আল মাহমুদের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

যদি কবিতা না লিখতাম তাহলে মিউজিশিয়ান হতাম

  আবিদ আজম ৩১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল মাহমুদের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার
প্রয়াত কবি আল মাহমুদ

আল মাহমুদের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। লোকান্তরিত হন ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে। আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। সাহিত্যের সব শাখায়ই তিনি উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেলেও কবি হিসেবেই পাঠক মহলে বেশি পরিচিত। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে।

পরে প্রকাশ পায় ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালী কাবিন’। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ- মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, দোয়েল ও দয়িতা, দ্বিতীয় ভাঙন, বখতিয়ারের ঘোড়া ও তোমার রক্তে তোমার গন্ধেসহ আরও অনেক। তার প্রবন্ধে রয়েছে নতুন এক গদ্যশৈলী। লিখেছেন ‘পানকৌড়ির রক্ত’র মতো গল্পগ্রন্থ। সেই অমর হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে ‘উপমহাদেশ’ ও ‘কাবিলের বোন’-এর মতো উপন্যাস।

‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ ঘরানার ক্লাসিক জীবনীগ্রন্থ বিশ্বসাহিত্যেও বিরল। এ যাবৎ প্রকাশিত শতাধিক গ্রন্থ নিয়ে খ্যাতনামা প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত হয়েছে আল মাহমুদের ১৩ খণ্ডের রচনাবলি। সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন নব্বইয়ের দশকে। সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় এবং তার ব্যক্তিগত অনেক কথা উঠে আসে এই সাক্ষাৎকারে।

যুগান্তর: আপনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন কবি না হলে আপনি সঙ্গীতজ্ঞ হতেন, প্রত্নতাত্ত্বিক হতেন

আল মাহমুদ : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সঙ্গীতের শহরে আমার জন্ম। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পরিবারের সঙ্গে আমাদের জানাশোনা ছিল খুব। আত্মীয়তা ছিল। এসব নিয়ে আমি প্রচুর লিখেছি অবশ্য। বহু বড় বড় ওস্তাদের জন্ম হয়েছে সেখানে। আমার সমসাময়িক একজন বড় সঙ্গীতজ্ঞ নাম বাহাদুর হোসেন খাঁ। তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। কথাও হয়েছে।

বেশি দিন আমরা একসঙ্গে থাকতে পারিনি। কারণ পরে তিনি চলে গেলেন কুমিল্লায়। বাহাদুর হোসেন খাঁ, তার পরিবারের লোকজন আমার ক্লাসমেট ছিল। যেমন রাজা হোসেন খাঁ। এরা হল সঙ্গীতের পরিবার। এদের ছেলেমেয়েরা আবার অন্যরকম। ঠিক আমাদের মতো না। তারা যন্ত্রে পারদর্শী। যদি আমি কবিতা না লিখতাম, তাহলে আমি মিউজিশিয়ান হতাম। গানের লোক হতাম। শিল্পী হতাম কি না জানি না।

কিন্তু গান আমার বিষয় হতো। ছোটবেলায় তাদের দেখে সুর-সঙ্গীত নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছা জেগেছিল। পরে ভাগ্য আমাকে কবিতার দিকে নিয়ে এসেছে। আমি গান লিখিনি সত্যি। তবে আধুনিক কবিদের মতো আমিও একজন লিরিক্যাল পয়েট, গীতপ্রবণ কবি। আমার কবিতায় তুমি সাঙ্গীতিক ভাব খুঁজে পাবা। কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত প্রায় সব কবিই গান লিখেছেন এবং তাদের একটা গীতসম্ভার আছে।

কিন্তু ত্রিশের কবিরা এসে গানের সঙ্গে কবিতার একটা বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিলেন। তারা গান আর রাখলেন না। বললেন, আমার কবিতাতেই গান আছে, মিউজিক আছে। আমি সে মিউজিক সৃষ্টি করি ছন্দে। এটি গাইতে হবে কেন? গাইতে হলে তবলা, হারমোনিয়াম দরকার। একটা যন্ত্র দরকার। সঙ্গীত সৃষ্টি করতে হলে নানা রকম অনুষঙ্গ দরকার।

কিন্তু আধুনিক কবিরা বললেন, ত্রিশের কবিরা বললেন, না আমি কারও ওপর নির্ভরশীল হব না। শুরু হল অন্যরকম খেলা। এটাই ত্রিশের অবদান। জীবনানন্দ দাশ এলেন। এতে আধুনিকতার একটা প্রকারভেদ ঘটল। যেটা পৃথিবীতে সর্বত্রই একটা সময় ঘটেছিল। আগে তো গানই সবকিছু ছিল। কিন্তু গানের জন্য যন্ত্র দরকার, গলা দরকার, গায়িকা দরকার। আধুনিক কবি সব করতে যাবেন কেন?

