বই আলোচনা

অগ্নিপ্রভাত

যুদ্ধজীবনের আখ্যান

  হরিশংকর জলদাস ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি আমার হাতে ‘অগ্নিপ্রভাত’ এলো। অকস্মাৎ আমার মনটা বহু পেছনে সরে গেল। তখন ’৭৩ কী ’৭৪। নতুন প্রভাত নামে একটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। ছবিটি শেষ হচ্ছে কোনো এক প্রভাতে লালসূর্য উদয়ের মাধ্যমে। এক তরুণী প্রভাতসূর্যের লালচে আলোয় খড়ের গাদায় প্রসবোন্মুখ। তার প্রেমিক-স্বামী মুক্তিযুদ্ধে নিখোঁজ হয়ে গেছে; কিন্তু তরুণীটির গর্ভে রেখে গেছে তার অনাগত ভবিষ্যৎকে। ছবিটির শেষ অংশে এসে স্বাধীন দিনের লাল সূর্যটি আর সদ্যোজাত সন্তানটি একাকার হয়ে গেছে। নায়ক-নায়িকা দু’জনে ছিল দুই ধর্মের। এ নিয়ে সেই সময় পত্রপত্রিকায় সামান্য বিতর্কের সৃষ্টি হলেও ছবিটি তার নির্মাণ কৌশল ও কাহিনী বৈচিত্র্যের জন্য বহু প্রশংসিত হয়েছিল।

‘অগ্নিপ্রভাত’ উপন্যাসের শেষটা এরকম- ‘মরিয়ম চাপা স্বরে চিৎকার করলেও সবাই শুনতে পাচ্ছে। সবাই অপেক্ষা করতে থাকে কখন মরিয়মের অনাগত সন্তান আসবে পৃথিবীতে। সবাই অপেক্ষা করতে থাকে একটা নতুন সূর্যের। সবাই অপেক্ষা করতে থাকে কখন সব কুয়াশা সরে গিয়ে আঁধার ভেদ করে সবুজ ধানক্ষেতের ওপার থেকে উঠবে লাল একটা সূর্য’।

উপন্যাসটি এই অংশেও একটি সন্তান, প্রভাতি রক্তিম সূর্য, একজন প্রসবোন্মুখ নারীর আর্তনাদ– আনন্দ, অনুপস্থিত পিতা, স্বাধীনতার আস্বাদন। চলচ্চিত্রটির সঙ্গে উপন্যাসটির এ অংশে মিল থাকলে কী হবে, উপন্যাসটির শরীর জুড়ে ভিন্নরকম বৈচিত্র্য। ঔপন্যাসিক সাঈদ আজাদ সেই বৈচিত্র্য উপস্থাপনে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

‘অগ্নিপ্রভাত’-এর বিষয়বস্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন তেমন করে স্থান পায়নি উপন্যাসটিতে। উপন্যাসটির বিপুল অংশজুড়ে যুদ্ধলাঞ্ছিত আর্তনাদমগ্ন উন্মুল মানুষের দৈনন্দিন চিত্র। পাকিস্তানি বর্বরদের দ্বারা অপমানিত নারী, হত্যার শিকার পুরুষ, দাউ দাউ আগুন, পোড়ামাটি- এ উপন্যাসের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে বারবার। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে- এ যেন ঢাকা শহরের ২৫ মার্চের কালরাত্রির হত্যাচিত্রের যথার্থ এক দলিল। হত্যাযজ্ঞের বিবরণ নিখুঁত, বিশ্বাসযোগ্য। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রহলের হত্যার যে বর্ণনা, তা শিহরণমূলক। একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শন ছাড়া এ-রকম বিবরণ অসম্ভব। কিন্তু লেখক তা সম্ভব করেছেন। আমাদের প্রত্যয় মানতে বাধ্য করছেন- এই হত্যাদৃশ্য বর্ণনা প্রত্যক্ষ-অভিজ্ঞতার বাড়া। হত্যাবিবরণ পড়তে পড়তে আমার প্রতীতি জন্মেছে যে, ঔপন্যাসিক নিশ্চয় সেই সময়ে ওই হলের ছাত্র ছিলেন বা ঢাকা শহরের অধিবাসী ছিলেন, তিনি হত্যারাত্রির পরের সকালে রাস্তায় বেরিয়েছিলেন কদাকার, রক্তরঞ্জিত মৃতদেহগুলো দেখার জন্য। আমি চট করে লেখক পরিচিতিতে গেলাম। সেখানে দেখলাম- সাঈদ আজাদের জন্মসাল জানুয়ারি ১৯৭৯। অর্থাৎ ওই কালরাত্রির পর তার জন্ম হতে আরও ৭ বছর ৯ মাস ৬ দিন বাকি। তাহলে এ-রকম বিশ্বাস্য, নিখুঁত, বাহুল্যহীন, মর্মান্তিক দৃশ্যাবলির বিবরণ তিনি লিখলেন কী করে!

