সেলিম আল দীনের অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকার

  সংগ্রহ ও ভূমিকা : মাসুদুজ্জামান ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নাট্যাচার্য সেলিম আল-দীন
নাট্যাচার্য সেলিম আল-দীন

বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে যিনি দেশীয় বা প্রাচ্য-ঘরানার দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি হচ্ছেন নাট্যাচার্য সেলিম আল-দীন। ইউরোপীয় নাট্যদীক্ষায় দীক্ষিত ছিলেন তিনি, কিন্তু মনে করতেন, প্রাচ্যনাট্যরীতি পাশ্চাত্যের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ ও আলাদা।

ইউরোপীয় নাট্য-ন্যারেটিভের যে ধরন, তাকে প্রায় বর্জন করে প্রাচ্যনাট্যরীতির উদ্ভাবনে আজীবন নিরলসভাবে সংগ্রাম করে গেছেন তিনি। সফলও হয়েছিলেন দারুণভাবে। প্রাচ্য-ন্যারেটিভ ও ডিসকোর্সকে তিনি শিল্পসম্মত করে তুলেছিলেন- কী ভাবনায়, কী চর্চায়।

বাংলাদেশের নাটক তাই আজ যে মহিমায় সুপ্রতিষ্ঠিত, তা সফল হতে পেরেছে, বলা যায়, এই মানুষটির প্রায় একক প্রচেষ্টায়।

এখানে যে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হল, সেটি সেলিম আল-দীন দিয়েছিলেন তার নাট্যচর্চার প্রায় তুঙ্গতম মুহূর্তে। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক সন্ধানী পত্রিকায়, ৬ষ্ঠ বর্ষ ১০ম সংখ্যায়, ১৯ জুন ১৯৮৩ সালে।

ওই সংখ্যায় সন্ধানী ঢাকা থিয়েটারের সেই সময়ের নাট্যচর্চা নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করে। প্রতিবেদনটি লিখেছিলেন মামুন রশীদ। সন্ধানীর পক্ষ থেকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেলিম আল-দীনের এখানে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি।

প্রতিবেদক, দেখা যাচ্ছে, ঢাকা থিয়েটার তখন আমাদের নাট্যধারায় যে নতুন নতুন অবদান রেখে চলেছিল, যেমন গ্রাম থিয়েটার প্রতিষ্ঠা ও মেলার আয়োজন করা, তার বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। ঢাকা থিয়েটারের মঞ্চস্থ নাটকগুলো সম্পর্কেও পর্যালোচনা ছিল।

ওই প্রতিবেদনের একজায়গায় ঢাকা থিয়েটারের সাম্প্রতিক নাট্যচর্চা সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘ঢাকা থিয়েটার মনে করে, পদ্মা মেঘনা ও অশান্ত বঙ্গোপসাগরের কূলে আমাদের বাস।

শত শত বছরের ইতিহাস ও ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে আমরা বেড়ে উঠেছি। হাজার বছরের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করেছি। বাংলাদেশের মঞ্চে তাই আমরা নিজেদের জীবন, পরিমণ্ডল ও লড়াইয়ের চিত্র তুলে ধরতে চাই। শুধু বিদেশি নাটক করার অর্থ হচ্ছে নাটকে বাংলাদেশের

মানুষ ও তাদের সত্যিকার জীবনচিত্র অবহেলা বা অবজ্ঞা করা।’ এ বক্তব্যটি বলা বাহুল্য, ছিল মূলত সেলিম আল-দীনেরই। তিনি ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের নবনাট্য আন্দোলনের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ভাবুক।

ঢাকা থিয়েটার স্বাধীনতার পরে যে ১৩টি নাটক মঞ্চস্থ করে, সেসব নাটকের ৮টিই ছিল তার রচিত। ঢাকা থিয়েটার যেমন ছিল সেলিম আল-দীনের নাট্যভাবনা প্রয়োগের ক্ষেত্র, তেমনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যবিভাগ ছিল তার ভবিষ্যতের নাট্যকর্মী, নাট্যকার ও নাট্যভাবুক তৈরির তাত্ত্বিক ও চর্চার ক্ষেত্র।

পরবর্তীকালে দারুণভাবে সফলও হয়েছিলেন তিনি। প্রকাশিত এই দুষ্প্রাপ্য সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নাট্যাচার্য সেলিম আল-দীনের জন্মদিনে তার কর্ম আর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছি।

প্রশ্ন: ঢাকা থিয়েটার এ দেশের নাটক তারকাপ্রথাকে নিশ্চিত করছে। পক্ষান্তরে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন এ সিস্টেমের পরিপন্থী। আমরা কি তাহলে ধরে নেবো ঢাকা থিয়েটার এ প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত?

