নাটকে হাসি আর সঙ্গীতে প্রেম

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার ১৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাহিত্য হল সমাজের দর্পণ। আয়নায় যেমন মানুষের চেহারা দেখা যায়, কোনো দেশের সাহিত্যের উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে তেমনি সে দেশের নাগরিকদের মন-মানসিকতা ও সভ্যতা-ভব্যতা অনুধাবন করা যায়। স্বাধীন দেশের সাহিত্যের সঙ্গে যেমন ঔপনিবেশিক বা পরাধীন দেশের সাহিত্যের পার্থক্য রয়েছে; তেমনি একনায়কতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাহিত্যিকদের রচনার সঙ্গে গণতান্ত্রিক দেশের কবি-সাহিত্যিক, নাট্যকারদের রচনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যীয় দেশগুলোর নাটক, সিনেমা ও সঙ্গীতের সঙ্গে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নাটক, সিনেমা ও সঙ্গীতের ধারার সুস্পষ্ট পার্থক্য দৃশ্যমান। তবে এমন সাদামাটা বিশ্লেষণ অনেক ক্ষেত্রে সত্য প্রমাণিত নাও হতে পারে। কারণ, একটি দেশে রাজনীতি সুস্থ না থাকলে সে দেশে উপরিউক্ত বিশ্লেষণ অনেক সময় কাজ করে না। রাজনীতি অসুস্থ হলে কোনো কিছুই আর ঠিক থাকে না। সবকিছুতে তখন পচন ধরে। প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘটে মানের অবনমন। রাজনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশে আজ সব কিছুতে মানের অবনমন ঘটেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, নির্বাচন, খাদ্য, প্রেম, শেয়ারবাজার, ব্যাংক, ভোট, নির্বাচন, কোনো কিছুই আর ভালো নেই। আর এ পচনের প্রভাব পড়েছে সমাজ ও জীবনের অন্য সব এলাকায়ও। এমনকি সাহিত্য-সঙ্গীতেও পড়েছে এর নেতিবাচক প্রভাব। সাহিত্যের তো অনেক শাখা। এর সব শাখার ওপর উল্লেখিত প্রভাব সম্পর্কে ছোট এক প্রবন্ধে আলোচনার চেষ্টা করা সম্ভব নয়। কেবল নাটক আর সঙ্গীতের কথাই যদি ধরি তাহলে বলা যায়, সাহিত্যের এ দুই এলাকায় এ দেশে চলছে আজ চরম অসুস্থতা।

রাজধানী বাদ দিলে জেলা পর্যায়ে মঞ্চ নাটকের চর্চা কমে গেছে। উপজেলা পর্যায়ে এর চর্চা তেমন চোখে পড়ে না। এ মঞ্চ নাটকের ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে যে কিছু ভালো কাজ হচ্ছে না এমনটা বলা যায় না। তবে এখন ডিজিটাল যুগে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম জনপ্রিয়তা পাওয়ায় টিভি নাটকের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। পনেরো-বিশ বছর আগেও এ দেশে ভালো ভালো টিভি নাটক হতো। ‘এই সব দিন রাত্রি’ ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘বহুব্রীহি’, ‘আজ রবিবার’, ‘অয়োময়’ ইত্যাদি টিভি ধারাবাহিক নাটক এ দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এসব নাটক দেখার জন্য দর্শকশ্রোতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। নাটকের বিষয়বস্তু, গুণ-মান এবং পরিচালনা ও অভিনয় মিলে একেকটি নাটক দর্শকশ্রোতাদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করত। কিন্তু এখনও টিভি নাটক হচ্ছে। বরং আগের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালের নাটকগুলো তো দর্শকদের মন কাড়তে পারছে না। নাট্যকাররা বিষয়বস্তু নির্বাচনে কেবল কমেডিকে কেন বেছে নিচ্ছেন তা ভেবে দেখার বিষয়। বর্তমান টিভি নাটকের দুটি বিষয় এর মান সৃষ্টিতে ব্যত্যয় সৃষ্টি করছে বলে মনে হচ্ছে। এর একটি হল হাস্যরস সৃষ্টির নামে ভাঁড়ামিযুক্ত বিষয়বস্তু এবং দ্বিতীয়টি হল বিভিন্ন রকম আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার। আঞ্চলিক ভাষার ওপর পূর্ণসম্মান রেখে বলছি, বিভিন্ন জেলার আঞ্চলিক ভাষার নাটক শুনতে শুনতে দর্শকশ্রোতাদের প্রমিত বাংলা ভাষার জ্ঞান দুর্বল হয়ে পড়ছে। দু’চারটে আঞ্চলিক ভাষার নাটক হতে পারে, তবে তার সংখ্যা এত বেশি হওয়া যথার্থ নয়, যা প্রমিত বাংলা চর্চায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে।

