জীবনের রঙ

  বিধান চন্দ্র মিত্র ১০ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘জীবনের রং কী’-আলো-আঁধার ভরা নিঃশব্দ সন্ধ্যায় বিবাগী বাউল পরাণ মণ্ডলের মুখে আচমকা এ প্রশ্নটি শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিল অনীক হালদার। তার মনে হয়েছিল, যারা কাউকে হঠাৎ বিব্রত করতে চায় কিংবা অন্যের ভেতরে ধূসর জটিল অস্বস্তি সৃষ্টি করতে ভালোবাসে, তারা মস্তিষ্কের করোটিতে এমন কিছু প্রশ্ন জমিয়ে রাখে- যার উত্তর দেয়া কঠিন বা উত্তর সহজ হলেও উত্তরের যথার্থতা প্রমাণ করা সহজ নয়। এই যেমন কবি ও প্রেমিক পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রহস্যময় প্রশ্ন, ‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়?’ বস্তুত এ-প্রশ্নের উত্তর ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক উপায়ে দেয়া যায়, রবীন্দ্রনাথ নিজেও তা-ই করেছেন, তবে স্পষ্ট করে কিছুই বলেননি; হয়তো স্পষ্ট করবার-ব্যাখ্যাটা তিনি নিজেও জানতেন না। কিংবা জানলেও, তিনি যেহেতু কবি- উত্তরটা তা-ই ইচ্ছে করেই ধোঁয়াশাময় করে রেখে দিয়েছেন। পৃথিবীর সকল ভাবুক যেমন ভাবনার মধ্যে বসবাস করতে ভালোবাসেন, তেমনি অন্যকেও তারা ভাবনার জগতে সাঁতার কাটাতে পছন্দ করেন।

‘জীবন’-এর দশদিক সম্পর্কে- অনীক হালদার নিয়তই ভাবে; কিন্তু ‘জীবনের রং কী’-না, এ-রকম ভাবনা তার মস্তিষ্কের করোটিতে কখনো উঁকি দেয়নি। আজও এ-‘রং’ নিয়ে ভাবিত হতো না সে- যদি ওই প্রশ্নের কর্তা হতো কোনো বিদগ্ধজন কিংবা অনুসন্ধিৎসু কেউ অথবা কোনো নির্বোধ বা কোনো বাচাল। ওদের প্রশ্নের মধ্যে উদ্দেশ্য থাকে, কাউকে হঠাৎ করে বিপদে ফেলবার দুরভিসন্ধি থাকে, তাতে অন্তরের যোগ থাকে না। কিন্তু আজ, প্রশ্নটা যে করেছে- পরাণ দাস, সে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে তো নয়ই- বোধহয় উত্তর জানার জন্যও এ প্রশ্নটি করেনি; হয়তো অনীকের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে জেগেছিল তার, হয়তো কথা বলার প্রসঙ্গ হিসেবে, তেমন কিছু না ভেবে ওই প্রশ্নটি দিয়েই আলাপ শুরু করতে চেয়েছিল। ‘জীবনের রং’- এর উত্তর যা-ই বলতো অনীক, লাল-নীল-হলুদ-সবুজ-আসমানি, পরাণ হয়তো কোনো কিছুতেই দ্বিমত পোষণ করতো না- কারণ, যার জীবনই নেই, জীবনের রং নিয়ে- তার আবার ভাবনা থাকে নাকি?

এ-জীবনে, জেনে না জেনে অনেকের অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে অনীক হালদার; তবে ওই-সব প্রশ্নের ধরন ছিল অন্যরকম, অধিকাংশ প্রশ্ন ছিল বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ছায়া দিয়ে আবৃত; আজ পরাণ যে প্রশ্নটি করেছে, এর সঙ্গে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সম্পর্ক নেই; রাজনীতি ও কাব্যমাদকতা দিয়ে এর একটা মনোহর উত্তর তৈরি করা যেতো, কিন্তু আজ বানানো গল্প বলতে ইচ্ছে হল না অনীকের। আজ তার মনে হল, আন্দাজনির্ভর বা উপাখ্যানধর্মী উত্তর দিয়ে পরাণের কৌতূহল হয়তো নিবৃত্ত করা যাবে; কিন্তু যে প্রশ্ন নিয়ে নিজের ভেতরেই শুরু হয়েছে উত্তাল তরঙ্গপ্রবাহ, যাকে মনে হচ্ছে নিজেরই বোধজাত প্রশ্ন- সে প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর না পেলে- অন্তর্সত্তার উগ্র আবর্তন স্থিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

২.

