গল্প

বাংলাদেশ সুপার ডিলাক্স

  সাব্বির জাদিদ ২৪ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ সুপার ডিলাক্স

একটু থেমে ফের চলতে শুরু করে বাস। আবার একটু থামে। আবার চলে। খানাখন্দে ভরা ভয়ঙ্কর রাস্তা। যাত্রীভরা বাসটি ডানে-বাঁয়ে মোচড় দিয়ে চলছে আর হাঁফাচ্ছে।

পেছন থেকে দেখলে মনে হবে, যেন বিশাল দেহের একটি হাতি হেলেদুলে এগোচ্ছে। যাত্রীদের ভেতর গন্তব্যে পৌঁছনোর তাড়া। অথচ বাসের যে গতি, এরচেয়ে হেঁটে যাওয়াই ভালো। তারা বারবার হাতঘড়ি দেখে। বাসের চেয়ে সেকেন্ডের কাঁটার দৌড়ই যেন বেশি।

প্রথম সারির পাশাপাশি দুই সিটে বসে আছে এক দম্পতি। স্ত্রীটি অসুস্থ। প্রসব বেদনায় ছটফট করছে। ঘামে ভেজা মুখ। ফর্সা মুখে ভেসে উঠেছে সবুজ শিরা। স্বামী তার কাঁধ ধরে বসে আছে। সান্ত্বনা দিচ্ছে- এই তো এসে গেছি। একটু সহ্য করো ফারিয়া। হাসপাতাল নিকটেই। আরে ওই মামা, একটু জোরে চালান না! দেখছেন না অবস্থা!

অসুস্থ স্ত্রী খামচে ধরে আছে স্বামীর উরু। যন্ত্রণা যত বাড়ছে, আঙুলগুলো তত ক্ষিপ্রতায় বসে যাচ্ছে উরুর মাংসে। স্ত্রী কাতরাতে কাতরাতে বলে, বাস এই রাস্তায় কেন এল? এরচেয়ে ভালো রাস্তা কি ছিল না!

স্বামী বলে, এটাই শর্টকাট রাস্তা। তাই হয়তো। তুমি একটু ধৈর্য ধর।

দ্বিতীয় লাইনে বসে আছে এক তরুণ। চোখে সানগ্লাস। জেল দিয়ে ফোলানো চুল। মোচের সঙ্গে মিলিয়ে থুতনিতে এক গুচ্ছ দাড়ি। দীপ্ত চেহারা। তরুণের বুক পকেটে উঁক দিচ্ছে গোলাপের কুঁড়ি। সবার মতো সেও মহাবিরক্ত এই বাস এবং রাস্তার উপর। প্রচণ্ড ধুলো চারপাশে। বাসের ভাঙা জানালা দিয়ে ভুসভুস করে ঢুকে পড়ছে ধুলো।

তরুণের যত্নে পালিশ করা মুখে আস্তর পড়ছে ধুলোর। চুলের জেলের ভেতর আরামসে বাসা বাঁধছে কিচকিচে বালি। তরুণ একটু পরপর শিট বলছে আর সামনের সিটের পিঠে ঘুষি মারছে। এতসব যন্ত্রণার ভেতরেও যখন তার চোখ পড়ছে বুক পকেটের গোলাপ-কুঁড়ির দিকে, মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। কুঁড়িটি সে স্নিগ্ধার জন্য কিনেছে।

অনলাইনে ছয় মাসের প্রেম-চর্চা শেষে আজ দেখা হবে দু’জনের, স্বর্ণালী উদ্যানে। কিন্তু রাস্তার যে অবস্থা এবং বাসের যে গতি, তার পৌঁছানোর আগেই ধৈর্য হারিয়ে উদ্যান ছেড়ে চলে যেতে পারে স্নিগ্ধা। প্রথম সিটের লোকটার মতো সেও তাড়া লাগায়- মামা, একটু জোরে যান না!

মামা, অর্থাৎ ড্রাইভার এবার পেছন ফেরে- জোরে যে যাইতে কন, কেমনে যাব? রাস্তার অবস্থা দেহেন না!