দেশে অনেক শক্তিমান নাট্যকার রয়েছেন। তারা তো সমসাময়িক সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ে নাটক রচনা করতে পারেন। কিন্তু তারা তা করছেন না। পরিবর্তে টিভি নাটকের বেশিরভাগই রচিত হচ্ছে কেবল কমেডি নাটক হিসেবে। বাংলাদেশ তো এত হাসি-খুশির দেশ নয় যে, এ দেশে হাসির বন্যা বয়ে চলেছে। হাসি-খুশিও জীবনের অঙ্গ। সম্মানিত নাট্যকাররা দু-চারটে হাসির নাটক লিখতেই পারেন। কিন্তু তার সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হবে কেন? ইউটিউব খুললে তো হাসির নাটকে ভরা। কিন্তু ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, এ সমাজে তো দুঃখ-কষ্ট আছে, রাগ-অনুরাগ আছে, সুখ-দুঃখ আছে, আন্দোলন-প্রতিবাদ আছে, ক্ষোভ-দ্রোহ আছে। সেসবের ওপর নাটক রচনায় বাধা কোথায়? এ সমাজে তো ন্যায়-অন্যায় আছে, জুলুম-নির্যাতন আছে, খুন-গুম আছে, অপহরণ, লুটপাট, চাঁদাবাজি আছে, ক্রসফায়ার-বন্দুকযুদ্ধ আছে, জঙ্গি তৎপরতা আছে, এসবের ওপরে প্রত্যাশিত সংখ্যায় নাটক কই? একাডেমিক চৌর্যবৃত্তি, প্রশ্ন ফাঁস, প্লেজারিজম আছে, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ আছে, ভোটচুরির মতো ব্যাপার আছে। সম্মানিত নাট্যকাররা এসবের ওপর কয়টা নাটক লিখেছেন? না, তারা লিখেননি। কেন লিখেননি সে জবাব নাট্যকারদেরই দিতে হবে। তারা কি বাস্তবতা বিসর্জন দিয়ে সামান্য পদ-পদবি-পুরস্কারের লোভে বিবেক বিসর্জন দিয়েছেন? নাকি সরকারি গুডবুকে থাকতে অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করছেন? এ জবাব দিতে একদিন লব্ধপ্রতিষ্ঠ নাট্যকারদের ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে।