যুগান্তর: কৈশোরে জীবনানন্দ দাশের ধূসর পাণ্ডুলিপি পড়ে প্রথম কবিতা লেখার কথা মনে হয়েছিল আপনার। প্রথম জীবনের সেই স্মৃতি কি মনে করতে পারেন?

আল মাহমুদ : হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ। জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ে প্রথম আমার মনে হল, আরে! আমিও তো কবিতা লিখত পারি। জীবনানন্দের কবিতাই প্রথম আমাকে আপ্লুত করেছে, মোহিত করেছে। যখন কেউ প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করে, তখন গোড়াতেই আকাশ থেকে তার কাছে কবিতা নাজিল হয় না। অনেক কবির কবিতা তাকে প্রভাবিত করে। শুরুর দিকে আমাকেও অনেকে প্রভাবিত করেছেন। তখন আরেকজন কবি ছিলেন সমর সেন, গদ্য কবিতা লিখতেন।

তার কবিতাও আমাকে ভারি টানত। আগে এই কথাটা বলিনি কখনও, আজই প্রথম বললাম। শামসুর রাহমানও শুরুর পর্যায়ে ছিলেন জীবনানন্দীয় ঘরানার কবি। জীবনানন্দের কবিতা দিয়ে একসময় আমি প্রভাবিত হয়েছিলাম সত্যি; কিন্তু আমার কবিতাকে তো সবাই ‘আল মাহমুদের কবিতাই’ বলে। এটা আমি হয়তো পেরেছি। জীবনানন্দের কাছে শুধু আমি নই, সব বাংলাভাষীই কৃতজ্ঞ। কারণ শুধু ‘বনলতা সেনই’ নয়, তার সব কবিতা।

তার কবিতা আবৃত্তি করতে ভালো লাগে এখনও ‘লাশকাটা ঘরে/চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ‘পরে।’ কিংবা ‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়- আরও এক বিপন্ন বিস্ময়...’। তিনি যে উপমা দিতেন, তা সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনের মধ্যে ধারণক্ষমতায় এসে যেত, কবি হিসেবে তিনি আমার বিশ্বাস খুব বেশি ইংরেজি সাহিত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।

যুগান্তর: আপনাদের পূর্ববতী ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে বাংলা ভাষায় আধিপত্য বিস্তার করেছেন এমন অনেকেই ছিলেন। কবি হিসেবে আপনার সঙ্গে তাদের সামাঞ্জস্যতা কেমন?

আল মাহমুদ : অগ্রজ-অনুজ কবিদের ভেতর কবিতাই একমাত্র সম্পর্কের বিষয়। আর আমি তো সবাইকে ভেঙে-ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছি নিজস্ব কাব্য উঠোনে। অন্যের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে আমার তেমন সময় লাগেনি। আমার মনে হয়, নিজের লেখাকে আমি ‘আল মাহমুদের কবিতা’ করতে পেরেছি। মৌলিকতা এখানেই। এখানে ত্রিশের দশকের কথা আসছে, জীবনানন্দ ছাড়া একজন কবির নাম বলো তো? তুমি বলবে জসীমউদ্দীনের নাম।

