৬৩ দিনের স্বামী

  আন্দালিব রাশদী ১০ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তখন ঠিকানা বদলে দেয়ার আন্দোলন চলছে।

দরিয়া-ই-সিন্ধ আর নয়, রাভি, বিয়াশ, চেনার শাটলেজ আর নয়। নতুন স্লোগান উঠেছে, জবরদস্ত স্লোগান : তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা।

স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টস জানুয়ারিতেই হয়। হেডস্যার বলেছেন, সময় খারাপ সামনের সময়টা আরও খারাপ যেতে পারে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্কুলের অ্যানুয়াল ইভেন্টগুলো সেরে নাও।

স্পোর্টসটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট। আমি দৌড়-ঝাঁপে তেমন সুবিধে করতে পারি না, তবে আমার প্রিয় তিনটি ইভেন্টে আমি কোনো না কোনো পুরস্কার পাব এটা সবাই ধরে নেয়। ক্লাস নাইনেও পেয়েছি। তিনটি ইভেন্টই সিনিয়র গ্রুপের : শর্টপুট, ডিসকাস ও জ্যাভলিন থ্রো গোলক চাকতি ও বর্শা নিক্ষেপ।

এবার শর্টপুট রিহার্সেলের দিন গোলকটা ছুড়েও মারলাম, কিন্তু আমার হাত এগোতে চাইল না, পায়ের কাছাকাছি কোথাও হাত ফসকে গোলক পড়ে যায়। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করলাম, এবার হাতে গোলকের ভারই বহন করতে পারছিলাম না। আমাদের স্পোর্টস টিচার পিটার গঞ্জালেস বললেন, এবারের মতো তোমার স্পোর্টস শেষ। তোমার মাসল পুল করেছে। রেস্ট নাও আর ঘাড়ের কাছে গরম সেঁক দাও, ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু আমার উপস্থিতি ছাড়া অ্যানুয়াল স্পোর্টস শেষ হতে পারে না। আমার হাত-পা যা হয় হোক আমি থাকবই।

পিটার গঞ্জালেস স্যার বললেন, একটা মাত্র ইভেন্ট আছে যেখানে হাত তেমন না নাড়লেও চলবে- ড্রেস অ্যাজ ইউ লাইক। যেমন খুশি তেমন সাজো।

আমাদেরটা পুরোপুরিই গার্লস স্কুল। কিন্তু মাত্র পাঁচজন লেডি টিচার আর একজন আয়া, বাকি সব পুরুষ। হেডস্যার, পিটি স্যার, ইংরেজি স্যার এমনকি দারোয়ান সবই পুরুষ। নারী প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়, অধিকাংশ সময় নারী প্রার্থীই পাওয়া যায় না। আমার ভাইয়ের শার্ট-প্যান্ট জুতো এবং বাবার কোট পরে আমি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সাজলাম। আইয়ুব খানের ছবি সামনে রেখে আমাকে যিনি সাজালেন তার নাম তাজ মোহাম্মদ, তিনি দোকানে সাইনবোর্ড লিখেন, তিনি নিজেকে বলেন, কমার্শিয়াল আর্টিস্ট। কবরী-রাজ্জাক, নাদিম-শবনম, জেবা-মোহাম্মদ আলী- এমন সব নায়ক-নায়িকার ছবি আঁকা প্র্যাকটিস (তিনি অবশ্য বলেন পেকটিস) করছেন, হাত আর একটু পাকা হলে সিনেমার হোর্ডিং আঁকবেন। ওখানে কাজ বেশি, পয়সাও বেশি। তিনিই আমাকে সাজানোর সময় বলেছেন, পাকিস্তানে একটা মাত্র বাঘের বাচ্চা আইয়ুব খান আর সব মেনি বিলাই। তিনি এমনও বলছেন, ১৯৬৫ সালের ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় আইয়ুব খানকে দেখেই নাকি ইন্ডিয়ার প্রাইম মিনিস্টার লালবিহারি শাস্ত্রী হার্ট ফেইল করেন। কাজেই এ রকম একজন বীরপুরুষ সাজতে সমস্যা কী?

কিন্তু সমস্যা হল। আমাদের পাঁচজন লেডি টিচারের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড মিসট্রেস চেমন আরা গুলবাহার ম্যাডাম খুব চটে গেলেন। বললেন, তোমার পুরুষ সাজার এত সখ কেন? পুরুষে কী এমন মজা?