এবার পেছন থেকে কেউ একজন বলে, আলালপুরের রাস্তা তো ভালো। সেই রাস্তা বাদ দিয়ে এই রাস্তায় আসলেন কেন?

জবাবে আজব কথা বলে ড্রাইভার- আলালপুরের রাস্তা ভালো, এইটা সক্কলে জানে। কিন্তু আপনে কি দুলালপুরের রাস্তার খবর জানেন? সেইটা এর থেকেও খারাপ। কিন্তু সেই রাস্তা দিয়েও বাস-টেরাক চলে। সেই তুলনায় আমরা তো বেটার আছি। আপনারা সবাই অধৈর্য। এত অধৈর্য হলে কেমনে হবে! ধৈর্য নিয়ে বসেন, সময় হলে ঠিকই জায়গা মতো পৌঁছায়ে দেব।

ধৈর্য কীভাবে থাকে! দেখছেন না গাড়িতে একজন অসুস্থ মহিলা রয়েছে! তাকে শিগগির হাসপাতালে নিতে হবে।

প্রথম সারির লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। তার স্ত্রীর সংকট নিয়ে চিন্তিত মানুষটাকে দেখতে ইচ্ছে করে। এই দুর্দিনেও তার বুকটা ভরে ওঠে। না, সে একা না; বিপদ- সাগর পাড়ি দেয়ার জন্য তার সঙ্গে আরও মানুষ আছে। চোখের কোণা মুছে সে যন্ত্রণাকাতর স্ত্রীর মাথাটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরে।

তৃতীয় সারিতে বসে আছে দুই স্কুলছাত্রী। দু’জনের উরুর উপর বিছানো হার্ডবোর্ড। তার উপর বই। তারা বইয়ে চোখ বুলাচ্ছে, ফাঁকে ফাঁকে ঘড়ি দেখছে আর একটু উঁচু হয়ে সামনের রাস্তা বোঝার চেষ্টা করছে। পরীক্ষার মাত্র আধাঘণ্টা বাকি। অথচ বাসের যে গতি, এইভাবে চলতে থাকলে তারা পরীক্ষার শুরুর সময়টা মিস করবে নির্ঘাত। টেনশনে মেয়েদুটো ঘামছে।

ঘামের ফোঁটা কেচো হয়ে নেমে যাচ্ছে ঘাড় থেকে বুকে, বুক থেকে পেটে। তাদের ঘর্মাক্ত মুখের উপর এঁটে যাচ্ছে ধুলো। অন্য সময় হলে চেহারার পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়ত দু’জন। ফেসিয়াল টিস্যু দিয়ে মুছত মুখ। ধুলোর উপর বিরক্ত হতো। কিন্তু এখন তাদের ভাবনায় কেবলই পরীক্ষা। তারা ধুলোর উপর নয়, বরং বিরক্ত হচ্ছে ড্রাইভারের উপর।

তার গাড়ি কি জোরে চলতে পারে না! দু’জনের অসহায় চারটে চোখ পলকহীন তাকিয়ে থাকে সামনে, এবড়োথেবড়ো রাস্তার দিকে। রাস্তাটাকে মনে হচ্ছে নজরুলের দুর্গম গিরি কান্তার মরু।

চতুর্থ সিটে বসে আছে এক যুবক। হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। খুব যত্নে উঁচু করে ধরে রেখেছে থাকে থাকে সাজানো খাবারের বাটিগুলো। ভাঙা রাস্তায় বাস দুলছে, সেই সঙ্গে দুলছে বাটির ভেতর কই মাছের ঝোল। যুবকের মা ভর্তি আছে হাসপাতালে। মেজর অপারেশন হয়েছে গেল সপ্তায়। ডাক্তার বলেছে কই মাছ, জিয়ল মাছ, কবুতরের বাচ্চার মাংস খাওয়াতে।

এগুলোর ভেতর মায়ের পছন্দ কই মাছের ঝোল। যুবকের স্ত্রী শাশুড়ির জন্য যত্ন করে রেঁধেছে কই মাছ। সকালে এই তারকারি দিয়ে ভাত খেয়ে মা ওষুধ খাবে। যুবক অস্থির চোখে মোবাইলে সময় দেখে। মায়ের ওষুধ খাওয়ার সময় চলে যাচ্ছে। বসা থেকে একটু উঁচু হয়ে সে ড্রাইভারকে অনুরোধ করে- একটু জোরে যাওয়া যায় না ভাই?