নকশিকাঁথার মাঠ কিংবা সোজন বাদিয়ার ঘাটের নাম আমিও বলতে চাই। আর আমার ধারণা হল, জসীমউদ্্দীন একটা ভিন্ন ব্যাপার। তার একটা কবিতা আছে না- ‘কাল সে আসিবে মুখখানি তার নতুন চরের মতো’। এই যে উপমায় প্রয়োগ, এটা একটা বিষয়। আর চল্লিশের কবি তো ফররুখ আহমদ। মৌলিক ও স্বতন্ত্র ঘরানার কবি। তার হাতেমতায়ীর কথা আমি বলতে চাই। ‘রাত পোহাবার কতো দেরি পাঞ্জেরী?’ কী আশ্চর্য লাইন! কবিদের ভেতর ফররুখ আহমদ ছিলেন আলিফের মতো সোজা একজন মানুষ। অন্যরা নানা ছলছাতুরী কিংবা আপস করে টিকে ছিলেন। এত শক্তিমত্তার পরও ফররুখের ওপর খুব একটা সুবিচার করা হয়নি। তিনি আমাদের এখনকার অপরাজনীতির শিকার কি না কে জানে?

যুগান্তর: কেউ কেউ বলেন, ফরুরুখ বাংলাদেশকে স্বীকার করেননি, পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। অপরদিকে পাকিস্তানের শাসকদের দেয়া পদক ফররুখ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আহমদ ছফা একটি গদ্য লিখেছেন, কবি ফররুখ আহমদের কী অপরাধ? পড়েছেন?

আল মাহমুদ : আমরা অনুজ কবিরা ফররুখ ভাইকে খুব মান্য করতাম, ভয়ও পেতাম। শামসুর রাহমান ও আমি বেশ কয়েকবার রেডিওতে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। যারা ফররুখের দিকে আঙুল তুলতে চায়, তাদের সেই অভিযোগের আঙুল নিজেদের দিকে ফিরিয়ে দেখুক না! একটি কথা আমি আগেও বলেছি। আমরা ছিলাম বাংলা ভাষার প্রথম বাঙালি লেখক।

তিরিশ-উত্তর বাংলা কবিতায় রূপ, দেশ ভাগ, মানুষ চলে যাচ্ছে, দাঙ্গা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া- এ রকম একটা সময় আমাদের বুকের ওপর দিয়ে গেছে। ভ্রাতৃহত্যা, দুর্ভিক্ষ, মানুষ মরে পড়ে আছে রাস্তায়, জয়নুল আবেদিনের ছবি, কাক মানুষকে ঠোকরাচ্ছে- এ দৃশ্যগুলো আমি নিজের চোখে দেখেছি। এজন্য পঞ্চাশের লেখকরা যারা ষাট দশকে লিখেছেন, তাদের ভেতর স্বপ্ন নেই, ড্রিমটা কম। তারপর এই অপূর্ণতা পূরণ করার চেষ্টা করা হলেও আমরা বাস্তবের সংঘাতে বড় হয়েছি।

যুগান্তর: আপনি বলেন আপনার প্রিয় লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করেন মাঝেমধ্যে। রবীন্দ্রসাহিত্যের কোন বিষয়গুলো আপনাকে বেশি প্রাণিত করে?

আল মাহমুদ : আমি রবীন্দ্রনাথ খুব উত্তমরূপে পড়েছি। ভাসা ভাসা না। থ্রোলি পাঠ করেছি। রবীন্দ্রনাথের সব ঠিক আছে, সব অসাধারণ। কিন্তু শেষ বয়সে এসে তিনি জবাব খুঁজতে গিয়ে বলেছেন, প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল, কে তুমি? তারপর শেষদিনের অস্তাচলগামী সূর্য প্রশ্ন করেছে, কে তুমি?

কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। রবীন্দ্রনাথ এ বেদনাটা উপলব্ধি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার কয়েকটি লেখা আছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের স্রষ্টা যদি রবীন্দ্রনাথকে বলা হয়, তাহলে হয়তো বাড়িয়ে বলা হবে না। আমি তাকে অনেক বড় কবি মনে করি। ছন্দ, মিল, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা তার কবিতায় যেমন আছে, অন্য আর কোনো কবির কবিতায় তেমনটি নেই।

ইংরেজি ভাষায় আমরা যা পাই, একাই বাংলা ভাষায় তা করে গেছেন। বাংলা ও বাঙালিদের জন্য রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য। রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম, আমি মুসলমান- এতে রবীন্দ্রনাথ পড়তে এবং তাকে ভালোবাসতে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। রবীন্দ্রসাহিত্যে একাত্মবাদের অস্তিত্ব রয়েছে বিশাল অংশজুড়ে, এটা আমার কাছে বিরাট ব্যাপার মনে হয়।

