গল্প

যদি একদিন

  রেজাউল করিম খোকন ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যদি একদিন

বিছানায় শুয়ে গায়ের কাঁথাটা আরও টেনে নেয়, গলা পর্যন্ত ঢেকে রাখে রুনা। আজ কেন জানি বিছানা ছেড়ে উঠতে মন চাইছে না। আজ ছুটির দিন হলে না হয় একটা কথা ছিল। বাইরে যাওয়ার তাড়া কিংবা তাগিদ থাকত না। কিন্তু আজ রুনাকে মতিঝিল, দিলকুশা এলাকার অফিসপাড়ায় ঢুঁ মারতে হবে।

রুনা বেশ কয়েকটি পত্রিকার হয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিজ্ঞাপন জোগাড় করে কমিশনের বিনিময়ে। ফকিরাপুল এবং মতিঝিল থেকে এসব পত্রিকা প্রকাশিত হয় স্রেফ জোগাড় করা বিজ্ঞাপনগুলো ছাপিয়ে বিল জমা দেয়ার জন্য। অনেকে এসব পত্রিকাকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ বলে গালি দেয়। এ ধরনের পত্রিকায় যা থাকে তা বিভিন্ন পত্রিকা থেকে ধার করা কিংবা সরাসরি মেরে দেয়া জিনিস। এখন অনলাইনে সব পত্রিকার আলাদা সংস্করণ থাকে।

সেখান থেকে কাটিং করে নতুনভাবে পরিবেশন করা হয় ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হওয়া পত্রিকাগুলোতে। স্রেফ বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে টু পাইস কামানো এসব আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার মালিকদের ধান্ধা। বিভিন্ন অফিসে ঘুরে ঘুরে বিজ্ঞাপন জোগাড়ের জন্য পত্রিকাগুলো যাদের নিয়োগ করে তারা কেউই স্থায়ীভাবে বেতনভুক্ত কর্মচারী নয়। বিজ্ঞাপন এনে দিতে পারলেই নির্ধারিত হারে কমিশন পাওয়া যায়।

পত্রিকার সুনাম-দুর্নাম কিংবা গ্রহণযোগ্যতা এসব নিয়ে বিজ্ঞাপন শিকারিদের মাথাব্যথা নেই। তাদের টার্গেট শুধুই বিভিন্ন অফিস থেকে যত বেশি বিজ্ঞাপন জোগাড় করা। বিনিময়ে কমিশন হিসেবে যা পাওয়া যায় তা দিয়েই নিজের এবং গোটা পরিবারের অন্ন সংস্থান হয়, যাবতীয় খরচ চলে।

রুনা চার বছর আগে যখন এ লাইনে আসে তখন নতুন হিসেবে তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না। অনেকটা হোঁচট খেতে খেতে চলতে হয়েছে এ পথে। ঘুরে ঘুরে বিজ্ঞাপন জোগাড় করে এনে দেয়ার পরও পত্রিকার মালিক রুনার প্রাপ্য কমিশনের টাকা দিতে নানা টালবাহানা করেছে।

অনেকদিন ঘুরিয়ে তারপর টাকা দিয়েছে। আবার কেউ কেউ কমিশনের পুরো অংশই মেরে দিয়েছে। এ পথে চলতে চলতে গত কয়েক বছরে অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে রুনার। যার মধ্যে বেশিরভাগই তিক্তকর। মাঝে মধ্যে মনে হয় এ কাজ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে।

রুনা দেখতে মোটামুটি সুন্দরী হলেও স্বামীর ঘর করা হয়নি বেশি দিন। কারণে-অকারণে স্বামী সন্দেহ করত তাকে। নিজের শারীরিক অক্ষমতার জন্য এক ধরনের সন্দেহ-সংশয় জেগেছিল লোকটির মনে। সে নিজে তার যুবতী বউয়ের চাহিদা পূরণে প্রতি রাতেই হোঁচট খেত। কিছুতেই নিজেকে জাগিয়ে তুলতে পারত না। বউয়ের কাছে নিজের অক্ষমতা আড়াল করতে না পেরে অহেতুক চড়াও হতো রুনার ওপর। তার অবর্তমানে বউ নিশ্চয়ই পরপুরুষের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক গড়েছে নিজের চাহিদা পূরণের জন্য- এমন একটা সন্দেহ রুনার স্বামীকে তাড়িয়ে নিয়ে ফিরত।