কিন্তু ড্রাইভারের কান পর্যন্ত তার কথা পৌঁছায় না। হতাশ হয়ে সে বসে পড়ে সিটে। আর তখন টিফিন বাটি কাত হয়ে খানিকটা ঝোল পড়ে যায় তার প্যান্টে। ঠিক সেই মুহূর্তে বউয়ের ফোন- মা ওষুধ খাইছে?

যুবক তার সব রাগ উগরে দেয় বউয়ের উপর-এ্যাই! তোমারে এত ঝোল দিতে কে কইছে?

ওপর প্রান্তে বউ অবাক হয়। কী হইছে তোমার? বেশি ঝোল দেখে মা কি রাগ করছে? ঝোল ছাড়া তো মা ভাত খাইতে পারে না, তাই একটু বেশি করে দিছি। কেন, কী হইছে?

তোমার মাথা হইছে! রাগে ফোন কেটে দেয় যুবক।

সামনের একটা স্টপেজে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বাস। এই বৃদ্ধ হাতির উদর পূর্ণ করতে প্রতিযোগিতায় নামে নতুন যাত্রীরা। যেন তারা মানুষ নয়, কলাগাছ। টিকিট কেটে, স্বেচ্ছায় বেছে নিচ্ছে ভক্ষিত জীবন। আগে থেকেই সিট বুক ছিল। নতুন যাত্রীরা বাঙ্কার ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের বোগল থেকে ঘামের দুর্ঘন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। ধুলো আর ঘামের গন্ধে বাসটা জাহান্নামের গর্তের মতো মনে হয়। কথাটা মনে মনে আওড়ায় দ্বিতীয় লাইনের তরুণ, যার বুক পকেটে চুপটি করে বসে আছে গোলাপ-কুঁড়ি, যে কুঁড়ির সৌরভ ঘামের দুর্গন্ধের কাছে হার মেনে যাচ্ছে। হঠাৎ তৃতীয় সারির স্কুলগামী মেয়েদুটো ফুঁপিয়ে ওঠে। কেউ একজন তাদের শরীরে হাত দিয়েছে। চতুর্থ সারির যুবক, যার প্যান্টে কই মাছের ঝোল লেগে গেছে, সে মুখ বাড়িয়ে বলে কী হইছে? কান্দো ক্যান? মেয়েদুটো আগের মতোই ফোঁপায়। কিন্তু ফোঁপানোর কারণ বলে না। দু’জনের চেহারায় আতঙ্ক।

ওরা বুকের সঙ্গে বই চেপে ধরে নিজের ভেতর সিটিয়ে থাকে। বৃদ্ধ অথবা রণক্লান্ত হাতির মতো হেলেদুলে বাস চলতে থাকে। একটু দূর যাওয়ার পর নতুন ওঠা যাত্রীরা অথবা কলাগাছেরা বুঝতে পারে, তারা ভুল বাসে উঠেছে। এই বাসে গন্তব্যে পৌঁছা পুলসিরাত পাড়ি দেয়ার মতো কঠিন এবং দুঃসাধ্য। তারা সিটে বসা পুরনো যাত্রীদের বলে, এই বাস কি এমনই? আগে থেকেই কি এইভাবে চলছে?

প্রথম লাইনের লোকটা, যার স্ত্রী প্রসব বেদনায় ছটফট করছে, সে বলে, বাসের কী দোষ! রাস্তাই তো খারাপ। এই রাস্তায় আর কতইবা জোরে যাওয়া যায়!