রবীন্দ্ররচনার ব্যক্তি এবং সৌন্দর্যবোধ আমাকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করে। কেউ প্রশ্ন তোলেন রবীন্দ্রসাহিত্যে মুসলিম চরিত্র নেই কেন? এটা তিনি স্বীকার করেছেন যে, মুসলমানদের সম্পর্কে তিনি জানতেন না। বলেছেন, ‘মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে,/ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।’ এই দুর্বলতা কবি নিজে স্বীকার করে গেছেন। আর সাহিত্য তো ধর্ম-গোত্রের ধার ধারে না। রবীন্দ্রনাথ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের গানও আমার খুবই প্রিয়।

যামিনী না যেতে জাগালে না কেন,

বেলা হলো মরি লাজে...

(নিজের কণ্ঠে গেয়ে শোনালেন)।

আমরা রবীন্দ্রনাথ পড়ব এবং প্রয়োজনে তার সমালোচনা করারও স্বাধীনতা আমাদের রয়েছে, আমরা তা করতেই পারি। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি নজরুলের কথাও বলতে হয়। রবীন্দ্র-যুগে নজরুলের আগমন আমাদের সাহিত্যের জন্য বিরাট ব্যাপার। নজরুল কোনো সাধারণ কবি নন, অসাধারণ কবি। তার গানের জগৎ বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। চার হাজার গান নিজে লিখে সুর করে গেছেন, এটা তো একটা ঐশ্বরিক ব্যাপার।

যুগান্তর: পঞ্চাশের দশকে আপনি কবি হওয়ার জন্যই ঢাকা শহরে এসেছিলেন এবং অনেক পরে বলেছেন, আমি গ্রামকে শহরে এনেছি। ঘটনাটা কী?

আল মাহমুদ : হ্যাঁ, আমি কবি হওয়ার জন্যই শহরে এসেছিলাম। তার মানে এই নয়, একজন কবি শহরে আসার সঙ্গে সঙ্গে পকেটে করে গ্রামকে শহরে নিয়ে আসতে পারেন। লেখায়, কবিতায় গ্রামের বিষয়-আশয় ছিল, তাছাড়া আবহমান বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্যের রূপদান করার চেষ্টা করেছি। আর বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সময় কৈশোরে যে ঘর ছেড়েছি, সেই যে পলায়ন আর ঘরে ফেরা হয়নি।

ফলে কবি না হয়ে আমার উপায় ছিল না। একসময় চলে এলাম ঢাকায়। একটা টিনের সুটকেসভর্তি বই নিয়ে ঢাকার স্টেশনে এসে নেমেছি। আমার ‘বদমাশ’ বন্ধুরা বলে ভাঙা সুটকেস (হা... হা... হা) সেই সুটকেসের ভেতর তো বাংলাদেশ ছিল। ঢাকা এসে ভালোই হল, অনেককেই পেয়ে গেলাম। যাতায়াত শুরু করলাম সওগাত, বেগমসহ অনেক পত্রিকা অফিসে। এখানেই সম্ভবত প্রথম পেয়েছিলাম কবি শামসুর রাহমানকে। শহীদ কাদরী, ফযল শাহাবুদ্দীন কিংবা ওমর আলীও সেখানে ছিল।

শুরুতে তারা আমাকে পাত্তা দেয়নি। পরে কবিতা শুনে বলল, ভাই তুমি বসো। আর তার পরের ঘটনা তো সবার জানা। আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করেছি কবিতার জন্য। আর প্রকৃত বন্ধু ছিল শহীদ-ই, এখন বিদেশে স্বেচ্ছা নির্বাসনে, শামসুর রাহমান প্রয়াত। আর ফযলার সঙ্গে তেমন দেখা হয় না। সবাইকে খুব মনে পড়ে। আমি বৃদ্ধ মানুষ, কী আর করার! নিজের অক্ষমতা আমি মেনে নিয়েছি।

যুগান্তর: ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ থেকে শুরু হয়ে এখন পর্যন্ত এই যে দীর্ঘ কাব্য পরিভ্রমণ, কবিতা সম্পর্কে নতুন করে কী ভাবছেন এখন?