বাইরে কাজ থেকে ফেরার পর বউকে নানাভাবে পরীক্ষা করত। অনেক সময় শরীরের সব কাপড়-চোপড় খুলে তার সামনে দাঁড়াতে হতো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখত লোকটা। স্ত্রীর শরীরের কোনো অংশে লাল দাগ কিংবা সন্দেহজনক তেমন কিছু পেলেই তার মাথায় রক্ত চড়ে যেত। ইচ্ছেমতো চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি, লাথি মারতে মারতে রুনাকে অজ্ঞান করে ফেলত লোকটা। এভাবে বেশ কিছুদিন মুখ বুজে স্বামীর নির্মম নির্যাতন সহ্য করলেও একসময় তা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত স্বামীর সংসার ছেড়ে বাপের বাড়ি ফিরে আসে। ভাইদের সংসারে বাড়তি বোঝা বিবেচিত হতে বেশিদিন লাগে না তার। ভাবীদের নানা কূটক্তি আর খোঁটা শুনতে শুনতে নিজেকে সংসারে অপ্রয়োজনীয় একজন ভাবতে শুরু করে রুনা। আত্মহত্যা করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়। সবার লাঞ্ছনা-গঞ্জনা থেকে বাঁচতে একরাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকা চলে আসে সে।

ঢাকায় এসে চেনাজানা এক মহিলার মাধ্যমে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে ঢুকেছিল রুনা। ক্লাস নাইন পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে পড়েছিল সে। তার আরও বেশি লেখাপড়া করা ইচ্ছে থাকলেও মেয়ে সেয়ানা হয়েছে, তাকে আর ঘরে রাখা যায় না, আবার কোন বিপদ ঘটিয়ে বসে কোন ছেলের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করে, তেমন আশংকা এবং চিন্তা-ভাবনা থেকে রুনাকে বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেছিল পরিবারের সবাই।

বিয়ে দিয়ে মেয়েকে সংসার থেকে বিদায় করতে পারলেই যেন আপদ মুক্ত হওয়া যায়, তেমন প্রচলিত ধারণা থেকেই পড়াশোনার মাঝ পথেই ধরে-বেঁধে অনেকটা জোর করে বিয়ে দিয়ে স্বামীর ঘরে পাঠিয়ে দেয়া হয় গ্রামের বেশিরভাগ মেয়েকে। এতে করে অনেক সম্ভাবনাময় জীবনের অকাল পরিসমাপ্তি ঘটে। অল্প বয়সে বাচ্চা-কাচ্চার মা হয়ে সুস্থ-সুন্দর সুখী-জীবনের স্বপ্ন হারিয়ে কোনোভাবে বেঁচে থাকে তারা। তাদের কোনো সাধ-আহ্লাদ পূরণ হয় না।

স্বামীর সংসারে ব্যবহৃত আসবাপত্র তৈজসপত্রের মতো তাদের উপস্থিতি থাকলেও কোনো গুরুত্ব থাকে না। আর যদি তার মতো স্বামীর সংসারে থাকা সম্ভব না হয় একান্ত অনিচ্ছায় সব ছেড়ে চলে আসতে হয় তাহলে সেটাও কম দুঃখের হয় না। স্বামীর ঘর ছেড়ে আসা মেয়েদের দুর্ভোগ পদে পদে। আবার নতুন করে ঘরবাঁধা সম্ভব না হলে সবাই ভিন্ন চোখে দেখতে চায়। বিশেষ করে লম্পট পুরুষদের বিশেষ নজর পড়ে। অনেকেই সুযোগ নেয়ার বদমতলবে থাকে।

গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে এক বছর চাকরি করার পর দূরসম্পর্কের এক মামাত বোন জরিনা তার সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেয় রুনাকে। মামাত বোনটি বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করে বলে জানত সে। কিন্তু তার কাজটা কী জানত না রুনা। মোটামুটি ভালো আয় করে, ঢাকা শহরে বাসা ভাড়া করে স্বামী, সন্তানসহ থাকে। জরিনাকে দেখে তার সঙ্গে কাজ করতে সাহসী হয়েছিল সে।

জরিনার হাত ধরেই রুনার এ লাইনে আসা। বিয়ে হলেও স্বামীর সংসার করা সম্ভব হয়নি, বাপের বাড়িতে ভাইদের সংসারে ঠাঁই হয়নি, অভিশপ্ত জীবনের জ্বালা জুড়োতে আত্মহত্যা করতে গিয়েও পারেনি। এ অবস্থায় জীবনটাকে আবার নতুনভাবে সাজাতে ঢাকা শহরে পা রেখেছিল রুনা।

বিভিন্ন পত্রিকার জন্য বিজ্ঞাপন জোগাড় করে প্রতি মাসে কমিশন হিসেবে যা পাওয়া যায়- তা মন্দ নয়। রুনার মোটামুটি চলে যায়। সে চাইলে প্রতি মাসে আরও বেশ টাকা আয় করতে পারে। এ লাইনের অন্যান্য আরও কিছু মেয়ে সেভাবেও বাড়তি আয় করছে। রুনাকে বেশ কয়েকজন এ বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছে অনেকবার। কিন্তু তাদের মুখের ওপর সরাসরি ‘না’ বলে দিয়েছে সে।

ঢাকা শহরে আসার পর প্রথম প্রথম সব বিষয়ে না জানলে না বুঝলেও গত কয়েক বছরে অনেকটাই চেনা হয়ে গেছে তার। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজে ঢোকার পর সে দেখেছে সঙ্গের অন্য মেয়েদের চালচলন। শুনেছে তাদের জীবনযাপনের নানা বর্ণময় বিবরণ।

সারা মাস হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যা বেতন পাওয়া যায় তাতে সংসার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেয়ে যেতে হয়। বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করতে না পারলে প্রতি মাসের বাসা ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া, ওষুধপত্রের জোগাড় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যাদের চেহারা, শরীরের গড়ন মোটামুটি সুন্দর তারা অনেকেই অনেকটা নিরুপায় হয়ে গার্মেন্টের কাজের ফাঁকে এখানে ওখানে বিভিন্ন বাসা বাড়ি, হোটেলে ঢু মারে। কয়েকটা খদ্দের পেলেই ভালো টাকা জোগাড় হয়ে যায়।

রুনা চাইলে সে পথে পা বাড়াতে পারে। বিজ্ঞাপনের জন্য বিভিন্ন অফিসে ঢু মারতে গিয়ে মাঝে মধ্যে তেমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে সে। অনেক জায়গায় বিজ্ঞাপন দেয়ার বিনিময়ে অশালীন প্রস্তাব পেয়েছে।

তেমন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বিজ্ঞাপনগুলো পায়নি রুনা। খালি হাতে হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। তার মতো বিজ্ঞাপন শিকারি অন্য অনেক মেয়ে সহজেই তেমন প্রস্তাবে রাজি হয়ে লুফে নিয়েছে বিজ্ঞাপনগুলো। আজকাল এ লাইনে দেয়া-নেয়ার ব্যাপারটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনুভব করে রুনা। সময়ের স্রোতে গা না ভাসিয়ে প্রতিকূলে সাঁতার কেটে কতটা পথ যেতে পারবে সে?

