খুব উপভোগ করেছি আমি আনন্দিত : ইমদাদুল হক মিলন

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের একজন অন্যতম জনপ্রিয় লেখক ইমদাদুল হক মিলন। সাহিত্যের বিচিত্র শাখায় তার সদর্প পদচারণা। পেয়েছেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। তার সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে জনপ্রিয় টেলিভিশন নাটক। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পদকসহ অগণিত রাষ্ট্রীয় পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ এই লেখকের সঙ্গে কথা বলেছেন

  কবি আহমেদ বাসার ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য সম্প্রতি আপনি একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। কেমন বোধ করছেন?

: একুশে পদক তো অনেক বড় রাষ্ট্রীয় সম্মান। আমার মনে হল, আমি যে এতদিন ধরে লেখালেখি করি, দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর হয়ে গেল আমার লেখকজীবনের বয়স। আমি বাংলা একাডেমি পুরস্কারই পেয়েছি এখন থেকে ছাব্বিশ বছর আগে। সবকিছু মিলিয়ে একুশে পদকটা পাওয়ার পর মনে হল, এই যে আমি এতগুলো দিন ধরে একটা জায়গায় লেগে থাকলাম, লেখালেখির কাজটা করলাম; তার একটা যথাযথ মূল্যায়ন হল। সেটি আমি খুব উপভোগ করেছি এবং আমি খুব আনন্দিত হয়েছি।

এই বইমেলায় আপনার কী কী বই প্রকাশিত হচ্ছে? সাড়া কেমন পাচ্ছেন?

: এই বইমেলায় আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইটার নাম হচ্ছে একাত্তর ও একজন মা। নাম থেকে বোঝা যায় যে, উপন্যাসের পটভূমি উনিশশ’ একাত্তর। সেই সময় পুরান ঢাকার একটি পরিবারের বাবাটিকে হত্যা করা হয়। একটু অন্যরকমভাবে মেরে ফেলা হয়। সেই মায়ের দশটা সন্তান। ভদ্র মহিলার চল্লিশ বছর বয়স। এই দশটি সন্তান নিয়ে তার যে স্ট্রাগল এটা নিয়ে লেখা উপন্যাস। এই বইটা বেরিয়েছে অনন্যা থেকে। এর পাশাপাশি আমার একটা অন্যরকম গল্পের বই বেরিয়েছে। বইটির নাম হচ্ছে ফেলে যাওয়া রুমালখানি, বেরিয়েছে অন্যপ্রকাশ থেকে। ছয়টা গল্পের সংকলন। আর একটা ছোটদের বই আছে। নাম হচ্ছে কলাপাতা ও লাল জবাফুল। এই বইটা কথা প্রকাশ বের করেছে। এর থিম হচ্ছে একটা কলাপাতাকে চৌকোণা করে কেটে যদি তার মাঝ বরাবর দশ-বারোটা লাল জবাফুল রাখা হয় তাহলে সেটা বাংলাদেশের পতাকার মতো দেখাবে।

পাঠক সৃষ্টিতে আপনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন?

: একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের বইয়ের বাজারটা একেবারেই ভারতীয় লেখকরা দখল করে রেখেছিলেন। সেদিক থেকে আমি চেষ্টাটা করেছিলাম সেই ১৯৭৭ সাল থেকে। তখন হুমায়ূন আহমেদ আমেরিকাতে পড়াশোনা করছেন। সাতাত্তর সালে আমার বই বেরুলো ভালোবাসার গল্প। এই বইটা দিয়ে আমি তখনকার যুবক-যুবতীদের প্রেম, দৈনন্দিন জীবন, ভালোবাসা, স্বপ্ন- এ সব নিয়ে আমি লিখতে শুরু করলাম। এ ক্ষেত্রে একশ্রেণীর পাঠক আমার তৈরি হল। পাশাপাশি একটা উপন্যাস লিখেছিলাম নিরন্নের কাল। তো একটা ভালোবাসার গল্প আরেকটা নিরন্নের কাল। দুটো বই দিয়ে যখন আমি যাত্রা শুরু করলাম তখন দুই ধরনের পাঠক আমার লেখা পড়তে শুরু করল। এক ধরনের সিরিয়াস পাঠক, আরেকটা সরল আঙ্গিকের প্রেমের গল্পের পাঠক। এর পাশাপাশি ছোটদের জন্য লেখাও শুরু করলাম। ফলে কিশোররাও বড় হয়ে আমার বই পড়ে। কিন্তু একটা সময় এসে আমার মনে হল যে, আমি শুধু পাঠকের কথা ভেবে লিখব কেন? আমি শুধু আমার লেখাটা লিখব, আমার ভাবনাটা লিখব। তার ফলে আমি দেখলাম যে, হ্যাঁ, একশ্রেণীর পাঠক তৈরি হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ আমেরিকা থেকে ফিরে এসে আবার লেখালেখিটা শুরু করলেন। একটা সময় আমরা লক্ষ করলাম বাংলাদেশি পাঠকরা ব্যাপকভাবে আমাদের লেখা পড়ছে। ভারতীয় লেখকদের তারা মোটামুটিভাবে পরিহারই করছে। এ রকম একটা বড় বাজার তৈরি করেছি আমরা।

আপনার লেখালেখিতে দুটি স্রোত লক্ষ করা যায়। একটি জনপ্রিয়তামুখী, অন্যটি চিরন্তন শিল্পঅভিমুখী, এটি কীভাবে সম্ভব হল?

