ধর্মমোহের যুগে রবীন্দ্রদর্শন

  রাজীব সরকার ১০ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনানন্দ দাশের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ বা রবীন্দ্রনাথ কথিত ‘সভ্যতার সংকট’ আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি আমরা। মাসখানেকের ব্যবধানে পৃথিবীর দুই প্রান্তে ঘটে গেল দুই ঘৃণ্য বর্বরোচিত ঘটনা। ধর্মের নামে জাত্যাভিমানের অহঙ্কারে সংঘটিত এ হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে অগণিত নিরীহ মানুষ। এমন পৈশাচিকতা সভ্যতার ইতিহাসে বিরল নয়। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তি প্রগতির অভাবনীয় ঐশ্বর্যমণ্ডিত একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্যের কারণে এমন মূঢ় পাশবিকতা প্রমাণ করে যে ধর্মের নামে মনুষ্যত্ব হারাতে বসেছে মানুষ।

এমন বিবেকহীনতার বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ধর্মের প্রতি মোহগ্রস্ত অন্ধকারের পূজারিদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন-

‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে

অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে। /নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,

ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর। /শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো

শাস্ত্র মানে না, মানে মানুষের ভালো।’

‘ধর্মমোহ’ নামক এ বিখ্যাত কবিতাটি রচনার অল্প কয়েকদিন আগে শান্তিনিকেতনে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন- ‘এ কী হল ধর্মের চেহারা? এ মোহমুক্ত ধর্ম বিভীষিকার চেয়ে সোজাসুজি নাস্তিকতা অনেক ভালো। ঈশ্বরদ্রোহী পাশবিকতাকে ধর্মের নামাবলি পরালে যে কী বীভৎস হয়ে ওঠে তা চোখ খুলে একটু দেখলেই বেশ দেখা যায়।’

উপাসনালয়ের তথাকথিত পবিত্র আবেষ্টনে সর্বব্যাপী ঈশ্বরের অনুসন্ধান যে অর্থহীন, তার আবাস যে বাইরে শাস্ত্রশাসন নিরপেক্ষ উদার বসুন্ধরার বুকে, সে কথা রবীন্দ্রনাথ নানাভাবে প্রকাশ করেছেন তার বিভিন্ন রচনায়। ‘বনবাণী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত মধুমঞ্জরি শীর্ষক কবিতাটির ভূমিকায় কবি বলেছিলেন, ‘এ লতার কোনো একটা বিদেশি নাম নিশ্চয় আছে- জানিনে, জানার দরকারও নেই। আমাদের দেশের মন্দিরে এ লতার ফুলের ব্যবহার চলে না; কিন্তু মন্দিরের বাইরে যে দেবতা মুক্তস্বরূপ আছেন তার প্রচুর প্রসন্নতা এর মধ্যে বিকশিত। কাব্যসরস্বতী কোনো মন্দিরের বন্দিনী দেবতা নন তার ব্যবহারে এ ফুলকে লাগাব ঠিক করেছি, তাই নতুন করে নাম দিতে হল।’ ‘মানুষের ধর্ম’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,

‘আচারীরা সামাজিক কৃত্রিম বিধির দ্বারা যখন খণ্ডতার সৃষ্টি করে তখন কল্যাণকে হারায়, তার পরিবর্তে যে কাল্পনিক পদার্থ দিয়ে আপনাকে ভোলায় তার নাম দিয়েছে পুণ্য। সে পুণ্য আর যাই হোক সে শিব নয়। সেই সমাজবিধি আত্মার ধর্মকে পীড়িত করে।... আত্মার লক্ষণ হচ্ছে শুভবুদ্ধি, যে শুভবুদ্ধিতে সবাইকে এক করে।’

ধর্মের সত্য রূপের যারা সন্ধান করেছেন তারা সবাই যুগে যুগে, দেশে দেশে একই কথা বলছেন। তারা সবাই ধর্মকে শাস্ত্র এবং আচারসর্বস্বতার বন্ধন থেকে মুক্ত করে উচ্চ-নিচ নির্বিশেষে সর্বমানবের কল্যাণময় পথে পরিচালিত করতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ লক্ষ করেছেন, পৌরাণিক যুগের কৃষ্ণ যে ধর্ম প্রচার করেছিলেন সে ধর্ম পুরোহিত-শাসিত শাস্ত্রসিদ্ধ বিধানের অমোঘতা মেনে নেয়নি; তিনি ধর্মের আবেদন আর্য-অনার্য নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষের জন্য প্রসারিত করেছিলেন। তিনি বলেছেন যে, রাখাল সম্প্রদায়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পুরাকাহিনী এ কথাই প্রমাণ করে। যে ধর্মের মধ্যমণি হিসেবে কৃষ্ণ বিরাজ করেছেন সে ধর্ম মূলত ছিল অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের আশ্রয়স্থল। পরবর্তীকালে, ঐতিহাসিক যুগে গৌতম বুদ্ধ এবং মহাবীর তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন ধর্মীয় চেতনাকে সব মানুষের কল্যাণমুখী করে তুলতে। যিশুখ্রিস্টও একই পথে তার প্রচারিত ধর্ম পরিচালিত করেছেন। ‘খৃস্ট’ রচনায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-