তখন পেছন থেকে কেউ একজন চিল্লায়- রাস্তা খারাপ তাই কি! ড্রাইভার তো ইচ্ছা করেই খানাখন্দের ভেতর দিয়ে চালাচ্ছে। দুনিয়ায় কি আর ড্রাইভার নাই! তাদের ড্রাইভিং কি আমরা দেখি নাই! ভাঙা রাস্তার ফাঁকফোকর দিয়ে কত নিপুণভাবে তারা গাড়ি বের করে নিয়ে যায়! আর এই শালা... বলতে না বলতে একটা গর্তের মধ্যে পেছন চাকা আটকে গিয়ে দম ফুরিয়ে যায় বাসের।

কয়েক বার চাবি ঘুরিয়েও আর স্টার্ট নেয় না বুড়ো হাতিটা। ড্রাইভার অনুরোধ করে- ভাইয়েরা, একটু ঠেলতে হইবে।

কয়েকজন একসঙ্গে গর্জে ওঠে- ওই মিয়া, গাড়ি চালাতে পারো! ডানে তো বেশ খানিকটা ভালো ছিল। ওইটা বাদ দিয়ে গর্তের মধ্যে চালাইলে ক্যান! এবার তোমার গাড়ি তুমিই ঠ্যালো। আমরা নামব না।

রাগের মাথায় তারা ‘তোমার গাড়ি তুমিই ঠ্যালো’ বলে বটে, কিন্তু তারা জানে, গন্তব্যে পৌঁছতে হলে তাদেরই ঠেলতে হবে। প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা নেমে পড়ে বাস ঠেলতে। প্রথম লাইনের লোকটা নামতে গেলে কয়েকজন নিষেধ করে- আপনি নামবেন না ভাই। আপনার স্ত্রী অসুস্থ। আমরা আছি তো।

বাস ঠেলতে গিয়ে প্রেমিক তরুণের বুকপকেট থেকে গোলাপের কুঁড়ি পড়ে যায় মাটিতে। পড়তে না পড়তে পার্শ্ববর্তীর স্যান্ডেলের নিচে চলে যায় কুঁড়িটা। তরুণ চিৎকার করে ওঠে- পা উঠান পা উঠান! আপনি আমার কলিজার উপর পাড়া দিছেন।

ভয়ে, আতঙ্কে লাফিয়ে ওঠে পার্শ্ববর্তী যাত্রীটা, যে কিনা গভীর নিষ্ঠায় বাস ঠেলে যাচ্ছিল। পা উঠিয়ে দেখে, তরুণ যাকে কলিজা বলছিল, তা এক গোলাপ ফুল। এখনও পূর্ণভাবে ফোটেনি। তবে রংটা কলিজার মতোই। তরুণ দ্রুত তার কলিজা অথবা কুঁড়িটা তুলে নেয় হাতে। ফুঁ এবং টোকার সাহায্যে কুঁড়ির গা থেকে ধুলো ঝাড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু টোকার আঘাতে দুটো পাপড়ি খসে গেলেও ধুলো খসে না। বিরক্ত তরুণ ধুলো-সমেত কুঁড়িটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখে।

আবার চলতে থাকে বাস। প্রথম সারির মা হতে চলা স্ত্রীটি প্রসব বেদনায় কাতরায়। দ্বিতীয় সারির তরুণ থেঁতলে যাওয়া গোলাপের দিকে গভীর মায়া নিয়ে তাকিয়ে থাকে।

তৃতীয় সারির মেয়েদুটো যান্তব হাত এবং পরীক্ষা মিস হওয়ার ভয়ে সিটিয়ে থাকে নিজেদের মধ্যে। চতুর্থ সারির যুবক মায়ের কথা ভাবে। মায়ের ওষুধ খাওয়ার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। অথচ ভাত এবং কই মাছের ঝোল নিয়ে সে এখনও মাঝ দরিয়ায় খাবি খাচ্ছে।