পরাণ দাসের ‘পরাণ’ তো স্বাভাবিক নেই, কবেই তাতে অসংলগ্নতা দেখা দিয়েছে। জীবনে থেকেও যে জীবনবিমুখ, বিপুল সম্পত্তির মালিকানা ছেড়ে- স্বেচ্ছায় যে কাটায় ভিখেরির জীবন, ভোগবাদে বিচরণ করবার সব ক্ষমতা করায়ত্তে থাকার পরও যে কি না ‘অচিন পাখির’ গান গেয়ে গেয়ে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়ায়, ভোলানাথের প্রসাদ পেলেই তুষ্ট থাকে যে- সে কখনো স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে গণ্য হতে পারে? রুচি ও ভাবের মধ্যে মিল থাকলেই দুই জোড়া চোখের দৃষ্টি অভিন্ন হয় না, একই গোলাপ- দু’জনের চোখে আলাদা রূপে প্রতিভাত হয়; সে-ক্ষেত্রে, জীবনকে দেখার বাউল-দৃষ্টি, আর জোছনা-আলোকিত নাগরিক-দৃষ্টির মধ্যে ঐক্য থাকার কথা নয়। একজন জীবনের খোঁজে- ঘরের সবকিছু ত্যাগ করে পথে নামে, অন্যজন পথের জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে জমা করে রাখে। ‘ঘর’ আর ‘বাহির’- কার কাছে কোন জীবন- ‘আরাধ্য’, সেটা বলা মুশকিল।

পরাণ তো প্রশ্ন করেই খালাস; কারণ, তার জীবনে প্রশ্ন-উত্তর, ঠাণ্ডা-গরম, হাসি-কান্না, দিন বা রাত-কোনোটাই আলাদা দ্যুতিবাহী নয়। তার পৃথিবী খুব ছোট, দেহের মধ্যেই এ পৃথিবীর-বিস্তৃতি। তার দেহকেন্দ্রিক পৃথিবীতে শৈত্য-উত্তাপ-ঝড়-বৃষ্টির আনাগোনা কম। সুখাকাক্সক্ষারহিত, বাঁধনছাড়া, মুক্ত মানুষ সে; তাই প্রাত্যহিক জীবনের রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ বা ধূসর-ধোঁয়াটে-জটিল-কুটিল-আন্দোলন তাকে তেমন স্পর্শ করতে পারে না। অন্যদিকে অনীকের পৃথিবী যেমন বড়ো, তেমনি তা বৈচিত্র্যময়ও। তার পেটে বিদ্যে আছে ঢের, আছে সাহিত্য-দর্শন-অর্থনীতি-রাজনীতির ব্যঞ্জনসূত্রও; ঘরে-বাইরে অভিনয় করে যাওয়ার সফল-তত্ত্বও মাথায় আছে তার; তার বিদ্যা যা বলে, বিশ্বাস এর উপর ছড়ি ঘুরায়, আর সংস্কার পেছন থেকে চোখ রাঙ্গায়। মাঝে মধ্যে তার ভেতরে প্রশ্ন জাগে- সমাজ আরোপিত বিধি, যুগ যুগ ধরে অনুসৃত প্রথা- আর দর্শন ও বিজ্ঞানজাত অনুভব- এর মধ্যে সমন্বয়ের কোনো সূত্র নেই? থাকলে সেটা কোথায় আছে?

আকাশে বিচরণশীল যে-পানি, এর নাম-জলদ। জলদের সাংঘর্ষিক রূপ-বৃষ্টি; ঘনীভূত রূপ-বরফ। বরফ থেকে আবারও সেই পানি বা জল। বস্তুত পরাণের জীবন যেন ‘জলবৎ তরলং’- একরূপে অন্বিত, সরল ও তরল। এ জীবনের লক্ষ্য একমুখী, এর তল দেখা যায়, এ-জীবনকে স্পর্শও করা যায়। অন্যদিকে অনীকের পৃথিবীর নির্দিষ্ট কোনো আকার নেই, তবে তা নিরাকারও নয়। তার ভুবন বহুমাত্রিক রসে রঞ্জিত, তার দৃষ্টির রং নিয়ত বদলায়, কাছে বা দূরের পরিপ্রেক্ষিতে দৃষ্টির উজ্জ্বলতা বাড়ে-কমে; তার বোধের প্রবাহ কখনও শান্ত, কখনও অশান্ত। জীবন তার কাছে ‘সূত্রবদ্ধ’ কিছু নয়, নীতির লৌহখণ্ডে আবদ্ধ ‘পবিত্র ও স্পর্শহীন নয়’- তার জীবন গড়-মানুষের জীবন- ‘যখন যেমন, তখন তেমন’। সে জীবনের আকার কখনও ‘জলাশয়ের পানি’র মতো, কখনও ‘বৃষ্টি’র মতো, কখনও বা ‘বরফখণ্ড’-এর মতো- নরম আবার বজ কঠিনও।