সেলিম আল-দীন : বাংলাদশে মঞ্চতারকা কোথাও নেই। তাই ঢাকা থিয়েটার নাটক তারকা প্রথাকে নিশ্চিত করছে একথা সত্য নয়। মঞ্চে অভিনয় করে তারকা হওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। কারণ বাংলাদশের মঞ্চ সুগভীর শিল্প সাধনার যে রাস্তাটি তৈরি করছে তাতে শুধু অভিনয়ই মুখ্য নয়। এতে জড়িত আছে মঞ্চ-শ্রমিকদের শ্রম-ঘামের স্পর্শ। তারকা শব্দটির উদ্ভব ঘটছে বাণিজ্যিক বুদ্ধি থেকে। এর সঙ্গে শিল্পী ও শিল্পীর কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রশ্ন: আপনার অধিকাংশ নাটক গীতল ও কাব্যপ্রধান। গীতিময়তা ও কাব্যকে প্রাধান্য ও প্রশ্রয় দিলে আপনার বহু নাটক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের বঞ্চনা ও নিপীড়নের নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে আচ্ছন্ন হয়েছে মিঠে ভাবালুতায়- নিজের নাটক সম্পর্কে এ অভিযোগকে আপনি কিভাবে খণ্ডণ করবেন?

সেলিম আল-দীন : আমার নাটকে নাটকই প্রাধান্য পেয়েছে, গীতলতা বা কাব্যালুতা নয়। মূলত দৈনন্দিনের গদ্যকে আমি জীবনের নিগূঢ় প্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চাই। আমার সংলাপরীতিকে আমি চরিত্রের উল্লাস ও বেদেনাপ্রবাহের সঙ্গে একীভূত করতে চাই।

আমি সরাসরি ইউরোপীয় রীতিতে লেখার অপপ্রয়াস কখনও করিনি। কাজেই ট্র্যাজেডি নাটকের সংলাপের স্থিতিস্থাপকতা আমার নাটকে অপ্রয়োজনীয়। ট্র্যাজেডি-পড়া কান দিয়ে বাংলাদেশি মনকে বোঝা যাবে না কখনও। বাংলা নাটকে ইউরোপীয় রীতির ট্র্যাজেডি করার প্রয়াস সর্বাংশে ব্যর্থ হয়েছে।

আমার নাটক যদি এই বাংলাদশি জনপদের জীবনযুদ্ধ, বেদনা ও পতনকে গভীরভাবে ধারণ না করে থাকে, তবে তা অবশ্যই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। অন্য কোনো কারণে নয়।

আমি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ছেলে। একটি প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ও যুক্তিবাদী সমাজে গদ্যের যে রীতি- তা থেকে বাংলাদেশি গদ্যরীতি ভিন্ন হতে বাধ্য। আমাদের গদ্যে থাকবে হত্যার আর্তনাদ, তাজা রক্তের স্পন্দন।

বাবুগদ্য নয়- পদ্মাপারের মানুষ যে ভাষায় আর্তনাদ করে সে ভাষা চাই নাটকে। উপরন্তু আমার জন্ম বঙ্গোপসাগরের তীরে। সমুদ্রের ঢেউ ও প্রলয়ের সঙ্গে পরিচয় জন্মাবধি। সুতরাং মোজাইক ড্রাই মনোটোনাস ইত্যাদি গদ্যরীতির অনুকৃতি আমার দ্বারা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন: এখানকার অধিকাংশ নাটকে বিশাল গ্রামজীবন আসছে নিঃসন্দেহে। এটি একটি ইতিবাচক প্রবণতা। কিন্তু গ্রাম বলতেই নাট্যকাররা বোঝাচ্ছেন নদীর ভাঙন, জোতদার আর ভূমিহীনের লাঠি, যুদ্ধ-সমস্যায় জর্জরিত শতাব্দী-প্রাচীন আমাদের গ্রামীণ জীবনের এ কি যথার্থ চেহারা?

