গল্প

বনসাই জীবন

প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  জয়া ফারহানা

আমি পারুল বেগম। না, আপনাদের পরিচিত কেউ নই। বাংলাদেশে পারুল নামে অন্তত হাজারখানেক মেয়ে আছে। বেশিও হতে পারে। এদের মধ্যে ক’জনকেই বা চেনেন আপনারা? আর আমি তো এই হাজার হাজার পারুলের মধ্যে এমন একজন অল্পশিক্ষিত পারুল, অশিক্ষিতও বলা যেতে পারে, চেনার প্রশ্নই নেই।

তাছাড়া নামহীন গোত্রহীন এই পারুলের জীবন এক টুকরো পোড়া, বিবর্ণ কাগজের মতো। তবে আসমানের তারারা সাক্ষী আপনাদের এই মেগা সিটি ঢাকায় এসে কীভাবে পদে পদে পা হড়কেছে আমার। আপনারা না জানুন, পানির নিচে বসে সব দেখেছেন খোয়াইজ খিজির।

পায়ের নিচে এক মুঠো মাটির জন্য কী নিদারুণ হিমশিম খেয়েছি মেঘের মধ্যে বসে দেখেছেন মিকাইল ফেরেশতা। স্বর্গে বসে দেবরাজ ঈন্দ্র দেখেছেন কীভাবে আমার জীবন অভিশপ্ত হয়ে গেছে। অথচ আমি তো অহল্যার মতো বিশ্বাসঘাতিকা নই। স্বামীর বিশ্বাসকে পায়ে দলে মথে আমি কোনো পুরুষের সঙ্গে মিলিত হইনি।

তাহলে আমার জীবনে কেন অহল্যার অভিশাপ নেমে এলো? কেউ কি বলতে পারেন একজন পুরুষ, নারীর প্রয়োজন প্রথম অনুভব করে কোথায়? শরীরে, বুদ্ধিতে না মাথায়? উত্তর জানা থাকলেও, উত্তর আপনারা দেবেন না জানি। আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে কারণ মস্তিষ্কের চেয়ে শরীরের অন্য কোনো অংশ তার কাছে বেশি দামি।

অবশেষে তাই ফিরে আসতে হয়েছে আমাকে। ফিরে এলাম গাঁয়ে। গাঁইয়া মেয়ে গাঁয়ে ফিরে এলো। ফেরার সময় সংসারের কেউ আমাকে বলেনি পারুল তুমি থেকে যাও। কেউ আমার জন্য অস্থির হয়নি, চঞ্চল হয়নি। ট্রেনের কামরায় উঠে বলেনি, যেতে হবে না তোমায়, থেকে যাও আমাদের কাছে। এতে আমার বুকটা মুচড়ে গেছে। চোখ ছাপিয়ে কান্না এসেছে। পরে সে কান্না গিলেও ফেলেছি।

সেদিন আমার মনে হয়েছিল ঈশ্বর নামে কোথাও কেউ নেই। ফেলে আসা সময়ের প্রতি কার মায়া নেই? নস্টালজিয়া ছেড়ে কে-ই বা বেরোতে চায়? একসময় মনে হয়েছে কেউ আমার ভেতরটা সম্পূর্ণ শুষে নিয়েছে। আমি আর বেঁচে নেই। তারপর মনে হল ভালোই হয়েছে, এতে ফেরাটা সহজ হল। আসলে দুঃখে কোনো মানুষ মরে না।

প্রবলতম দুঃখের পরও লোকে ভাত খায়, পানি পান করে। সম্ভবত পেটের হিসাব এই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় হিসাব। দুনিয়াটা বড় রঙচঙে, এখানে কত লোক কতভাবে বেঁচে আছে। রেলস্টেশনের সামনে ফুচকাওয়ালা ফুচকা বিক্রি করে বেঁচে আছে। দেহপসারিণীরা শহরের সব আবর্জনা সাফ করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ‘ভালো ম্যাগাজিন’ বলে থ্রি এক্স বিক্রি করছে দেদার মানুষ।

কিছু লোক সব সময় কাউকে না কাউকে ঠকিয়ে একটা ফিচেল হাসি দিয়ে বলছে দুনিয়াদারি মানেই লোক ঠকানো স্যার। জানি, এসব কথা আপনাদের কানে সুধা বর্ষণ করবে না। কিন্তু তবু বলতে হবে আমাকে। পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষটিরও তো কাউকে না কাউকে জানাতে ইচ্ছা করে তার দুঃখের কথা।

এই যে দেখুন অস্তাচলের এই বেলায় ডালপালার ফাঁক গলে কী অপূর্ব নরম আলো জানান দিচ্ছে সন্ধ্যার। জীবনে যত তীব্র দহনই থাকুক, ভুলে যেতে ইচ্ছা করে। আমিও সব ভুলে বাঁচতে চাই। শৈশবে যেমন রাতের শিশির ভর্তি শিমুল ফুলের বিছিয়ে থাকা পথে হাঁটতে হাঁটতে শিশির খাওয়া দেখতাম, জোরে নিঃশ্বাস নিলে বকুল আর হাসনাহেনার সুবাস পেতাম তেমন একটা জীবন চাই। উঠোনে পাটি পেতে সপ্তর্ষিমণ্ডল আর কালপুরুষের শিমুলের ডালে জোনাকি হয়ে আটকে থাকা দেখতে চাই।