শান্তভাবে চলতে থাকা বাস হঠাৎ রাস্তা ছেড়ে বেশ খানিকটা নিচে নেমে যায়। রাস্তার পাশেই এক বাঁশঝাড়। রুকুর ভঙ্গিতে বাঁশের আগা নুয়ে পড়েছে রাস্তার দিকে। আর বাসটাও এগিয়ে যায় নুয়ে পড়া বাঁশের দিকে।

ফলে বাঁশের আগার ঘর্ষণে জানলার একটা কাচ সোনার মোহরের মতো ঝনঝন করে ভেঙে পড়ে। জানালার পাশের যাত্রীর হাত রক্তাক্ত হয়। যাত্রীরা প্রথমে ভয় পেয়ে যায়। একটুক্ষণ পর যখন দেখে বিপদ গুরুতর নয়, তারা হইহই করে ওঠে ড্রাইভারের উপর। দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন যুবক বলে, ওই মামা, তোমার লাইসেন্স আছে? লাইসেন্স দেখাও।

লাইসেন্সধারী কোনো ড্রাইভার এরকম ফাউল ড্রাইভ করতে পারে না। যুবক দুটোর সুর ধরে অন্যরাও লাইসেন্স দেখাতে বলে। নয়তো পুলিশে ধরিয়ে দেবে হুমকি দেয়। কেউ কেউ মারমুখী হয়ে ওঠে। ড্রাইভার ভয় পেয়ে যায়। লাইসেন্স না থাকার ব্যাপারটা স্বীকার করে নিয়ে বলে, সামনের স্টপেজে তাদের কোম্পানির একজন ড্রাইভার আছে।

ওই ড্রাইভারের কাছে সে গাড়িটা হস্তান্তর করে দেবে। তারা যেন তাকে না মারে এবং পুলিশে না দেয়। যাত্রীরা শান্ত হয় এবং নতুন ড্রাইভারের অপেক্ষায় থাকে। সত্যি সত্যি পরের স্টপেজে এ-বাসের ভার গ্রহণ করে নতুন চালক।

যাত্রীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এইবার বুঝি তারা দ্রুত এবং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। প্রথম লাইনের স্বামী সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে স্ত্রীকে বলে, আর একটু সহ্য করো ফারিয়া, নতুন ড্রাইভার এসেছে। এবার আমরা শিগগিরই ক্লিনিকে পৌঁছে যাব।

কিন্তু অসুস্থ দম্পতির এবং অন্যদের স্বস্তির গুড়ে বালি ফেলে নতুন ড্রাইভার আগের ড্রাইভারের আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। যাত্রীদের খুশি করতে সে ভাঙা রাস্তায় এমন জোরে গাড়ি ছোটায়, বসে থাকা যাত্রীদের বসে থাকা এবং দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকা দায় হয়ে পড়ে। তাদের তখন পুরনো ড্রাইভারের কথা মনে পড়ে। আগেরজনই বোধহয় ভালো ছিল।

এই সব ভাবতে ভাবতে তাদের বাস একটা কুকুরকে চাপা দিয়ে চলে যায়। কয়েকজন জানালায় মুখ বের করে দেখে, থেঁতলানো কুকুরের গা ভেসে যাচ্ছে রক্তে। ওই দৃশ্য দেখে তাদের পেট গুলিয়ে ওঠে। বুক ঠেলে বমি উঠে আসতে চায়। তখন কেউ কেউ আগের মতো এই ড্রাইভারকে লাইসেন্স দেখাতে বলে। ড্রাইভার প্রথমে তোয়াক্কা করে না।

ঝাড়ি দিয়ে বলে, লাইসেন্স দিয়ে কী করবেন? আপনারা কী আইনের লোক যে লাইসেন্স দেখাব। চুপচাপ বসে থাকেন। রাস্তায় চলতে গেলে দু-একটা কুকুর মরবেই। কুকুর ক্যান, এইভাবে মানুষও মারা পড়তে পারে। রাস্তায় সবই হয়।

