অনাবিষ্কৃত লালন এবং সুনীলের মনের মানুষ

  আহসানুল কবির ২২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অনাবিষ্কৃত লালন এবং সুনীলের মনের মানুষ

কাহিনীর শুরু গ্রামের এক কবিরাজ কৃষ্ণপ্রসন্নের বাড়িতে চোর ধরা থেকে। কবিরাজ বাড়ি গৃহস্থ বাড়ি। অবস্থাশালী কবিরাজ ঘোড়ায় চড়ে রোগী দেখে এ গ্রাম সে গ্রাম। ঘরে তার দু’জন স্ত্রী, গিরিবালা বড়, ছোট শোভাময়ী। বাড়ির উঠানে চোর বেঁধে রাখা হয়েছে। চোরটি ঘোড়া চোর। বাড়িটি কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর ধারের একটি গ্রামে অবস্থিত। ধরাপড়া চোরটির অদ্ভুত সরলতা।

সে বলেই ফেলেছে চুরির জন্য নয়, ঘোড়ায় চড়ার জন্য সে ঘোড়াটি নিয়ে যায়। এর আগেও সে ঘোড়া নিয়ে চড়ে আবার রেখে গেছে। আজকেও সে ঘোড়া রাখতে এসে ধরা পড়েছে। এ কথা শোনার পর কৃষ্ণপ্রসন্ন বাবু একুট সদয় হয়ে তাকে হালকা শাস্তি দেয়। ছেলেটির নাম লালমোহন কর।

বাবার নাম ঈশ্বর রাধামাধব কর। মা পদ্মাবতী বউ গোলাপী। বাড়ির ঠিকানা দাসপাড়া গ্রাম। গ্রামটির ভেতর হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই যাত্রাদল আছে। নকুলেশ্বর দাসের যাত্রার খ্যাতি ছিল বর্তমানে নেই। তবে তাহের দস্তিদারের যাত্রাপালার নাম আছে।

কুষ্টিয়ার যাত্রাদল এখন খুলনার বাগের হাটে। এসব যাত্রাদলের লোকেরা লালমোহনকে লালু বলে ডাকে। লালুর গানের গলা ভালো বলে সব দলই লালুকে ডাকে। লালু এসব কাজ করতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয়।

‘লালু যাত্রাদলে যদি অভিনয় করতে না চায়, শুধু গান গাইলেও তো পারে। তাও সে রাজি হয় না।’ (মনের মানুষ)। লালু সরল প্রকৃতির ছেলে- সে এতিম। অল্প বয়সেই বাবা হারিয়েছে। নিুবর্গের কায়স্থ পরিবারের সন্তান, অসহায় মা সন্তানকে নিয়ে তার মামার বাড়ি চলে যায়। লালু একটু বড় হলে আবার দাসপাড়ায় বাবার ভিটেতেই বিধবা মা ঘর বাধে। মা পদ্মাবতী অল্প বয়সে লালুর বিবাহ দেয়।

বধূ গোলাপীর বয়সও কম বলে লালুর জীবনে তার প্রভাব পড়েনি। কবিরাজ মশায়ের সুখের সংসার ফি-বছর গঙ্গাস্নানে বাড়ির গিন্নিরা যায়। এবারও যাওয়ার সময় এলে কবিরাজ মহাশয় লালুকে ডেকে সঙ্গে নেয়। মা পদ্মাবতীর আপত্তি সত্ত্বেও লালু কবিরাজ মশায়ের দলের সঙ্গী হয়। কবিরাজ মহাশায়ের ঘোড়ার নাম মানিক চাঁদ।

এই মানিক চাঁদকে দেখাশোনা করা এবং গান গাওয়ার দায়িত্ব পেল লালু। গঙ্গাস্নানের স্থান বহরমপুর গঙ্গারধার। ‘বহরমপুর কতদূর সে জানে না। গঙ্গা নদীরই বা কেমন রূপ? এই নদী নাকি স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে।’ (মনের মানুষ)। এমন নানা কথা তার মনে ঘুরছিল। তিনটি গ্রাম ছাড়া সে আর কোথায় যায়নি।