শৈশবে চার আনার কাঠবিস্কিট তার তৃপ্তির গহীনে সমুদ্রের উদ্দাম জোয়ার এনে দিতো; বিস্কিটের মিহি দানাগুলো চিবুতে চিবুতে মনে হতো- আহা, জীবন কী তাজা, মচমচে, শান্তিময়। সে ভাবতো, বড়ো হলে- হাতে অনেক টাকা এলে, এক-দোকানের সব কাঠবিস্কিট কিনে অপার আনন্দে খেতে হবে। অনীক এখন বড়ো হয়েছে, হাতে অনেক টাকা আছে, এখন কত কিছু খায় সে, দেশি-বিদেশি বিচিত্র রকমের মূল্যবান খাবার; কিন্তু না, এ-খাবারের ভেতরে শৈশবের সেই অমৃতময় কাঠবিস্কিটের স্বাদ পাওয়া যায় না। একবার অতি আগ্রহ করে কাঠবিস্কিট কিনেছিল সে; এরপর পরমানন্দে মুখে ঢুকিয়ে, কণামাত্র না গিলে ফেলে দিয়ে সবছিল তার। কিন্তু কেন? সময়ের আবর্তনে কাঠবিস্কিটের স্বাদ কি বদলে গেছে? নাকি পাল্টে গেছে জিহ্বার চরিত্র? পাল্টাবে না কেন? আগে হুইস্কির গন্ধ পেলে খুবই অস্বস্তি লাগত তার; কিন্তু এখন, ওই একই জিনিস- কী অনায়াসে, আরাম করে খায়; পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে মায়ের øেহ-ব্যতীত- ‘অপরিবর্তনীয়’ কিছু কি নেই?

বাইরের মানুষ, এমনকি ঘনিষ্ঠজনরাও অনীকের মধ্যে বহুবিচিত্র রং ও রসের সমাহার দেখে আন্দোলিত হয়; তার তুলনায় নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করে কষ্ট পায় তারা। সে ভালো একটা চাকরি করে, পাঠকনন্দিত সাহিত্য লেখে, রসাত্মক কথামালায় সভা সেমিনারকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখতে পারে। ঘরে তার রূপবতী স্ত্রী, বাতাসে সুগন্ধি ছড়িয়ে হাঁটে, আবৃত্তির মাদকতায় সবাইকে আচ্ছন্ন করে দেয় এবং বুদ্ধি ও হাসির দীপ্তিতে আশপাশকে নীরব শ্রোতা বানিয়ে রাখে। অন্যদের কাছে এ-দুজন-স্বপ্নের মানুষ, আলোকিত-অনন্য সাধারণ দম্পতি; কিন্তু ঘরে, অর্থাৎ নিজেদের কাছে তারা ধূসর-মলিন-প্রাত্যহিক। স্বামীর নন্দনতত্ত্ব-জ্ঞান, স্ত্রীর কাছে বিশেষত্বহীন; কিংবা তার সম্মোহনী কথামালা- কথার কথা ছাড়া আর কিছু নয়। স্ত্রী-শিউলির দেহ সৌন্দর্য, সেটা কষ্ট করে অর্জিত নয় বলে অনীক তাকে দেখার জিনিসই মনে করে না। তার মিষ্টি হাসিকে অনীক ভাবে, শ্রাবণ মেঘের বিদ্যুৎ-ঝলক, যাতে আলোর-স্থিতি কম কিন্তু বজ পাত ঘটানোর সম্ভাবনা নিয়ে উড়ে চলে। একই ঘরে বহুদিন আছে দু’জন, তাই হয়তো একজনের কাছে অন্যজন সম্পূর্ণরূপে অনাবৃত হয়ে গেছে, বৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলেছে। যে-জীবনে প্রাণের যোগ নেই- সে জীবন কেবলই সময় অতিক্রম করে যাওয়া- নীরস ও বিবর্ণ। এখন অনীকের ভাবনা- নতুন, অনাস্বাদিত জগতের স্বাদ চায়, হাওয়া বদলাতে চায়; শিউলির ভাবনাও হয়তো একই রকম, তবে সে যেহেতু মেয়ে- তাই তার অন্তর্জগত আবৃত থাকে বেশি। মাত্র সতেরো মাসের দাম্পত্য জীবন তাদের, এরই মধ্যে সব উষ্ণকথা ফুরিয়ে গেছে, পরস্পরকে জানাও যেন শেষ হয়ে গেছে; এখন তাদের কথায় হৃদয় নেই, চাল-ডাল-আলুময় কথায় বেশি অনুভূত হয় পেঁয়াজের ঝাঁঝ।