পুরুষ মানুষের ওপর ম্যাডামের ক্ষেপে থাকার কারণ আমাদের অজানা। তবে আমরা ক্লাসে বলাবলি করেছি ম্যাডামের হাজব্যান্ড তার ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। এ কথাটা আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে ওল্ড ক্লাস টেনের কাছ থেকে পেয়েছি, কিছুদিন পর আমরাও নিউ ক্লাস টেনকে এ কথা জানিয়ে যাব।

ম্যাডাম তার হাতের বেত উঁচিয়েছেন, কিন্তু মারেননি। বলেছেন, তুমি বেগম রোকেয়া সাজতে পারতে, সুলতানা রাজিয়া সাজতে পারতে, এমনকি মিস ফাতেমা জিন্নাহও সাজতে পারতে। আর পুরুষ সাজার এতই খায়েশ হয়ে থাকে তাহলে শেখ সাহেব সাজতে পারতে। আমি তোমাকে আবার সতর্ক করে দিচ্ছি, পাঁপড়ি তুমি বড্ড বেড়ে গেছ, বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি তোমার পাখা দুটি ছেঁটে দেব। শুধু আইয়ুব খান সাজাই নয়, আমি প্রধান অতিথির সামনে গিয়ে বেরাদানে মিল্লাত মাই ডিয়ার কান্ট্রিম্যান সম্বোধন করে জাতির উদ্দেশে ইংরেজিতে একটা বক্তৃতাও দিয়েছি। একতা, ইমান, শৃঙ্খলা পুঁজি করে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করার জন্য দেশবাসীকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছি।

অনেকেই হাততালি দিয়েছেন, কেউ কেউ বলেছেন, শেইম শেইম। ড্রেস অ্যাজ ইউ লাইকের পুরস্কার ঘোষণার সময় চেমন আরা গুলবাহার ম্যাডাম বলেছেন, বিশেষ কারণে সব অংশগ্রহণকারীকে বিবেচনায় আনা হয়নি। প্রথম হয়েছে নার্স ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, দ্বিতীয় বাংলার কৃষাণী এবং তৃতীয় পঙ্গু ভিখারিণী।

আমি এমনকি সান্ত্বনা পুরস্কারও পাইনি। কিন্তু সে ক্ষতি অন্তত দশগুণ পুষিয়ে দিয়েছেন অবাঙালি প্রধান অতিথির স্ত্রী বেগম লায়লা মোজাফফর। তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যের আগে এক মিনিট কথা বলার অনুমতি চান। তিনি বলেন, যে কারণে আইয়ুব খান হিসেবে নিজেকে সজ্জিত করা মেয়েটিকে পুরস্কার দেয়া হয়নি, কারণটি মোটেও অস্পষ্ট নয়, হয়তো সে কারণটি যৌক্তিকও। কিন্তু সে যে নিখুঁতভাবে সাজতে পেরেছে এবং একটি প্রেসিডেন্সিয়াল স্পিচ দিতে পেরেছে সে প্রশংসা তার অবশ্যই প্রাপ্য। তিনি মেয়েটির প্রশংসা করেন এবং তার পছন্দের বিষয়ে খুশি মতো বই কেনার জন্য ৫০০ রুপি পুরস্কার গ্রহণের জন্য মেয়েটিতে আমন্ত্রণ জানান।

সবার চোখ এমনই ছানাবড়া যে হাততালি দিতেও অনেক ভুলে যান। যেখানে স্কুলের স্পোর্টস বাজেট অনুযায়ী তৃতীয়, দ্বিতীয় ও প্রথম পুরস্কারের জন্য যথাক্রমে সাড়ে পাঁচ রুপি সাড়ে সাত রুপি এবং সাড়ে নয় রুপি সেখানে যেমন খুশি তেমন সেজে ৫০০ রুপি!