সমসাময়িক কালের খোকশা, কুমারখালী, ছেউড়িয়া, শিলাইদহ পেরিয়ে কুষ্টিয়া হয়ে একেবারে যশোর ছেড়ে বহরমপুরের পথেই তাদের যাত্রা শুরু হল। যশোরে এক রাত্রি থাকার পর আবার যাত্রা শুরু। লালু অবাক দৃষ্টিতে গ্রাম, শহর, মানুষ, রাস্তা দেখে।

যাত্রাপথে বিশ্রামের সময়, লালুকে দিয়ে গানও গাওয়ানো হয়। এ সময়টাতে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবও হয়। নদীর ধারে পৌঁছাতে দু-একটি মরা ভেসে যেতেও তারা দেখে। পালকির ভেতর গিন্নি মা দাসী বিনাও এসব দৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এসব দৃশ্য আর পথের নানা কষ্ট মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো গেলেও বিপত্তি বাঁধল লালুকে নিয়ে। লালুর গায়ে জ্বর, গায়ে গোটা গোটা কী যেন বেরোল।

কবিরাজ মশায় নাড়ি টিপে দেখে, ওষুধ সেবন করালেও কোনো উন্নতি নেই। বরং অবনতি হল লালু বেহুশ হয়ে গেল জ্ঞান ফিরল না। কবিরাজ এবার সাফ জবাব দিলেন, লালু ধরাধামে নেই। সবাই অধিক শোকে পাথর হয়ে গেল। বিনা দাসীর কান্না আর থামে না। লালুর দেহ কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হল। ‘কাঙালি ছেলেরা সাঁতরে সাঁতরে ভেলাটি মাঝ নদীতে নিয়ে গিয়ে ভাসিয়ে দিল স্রোতে। ভেলাটি দুলতে দুলতে মিলিয়ে গেল।’ (মনের মানুষ)।

ঢেউ-এর ধাক্কায় ভাসতে ভাসতে ভেলা এসে মুসলিম পাড়ার ঘাটে ঠেকে। তখন সে ঘাটে যেসব মহিলারা স্নান করছিল তাদের মধ্যে একজন রাবেয়া শুনতে পেল জল জল বলে কাতরানো শব্দ। এই জল চাওয়া ধরেই পরবর্তীতে গান হয়েছিল, ‘লালন মরল জল পিপাসায় থাকতে নদী পদ্মা’। তবে লালন সেদিন মরেনি। রাবেয়াই তাকে তুলে এনে বাড়িতে সেবা দিয়ে সুস্থ করেছিল। রাবেয়ার বাড়িতে এক ফকির আসত কামেল ফকির। রাবেয়ার বাড়িতেই সেই ফকিরের সঙ্গে লালুর সাক্ষাৎ হয়।

লালু সম্মানের সঙ্গে তার নাম জিজ্ঞেস করলে ফকির উত্তর দেয়। ‘আমি ফকির টকির কিছু না এক সময় পালকি বইতাম। আমার নাম সিরাজ, তখন লোকে বলত সিরাজ কাহার। এখন বলে সিরাজ সাঁই।’ (মনের মানুষ) ‘এই সিরাজ সাঁইয়ের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে লালু ফিরে গেল তার মা পদ্মবতী এবং বউ গোলাপীর কাছে। হিন্দু পল্লির মানুষ লালুকে দেখে সবাই অবাক। ‘দাসপাড়ায় হইচই পড়ে গেল। একজন মরা মানুষ ফিরে এসেছে।’ (মনের মানুষ)।