অনীকের এক সহকর্মী, নীলা তার নাম- কারও সঙ্গে কথা বলে না, সারাবেলা বসে থাকে মুখ বেজার করে, একা একা। নীলার এই ‘বাকহীন কালো মুখ’ ইতোপূর্বে অনেকের হাসাহাসির কারণ হয়েছে- অনীকও তাতে যোগ দিয়েছে মহানন্দে। কিন্তু এখন- মাঝেমধ্যেই তার মনে হয়, ‘নীলার ওই ‘বাকহীন কালোমুখো’ ভাবের মধ্যে নিন্দের কিছু নেই; ওই ভাবে, বোধহয় আছে ‘ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য’। নীলা নিশ্চয়ই তার স্বামীর সঙ্গে অনেক কথা বলে, সর্বদা একাত্ম হয়ে থাকে; তাই অফিসে এসে কারও সঙ্গে কথা বলে না, কারও সঙ্গে মেশে না সে। নীলার জীবন, তার সবকিছু- কেবল তার স্বামীর জন্যই তুলে রাখা; অথচ শিউলি, সে যত না ঘরের- এর চেয়ে বেশি বাইরের। যে-পাখি মুক্ত আকাশের খোঁজ জানে, আর যে মন- মুক্তজগতে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস রপ্ত করে ফেলেছে- তাদের বৃত্তবন্দি করার চেষ্টার মধ্যে- ‘অধ্যবসায়ী’ চিন্তার প্রতিফলন থাকতে পারে কিন্তু তাতে সফলতার সম্ভাবনা থাকে না।’

৩.

সেদিন পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা সঙ্গীতের রাগ শুনে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে অনীক বলেছিল,‘ তুমি যদি গাইতে পারতে, তবে বেশ হতো।’ শিউলি উত্তর দিয়েছিল, ‘বিয়ের আগেই তো তুমি জানতে যে, আমি গান গাইতে পারি না, কি জানতে না?’ স্ত্রীর কাছ থেকে এ-রকম উত্তর- মোটেও পছন্দ হয়নি অনীকের। তার মনে হয়েছে, এতে উত্তরের চেয়ে উত্তাপের পরিমাণ বেশি; ‘উক্ত’ অপেক্ষা ‘অনুক্ত’র আঁচ বেশি। তার মন ভাবলো, একই কথা যদি নীলাকে বলা হতো, সে হয়তো নির্বাক থেকে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করে নিতো। কিংবা ম্লান হাসির চাদরে ঢেকে দিতো অনীকের আফসোসকে। শিউলি আর নীলা- দু’জনকে তুলনা করতে গিয়ে অনীক যেন স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে, ‘নীলার বহিরঙ্গ কালো, তবে অন্তর ধবধবে সাদা। আর শিউলি ঠিক এর উল্টো। চাঁদের মধ্যে অদৃশ্য কলঙ্ক যেমন।’

