

তমাল এই কেসটা খোঁজ পেয়েছে অনেক কষ্টে, টুকটুকির আসলে কী রোগ কেউ বলতে পারেনি তাকে। কেবল আন্দাজের ওপর, অনেক সাহস করে সে যোগাযোগটা করেছে।

প্রথম দিকে টুকটুকি একদমই রাজি হয়নি চিকিৎসা নিতে, পরে অনেক বুঝিয়ে মেনে নিয়েছে।

তার সমস্যাটা খুব অল্প, একটা সার্জারি করলেই ভালো হয়ে যাবে, অথচ এই সামান্য সমস্যার জন্য চল্লিশটা বছর একটা মানুষ গোয়ালে শুয়ে শুয়ে জীবন পার করে দিল! তমালের চোখ ভিজে আসে, মমতা নিয়ে টুকটুকির হাতটা ধরে তাকে রিকশায় তোলে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×