কেউ তার সঙ্গে ভালোমতো কথা বলল না। লালুর জাত গেছে। সে মুসলমানের ঘরে ভাত খেয়েছে। তার মা ঘরে না তুলে তাকে বারান্দায় বসিয়ে ভাত খাওয়াল এবং থালা না দিয়ে কলাপাতা দেয়াতে সে কষ্ট পেয়ে এবং বিরক্ত হয়ে রাতেই বাড়ি ত্যাগ করে। ত্যাগ করার সময় বউ গোলাপীকে ডেকেছিল কিন্তু গোলাপী তার সঙ্গী হয়নি। লালু মনের দুঃখে আবার কুমারখালী ছেউড়িয়া অঞ্চলে চলে আসে। এবার সে কারও বাড়ি না এসে গড়াই নদীর ধারে এক জঙ্গলে আশ্রয় নেয়।

‘মৃত্যু থেকে ফিরে এসেছে সে। ধর্মও চলে গেছে। সে এখন নতুন মানুষ। যেন আবার জন্ম হয়েছে তার এখন থেকে লালন পালনের ভার নিজেকেই নিতে হবে।’ (মনের মানুষ) তখন সে অঞ্চলে জনবসতি কম নদ-নদীর ধার দিয়ে বিরাট জঙ্গল। সেই জঙ্গলেই গাছের নিচে তার বসত হল।

এক এক করে দু-একজন সমাজচ্যুত মানুষ তার সন্ধান পেয়ে জঙ্গলেই বসত শুরু করে। আহত, দুস্থ কাশেম, কালুয়া, মনসুর, কমলি, ভানুমতি, এরা সবাই বিপদগ্রস্ত হয়ে লালনের আশ্রয়ে এসে ওঠে। কমলির জাত গেছে, ভানুমতি সহমরণের থেকে বেঁচে আসে। লালনের সংসার জীবন এই ভাবেই গড়ে ওঠে। ধ্যান-জ্ঞান, গান আর কাজের শিক্ষা এখান থেকে লাভ করে সে। জঙ্গলের বিন্যাসের শিমুলতলা গ্রাম হল লালনের গ্রাম।

এখানকার মানুষের সবাই লালন ভক্ত হয়ে ওঠে। কৃষি কাজেও তারা মনোযোগী হয়। লাউ, কুমড়া, ফসল, মাছ মারা ঘরামিগিরি এসব করেই তাদের জীবন জীবিকা চলতে থাকে। লালনও পানের বরজ করে সেই বরজে কাজ করে। ‘শিমুলতলায় গ্রামটির জীবনযাত্রায় একটা স্বচ্ছন্দ প্রবাহ এসে গেছে। যে যার মতন আনন্দে আছে। উৎকট দারিদ্র্য নেই এখানে, সবারই কিছু না কিছু খাদ্য ছুটে যায়।’ (মনের মানুষ)।

সবার ভেতরে শান্তির আনন্দ এবং নেতা লালনের গান তাদের মাতিয়ে রাখে। যৌন-জীবনের বিষয়টিও সুনীল তার উপন্যাসে উন্মুক্ত করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে লালন নারীসঙ্গ করলেও নারী মিলনে সংযমী (sex control)। কমলি, ভানুমতী এরা বিধবা এবং জাত পরিত্যক্তা হয়ে লালনের আশ্রমে থাকলেও লালন তাদের সম্মান দিয়েই রাখে। এসব কারণেই তার শিষ্য এবং অনুগতদের সংখ্যা বেড়ে যায়।

লালন সামাজিক কাজ হিসেবে মানুষের উপকার করার চেষ্টা করতে থাকে। ইংরেজ হাকিম সাহেব যখন ভোরাই নদীপথে লঞ্চে যাবে তখন লালন জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য লঞ্চ থামানোর পরিকল্পনা করে সফল হয়। হাকিমের কাছে নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনীও তুলে ধরে। লালন জমিদারদের অত্যাচারও পছন্দ করেনি। হরিনাথ মজুমদার তার বন্ধু হয়ে ওঠে। জমিদারের পাইক-পেয়াদা হরিনাথের বাড়ি ঘেরাও করলে লালন তার লাঠিয়ালদের নিয়ে হরিনাথকে সমর্থন দেয়।