তঘমা-ই-পাকিস্তান খেতাব পাওয়া আমাদের স্বল্পভাষী হেডস্যার খুশিতে ডগমগ হয়ে প্রধান অতিথির স্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। পরদিন আমার পাঁচশ টাকা প্রাপ্তির খবর শুধু নয়, দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় আইয়ুববেশে আমার ছবিও ছাপা হল। পর দিনের ছবি আমাকে সেলিব্রেটি করে তুলল।

আমার বান্ধবীদের একজন তাদের বাড়িতে ভোরবেলায় দেয়া পত্রিকাটিই স্কুলে নিয়ে এসেছে। বান্ধবীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ছবির ওপর। যথেষ্ট দুষ্টুমি তারা করেছে : আইয়ুব খানের বুকের দিকটা এত উঁচু কেন? আইয়ুব খানের খতনা হয়েছিল কিনা, প্যান্ট খুলে চেক করা দরকার। তারপর কী খিলখিল হাসি। মেয়েদের দুষ্টুমি এমনই হয়।

আমার এই হঠাৎ খ্যাতি চেমন আরা গুলবাহার ম্যাডামের কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। পুরুষ মানুষের ওপর ঘৃণায় হোক, নিজের স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ থাকার কারণে হোক (এটি কেবলই অনুমান, তার মেজাজ দেখানোকে যৌক্তিক করে তোলার জন্য এসব আমাদেরই সৃষ্টি) কিংবা ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানকে অপছন্দ করার কারণেই হোক আমার সঙ্গে গায়ে পড়ে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করলেন। আমি মাথায় ওড়না না দিলে ধমক খাচ্ছি, চুল খোলা কেন? মাথায় ওড়না দিলেও ধমক- একদিকে ব্যাটা সাজতে আমার মাথায় কাপড় দেবে- আর কত বদমায়েশি করবে? আমি জোর কদমে হাঁটলে বলেন, ঘোড়া হয়েছ নাকি? আস্তে হাঁটলে বলেন, কচ্ছপ সেজেছে? বেত মেরে সোজা করে দেব।

এ ঘটনাগুলো ১৯৬৯-এর জানুয়ারি মাসের প্রথম দু’সপ্তাহের। ২০ তারিখে আসাদ আর ২৪ তারিখে মতিউরের মৃত্যু ঠিকানা বদলে দেয়ার আন্দোলনটাকে ভয়ংকর গতি এনে দিল।

মার্চের শেষ দিকে চেমন আরা গুলবাহার ম্যাডাম সোজা ক্লাসে ঢুকে সরাসরি আমাকে লক্ষ করে বললেন, কোথায় তোমার আইয়ুব খান। আরও সাজো। তখনই বলেছিলাম, ভালো হচ্ছে না ব্যাপারটা। পেছন থেকে আমার ক্লাসমেট দূরে আফসানা বলল, ম্যাডাম এখন ইয়াহিয়া খান সাজবে। ও পারবে ম্যাডাম।

ম্যাডাম চেঁচিয়ে উঠলেন, খামোশ। এসব আর শুনতে চাই না।

আমার ওপর তার চটে থাকার এবং বিভিন্ন সময় আমাকে অপদস্ত করার সংবাদটি হেডস্যার পেয়ে ম্যাডামকে বললেন, ক্লাস নাইন-টেনের ছাত্রীদের সঙ্গে নমপিট করতে যান কেন? আপনার কমপিটিশন হবে বিএসসি বিটি কোনো টিচারের সঙ্গে।

এটিও যে ইঙ্গিতপূর্ণ খোঁচা তা বুঝতে আমাদের আরও ক’বছর অপেক্ষা করতে হয়। ম্যাডামের হাজব্যান্ড ভিন্ন কোনো স্কুলের বিএসসি বিটি ডিগ্রিধারী রোয়েনা ম্যাডামের সঙ্গে সম্পর্ক করতে যাচ্ছেন বলে গুজব আছে।

হেডস্যার আমাকে ডেকে বললেন, চেমন আরা যা বলে চুপচাপ সহ্য করে যাও, আর মাত্র ক’মাস পরই তোমাদের স্কুল ফাইনাল। এরপর তোমাদের দু’জনের দেখাও হবে না।

সেই কমার্শিয়াল আর্টিস্ট তাজ মোহাম্মদের সঙ্গে দেখা হল। তিনি বললেন, ইয়াহিয়া খানের চেহারাটা তার পছন্দ নয়, আমাকেও মানাবে না।

আমি বললাম, সামনে আমার পরীক্ষা। স্কুল ছাড়লে সাজার সুযোগ শেষ। এসএসসি পরীক্ষা শেষ এবং ইন্টারমিডিয়েটের ক্লাস শুরু এই অন্তর্বর্তী সময়টুকু আমাদের সময়ের মেয়েদের জন্য বলা যায় ক্রান্তিকাল। সুনির্দিষ্ট কাজ ছাড়া একটা মেয়ে বসে থাকবে কেন? বিয়ে দিয়ে দাও।