‘...মানবপুত্র আচার ও শাস্ত্রকে মানুষের চেয়ে বড় হইতে দেন নাই এবং বলেছিলেন বলি নৈবেদ্যের দ্বারা ঈশ্বরের পূজা নহে অন্তরের ভক্তির দ্বারাই তাহার ভজনা। এই বলিয়াই তিনি অস্পৃশ্যকে স্পর্শ করিলেন, অনাচারীর সহিত একত্রে আহার করিলেন এবং পাপীকে পরিত্যাগ না করিয়া তাহাকে পরিত্রাণের পথে আহ্বান করিলেন। ’

রবীন্দ্রনাথ সমাজবিজ্ঞানীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করেছেন ধর্মের সর্বনাশা সাম্প্রদায়িক উৎসাহে দেশের মানুষ বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন- ‘মানুষ বলেই যে মানুষের মূল্য সেইটিকে সহজ প্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি।’ মানবপ্রেমের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মবুদ্ধি থেকে বিচ্যুত হয় বলেই ধর্মের নামে অধর্ম মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদনে এক ধর্ম তখন অন্য ধর্মকে আঘাত করতে অগ্রসর হয় এবং সব ধর্মের সারকথা মনুষ্যত্ব এভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়। প্রত্যেক সম্প্রদায় দাবি করে যে, একমাত্র তার ধর্মই সত্য। এ মনোভাবকেই তিনি স্পষ্ট করে তুলেছেন ‘স্ফুলিঙ্গ’ কবিতায়-

‘যে গোঁড়ামি সত্যেরে চায়/ সুধায় রক্ষিতে-/যত জোর করে, সত্য

মরে অলক্ষিতে। ’

নিজের সাহিত্যকর্মে নিপুণভাবে ধর্মীয় মৌলবাদের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘অচলায়তন’ নাটকের মহাপঞ্চক, ‘বিসর্জন’ নাটকের রঘুপতি, ‘মালিনী’ নাটকের ক্ষেমঙ্কর ধর্মান্ধ অপশক্তির প্রতিভূ। অন্ধকারের পূজারি এ চরিত্রগুলো বরাবরই যুক্তিবিরোধী। এ যুগের ধর্মান্ধ উগ্রবাদীদেরও একই রূপ।

‘মালিনী’ নাটকে আমরা তাই শেষ পর্যন্ত দেখি মৌলবাদী শক্তির নেতা ক্ষেমঙ্কর মৌলবাদের প্রচলিত ছকে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। ব্রাহ্মণদের দিয়ে উচ্চারণ করিয়েছে মালিনীর নির্বাসনের কথা। নির্বাসন প্রসঙ্গে সুপ্রিয় প্রশ্ন তুলেছে :

‘ধর্মাধর্ম সত্যাসত্য/কে করে বিচার! আপন বিশ্বাসে মও

করিয়াছ স্হির, শুধু দল বেঁধে সবে/সত্যের মীমাংসা হবে, শুধু উচ্চরবে?

যুক্তি কিছু নহে?’

মৌলবাদীরা তো যুক্তির ধার ধারেন না। ‘বিসর্জন’ নাটকে রঘুপতি, ‘অচলায়তনে’ মহাপঞ্চক ধারেননি।

ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীলদের মনস্তত্ত্ব নিখুঁতভাবে উপলব্ধি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘ধর্ম’ গ্রন্থে তিনি মন্তব্য করে বলেছেন, ধর্মব্যবসায়ী ধর্মের স্বরচিত গণ্ডি রক্ষার্থে প্রবল উৎসাহ দেখায়, বিষয়ী নিজের জমির সীমানা রক্ষা করতেও এত উৎসাহ দেখায় না। এ গণ্ডি রক্ষাকেই তারা ধর্মরক্ষা মনে করে। সাম্প্রদায়িক ধর্মরক্ষকেরা ধর্মের বৃন্তটিকে এত ক্ষীণ করে রাখে যে প্রত্যেক বায়ু হিল্লোলকেই শত্রুপক্ষ মনে করে। ‘খৃস্টধর্ম’ রচনায় তিনি যথার্থই বলেছেন- ‘এই জন্যই মানুষকে সাম্প্রদায়িক খৃস্টানের হাত থেকে খৃস্টকে, সাম্প্রদায়িক বৈষ্ণবের হাত থেকে বিষ্ণুকে, সাম্প্রদায়িক ব্রাহ্মের হাত থেকে ব্রহ্মকে উদ্ধার করে নেয়ার জন্য বিশেষভাবে সাধনা করতে হয়।’

ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ কলম ঝলসে উঠেছে উপন্যাসেও। ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসের জগমোহন এক অবিস্মরণীয় চরিত্র। তার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- ‘তিনি ঈশ্বরে-অবিশ্বাস করিতেন বলিলে কম বলা হয়, তিনি না-ঈশ্বরে বিশ্বাস করিতেন।’ ঈশ্বরবিশ্বাসীর সঙ্গে তার তর্কের একাধিক বিবরণ রয়েছে এ উপন্যাসে। জগমোহন বলতেন-

‘ঈশ্বর যদি থাকেন তবে আমার বুদ্ধি তারই দেয়া। সেই বুদ্ধি বলিতেছে যে ঈশ্বর নাই। অতএব ঈশ্বর বলিতেছেন যে ঈশ্বর নাই। অথচ তোমরা তার মুখের ওপর জবাব দিয়া বলিতেছ যে ঈশ্বর আছেন। এই পাপের শাস্তিস্বরূপ তেত্রিশ কোটি দেবতা তোমাদের দুই কান ধরিয়া জরিমানা আদায় করিতেছে। ’

যুক্তিবাদী ও নাস্তিক জগমোহন তার ভাইপো শচীশকে বলতেন, ‘দেখ বাবা, আমরা নাস্তিক, সেই গুমরেই আমাদিগকে একেবারে নিষ্ফলঙ্ক নির্মল হইতে হইবে। আমরা কিছুকে মানি না বলিয়াই আমাদের নিজেকে মানিবার জোর বেশি। ’

ধর্মীয় উন্মাদনা ও উগ্র জাত্যাভিমানের বিরুদ্ধে চিরন্তন দ্রোহ রবীন্দ্রনাথের মহত্তম উপন্যাস ‘গোরা’। ভারতবর্ষ আর হিন্দুত্ববাদ সমার্থক- এমন যুক্তিবর্জিত ধারণা পোষণের মাধ্যমে জীবনের মূল্যবান সময় অপচয় করে গোরা। যে হিন্দুত্বের অহঙ্কারে গোরা গর্বিত ছিল সেই অহঙ্কার একদিন চূর্ণ হয়ে যায়। গোরা জানতে পারে সে হিন্দু নয়, সে এক আইরিশ দম্পতির সন্তান। নিজের ভুল বুঝতে পেরে পরেশবাবুকে গোরা বলেছিল-

‘আপনি আমাকে আজ সেই দেবতারই মন্ত্র দিন যিনি হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, ব্রাহ্ম সবারই, যার মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে, কোনো ব্যক্তির কাছে কোনোদিন অবরুদ্ধ হয় না, যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নন- যিনি ভারতবর্ষের দেবতা। ’

‘গোরা’ উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠায় আরও বিস্ময় অপেক্ষা করে পাঠকের জন্য। জাতিভেদকে সøেহে মনের মধ্যে এতকাল লালন করে এসেছে গোরা। মা আনন্দময়ীর ঘরে সে খেতে চায়নি খ্রিস্টান দাসী লছমিয়া সেখানে থাকে বলে। আনন্দময়ীর ঔদার্যকে কখনও মেনে নিতে পারেনি সে। কিন্তু গোরার জন্ম-রহস্য উন্মোচন তার অন্তর্দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। আনন্দময়ীকে সে বলে-

‘মা, তুমিই আমার মা! যে মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলুম তিনিই আমার ঘরের মধ্যে এসে বসেছিলেন। তোমার জাত নেই, বিচার নেই, ঘৃণা নেই- শুধু তুমি কল্যাণের প্রতিমা! তুমিই আমার ভারতবর্ষ!...’

আজকের পৃথিবীতে ধর্মাশ্রিত জঙ্গিবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের ছোবল মানবধর্মকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করছে। এর মূলে রয়েছে ধর্মমোহ। রবীন্দ্রনাথ ‘ধর্মমোহ’ কবিতায় এ ব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়ার যে উপায় নির্দেশ করেছিলেন তা এ যুগেও প্রাসঙ্গিক-

‘যে পূজার বেদি রক্তে গিয়াছে ভেসে

ভাঙো ভাঙো, আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে-

ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,

এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক জ্বালো।’ হ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×