লালন ইতোমধ্যে সমাজ সংস্কারক হিসেবে নয় আধ্যাত্মিক গায়েন হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। শিলাইদহের তরুণ জমিদার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনকে ডেকে পাঠায়। লালন খুব বিনয়ের সঙ্গে ঠাকুর বাড়ি পৌঁছলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তার গান শুনে এবং সে লালনের পোট্রেট আঁকে। উপন্যাসের শেষাংশ শিলাইদহ পর্যন্ত। গগন হরকরার বাড়িও শিলাইদহে জমিদারবাড়ি থেকে ফেরার পথে গগন হরকরা তাকে তার বাড়িতে নিয়ে যায়।

সেখানে সর্বখেপি একজন রমণী বাউলও তার জন্য অপেক্ষায় ছিল। সন্ধ্যা থেকে সারা রাত গান গেয়ে ভক্তি সাধনায় নিষ্ঠা প্রদর্শন। সর্বশেষ গানটি ছিল মনের মানুষের সঙ্গে মিলন বাসনার। মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষের সনে। (লালন) ‘একসময় বাইরে থেকে ভেসে এলো আজানের সুর। তখন ওদের ঘোর ভাঙল। রাত্রি শেষ, ভোর হয়ে গেছে। ফুটে উঠেছে আলো’। (মনের মানুষ)।

এই উক্তির মাধ্যমেই উপন্যাসটির সমাপ্তি ঘটেছে। লালনের পরবর্তী জীবন সাধুজীবন এ জীবনের সুখ্যাতি ভক্তি আরতির প্রসঙ্গ সবার জানা বলেই সুনীল উপন্যাসটিকে তার মৃত্যু পর্যন্ত টানেননি। তারপরও উপন্যাসটিকে লালনের জীবনীমূলক বললেও ভুল হবে না। কেউ কেউ উপন্যাসটিকে কল্পকাহিনী বলে অভিহিত করলেও এর সাহিত্যিক মূল্যকে অস্বীকার করা যাবে না। তাই গৌতম ঘোষ ‘মনের মানুষ’ উপন্যাসটি নিয়ে সিনেমা করে খ্যাতি অর্জন করেছেন।

অতীতের ইতিহাস ঘটনা মহৎ ব্যক্তিত্বের নবমূল্যায়নই হচ্ছে রেনেসাঁ। ‘বিষাদ সিন্ধু’ লেখকের কল্পনামিশ্রিত সৃষ্টি, ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকে ইতিহাসের উপাদানের সঙ্গে সাহিত্যের মিশেলে চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে। মহাকাব্যগুলো একইভাবে বীরদের মহৎ করা হয়েছে। এ উপন্যাসেও লালনকে তার বংশপরিচয়ের মাধ্যমে মানবিক করা হয়েছে। অর্থাৎ লালন এখন আর অলৌকিক চরিত্রের লোক নয়। তারও জন্ম, মৃত্যু হয়েছে। লালন মা’র গর্ভ থেকে জন্মেছে।

সেই মা মানব ধর্মের নন হিন্দু ধর্মের। সে শিশু বয়সেই লালন হয়ে জন্মায়নি। তাকে নানা বাধা বিপত্তি, অবহেলা ঘৃণা সয়ে লালন হতে হয়েছে। এখানেই লালন মানবিক এবং সার্থক সাধক। আসলে লালন চরিত্র সৃষ্টিতে মনের মানুষের রচয়িতা সুনীল বাল্মীকির জঙ্গলবাস দস্যু থেকে কবি মুনি ঠিক একইভাবে লালনও যেন ঘোড়া চোর থেকে বাউল শিরোমণি হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×