তখন প্রস্তাবও আসতে থাকে। বাবা যদি বলেন, মেয়েকে আরও পড়াব, তখন পাত্রপক্ষ বলে, কী লাভ! যত তাড়াতাড়ি সংসার শুরু করে তত মঙ্গল। পাত্রীপক্ষও চায়, আগে একটা ভালো প্রস্তাব আসুক, আমরা কী করব, সে তো জানিই। কনে দেখতে এসেই যাতে বিয়ে করিয়ে নিয়ে যায় সে রকম একটা পরিস্থিতিই সৃষ্টি করব।

আমার বেলায় তাই ঘটল। ১৯৬৫ তে বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেয়া জেসিও মিজান বেদিয়ান সেক্টরে ইন্ডিয়ান আর্মির বিরুদ্ধে দারুণ ফাইট দিয়ে লাহোর রক্ষা করেছে। গুলি কানের পাশ দিয়ে গেছে। আগামী বছর চলে আসবে শিয়ালকোট থেকে বদলি হয়ে ঢাকার জয়দেবপুরে। বয়স তেইশ কি চব্বিশ। সুদর্শন পাত্রটির বউ হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আসেন আমার ছোট খালু ইমাদুদ্দিন ড্রাইভার। এই ড্রাইভার টেক্সিরও না, গরুর গাড়ির গাড়িয়ালও না তিনি ইস্ট পাকিস্তান রেলওয়ের দশ থেকে বিশ বগি টানা ইঞ্জিনের ড্রাইভার। তিনি মিজানের আপন মেজ মামা। বিয়ে না হলেও এই সূত্রে মিজান আমাদের মাতৃকুলের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তিনি ঢাকার কমলাপুর জংশনে ইঞ্জিন রেখে আমাদের বাসায় বসে ফিসফিস করে বললেন সৈয়দপুরের বিহারিদের কাছে শুনে এসেছেন সামনে ভয়ংকর খারাপ সময়। যুবতী মেয়ের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। বয়সের কথা ভাবার দরকার নেই। মেয়ের ঋতু শুরু হলেই স্বামীর ঘরে পাঠাতে হবে। আর সেই স্বামী যদি হয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের মিজান, তার পক্ষেই সম্ভব নিজের স্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শ্বশুরবাড়ির নিরাপত্তার দিকেও নজর রাখা। মাস্টার কিংবা চাকুরে কিংবা বেপারির নিজেরই তো নিরাপত্তা নেই।

এমাদুদ্দিন খালু এবার মারলেন ট্রাম্পকার্ড, আগে মিজানকে একবার দেখেন, সে ছুটিতে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছে, আমিও রোববার ছুটিতে, সকালে শাহজাহানপুরে আমার বাসায় আসবে, দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিয়ে আসব। দুটি করে রসগোল্লা আর এককাপ চা, এই তো খরচ। পাত্রী আমরা আগে দেখাব না। পাত্র যদি পছন্দ হয়, এমন ইশারা দেন তাহলেই যেমন আছে তেমন পাত্রীকে সামনে নিয়ে আসবেন। ব্যাস দু’পক্ষের পছন্দ হয়ে গেলে আর বাকি থাকে কবুল বলা।

তা-ই হল। মিজানকে দেখার পর কারও চোখ সরানোর কথা নয়, আমারও সরেনি। আমার বাবাই বলেছে ইমাদুদ্দিন আকদ পড়িয়ে ফেলো, যখন সময় সুযোগ হয় তুলে নেবে। আমাদেরও তো একটু প্রস্তুতির ব্যাপার আছে।

আমার ছোট বোন উম্মেহানি বলেছে, আপু তুমি আইয়ুব খান সেজে পাত্রের সামনে হাজির হও, দেখবে স্যালুট দেবে।

কোন মিজান? সিগন্যালসের মিজান এক ডাকে সবাই চেনে। অন্য কোনো পাত্রীপক্ষের নজর মিজানের আগে পড়ার আগেই পঞ্চাশ হাজার এক টাকা মোহরানায় অর্ধেক উসুলে মিজানের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের দিনই কেমন করে যেন আমার কথাগুলো মিজানই বলে দেয়; না, না, পড়াশোনা বন্ধ করার কোনো প্রশ্নই আসে না, অবশ্যই কলেজে পড়বে। আমার বদলিতে কমবেশি বছর লেগে যাবে, ততদিনে সেকেন্ড ইয়ারে, তারপর আর ক’মাস, আইএ পরীক্ষা দেবে। আমার মা নেই যে তার দেখাশোনা করতে গ্রামে যেতে হবে, বাবার দেখাশোনার ব্যবস্থা নিজেই করেছেন, কমবয়সী একটা মেয়ে বিয়ে করেছেন, আমার বউ দূরে থাকলেই তিনি খুশি থাকবেন (এমন খোলামেলাভাবে কোনো স্বামী বলে?)।