আল মাহমুদ : অনেক তো কাজ করলাম, এখন একটু বিশ্রাম নিলে হয় না! মানুষ হিসেবে আমারও সীমাবদ্ধতা আছে। সত্যি বলি ভাই, শুরু থেকে আমি নিমগ্ন কবিতাতেই, এই বয়সেও আমি লিখে চলেছি। তোমাদের কাছে এটা অবাক লাগে না? আর কবিতার জন্য আমি কী না করেছি! কবিতা নিয়ে তর্ক করেছি, কেটে পুনরায় লিখেছি, দু-একটা কবিতা খারিজ করে দিয়েছি।

আমার একটা কবিতা নিয়ে তো রীতিমতো কতকিছু হয়ে গেল। পরে আমি বললাম কবিতাটা বাদ। আমি হয়তো ভুল কিছু লিখিনি। সমকালীন বাংলা কবিতা গীতপ্রবণ, আমিও ‘লিরিক্যাল পয়েটস’। ছন্দের কবিতা লিখছি। একটা কথা, আধুনিক বাংলা সাহিত্য আর কতদিন ‘আধুনিক’ থাকবে? একশ’-দুইশ’ বছর? এর একটা আলাদা নাম হওয়া দরকার। নতুন আঙ্গিকে কবিতা লেখার কাজটা হয়তো নতুনরা করছে।

আর আমাদের এখানে মহাকাব্যের যে সম্ভাবনা ছিল, রবীন্দ্রনাথ তা শেষ করে দিলেন। বললেন, ‘আমি নাবব মহাকাব্য-/সংরচনে/ছিল মনে-/ঠেকল যখন তোমার কাঁকন-/ কিংকিণীতে,/কল্পনাটি গেল ফাটি/হাজার গীতে।’ রবীন্দ্রনাথ নিজে মহাকাব্য লিখতে পারেননি বলে আর কেউ পারবে না এমন নয়, রবীন্দ্রনাথের এটা একটা ফালতু অজুহাত। আধুনিক সময়ে মহাকাব্য হতে পারে। আমরা কি উপন্যাস পারি না? আমার একটা উপন্যাস আছে- ‘পোড়া মাটির জোড়া হাঁস’ পড়ে দেখো। কাব্যিক গদ্য কাকে বলে।

যুগান্তর: যেই হাত দিয়ে সোনালী কাবিন লিখেছেন, সেই হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে উপমহাদেশ, কাবিলের বোন কিংবা পোড়ামাটির জোড়া হাঁসের মতো গদ্য। একজন কবির পক্ষে এটা কীভাবে সম্ভব হল?

আল মাহমুদ : আমার বন্ধু শহীদ কাদরী গদ্যকার আল মাহমুদকে নিয়ে খুব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন। আমি কিছুটা কাজ করে দেখিয়েছি, কবিরাও ভালো গদ্য লিখতে জানে। হুমায়ুন আজাদ একদিন আমাকে ডেকে বললেন, মাহমুদ ভাই আসেন আপনার সঙ্গে একটা সিগারেট খাই। আপনার গদ্য খুব ভালো- কথাটা আমি বললাম; কিন্তু লিখব না। বলেই হাসলেন।

সাহিত্যের যত বিষয়-আশয় আছে, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আমি কিছুটা কাজ করেছি। উপমহাদেশ উপন্যাসের কথা তুমি বললে এটা একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল। সত্য ঘটনা অবলম্বনে। উপমহাদেশ খুব হেলায়ফেলায় লিখেছিলাম। পরে এটার গুরুত্ব বুঝলাম। কাবিলের বোনও তাই। আমাকে নিয়ে নানা কথা বলা হয়। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ তো আমরা করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি। কে কাকে গুরুত্ব দেয় আজ? শেখ সাহেব ছিলেন অসাধারণ এক নেতা। তার ডাকে সবাই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। থাক, সাহিত্যের আলোচনার বাইরে না যাওয়াই ভালো। আমরা কবি মানুষ, মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে দু-একটি কথা বললাম।

ভালো গদ্য-পদ্য লিখতে পারলে আমি নিজে খুব তৃপ্তিবোধ করি। একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী লেখার ইচ্ছা আছে, কাব্যনাটকও লিখতে পারি। আমার পরিচিত একজন সৈয়দ শামসুল হক। (তখন হক ভাইও বেঁচে ছিলেন) একটু চতুর লোক। সাহিত্যে নানা কাজ করেছেন। গদ্যও আছে তার। হক কেমন আছে রে? আহ, কত লোকের সঙ্গেই না আমরা সম্পর্কিত ছিলাম, এখন কে কোথায় আছে!