সেলিম আল-দীন : খুব কম নাটকেই বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের শাশ্বত পরিচয় আমি পেয়েছি। অক্ষম লেখকদের বৈশিষ্ট্য এই যে তারা যতটা রাজনীতি সচেতন ততটা শিল্পসচেতন নন। তবে এটা ভুললে চলবে না যে, আমাদের বাংলাদেশের গ্রামের মানুষরা দুর্দান্ত সাহসী, তারা সুযোগ মতো লাঠি, ফালা ও রামদাও ব্যবহার করে থাকে।

প্রশ্ন: আমরা দেখছি গাঁ থেকে মেহনতী মানুষের জীবনযাপনের উপকরণ জোগাড় করে এনে, মহিলা সমিতির একরত্তি মঞ্চে তা অভিনীত হচ্ছে, তাতে খানিকটা থাকছে মেহনতী মানুষের দুঃখ কষ্ট এবং শেষে ফ্রিজশট- সমাজ পরিবর্তনের ইঙ্গিত; দেখছি দু’ঘণ্টায় অভিনয় শেষ হলে নিরুদ্বেগ ঢাকাই দর্শক যে যার ঘরে ফিরছে। একটা বৃত্ত তৈরি হচ্ছে কি?

সেলিম আল-দীন : হ্যাঁ, আমি একমত। ঢাকা থিয়েটার এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। বৃত্তভাঙার চেষ্টা চলছে। সাতাত্তরে আমরা রাস্তা নাচাও আন্দোলন শুরু করি। ’৮১ সালে আমরা দেশীয় ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য আমরা গ্রামে গ্রামে মেলা পত্তন ও নাট্য-সংগঠন গড়ে তোলার কাজে হাত দিই। আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম ফল পাবনা থিয়েটার, বগুড়া থিয়েটার, চাটগাঁর অরিন্দম ও ফেনীর সংলাপ নাট্যগোষ্ঠী অনেক দূর এগিয়েছে।

প্রশ্ন: একই প্রশ্ন কি শহর থেকে গাঁয়ে গিয়ে নাটক করার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়? কীভাবে একে মেলানো যাবে?

সেলিম আল-দীন : তবে গ্রামের লোকদের পক্ষে কি আপনা থেকে সংগঠিত হয়ে নাট্যচর্চা করা সম্ভব! শহর থেকে গিয়েই তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে।

প্রশ্ন: সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনে নাটক কতটা ভূমিকা রাখতে পারে? সমাজ পরিবর্তনে বিচ্ছিন্ন নাট্যপ্রয়াস শেষাবধি কতটুকু সুফল আনবে?

সেলিম আল-দীন : নাটক সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনে বেশ সাহায্য করতে পারে।

প্রশ্ন: টিভি নাটকের ক্ষেত্রে স্ক্রিপ্টের দারিদ্র্যের পাশাপাশি যে ব্যাপারটি প্রায়ই উচ্চারিত হয় তা হল কট্টর সেন্সরশিপ। এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

সেলিম আল-দীন : টিভিতে কেন যে এত সরকারি নিয়ন্ত্রণ তা বুঝি না, লেখকদের সত্য কথা বলতে দিলে জনগণের ক্ষোভ দূর হয়ে যায়। ফলে, সরকার ও জনগণের দূরত্ব কমে আসে, সরকারের প্রতি বিশ্বাস গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে অবশ্য সরকারি নিয়ন্ত্রণের চেয়েও মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল দর্শকদের রুচি আমাকে বেশি পীড়িত করে। সমাজের সঠিক চিত্র দেখলে অনেকেই ‘এ মা! ছি!’- ভাব করে।

প্রশ্ন: গ্রুপের আগামী নাটক সম্পর্কে কিছু বলুন।

সেলিম আল-দীন : এখনও জানি না। সব অনিশ্চয়তার মাঝ দিয়েও আমাদের কর্মীদের একনিষ্ঠতা, দক্ষতা আর গ্রুপের প্রতি অবারিত আন্তরিকতার জন্যই আমরা আজও টিকে আছি এবং টিকে থাকব।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×