তার পেছনে তো তেমন জোরালো কোনো অভিভাবক কিংবা আপনজন নেই, যারা তার পথচলায় ভরসা হয়ে উঠতে পারে। আগামীতে নিজেকে স্রোতের বিপরীতে টিকিয়ে রাখতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় জাগে মনে। নিজের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতে গিয়ে কেমন অস্থিরতা গ্রাস করতে চায় তাকে। আর কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে ইচ্ছে করে না রুনার। বিছানা ছেড়ে উঠে বসে থাকে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে। এরপর বাথরুমের দিকে পা বাড়ায়।

বাসা থেকে বেরিয়ে মহল্লার একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে নাস্তা সেরে মতিঝিলের অফিসপাড়ার দিকে রওনা দেয় রুনা। শাপলা চত্বরে বাস থেকে নামতেই বকুলের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সেও রুনার মতো বিজ্ঞাপনের ধান্ধা করে।

‘কি গো বইন, খবর কী, এই সপ্তাহে কিছু পাইছো টাইছো নাকি?’ বকুল জানতে চায়।

‘নারে বকুল, তেমন কিছুই জুটাইতে পারি নাই, বাজার ভীষণ মন্দা, আজ আইলাম নতুন কোনো খবর আছে কিনা জানতে’, জবাব দেয় রুনা।

দু’জন মামুলি কিছু আলাপ সেরে যে যার কাজের ধান্ধায় পা বাড়ায় দু’দিকে। চাইলে একসঙ্গে দু’জনে বিভিন্ন অফিসে ঢুঁ মারতে পারত। কিন্তু তাতে নিজেরই ক্ষতি। আগেও এক সঙ্গে কয়েকজন দলবেঁধে বিজ্ঞাপন শিকারে অফিসগুলোতে গিয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। একসঙ্গে এতজন বিজ্ঞাপন শিকারি মেয়েকে দেখে অফিসের লোকজন বিরক্ত হয়েছে। ঝামেলা না করে তাড়াতাড়ি বিদায় হতে বলেছে। এতে কারও লাভ হয়নি, বরং ক্ষতি হয়েছে বেশি।

প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বীকে কাছে রাখলে নিজের সব কলাকৌশল তার জানা হয়ে যায়, ফলে তার কাছে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় এরকম আরও অনেক কিছুই জেনেছে রুনা। সে কারণে কোনো অফিসে বিজ্ঞাপনের জন্য নিজের মতো করে যায় সে এবং আবেদনপত্র জমা দেয়।

প্রয়োজনে একাকী এ কাজে সংশ্লিষ্ট বড় কর্তাদের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে। তাদের চেম্বারে ঢোকা সম্ভব হয় না সবসময়ে। আগে থেকে বড় কর্তারা তাদের পিএস কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তেমন বিজ্ঞাপন শিকারিদের চেম্বারে ঢোকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাখেন; কিন্তু তারপরও নানা কৌশল অবলম্বন করে রুনা অনেক অফিসের বড় কর্তাদের সঙ্গে দেখা করে নিজের দুঃখ-কষ্ট, অভাব সংকটের কথা বলে।

‘স্যার, আপনারা যদি একটু সাহায্য না করেন তাহলে তো না খেয়ে মরতে হবে, আমাদের তো করার আর কিছু নেই, এখন যদি একটা বিজ্ঞাপন না পাই তাহলে চলবে কীভাবে?’

‘এইখানে তো কেউ তোমাদের জন্য দানছত্র খুলে বসে নাই, বিজ্ঞাপন দেবো আমাদের পাবলিসিটি টার্গেট পূরণের জন্য। তোমাদের আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা পড়ে কয়জনে? এসব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া মানে কোম্পানির টাকা স্রেফ পানিতে ফেলা, যাও ভাগো এখান থেকে’, অফিসের বড় কর্তা শফিক চৌধুরীর মুখে বিরক্তির সুর ঝরে পড়ে।

তার অপমানজনক মন্তব্য আর কথাবার্তা গায়ে না মেখে রুনা বলে, ‘আপনারা কত টাকা কত জায়গায় অপচয় করেন স্যার, আর কিছু টাকা না হয় অপচয় করলেন আমাদের জন্য। আপনাদের দয়ায় তো আমরা বেঁচে আছি। আমাদের দিকে না তাকালে বাঁচব কীভাবে?’

