রিজিয়া রহমান ও আদিম মানুষেরা

  ফজলুল হক সৈকত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনের যে আখ্যান উপন্যাসে পরিবেশিত হয়, তা কখনও কখনও পাঠককে চিন্তার অতলে ডুবিয়ে দেয়। -বাঙালি কথানির্মাতা রিজিয়া রহমান (জন্ম : ২৮ ডিসেম্বর ১৯৩৯, ভবানীপুর, কলকাতা)-এর একটি ছোট্ট-পরিসরের উপন্যাস পড়তে গিয়ে এ পুরনো কথাটি নতুন করে মনে হয়েছে। ‘বাঁশের খুঁটি পুঁতে দিল তোমা। বলল,- এখানে। হ্যাঁ, এখানেই আমাদের বাস্তু। আকাশটা খুব চমৎকার নীল। পাহাড়ের নীল অরণ্যে মর্মরিত হচ্ছে বাতাস। সেই বাতাস উড়িয়ে আনছে বনমোরগ আর হরিণের ডাক।’- এভাবেই আরম্ভ এ ক্ষীণকায় উপন্যাস শুধু তোমাদের জন্য (প্রথম প্রকাশ : এপ্রিল ১৯৮৮, মুক্তধারা; দ্বিতীয় প্রকাশ : সেপ্টেম্বর ২০১৩, সাহিত্য বিলাস, ঢাকা)। সামান্য-পরিসরে কীভাবে বিরাট বিষয়কে জায়গা দিতে হয়, সেই শিল্পকলা হয়তো রিজিয়ার জানা ছিল। মানবসভ্যতার বিকাশ নিয়ে বিপুল আকারের আখ্যান তিনি লিখতে পারতেন। উত্তরপুরুষ (প্রকাশকাল : ১৯৭৭), বং থেকে বাংলা (প্রকাশকাল : ১৯৭৮) এবং একাল চিরকাল (প্রকাশকাল : ১৯৮৪) লিখে তিনি জাতীয়তাবোধ এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-সভ্যতা আশ্রিত উপন্যাস লেখার দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন। বর্তমান উপন্যাসটির পাঠ ও পর্যালোচনায় আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে- ইতিহাস, সবকিছু ভেঙে নিচ্ছে, প্রতিবন্ধকতা, অধিকার, দাবি, বিধিনিষেধ, শর্ত, দানব, নিরাপত্তা-দেয়াল, অভ্যন্তরীণ বিষয়, দেবতা, মানুষকে মুক্ত করার সংগ্রাম এবং প্রগতিশীল চিন্তার দাসত্ব ও অবিনাশী শক্তি ইত্যাদি কথামালা।

শুধু তোমাদের জন্য উপন্যাসটির কাহিনী-সংক্ষেপ করলে এরকম দাঁড়ায় : আদিবাসী এক গোত্রের প্রধান ‘তোমা’। সে ‘সুঠাম দেহের নারী। তোমাদের গোত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী মেয়ে।... দল-নেত্রী হওয়ার সব গুণই তোমার আছে। জঙ্গলে হাঁটার সময় তোমার মতো শিস বাজিয়ে কেউ কু দিতে পারে না। পাথর ঘষে অস্ত্র তৈরি করতে তোমার জুড়ি নেই। শিকারে তোমার হাত অব্যর্থ। আর তোমা সবসময় গোত্রের লোকদের ভালোমন্দ চিন্তায় উদার।... তোমার ওপর সবার অগাধ বিশ্বাস আর নির্ভরতা।’ এ গোষ্ঠীনেত্রীর কন্যা কিরি। সে বুদ্ধিমতি এবং উজ্জ্বল-সম্ভাবনাময়। সে একদিন এ আদিবাসী জনপদে মানুষের জীবন-ধারণের ‘প্রাণ’ ঝরনা আবিষ্কার করে ফেলে। কিন্তু তার মা তোমা এ কৃতিত্বের স্বীকৃতি তাকে দিতে নারাজ। সে জানে একথা জানলে লোকেরা কিরিকে দলনেত্রী বা তোমা বানাবে। কিন্তু প্রকৃতির হিসেব ভিন্ন। তা কারও জানা থাকে না। মানুষ না চাইলেও প্রকৃতির বিধান চিরদিন বহাল থাকে ঠিকই। আর এও সত্য যে, প্রতিভাকে, সম্ভাবনাকে, যোগ্যতাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। এ উপাখ্যানেও তেমনটিই ঘটেছে। একসময় তোমার নেতৃত্বের অবসান ঘটে। নেতৃত্বে আসে কিরি। লোকেরা তার সাহস আর যোগ্যতাকে স্বীকৃতি জানায়। এ গোত্রের এক যুবক বল্লা কিরিকে ভালোবাসে। তাকে একার করে পেতে চায়। ‘কিরির হাসি, কিরির ধারাল পাথরের মতো আঁকাবাঁকা ভীষণ আকর্ষণীয় শরীর বল্লার বুকে শরীরে কামনার গর্জন তুলে দেয়।’ কিরিকে নিয়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে চায় বল্লা। প্রতিষ্ঠা করতে চায় নতুন গোত্র। কিন্তু কিরি চায় সবার জন্য নিবেদিত থাকবে- কারও একার হতে চায় না সে। তার শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তোমাগোত্রের সব মানুষকে নিরাপত্তা, আশ্রয় ও খাদ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করার দিকে কিরির প্রত্যয়। কিন্তু বল্লা অন্য ধরনের মানুষ। সে প্রতিষ্ঠা করতে চায় তার একার অধিকার। ব্যক্তিগত ভালোলাগা-মন্দলাগাকে। কাহিনীর পরিসমাপ্তিতে দেখা যায় তোমাগোত্রের তিন প্রজন্মের নারী শাসন- উরি-তোমা-কিরি’র অবসান ঘটে পরিবর্তনকামী পুরুষ বল্লার হাতে। বল্লা কিরিকে হত্যা করে তোমাগোত্রের দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে বুক বাঁধে। ‘ক্ষমতার প্রতীক বল্লম’ ছিনিয়ে নেয় সে রুকির কাছ থেকে। রুকি এটি কোনো এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় লুকিয়ে ফেলেছিল। সে-ও হতে চেয়েছিল তোমাগোত্রের কর্ণধার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নারী-পুরুষের ক্ষমতার লড়াইয়ে বিজয়ী হয় পুরুষ।