যুগান্তর: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনি ‘কাবিলের বোন’ ও ‘উপমহাদেশ’ দুটি অনবদ্য উপন্যাস লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে আপনার নিজের অংশগ্রহণ অভিজ্ঞতার সাহিত্যিক নির্যাস মনে করতে পারি উপন্যাস দুটি?

আল মাহমুদ : শুধু মুক্তিযুদ্ধ কেন? বাংলা ভাষায় কয়টা উপন্যাস আছে। আঙুলে গোনো। খুব একটা বেশি তো নেই। তার মধ্যে কাবিলের বোন ও উপমহাদেশ একেবারে পরিপূর্ণ দুটি উপন্যাস। উপন্যাসের যে আঙ্গিক, রীতি, স্থাপত্যকৌশল- এসব পুরোপুরি মেনে কাবিলের বোন লিখেছি। এর প্রশংসাও আছে। সমালোচনাও আছে। সমালোচনা যে নেই তা না। কিন্তু আমি যে প্রশংসা পেয়েছি, তা অল্প বাঙালি লেখক পেয়েছেন। আমার লেখার জন্য জীবিতকালে আমি সম্মান কম তো পাইনি। আমার কোনো নালিশ নেই কারও বিরুদ্ধে।

যুগান্তর: চর্যাপদ থেকে শুরু করে আজকের সাহিত্য পর্যন্ত নারী প্রসঙ্গ এসেছে বরাবরই। নারীর প্রতি এটা কি একধরনের পক্ষপাত?

আল মাহমুদ : আমিও কিন্তু নারীকে ভালোবাসি, পছন্দ করি। (দীর্ঘ হাসি) একজনকে ভালোবাসতাম সৈয়দা নাদিরা মাহমুদ, প্রয়াত। প্রেম-ভালোবাসা তো আমাদের লেখালেখির প্রধানতম অনুষঙ্গ। আর কবিরা তো প্রেম ভাঙ্গিয়েই খান। এই যে তুমি বললে, বিশ্বসাহিত্যের বিরাট অংশজুড়ে নারীবন্দনা।

এটা আরোপিত নয়, অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে। নারী ছাড়া তো জগৎ শূন্য- জীবন অপরিপূর্ণ। আর আমি তো নারীর ভেতর দিয়ে প্রকৃতিকে দেখেছি এবং বর্ণনাও করেছি। আমি তো কবি মানুষ, পীর-দরবেশ না- নারীকে ভালোবেসেছি, ওটাকে বাড়াবাড়ি বলা যায়? আমার লেখা সর্বশেষ উপন্যাস পোড়ামাটির জোড়া হাঁস পড়ে দেখো, নারীকে শুধু প্রেমিকা হিসেবেই নয়, প্রেরণাদাত্রী হিসেবে খুঁজে পাবে। উপন্যাসের ওই ‘আনন্দ’ চরিত্রটি কে? ওটা আল মাহমুদ।

বাংলাদেশের নারীরা যারা সাহিত্য পড়ে, তারা জানে আল মাহমুদ কে। কবিরা কবিতায় নারীকে ভোলাতে চায় নানা ছলছুতোয়। ভালোবাসতে চায় বধূ, মাতা, কন্যা কিংবা প্রেমিকা হিসেবে। প্রকৃত প্রেম-ভালোবাসা সবসময়ই সুন্দর। আর আমার প্রেম-ভালোবাসা শুধু নর-নারীতেই থাকেনি বরং তা আরও ঊর্ধ্বে উঠে সৃষ্টি ও স্রষ্টায় স্থির হয়েছে। আমার রচনায় শুধু প্রেমই নয় বরং মানবিক ভালোবাসার বিজয় হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমার রচিত সাহিত্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পূর্ণ নির্যাস।

যুগান্তর: আপনার পোড় খাওয়া বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকায়। পত্রিকাটি সম্পাদনার কারণে আপনাকে বছরখানে জেল খাটতে হয়েছে। পরে আপনার কাব্যখ্যাতিতে মুগ্ধ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আপনাকে মুক্তি দিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি দেন। সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে?