তার কথায় অনেকটা নমনীয় হন শফিক চৌধুরী। পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, এই যে মেয়ে তোমার কী যেন নাম?’

‘জ্বি, রুনা আক্তার স্যার’।

‘আচ্ছা রুনা, তোমার কত টাকার বিজ্ঞাপন দরকার বলো, কত টাকার বিজ্ঞাপন হলে তোমার মন ভরবে?’

বড় কর্তার তেমন কথায় হঠাৎ থতমত খেয়ে যায় রুনা। আগেই জেনেছে, লোকটার মাথা-টাথা সবসময় গরম থাকে। তবে তার হাতে অনেক ক্ষমতা রয়েছে, চাইলে অনেক টাকার বিজ্ঞাপন দিতে পারেন যাকে খুশি। এসব কথা ভালো করেই জানে রুনা।

অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে সে শফিক চৌধুরীর মুখের দিকে। লোকটা মধ্য বয়সী হলেও বেশ সুঠামদেহী। সব সময়ে ফিটফাট, স্মার্ট থাকার চেষ্টা করেন।

‘আচ্ছা রুনা, আজ আমি যদি তোমার পত্রিকার জন্য আগামী এক বছরে বারো মাসে বারোটি বিজ্ঞাপন দেয়ার ব্যবস্থা করি তুমি খুশি হবে?’

রুনার কাছে মনে হল লোকটি তার সঙ্গে স্রেফ ঠাট্টা-মশকরা করতে শুরু করেছে। বড় কর্তাদের কত কী খেয়াল থাকে। মানুষের দুর্বলতা এবং অসহায়ত্ব নিয়ে পরিহাস করতে অনেকেই পছন্দ করে। এটা তাদের এক ধরনের বিলাসিতা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেম্বারে নিজের চেয়ারে বসে বড় কর্তা হাসছেন মিটমিট করে। ভাবসাব দেখে তো মন হয় না, তিনি ঠাট্টা মশকরা করছেন।

‘এই মেয়ে, তুমি কী মনে করেছো আমি এমনি এমনি বলেছি এই কথা। সত্যি করে বলছি, তোমার পত্রিকার জন্য আগামী এক বছরে বারোটি সংখ্যায় প্রতিটিতে দশ হাজার টাকা করে মোট এক লাখ বিশ হাজার টাকার আমাদের বারোটি বিজ্ঞাপন দেয়ার ব্যাপারে আমি বলে দিচ্ছি। তুমি কাল বিকালে এসে ওয়ার্ক অর্ডারটা নিয়ে যেও। ওটা রেডি থাকবে তোমার জন্য’ কথাগুলো বলে শফিক চৌধুরী রুনার দাখিল করা বিজ্ঞাপনের আবেদনপত্রটিতে খসখস করে কী যেন লিখে দেন। কলিংবেল টিপে পিসএসকে ডাকেন।

‘এই কাগজটা সাব্বির সাহেবকে দিয়ে বলো, কালকের মধ্যে যেন প্রতিটি দশ হাজার টাকা করে এক বছরের বারোটি বিজ্ঞাপনের ওয়ার্ক অর্ডারটা রেডি করে ফেলতে। আগামীকাল বিকালে এসে সে নিয়ে যাবে অর্ডারটি। এ কাজে যেন গাফিলতি না হয়, বলে দিলাম।’