কৃষকের ওপর ব্রিটিশদের অত্যাচার তুলে ধরে নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র ‘নীল দর্পণ’ নাটক লিখেছিলেন। পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে খান আতাউর রহমান লিখেছিলেন ‘জীবন থেকে নেয়া’, যা সিনেমা হিসেবে অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ওই সময়ের নাট্যকাররা তো এভাবে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করেছেন। কবি ও শিল্পীরা পালন করেছেন তাদের ওপর অর্পিত সামাজিক দায়িত্ব। ব্রিটিশদের তোয়াজ না করে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কি ‘এ দেশ ছাড়বি কিনা বল, নইলে কিলের চোটে হাড় করিবো জল’ লিখে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তিকে হুমকি দেননি? কবি রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা’ এবং শিল্পী কামরুল হাসানের ‘বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে বাংলাদেশ’ স্কেচ কি কবি ও শিল্পীদের অন্যায়ের প্রতিবাদের স্বাক্ষর বহন করে না? এ প্রতিবাদ করতে তারা তো ভয় পাননি। এখন তাহলে নাট্যকাররা খুন, গুম, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধের ওপর নাটক লিখছেন না কেন? কেন নাটক লিখছেন না বিডিআর বিদ্রোহের ওপর? নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ বৃদ্ধির ওপর? গায়েবি মামলা ও রাজনৈতিক বিরোধিতা-নিপীড়নের ওপর? সাহিত্যিক ও কবিরা কি তাহলে রাজদরবারি কবি-সাহিত্যিকে পরিণত হলেন? তারা কি সুবিধাবাদে প্রভাবিত হয়ে বিবেক বিসর্জন দিলেন? সামান্য একটি পদ বা পদকের জন্য নিজের স্বাধীনতা বিক্রয় করলেন? নাট্যকারদের সামাজিক অসঙ্গতি তুলে না ধরে কেবল কমেডি লিখে জাতিকে সুড়সুড়ি দেয়ার মধ্যে নিজ দায়িত্বকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা কতটা শোভনীয় হচ্ছে? এ প্রশ্নের জবাব তাদের অবশ্যই দিতে হবে।

তবে হাসির নাটক লিখেও অনেক মেসেজ দেয়া যায়। সে রকম নাটক হচ্ছে কি? না, খুব একটা হচ্ছে না। বর্তমান সময়ের হাসির নাটকের নামকরণেই এসব নাটকের গুণ-মান প্রতিফলিত হয়। এসব নাটক দেখলে অনেকেরই হাসি পায় না, বরং ভাঁড়ামি মনে হয়। এখানে উদাহরণ হিসেবে কিছু হাসির নাটকের নাম উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। যেমন, ‘খ্যাপা ডাক্তার’, ‘রাইতে কচু দিনে আলু’, চিটার নাম্বার ওয়ান’, ‘হালকা হাফিজ’, ‘গিঁট্টু সেলিম’, ‘পানি বাবা’, ‘বাঁচাল বাচ্চু’, মাথা নষ্ট’, ‘বোকা খোকা’, ‘বলদ মফিজ’, তেল মাখা চোর’, ‘বোকা আবুল’, ‘কানা মজিদ’, ‘তারিক আলী হাডারী’, ডেয়ারিং লাভার’, ‘ঝামেলা জামাল’, ‘বাপ-বেটা মডার্ন’, ‘কুত্তা চোর’, ‘কিপটুস’, দুলাভাই জিন্দাবাদ’, ‘প্রেম পাগল’, ‘চোরের ভবিষ্যৎ’, ‘জামাই পাগল’, ‘ভাদাইম্যা ঘরজামাই’, ‘বিলাতি জামাই’, ‘জামাই বলদ’, ‘ত্যাড়া জামাই’, ‘পেটুক জামাই’, ‘বলদের প্রেম’, ‘চিনিখোর’, ‘সেই রকম চাখোর’, ‘সেই রকম ঘুষখোর’, ‘বউ ভাগ’, ‘পিরিতির জ্বালা’, ‘ঘাড় ত্যাড়া’, ‘সরল প্রেম’, ‘নান্টু ঘটক’, ‘প্রেমের কাঙাল’, ‘কিপটে ডাক্তার’, ‘হাড় কিপটে’, ‘কালা চশমা’, ‘বাঁকা ভায়রা’, ‘বৌয়ের জ্বালা’, ‘চাপাবাজ’, পল্টিবাজ, ‘খালাতো বউ’, ‘চালু মাল’, ‘ভোদাই’, ‘ব্যক্কল’, ‘ফাউল’, ‘ঘাউড়া মজিদ’, ‘বিয়ে পাগল’, ‘কাউয়া মদন’, ‘ছেঁচড়া চোর’, ‘আবাল’, ‘মামুর ব্যাটা’, ‘ভাড়ায় চালিত’, ‘ফেলু মাস্টার’, ‘বিবাহিত ব্যাচেলর’, ‘চাল্লু মামার পাল্লু ভাগ্নে’, প্রমুখ। নামকরণেই এসব নাটকের গুণ-মান অনুধাবনীয়।