উপন্যাসটির পটভূমি কিংবা প্রেরণা-বিষয়ে লেখকের একটি জবানবন্দি আমরা পাই গ্রন্থের শেষ পৃষ্ঠায়। তিনি লিখছেন- ‘সীতাকুণ্ড-রামগড় রেঞ্জের কাছে করেরহাটে পাওয়া দ্বিতীয় প্রস্তর যুগের অস্ত্রের সূত্র নিয়ে আনুমানিক প্রায় আট হাজার বছর আগের সময়সীমা কালের মধ্যে এ উপন্যাসের কাহিনী বিস্তৃত।’ আদিম মানুষের বসতি স্থাপন, কৃষি-সভ্যতা ও গৃহস্থ-কালচারের বিকাশধারা, গোত্র-দ্বন্দ্ব এবং সভ্যতার ক্রমবিকাশ, প্রার্থনা ও দেবতাভক্তি, নারীর মর্যাদা-অধিকার ও ক্ষমতায়ন ইত্যাদি প্রসঙ্গের অবতারণা করে কাহিনীকার প্রাচীন মানব-সমাজের একটি কল্প-বাস্তব ছবি আমাদের সামনে হাজির করেছেন। তুলে ধরেছেন ঈশ্বরে বিশ্বাস ও প্রকৃতির প্রতিশোধপ্রবণতায় আস্থার বিষয়াদিও। রিজিয়া রহমান এ উপন্যাসে লিখছেন- ‘দেবতা অসন্তুষ্ট হলে কত অঘটন ঘটে যেতে পারে। পৃথিবীটা থর থর করে কেঁপে উঠতে পারে। টলমলিয়ে উঠবে তখন পাহাড় বন। হয়তো সমুদ্রটা ফুলে উঠে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে সবার ওপরে। কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে সব। কিংবা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে পারে সারা বনজুড়ে দাবানল।’ জীবন-সংগ্রাম, প্রতিকূলতা, ফসল-আগুন-পশুশিকার, পানীয় পানির উৎস ঝরনা খুঁজে পাওয়ার মতো নতুন নতুন আবিষ্কার আর বাঁচার নানান কৌশল অনুসন্ধানের ভেতর দিয়ে যে আদিম মানবসভ্যতার বিকাশ, তারই একটি ধারাক্রম নির্মাণের চেষ্টা আছে এ কাহিনীতে। লেখক গোত্রপ্রথার পাশাপাশি ব্যক্তির বিকাশ এবং ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের আবির্ভাব ও জীবনের বৈচিত্র্য-অন্বেষী মানুষের বিপুল সম্ভাবনা ও প্রত্যয়কে পাঠকের সামনে হাজির করেছেন। ক্ষমতার পরিবর্তন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় উৎসবের আয়োজন, ভগবানের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন, মৃত ব্যক্তির কল্যাণের জন্য প্রার্থনা, মানসিক পবিত্রতা, মানবতার মঙ্গল কামনা ইত্যাদি লোকাচার বা কালচারেও যে আদিম মানুষরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল, সেসব বিষয়েও আলোকপাত করেছেন কথাশিল্পী রিজিয়া রহমান। সভ্যতা যে একদিনে তৈরি হয়নি, ঐতিহ্য যে আমাদের বহুদিনের অর্জিত সম্পদ, আদিম মানুষরা যে সভ্যতা-সংস্কৃতির উদ্ভাবক ও লালনকারী- এসব কথা বলতে কোনো কার্পণ্য করেননি কথাকার।

আর এ বিপুল জীবনে, আদিমতার অন্ধকার থেকে মানুষের আলোয় আবির্ভাবের কথা বলেছেন রিজিয়া রহমান; বহু নারী বহু পুরুষের মিলিত সংসার থেকে আলাদা হয়ে দাম্পত্য-প্রথা এবং সংসারের যে আদিম অভিযাত্রা, তারও সন্ধান মেলে রুকি-বল্লার প্রেম-অনুভবে। রুকিকে ‘দু’বাহুর মাঝে বন্দি করে বল্লা নতুন উন্মাদনায়’ প্রকাশ করে এক নবতর উপলব্ধি- ‘আমরা দু’জন শুধু দু’জনের। আমরা সবার নই।’ বর্তমান কাহিনীর যেখানে সমাপ্তি, সেখানে আমরা দেখি, শেষপর্যন্ত, নেতৃত্ব-সংকটের এক চির-সমস্যার আবর্তে পড়ে গেল মানুষ। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যাকুল মানুষ কী এক অভিশাপের জালে পা রেখে পথ হাঁটতে শুরু করেছে! ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, জয়-বিজয়, ফেমিনিজম-এন্টিফেমিনিজমের মতো কিছু প্রসঙ্গ অমীমাংসিত রেখেই উপন্যাসের সমাপ্তি টেনেছেন।

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×