অনীকের বেশ ক’জন বন্ধু আছে, যারা জীবনকে রঙ্গিন করতে গিয়ে লালনীল পানিতে ডুব দেয়; পাহাড়-সমুদ্র-বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, ব্যাগভর্তি টাকা ঢেলে স্বাদ নেয় হরিণের কিংবা অন্য নরম মাংসের। বিচিত্রতায় জীবন সঁপেও, সখেদে বারবার বলে তারা, ‘শান্তি নেই, স্বস্তি নেই- জীবন বড় দুর্বিষহ; জীবন খুবই যন্ত্রণাময়।’ জীবনের দুঃখ দূর করার জন্য সিদ্ধার্থ ঘর ছেড়েছিলেন, রঙহীন জগতে দিনের পর দিন কাটিয়ে ফিরে এসেছিলেন বুদ্ধ হয়ে- রঙের ঢালা সঙ্গে নিয়ে। প্রশ্ন হল, তিনি কি জীবনের দুঃখ দূর করতে সক্ষম হয়েছিলেন? নাকি দুঃখ-এড়িয়ে থাকার উপায় জেনেছিলেন কেবল? বস্তুত বুদ্ধের কাক্সিক্ষত রং আর অনীকের প্রার্থিত রং- এ দুয়ের মধ্যে প্রকৃতিগত ফারাক বিস্তর। অনীক রংকে উপভোগ করতে চায়, আর বুদ্ধ তার রং দিয়ে জগৎ ও জীবনকে শান্তি ও কল্যাণের ছায়ায় ঢেকে দিতে চেয়েছিলেন। অনীক মানব মাত্র, আর বুদ্ধ- মহামানবের চেয়েও বেশিকিছু।

অনীক যতোই ভাবে, ‘না- জীবনের রং নিয়ে আর কোনো চিন্তা নয়’, ততোই যেন পরাণের প্রশ্নভরা হাসিমুখ তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে; পরাণ যেন বিদ্রুপ করে বলে যায়, ‘পারলে না, পারলে না তো উত্তর দিতে। এতো বিদ্যা-বুদ্ধি তোমার, তবু আমি যে প্রশ্নের উত্তর জানি, তুমি তা জান না। জানবে কেমন করে? পুস্তকি বিদ্যা আর জীবন থেকে অর্জিত বিদ্যা তো সমান ক্ষুরধার নয়। তুমি অধীত বিদ্যায় ধনী, কিন্তু সে বিদ্যায় অন্তর-আলোকিত হয় না। বড় বড় ডিগ্রিধারী লোকজন- যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে পণ্ডিত, দেহ ও বিশ্বরূপ সম্পর্কে তারা কতটুকুই বা জানেন?’ হ্যাঁ, অনীকের নিজেরও বিশ্বাস, পুস্তকি-বিদ্যার আলো বহির্জগতকে আলোকিত করে; আর আত্মায় উপলব্ধ বোধের আলো ভেতর-বাহির উভয়কেই দীপ্ত করে, পরিশুদ্ধ করে। লালন-দ্বিজ দাস-উকিল মুন্সী- তারা পাঠশালায় না গিয়েও এ-জগতের সেরা পণ্ডিত, সেরা শিক্ষক। তারা জীবনের পাওয়া-না পাওয়ার অঙ্কের সূত্র জানেন না, কিন্তু জীবনের আদি-অন্তের রহস্যগুলো অতি সহজে ভেদ করতে পারেন; বাউল পরাণও বোধহয় একটু একটু পারে, তা না হলে প্রাত্যহিক ঘাত-সংঘাতের মধ্যেও সে সুখী ও নির্বিকার জীবনযাপন করে কীভাবে?

৪.

পরাণের জীবনে কেউ নেই, কিছু নেই; সেখানে যোজনের উচ্ছ্বাস নেই, বিয়োজনের শোকও নেই। অথচ অনীকের জীবনে অনেক কিছু আছে- অর্থ আছে, যশ আছে, ক্ষমতা আছে, রূপবতী স্ত্রী আছে। এতো কিছু আছে বলেই ‘কী নেই’- এর বায়ুবেগ তাকে প্রভাবিত করে; পাওয়ার আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, না-পাওয়ার দুঃখ দীর্ঘস্থায়ী- তাই পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার হিসেবের প্রভাব ও ব্যাপ্তি বেশি। সূর্যের আলো- প্রতিদিনই পাই, তাই এ-আলো নিয়ে কাব্য রচিত হয় না। অথচ চন্দ্রকিরণ- যা সূর্যেরই কণামাত্র দান, বহুদিন অপেক্ষা করে পেতে হয় বলেই, এ-নিয়ে কত কী কাব্য, কত কী উচ্ছ্বাস। বস্তুত আমরা যা চাই, তা কি সত্যি-সত্যিই ভুল করে চাই? হয়তো বা, হয়তো না; শিউলি আর নীলা- দু’জনকে পাশাপাশি রাখলে, সবাই শিউলির পক্ষেই হাত উঠাবে। কিন্তু অনীক হালদার শিউলি অপেক্ষা নীলার প্রতি বেশি অনুরক্ত, কারণ শিউলিকে সে হাত বাড়ালেই পায়; নীলাকে-কাছে পাওয়ার সুযোগ নেই, সুযোগ যদি থাকেও, সমাজ বা ধর্ম কোনোটাই তা অনুমোদন করে না। অননুমোদিত বা নিষিদ্ধ ছিল বলেই ‘গন্ধম ফল’-এর প্রতি দুর্দমনীয় আগ্রহ ছিল ইভের, ওই নিষেধ না থাকলে ইভ-এ-ফল খেতো কি না সন্দেহ আছে ঢের।