এসব নাটকের মধ্য দিয়ে নাট্যকাররা যে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করেননি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হাস্যরস অবশ্যই জীবনের অংশ। কিন্তু এত বেশি সংখ্যক ‘কমেডি’ নাটক লেখা ঠিক হচ্ছে কি? সমাজের অন্যান্য অসঙ্গতি, অন্যায় তুলে ধরা কি নাট্যকারদের কাজ নয়? তারা কি সে দায়িত্ব পালন করছেন? গায়েবি মামলা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ওপর নাটক কই? ভোট চুরির ওপর নাটক কই? এগুলো কি সামাজিক সমস্যা নয়? এগুলো কি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ নয়? মানি লন্ডারিং, শেয়ারবাজার লুটপাট বা ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ওপর নাটক আছে কি? সম্মানিত নাট্যকাররা কি তাহলে দরবারি নাট্যকারে পরিণত হলেন? তারা কি ফরমায়েশি নাটক রচনা করছেন? তাদের নাটকে সমসাময়িক অন্যায়ের প্রতিবাদের অনুপস্থিতির জন্য তাদের নাগরিক সমাজের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। বর্তমানে কতিপয় বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল যেসব সিরিয়াল উপস্থাপন করছে, তা প্রতিবেশী ভারতীয় সিরিয়ালের মতোই অবাস্তবতা ও পরকীয়া ঠাসা, কুবুদ্ধি চর্চা ও অশুভ সামাজিক প্রতিযোগিতায় ভরপুর। এসব সিরিয়াল থেকে কিছুই শেখার নেই। অবিরত এসব সিরিয়াল দেখলে বরং মানসিক রোগী হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ কারণে এ দেশের মা-বোনদের কাছে ভারতীয় সিরিয়ালগুলো জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর থেকে এ দেশে মানসিক ডাক্তারদের ব্যবসা বেড়েছে। দর্শকশ্রোতা কী শিখছেন এসব ভারতীয় সিরিয়াল থেকে? যেসব সিরিয়ালের নারী চরিত্ররা জড়োয়া গহনা পরে ঘুমাতে যান, লিপস্টিক মাখা ঠোঁট নিয়ে ঘুম থেকে ওঠেন, সেসব সিরিয়াল যে কতটা বাস্তবতাবিবর্জিত তার ব্যাখ্যা নিষ্প্রোয়জন। এসব অবাস্তব সিরিয়ালের মন্দ প্রভাব দেখে আতঙ্কিত হয়ে বিশিষ্ট নাট্যশিল্পী জামাল উদ্দিন হোসেন বাংলাদেশের একটি শীর্ষ দৈনিকে প্রায় ১৫ বছর আগে ২০০৪ সালে ‘দয়া করে হিন্দি চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দিন’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

সঙ্গীতের অবস্থা প্রায় একই রকম। সেখানেও প্রেমের বাড়তি মাখামাখি। প্রেমের গান অবশ্যই লিখতে হবে। কারণ, প্রেম তো জীবনেরই অংশ। প্রেম তো জীবনকে গতিময় ও স্বপ্নময় করে রাখে। প্রেমের গান নিশ্চয়ই গাইতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু প্রেমকে তুলে ধরাই কেবল গানের কাজ নয়। সঙ্গীত রচয়িতারা তো গানকে ব্যবহার করবেন সমাজ পরিবর্তনের অস্ত্র হিসেবে। সে কাজ তারা করছেন কি? তারা তো গানকে ব্যবহার করতে পারেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে। তা তারা করতে পারছেন কই? এ প্রসঙ্গে শিল্পী আপেল মাহমুদের বিখ্যাত ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি’, গানটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে এ গান লাখো মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে এ গানের ভূমিকা ছিল বিমান কামানের চেয়েও শক্তিশালী। কাজেই সঙ্গীতকে কেবল মানবীয় প্রেমে সীমায়িত করে ফেলা ঠিক নয়। এখনকার তারকা সঙ্গীতশিল্পীরা কয়টা অন্যায়ের বিরুদ্ধাচারণকারী প্রতিবাদী গান গাইছেন? ক্রসফায়ার, নারী নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, বর্ধিত দুর্নীতির ওপর কয়টা গান লিখিত ও গীত হয়েছে? কেবল প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার মধ্য দিয়েই কি সঙ্গীতশিল্পীর দায়বদ্ধতা পালন শেষ হতে পারে?