লেখা তো যায়-ই। যদি লেখক আন্তরিক হন, যদি তিনি গ্রন্থলব্ধজ্ঞানে যথাযথ অভিজ্ঞ হন, সর্বোপরি তার দেশপ্রেম যদি নিটোল হয়, তাহলে ‘অগ্নিপ্রভাতে’র মতো উপন্যাস লেখা যেতেই পারে। উপন্যাসটির পরতে পরতে সাঈদ আজাদের দেশপ্রেম উপস্থিত থেকেছে। একটু উদাহরণ দিলেই সেই মৃত্যুরাত্রির রূপ যে কী ভয়াল ছিল, বোঝা যাবে-

‘সৈন্যরা ছাত্রদের রুমে রুমে ঢুকেছে। ভেতরে থাকা ছাত্রদের বের করে বাইরে এনে গুলি করছে। কাউকে কাউকে ভেতরেই গুলি করছে। ... কাউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে দোতলা থেকে। এক রুম থেকে তিনজনকে বের করে বাইরে দাঁড় করায়, তারপর একসঙ্গে গুলি করে। ছেলেগুলো ধপাস করে পড়ে যায়। ওদের হাত থেকে বাঁচতে উপায় না পেয়ে ক’জন ছাত্র আর ক্যান্টিনবয় দৌড়ে একটি রুমে ঢোকে। ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেয়। আর্মিরা সে-রুমের দরজা বুটের আঘাতে ভেঙে ফেলে। তারপর রুমের ভেতরে কী যেন একটা ছুড়ে মারে। প্রচণ্ড শব্দের সঙ্গে সঙ্গে রুমটাতে আগুন ধরে যায়।’

এ-রকম আরও অনেক অনেক দৃশ্য আছে ‘অগ্নিপ্রভাত’-এ। এ যেন চার হাজার বছর আগে সংঘটিত কুরুক্ষেত্রের বর্ণনা। যেখানে যুদ্ধ হয়েছিল কুরু আর পাণ্ডবে। উভয়পক্ষের অজস্র অগণিত সৈন্য মারা গিয়েছিল। কুরুক্ষেত্র জুড়ে লাশ। কারও হাত নেই, কারও পা নেই, কারও মস্তক বিচ্ছিন্ন। কারও উদর থেকে নাড়িভুঁড়ি বের করা। ২৫ মার্চের যুদ্ধ একতরফা। আক্রান্তরা নিরস্ত্র। সেই আক্রান্ত নিরস্ত্র মানুষদের ছিন্নভিন্ন দেহে সমস্ত ঢাকা শহর সেই রাতে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। আমরা বহু বছর পরে কুরুক্ষেত্রকেই যেন প্রত্যক্ষ করলাম আরবার। আজ ১৯৭১-এর পর ৪৭ বছর অতিক্রান্ত। সাঈদ আজাদ তার লেখনীর গুণে সেই বীভৎস বিবমিষা-জাগানিয়া রাত্রিটিকে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন। এ জন্য তিনি বিশেষভাবে ধন্যবাদের যোগ্য।

উপন্যাসের কালটি ১৯৭১ হলেও সব দিনের চিত্র এই উপন্যাসে নেই। উপন্যাসটির শুরু ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর ঘটনা দিয়ে। হাবিল নামের একজন গার্ডের মনোচিত্রের মাধ্যমে উপন্যাসটির প্রারম্ভ। ছাত্রহলের গার্ডরুমের চৌকিতে শুয়ে সে ভাবছে তার তরুণ বউটির কথা, দেশের সঙ্গে বউটির সাযুজ্যের কথা।

এরপর যুদ্ধদিনের শুরু। বাঙালি জীবনে নেমে আসে অমাবস্যা। রক্তস্রোতে ভেসে যেতে থাকে বাঙালির দৈনন্দিনতা। মোট ১৪টি দিন এবং রাত্রি এ উপন্যাসের পটভূমি হয়েছে। ৯টি পর্বের ‘অগ্নিপ্রভাত’ শেষ হচ্ছে ২৫ নভেম্বর ১৯৭১-এ। কিন্তু দেশ স্বাধীন হতে তখনও কুড়ি দিন বাকি। ওই কুড়ি দিনের ব্যাপারে ঔপন্যাসিক নির্লিপ্ত থেকেছেন। তার একটি কারণও হয়তো আছে।

অগ্নিপ্রভাত সাঈদ আজাদ প্রকাশক অন্যপ্রকাশ

প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ মূল্য ৪৫০ টাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×