আসলে মানুষের মন বড় বিচিত্র জিনিস, বন্ধনহীন রহস্যময় জিনিস; এ-কে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, বোঝাও যায় না; যেখানে নিজের মনই নিজের অধীন নয়, সেখানে অন্যের ‘মন’ পাওয়ার জন্য কেন এতো কসরৎ, এতো ব্যাকুলতা? ‘তব হৃদয়ং মম, মম হৃদয়ং তব’-যে মন্ত্র পড়ে ‘অভিন্ন’ হওয়ার শপথ নেয়া হয়, সে-মন্ত্রের শক্তি কতটুকু? দুটি আত্মা কখনও কি অভেদাত্মা হয়? দুটি মানুষ মতে অভিন্ন হতে পারে, মনে অভিন্ন হওয়া সম্ভব নয়। এই দেহ- যার প্রকৃতি ‘বিশ্বস্বরূপ’, এই মন- যা খ্যাত ‘অচিন পাখি’ হিসেবে, দুই দেহজাত দুই পৃথিবী আর দুই অচিন পাখি- এরা কখনও ‘এক’ হতে পারে? পানিতে লবণের অস্তিত্ব বিলীন হয় বটে, তবে পানির লবণাক্ততা- তা কি দূর হয়ে যায়?

৫.

এক বৃষ্টিভেজা রাতে, বাইরের জগতে মন-প্রাণ রঙ্গিন করে ঘরে ফিরল অনীক। ঘরজুড়ে অনিঃশেষ অন্ধকার। একটা আলোও জ্বালানো হয়নি। অনেক দিন পর, অনেক মাস পর অনীক অনুভব করল, শূন্য ঘরের স্তব্ধতা। কান পেতে, যেন শুনতে পেল- অন্ধকারের কান্না। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মধ্যে সবাই নিজের জায়গাতেই আছে, শুধু একজন- হয়তো রাগ করে বা অভিমান করে চলে গেছে অন্য-কোথাও, তাতেই এতো শূন্যতা, শ্মশানের স্তব্ধতা?

দীর্ঘ-বিরতির পর, যেন মনের অজান্তেই স্ত্রীর নাম ধরে ডাকল অনীক, ‘শিউলি, শিউলি।’ না, শিউলি নেই, নেই; টেবিলের ওপর পড়ে আছে ছোট্ট একটা কাগজ। তাতে লেখা, ‘জীবনের কোনো রঙ নেই; মনের রং-ই ব্যক্তির জীবনের রঙ।’ অন্য পৃষ্ঠায় আরও দুটো কথা, ‘জীবনের সঙ্গী হয়, হৃদয় বা আত্মার নয়।’ সাদা পাতার বুক জুড়ে কালো-কালিতে লেখা কয়েকটা মাত্র শব্দ; এ-কটা শব্দই কি এক খণ্ড জীবনদর্শন নয়? অনীকের হঠাৎ মনে হল, যাই- পরাণকে গিয়ে এই জীবনদর্শনের কথা বলে আসি।

ঘর থেকে বেড়িয়ে বিচঞ্চল অনীক জোরে, খুব জোরে হাঁটতে লাগল এবং ভুল করে হাজির হল ভুল ঠিকানায়। দরজায় কড়া নাড়িয়ে অসীম-বিস্ময়ে আন্দোলিত হল সে; তার মন-প্রাণ শত বর্ণে রঞ্জিত করে, যেন পাপড়ি মেলতে মেলতে শিউলি বলল, ‘জীবনের রঙ’ খোঁজ করতে এলে নাকি?’ হ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×