আল মাহমুদ : মনে না পড়ার কোনো কারণ নেই। বিনা বিচারে আমাকে বছরখানেক জেল খাটতে হয়েছে। হ্যাঁ, ভীষণভাবে মনে পড়ে সে সময়টা। বঙ্গবন্ধু আমাকে একদিন লোক পাঠিয়ে ডেকে বলেছিলেন, ‘দেখ আমি ওই শিল্পকলা একাডেমি করেছি, তুই ওখানে জয়েন কর। আমি তোকে পৃষ্ঠপোষকতা দেব, তুই জয়েন কর।’

বলেই আমার সামনে তিনি নিজের টেলিফোনটা নিয়ে আমার বাসার ফোন নম্বর জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, তিনি টেলিফোন করলেন। এরপর ফোনে আমার স্ত্রীকে বললেন, ‘আমি ওকে শিল্পকলা একাডেমিতে জয়েন করতে বলেছি, তুমি তাকে রাজি করাবে।’ কথা বলা শেষ, ফোনটা রেখে দিলেন তিনি। বাসায় ফেরার পর স্ত্রী আমাকে খুব বোঝালেন।

বাস্তবতা বুঝিয়ে বললেন, শেখ সাহেব রাগী মানুষ। তোমাকে ভালবেসে-স্নেহ করে চাকরিটা দিতে চাচ্ছেন; না করবে কেন? সত্যি শুরুতে আমি কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলাম। আমার খুব উপকার হয়েছিল শিল্পকলায় জয়েন করে। শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আসলে একজীবনে কত যে ঘটনা! জীবন আমাকে অনেকদিকে নিয়ে গেছে।

যুগান্তর: নানা কিছুর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ একটা জীবন পাড়ি দিয়ে আপনি এখন ক্লান্তিলগ্নে। অভিজ্ঞতা কেমন?

আল মাহমুদ : তুমি যদি অভিজ্ঞতার কথাই বলো তাহলে তা মিশ্র অভিজ্ঞতা। সাহিত্য কখনও কাউকে খালি হাতে ফেরায় না। আমি হয়তো অনেক কিছু পেয়েছি, যা পাব ভাবিনি। পূর্ণতা না থাকলেও শূন্যতা নেই। অপ্রাপ্তিও হয়তো নেই। আমি মুগ্ধ, আনন্দিত। তবে আমি এখনও ভাবি জীবন নিয়ে, জগৎ নিয়ে। ভাবি, কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাব। আই উইস টু বি এ পয়েট। আই অ্যাম এ থিংকার- নট আদারস। আমি চিন্তা করি। চিন্তার ভেতর দিয়েই আমি আল মাহমুদ। লিখতে পেরেছি।

আরও অবশ্য লিখতে ইচ্ছে হয় অনেক-অনেক কিছু। কিন্তু এত শক্তি-সামর্থ্য কিংবা আয়ু কোথায় আমার? আল্লাহ চিন্তাশীলদের পছন্দ করেন, তাই চিন্তা করতে ভালো লাগে। আমার এই একাকী স্বেচ্ছা নির্বাসিত জীবনে শুয়ে-বসে, বিশ্রাম নিয়ে দিন কাটাচ্ছি বর্তমানে। ইচ্ছে হলে লিখি, না হয় অলসতা করি। পেছন অতীতের কথা চিন্তা করি।

অনেক মুখ মনে পড়ে। ফিরে যাই পেছনে। ভাবতে ভাবতে ফিরে যাই কৈশোরে। মায়ের আঁচল ধরে যেন অলক্ষ্যে বলে উঠি, বাড়ি যাব। মাঝে মাঝে ভাবি- আমার বাড়ি কই, আমার বাড়ি কি কখনও ছিল। জীবনে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, তা যেন ফুরোবার নয়। আমি কৃতজ্ঞ এই মা, মাটি আর মানুষের কাছে। আমি আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকি। আর এরই মধ্যে তোমরা একদিন শুনবে ‘আল মাহমুদ আর নেই’।

ঘটনাপ্রবাহ : ক‌বি আল মাহমু‌দ আর নেই

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×