: আমি খুব সচেতনভাবেই এটি করার চেষ্টা করেছি। আমি সব ধরনের লেখা লিখব। সব ধরনের পাঠক যেন আমার লেখা পড়ে। যারা এক সময় ভালোবাসার সুখ-দুঃখ পড়বে তারাই এক সময় পড়বে নূরজাহান। পরবর্তী সময় হয়তো পড়বে জিন্দাবাহার কিংবা কেমন আছো সবুজ পাতা বা রূপনগর, নদী উপাখ্যান, কালো ঘোড়া। এগুলোকে আমি আমার গুরুত্বপূর্ণ লেখা মনে করি। গত বছর আমি লিখেছিলাম মায়ানগর নামে পুরনো ঢাকার পটভূমিতে একটি উপন্যাস। এবার লিখেছি একাত্তর ও একজন মা। প্রতিবছরই আমি একেবারে অন্যরকম কিছু লেখার চেষ্টা করি। এর আগে লিখেছিলাম সাড়ে তিন হাত ভূমি নামে একটি উপন্যাস। এভাবে প্রতিবছর আমি নতুন কিছু দিতে চাই।

বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টিতে এক সময় পাঠাগারের গুরুত্ববহ ভূমিকা ছিল। বর্তমানে পাঠাগারগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?

: পাঠাগারগুলোর বিলুপ্তি আমাদের জন্য একটি বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময় প্রতিটা পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার ছিল। যেমন আমি গেণ্ডারিয়াতে থাকতাম। সেখানে ১৯৫৫ সাল থেকে একটা পাঠাগার ছিল- সীমান্ত গ্রন্থাগার। ওই পাঠাগারে বই পড়ে পড়ে আমি বড় হয়ে উঠেছি। পাঠাগারটা না থাকলে আমি বোধ হয় লেখকই হতাম না। সুতরাং আমি মনে করি, পাঠাগার অত্যন্ত জরুরি। আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়েরও ব্যাপকভাবে ভাবা দরকার। পাঠাগারগুলোকে পুনরুদ্ধার করে কিংবা নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করে পাঠাগারের জায়গাটাকে জোরদার করা দরকার। প্রতিটা উপজেলায়, প্রতিটা ইউনিয়নে, প্রতিটা পাড়া-মহল্লায় এক সময় যে রকম পাঠাগার ছিল তা থাকাটা খুব জরুরি।

জনপ্রিয় সাহিত্যকে সাহিত্যবোদ্ধাগণ প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখে থাকেন। আপনি যেহেতু বর্তমান বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম জনপ্রিয় লেখক। এ ক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা কী?

: আমি নিজেকে আর জনপ্রিয় লেখক ভাবি না। যা বলতে চাই, এখন আমি ফেব্রুয়ারির বইমেলা এলেই দেখি, পত্র-পত্রিকায় যে বিজ্ঞাপনগুলো হয় সেখানে একশ্রেণীর লেখক নিজেদের লিখে যাচ্ছেন জনপ্রিয় লেখক, জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, জনপ্রিয় অমুক, জনপ্রিয় তমুক। এর ফলে জনপ্রিয় জিনিসটাও এখন এমন একটা পর্যায়ে গেছে যে, প্রত্যেকে জনপ্রিয় লেখক। যার ফলে জনপ্রিয়তা কিংবা জনপ্রিয় লেখকের ইমেজটাই এখন এক ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রকৃত অর্থে জনপ্রিয় লেখদের যারা নাক সিটকান, তাদের আমি কয়েকজন লেখকের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। যেমন- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। তিনি কি খারাপ লেখক? তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতি এদের প্রত্যেকের বই বছরের পর বছর ধরে চলছে। রবীন্দ্রনাথের বই বিক্রি হচ্ছে, নজরুলের বই বিক্রি হচ্ছে, জীবনানন্দের বই বিক্রি হচ্ছে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহের বই বিক্রি হচ্ছে। বিক্রি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদ, সেলিনা হোসেন, হাসান আজিজুল হকের বই। আমার কথা হচ্ছে জনপ্রিয় লেখা কিংবা অজনপ্রিয় লেখা বড় নয়। বড় হচ্ছে ভালো লেখা এবং মন্দ লেখা। কে ভালো লিখছে সেটা ভাববার বিষয়, কে মন্দ লিখছে সেটা ভাববার বিষয়।

লেখালেখি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

: আমি একটি বড় উপন্যাস লিখব। তার চারটি পর্ব লিখেছি। আর একটা পর্ব এ বছর লিখব। আপাতত এই পরিকল্পনার মধ্যেই আছি। এটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস। বলা যায় যে, আমার দেখা, আমার বেড়ে ওঠা আমার চারপাশ আমার সময়।

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×