তখন এক তরুণ সামনের দিকে এগিয়ে আসে। বলে, আপনি যে কথাগুলো বলেছেন, আমি ভিডিও করে রেখেছি। লাইসেন্স যদি না দেখান, আপনার এই ভিডিও আমি ভাইরাল করে দেব। লোকে আপনার মুখে থুতু দেবে। আপনার গাড়ি সবাই বর্জন করবে। এমনকি পুলিশ আপনাকে এরেস্ট করতে পারে।

ড্রাইভার এবার নরম হয়। ফণা নামায়। সে স্বীকার করে, তার লাইসেন্স নেই।

তরুণ বলে, তবে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাচ্ছেন কেন? আপনি নিজেও মরতে চান আমাদেরও মারতে চান? আপনাকে আমরা পুলিশে দেব। আমরা কোনো অবৈধ ড্রাইভার রাস্তায় দেখতে চাই না।

ড্রাইভার নরম সুরে বলে, সামনের স্টপেজে আমাদের কোম্পানির নতুন ড্রাইভারের কাছে গাড়ি ছেড়ে দেব। আপনারা আমাকে মারবেন না দয়া করে। পুলিশেও দেবেন না।

ড্রাইভারের এই কাকুতি-মিনতিতে মন নরম হয় যাত্রীদের। তারা নতুন ড্রাইভারের জন্য অপেক্ষা করে। যাত্রীদের দুর্ভাগ্য, দক্ষতার প্রশ্নে নতুন ড্রাইভার আগের দু’জনকে হার মানায়। গাড়িটা সে এমনভাবে স্টার্ট করে, যেন এক বদমেজাজি আরবি ঘোড়া হঠাৎ লাফ দিয়েছে। দাঁড়ানো যাত্রীরা ঝড়-কবলিত কলাগাছের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে।

টলকে ওঠা যুবকের কই মাছের ঝোল ছিটিয়ে পড়ে পাটাতনে। গর্ভধারিণী স্ত্রীর অনাগত সন্তান ভয়ে কেঁদে ওঠে পেটের মধ্যে। তখন কয়েকজন যাত্রী, যাদেরকে দেখতে অভিজাত মনে হয়, তারা নেমে যায় বাস থেকে। নামার আগে বলে যায়, ভাড়া একটু বেশি লাগলেও তারা আলালপুরের লাইনের বাসে চড়বে। সেখানকার রাস্ত এবং বাস দুটোই ভালো।

অবশিষ্ট যাত্রীরা ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে থাকে অভিজাত মানুষগুলোর দিকে। তাদের দৃঢ় চোয়াল প্রতিজ্ঞা করে- কোনোদিন টাকা হলে তারাও এই বাস ত্যাগ করে নিয়মিত আলালপুরের বাসে যাতায়াত করবে। তখন তাদের আর কোনো ভোগান্তি থাকবে না।

দরিদ্র যাত্রীদের নিয়ে বাস চলতে থাকে আগের মতো। বেপরোয়া ড্রাইভিং করায় প্রতিবাদী যাত্রীরা বারবার চালক বদল করে। কিন্তু নতুন যে আসে, সে আগেরজনের চেয়েও ভয়ঙ্গকর। যাত্রীরা চরম এক বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়। তাদের এই বাসজার্নি অনন্তকালের একটা বৃত্তের মধ্যে ঘুরতে থাকে যেনবা। তাদের বাস বারবার গর্তের মধ্যে আটকা পড়ে।

বাঁশের ঝাড়ের সঙ্গে টক্কর খায়। কুকুরকে পিষ্ট করে। বদমেজাজি আরবি ঘোড়ার মতো হঠাৎ হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে। কাছে আসার বদলে, সময়ের সঙ্গে তাদের গন্তব্য দূরে বহুদূরে সরে যায়। যাত্রার এই গোলকধাঁধা থেকে বেরোনোর জন্য গন্তব্যহীন বাসের যাত্রীরা ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে থাকে সামনের দিকে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×