পুরো ব্যাপারটা রুনার কাছে অবিশ্বাস্য, স্বপ্নময় মনে হয়। গত কয়েক বছর ধরে এ লাইনে কাজ করছে সে। এরকম অভিজ্ঞতা হয়নি আগে কখনও। ছয় মাস ঘুরেও সে এত টাকার বিজ্ঞাপন জোগাড় করতে পারে না। রুনা কোনোভাবেই কল্পনা করেনি এ অফিসের বড় কর্তা এভাবে পুরো এক বছরের জন্য বারোটি বিজ্ঞাপন দিয়ে দেবেন এক কথায়। এক লাখ বিশ হাজার টাকার বিজ্ঞাপন এক সঙ্গে জোগাড় করে দেয়ার কারণে কমিশন হিসেবে কত টাকা পাবে ভাবতেই মাথাটা ঘুরে ওঠে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে না সে, বাস্তবেই ঘটেছে ব্যাপারটা উপলব্ধি করে রুনা।

তার কথায় এভাবে একসঙ্গে এত টাকার বিজ্ঞাপন দেয়ার পেছনে অফিসের বড় কর্তার অন্য কোনো মতলব আছে কিনা কে জানে। আজকাল কেউ তো বিনিময়ে কিছু না পেয়ে কিছু দিতে চায় না। আসলে লোকটা তার কাছে তেমন কিছু চাইবে কিনা, ভাবতে ভাবতে নিজের বাসার দিকে রওনা দেয় সে মতিঝিল অফিসপাড়া থেকে।

গাড়িতে চড়তে গিয়ে ভিড়ের কারণে উঠতে পারে না। অগত্যা হাঁটতে শুরু করে রুনা কমলাপুর ধরে। রেলস্টেশনে ফুটওভারব্রিজ পেরোলেই ওপারে বাসাবো-মুগদা। রুনা থাকে বাসাবোর শেষ প্রান্তে মাদারটেক এলাকায়।

একটা ঘোরের মধ্যে বাসায় ফিরে রুনা। বাসায় ফিরলেও তার ঘোর কাটতে চায় না যেন। কোনো কাজকর্ম করতে ইচ্ছে করে না। রান্নাবান্নাও করে না। খাওয়া-দাওয়ার ইচ্ছেটাও লোপ পেয়েছে অনেক বড় কিছু পাওয়ার আনন্দ-উচ্ছ্বাসে। সারা রাত ঘুম আসতে চায় না বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে করতে রাত কাটিয়ে দেয় সে। সকালের দিকে ঘুমে জড়িয়ে আসে দু’চোখ।

যখন তার ঘুম ভাঙে তখন বাইরে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালা দিয়ে বৃষ্টির ঝাপটা আর ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। বেশ আরাম বোধ করলেও বিছানায় শুয়ে থাকার জো নেই। বিছানা ছেড়ে জানালার পাশে গিয়ে বাইরের উত্তাল ঝড়বৃষ্টি দেখতে দেখতে আনমনা হয়ে পড়ে রুনা। আজ বিকালে এক বছরের বারোটি বিজ্ঞাপনের অর্ডারটা হাতে পাবে সে। সেটা আনতে যেতে হবে তাকে।

আজকের আবহাওয়াটা বেশ খারাপ। সারাদিন ধরে ঝড়ো হাওয়া বইছে, থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। কষনও বৃষ্টির চাপ বাড়ছে। আবার কিছু সময় পর বৃষ্টিটা ধরে আসছে। কিন্তু একেবারে থামছে না বৃষ্টি। এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ঘরের বাইরে যাওয়ার কথা সহজে ভাবছে না কেউ।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলেও বৃষ্টি কিংবা ঝড়ো হাওয়ার তেজ কমছে না। আজ বিকালে তাকে মতিঝিল যেতে হবে আবহাওয়া যতই খারাপ থাকুক না কেন। নিউওয়েভ গ্রুপের হেড অফিসে এক বছরের বারোটি বিজ্ঞাপনের ওয়ার্ক অর্ডার আনতে যেতে হবে। ওটা নিশ্চয়ই এতক্ষণে রেডি করা হয়েছে। এখন শুধু গিয়ে আনলেই হল। পত্রিকার মালিকের হাতে অর্ডারটা তুলে দিলে কমিশন হিসেবে একসঙ্গে বেশ অনেক টাকা পাওয়া যাবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×