অবশ্য কেউ যে কাজ করছেন না, এমন নয়। শিল্পী হায়দার হুসেইনের কথা বলা যায়। তিনি বিডিআর বিদ্রোহের ওপর একটি চমৎকার গান গেয়ে এ বিদ্রোহে নিহত ৫৭ দেশপ্রেমিক চৌকস সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তুলে ধরে সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করেছেন। এজন্য তার প্রশংসা করা যায়। এ গান ইতিহাসে একটি কালজয়ী সঙ্গীত হিসেবে মর্যাদা পাবে। গানের কথাগুলোতেও দেশবাসীর ভাবাবেগ প্রতিধ্বনিত হয়েছে : ‘কতটুকু অশ্রু গড়ালে হৃদয় জলে সিক্ত, কত প্রদীপ শিখা জ্বালালে জীবন আলোয় উদ্দীপ্ত। কত ব্যথা বুকে চাপালে তাকে বলি আমি ধৈর্য, নির্মমতা কতদূর হলে জাতি হবে নির্লজ্জ। আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার, বুকের ব্যথা বুকে চাপায়ে নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার’...।

স্বাধীনতার প্রকৃত লক্ষ্য নিয়েও হায়দার হুসেইন গান লিখেছেন। আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করলেও স্বাধীনতার প্রকৃত লক্ষ্য যে এখনও অর্জন করতে পারিনি তা তার গানের কথা ও সুরে চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে : ‘কী দেখার কথা কী দেখছি, কী শোনার কথা কী শুনছি, কী ভাবার কথা কী ভাবছি, কী বলার কথা কী বলছি, তিরিশ বছর পরও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি’ ...। এই হল সংস্কৃতিকর্মীর কাজ। এখনকার সংস্কৃতিকর্মীরা এমন কাজে কতটা মনোযোগী? তারা কি কেউ খুন, গুম, ক্রসফায়ার, গায়েবি মামলা, রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে গান গেয়েছেন? না গেয়ে থাকলে কেন গাননি? এসব কি সংস্কৃতির অংশ নয়? কেবল আমি-তুমি জাতীয় প্রেমের গান গেয়ে এসব সমস্যার বিরুদ্ধে গানকে প্রতিবাদের অস্ত্র বানাতে না পারলে এজন্য সঙ্গীতশিল্পীদের জবাবদিহি করতে হবে।

আমরা চাই আমাদের নাটক, আমাদের সাহিত্য এবং আমাদের সঙ্গীত হোক সমাজ পরিবর্তন ও সমাজ শোধনের হাতিয়ার। সমাজের অন্যায়, অবিচার ও নীতিহীনতার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠুন আমাদের সম্মানিত সাহিত্যিক, কবি, গীতিকার ও শিল্পীরা। তাদের একেকটি নাটক ও সঙ্গীত অন্যায়, নীতিহীনতা, ধর্ষণ, খুন-গুম, গায়েবি মামলার বিরুদ্ধে গ্রেনেডের মতো গর্জে উঠুক। তাহলেই বলা যাবে, নাট্যকার ও শিল্পীরা তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করছেন। অন্যথায়, কেবল নাটকে হাসাহাসি আর সঙ্গীতে ভালোবাসাবাসিতে মজে থাকলে কোনো না কোনো সময়ে তাদের ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ না করার অপরাধে জাতির কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×