কী যে সুন্দর মিজানের চেহারাটা (নিজের স্বামী সম্পর্কে এভাবে বলতে নেই, মন্দ মানুষের নজর লাগবে), চোখগুলো থেকে আলো বেরোচ্ছে, ঠিক ডান কান বরাবর নিচে গলায় একটা কালো তিল (হায় আল্লাহ! গলায় তিল থাকলে নাকি ফাঁসি হয়! তৌবা তৌবা, এ কথা আমার মুখ দিয়ে আনব না।) অবশ্য উম্মে হানি বলেছে, ভালো করে দেখলে বোঝা যায় মানুষটা একটুখানি আহাম্মক ধরনের (মিজানকে আহাম্মক বললে একটা থাপ্পড় লাগাব। তুই কি চালাকের হাড্ডি?)

বিয়েটা যেভাবে হয়েছে হাতেগোনা ক’জন জানে, মিজান যখন তুলে নেবে তখন একটা অনুষ্ঠান হবে, সবাই জানবে এবং তখন হেডস্যার আর চেমন আরা গুলবাহার ম্যাডামকে দাওয়াত দেব। আমি সেকেন্ড ইয়ারে উঠি। সত্তর সালের শেষ নির্বাচন হয়। আমরা অপেক্ষায় আছি, ইয়াহিয়া খানের দিন শেষ, শেখ সাহেব ক্ষমতা নেবেন। বদলির আদেশ আগে হলেও মিজান ঢাকায় এসে পৌঁছে একাত্তরের জানুয়ারির ২৭ তারিখ। ক’দিন ছুটি কাটিয়ে পরে জয়েন করবে।

বাংলাদেশ তখন বেশ উত্তপ্ত। আমার বাবাও জিজ্ঞেস করেন, কী বাবা মিজান, কী মনে হচ্ছে?

মিজান বলল, আব্বা আমাদের তো মুখ খোলা নিষেধ। তবুও বলি শেখ সাহেবকে ঠেকাতে যা যা করা দরকার তা-ই করবে।

২৫ মার্চ সকালবেলা মিজান আমাদের বাসাতেই, রুটি আলুভাজি আর ডিমের নাস্তা সেরে তার ব্যাগের ভেতর থেকে একটা সিলভারের মগ বের করে দিয়ে বলল, তোমাদের বাসায় চা খেয়ে মন ভরে না। একটা কাপে কতটুকু চা ধরে? আমাকে এই মগ ভরে চা দেবে। শিয়ালকোটে সকালের পিটি প্যারেডের পর মোটা রুটি, বুটের ডাল, সুজির হালুয়া আর এক মগ চা- একবার খেলে সারা দিনের জন্য শাহানশাহ!

আরও একবার চা বানিয়ে মগ ভরে মিজানকে দিই।

চা খেয়ে নিজের ব্যাগ পকেট সব হাতড়ে অনেক টাকা বের করে। ষোলো শত তিয়াত্তর টাকা। টাকাটা আমার হাতে দিয়ে বলে ভাংতি তিয়াত্তর আমাকে দাও। তোমাদের বাসার সবচেয়ে কাছে হাবিব ব্যাংক। তোমার নামে একটা অ্যাকাউন্ট করে দেড় হাজার টাকা জমা দাও। টুকটাক খরচের জন্য একশত টাকা তোমার হাতে রেখ। আমি এখন পিলখানা যাচ্ছি, ওখান থেকে ইপিআর সিগন্যালসের ওয়াদুদকে নিয়ে ইপিআর হেডকোয়ার্টারে ঢুকব। ফিরতে দেরি হতে পারে।

দেরি মানে?

রাত আটটা সাড়ে আটটা। এসে তোমার সঙ্গে ভাত খাব।

যা কিছু ঘটার তার শুরু তো সে রাতেই।

মিজান ফেরেনি। পরদিনও না, তার পরদিনও না। এপ্রিলের দুই তারিখে ইমাদুদ্দিন খালু ইপিআর ঘুরে এসে বললেন, ফেরার আশা নেই। বহু ডেডবডি সরিয়ে ফেলেছে।

কিন্তু তার তো আমার সঙ্গে ভাত খাওয়ার কথা।

এপ্রিলের পাঁচ তারিখে বাবাকে রেখে আমরা পদ্মা পাড়ি দিয়ে গোঁসাইরহাট চলে যাই।

মিজানকে রেখে আমার যাওয়ার কথা নয়, তবুও যেতে হয়েছে। মে মাসের পনেরো তারিখে ঢাকার পাঠ চুকিয়ে গোঁসাইরহাট আসার পথে পদ্মায় নৌকা উল্টে গেলে যে মানুষটি উঠতে পারেননি, যার লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি তিনি আমার বাবা।

ডিসেম্বরের কুড়ি তারিখ স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে শুরু হয় আমার মিজান অনুসন্ধান অভিযান। যাকে পাই তাকেই জিজ্ঞেস করি, মিজানকে দেখেছেন।

মিজানের একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে পত্রিকা অফিসে ঢুকতে গিয়ে দেখি বাইরে একটি টুলের ওপর বসে আছেন চেমন আরা গুলবাহার ম্যাডাম।

ম্যাডাম।

তোমার কে মরেছে?

ম্যাডাম, আমার স্বামী মিজান, ২৫ মার্চের পর থেকে কোনো খোঁজ নেই। এই যে মিজানের ছবি।

খোঁজ না থাকলে তো ভালো, আশায় থাকতে পারবে যে ফিরে আসবে, একদিন ফিরে আসবে। কিন্তু আমি কী করব? পঁচিশে মার্চ এখানেই আগুনে যারা পুড়ে মরেছে তাদের একজন আবুল বাশার। কমিউনিস্ট আবুল বাশার। নাম শোনোনি?

সেটাও তো ভালো, আপনি নিশ্চিত হলেন যে নেই, মিথ্যে আশায় আপনাকে বাকি জীবনটা পার করতে হবে না, আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

ম্যাডাম চটে গেলেন, বেয়াদব মেয়ে, আমাকে সবক দিচ্ছ? বিয়ে করে একসঙ্গে ক’দিন ছিলে?

ম্যাডাম মোট তেষট্টি দিন।

তাহলে, তুমি স্বামীর কি বোঝ? আমরা একসঙ্গে থেকেছি ঊনত্রিশ বছর সাত মাস এক দিন। স্বামীর জন্য তোমার কষ্ট বেশি না আমার কষ্ট বেশি? আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছ। তেষট্টি দিনের স্বামী!

নিচে এসে দাঁড়ালেন আরেক বৃদ্ধ। তার হাতে বিয়ের সাজ পরা তরুণীর ছবি। তিনি দু’জনকে ছবিটা দেখিয়ে বললেন এপ্রিলের দুই তারিখে যখন কেরানীগঞ্জে আর্মির গোলাগুলি শুরু হয় সুরাইয়া আমার হাত থেকে ফসকে যায়।

ম্যাডামের ক্রোধ একটু কমে আসে, জিজ্ঞেস করেন, সুরাইয়া কী হয়?

বুড়ো কান খাড়া করেন।

সম্ভবত কানে কম শোনেন।

আবার জিজ্ঞেস করেন, সুরাইয়া আপনার কী হয়?

বুড়ো বলেন, ১৯৩৩ সালের ২৭ অক্টোবরের ছবি সেদিন সুরাইয়াকে বিয়ে করি।

আমি আঙুলের করে গুনতে থাকি বিয়ের দিন থেকে হারানোর দিন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাঁইত্রিশ বছর।

বুড়ো ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন, বলেন, ছবিটা হাতে নিয়ে দেখ, তখন দেখতে তোমার মতোই ছিল।

আমি ছবিটা হাতে নিই।

তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার মন কী বলে- আমি কি সুরাইয়াকে ফিরে পাব?

আমি এবার সুরাইয়ার ছবিটা সরিয়ে মিজানের ছবিটার দিকে তাকিয়ে নিজেকেই জিজ্ঞেস করি, তোমার মন কী বলে- মিজানকে ফির পাবে?

আবারও প্রশ্ন করি, মাত্র তেষট্টি দিন! পাঁপড়ি তুমি স্বামীর কী বোঝো? হ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×