এখন আমার জীবনের কোনো গোপন সুড়ঙ্গ নেই। এখন আমি হাঁটব প্রকাশ্য সড়কে। এই সিদ্ধান্ত আমার নিজের। তবু ভালোবেসে, বড় বেশি ভালোবেসে সেই ভালোবাসাকে চিরকালীন করে রাখার জন্য যা যা এতদিন করেছি তা অন্যের হাতে তুলে দেয়ার যন্ত্রণা কি নেই? বোকা পারুলের কাছে ভালোবাসার চেয়ে মূল্যবান আর কিছু ছিল না তো কখনও, তাই।

আমার কাছে ভালোবাসা মানে পাওয়া নয়। ঈশ্বর প্রদত্ত গভীর এক অনুভূতি। যেখানে না পেলেও অনেক কিছু পাওয়া হয়ে যায়। তবে দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসার প্রতিটি অলিগলি বাঁক সবখানে ঘুরে দেখলাম ভালোবাসার চেয়ে মূল্যহীনও আর কিছু নেই। এসব ভালোবাসাবাসি নিছক কুহক। এতক্ষণ যেসব কথা বললাম এসব ট্রিভিয়াল ব্যাপারে কি কারও কোনো আগ্রহ আছে?

না থাকারই তো কথা। মেগাসিটির নাগরিকরা ব্যস্ত থাকবে কঠিন ইন্টেলেকচ্যুয়াল ইস্যু নিয়ে। তবে যত কঠিন ইস্যুই হোক তারা সব ম্যানেজ করে ফেলে। ম্যানেজারিয়াল ক্যাপাসিটি ছাড়া এই কঠিন শহরে টিকে থাকা মুশকিল।

শুধু কি শহর, সংসারেও টিকে থাকা মুশকিল। আমি এক এলোমেলো হতচ্ছাড়া পারুল বেগম, সত্যি কথা বলতে আর ম্যানেজ করতে পারছিলাম না। ওভার বাউন্ড হয়ে যাচ্ছিলাম।

সংসারে এসে দেখলাম এখানে আমার ভূমিকা কেবল ম্যানেজারের। সবাইকে আনন্দে রাখা, মানি ম্যানেজমেন্ট, মেডিকেল ইমারজেন্সি, লেজার অ্যাক্টিভিটি সব কিছু ম্যানেজ করার তাগিদ। এমনকি পেরেন্ট টিচার মিটিংয়ের দিনে মিসের ঘরে ঢুকে গুডমর্নিং বা গুড আফটার নুন বলে অন্য অভিভাবকদের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়াটাও নাকি ম্যানেজারিয়াল ক্যাপাসিটি।

সংসারের ম্যানেজারকে কী না করতে হয়? বাচ্চাদের পরীক্ষার খাতা বাড়িতে এনে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা, ভুল-ত্রুটির কারণ শোধরানো, তা নিয়ে ক্লাস টিচারের সঙ্গে আলাপ করা। বাচ্চাদের আবার একেকজনের পড়ার সময় একেকরকম। একজন খুব ভোরে উঠে পড়ে তো আরেকজন গভীর রাত পর্যন্ত।

একটানা পড়ার একঘেয়েমি কাটানোর জন্য ফাঁকে ফাঁকে মুখরোচক খাবার বানাতে হয়েছে, গল্প শোনাতে হয়েছে। কখন দিন, কখন রাত, কখন ঘুমোতে হবে, কখন বিশ্রাম নিতে হবে, হিসাব করিনি। এর চেয়েও বেশি করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম আমি। কিন্তু একসময় বুঝতে পারলাম কেউই আমার সন্তান নয়। তাদের একজন সুপার মম দরকার, মাকে নয়।

আরেকটু গভীরভাবে ভেবে যদি বলি আমি তো কখনও আশরাফ হোসেনের সঙ্গে সহবাসে পরিপূর্ণ নারী হতে পারিনি। তবে এরা আমার ভালোবাসার সন্তান? কলমের ঠোঁট দিয়ে এটা বলে বোঝানোর নয়। এসব সন্তান কেবল আশরাফ হোসেনের লোভ। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার লোভ।

তো এসব আমি খুব নিখুঁতভাবে করতে পেরেছি কিনা জানি না তবে আমার মেয়ে গ্র্যাজুয়েশনের সময় প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়ে যায়। ছেলে বিশ্বখ্যাত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়েটিভ কনসালটেন্ট। ক্রিয়েটিভিটির সঙ্গে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ দক্ষতায় তুখোড় নাম কামিয়েছে। এসব বলার সময় আমার গলা বুজে আসছে।

জীবনের বেশিরভাগ সময়টা পার করে এই চৌষট্টিতে এসে যখন নিজের সম্পর্কে অভিনব সব মূল্যায়ন শুনলাম, তাও আবার সবচেয়ে কাছের সন্তানদের কাছ থেকে তখন সেটা তীব্র হয়ে বুকে বাজছে বৈকি।

আর স্বামী বলল, সে নাকি যা করেছে সব ভুল করেছে। আমি বুঝলাম, স্বরচিত প্রাসাদে ফাটল দেখা দিয়েছে। নাকি ফাটল ছিল শুরু থেকেই? নাকি প্রথমেই বালির ওপর বানিয়েছিলাম ঘর? কিছু না জেনে, শক্ত ভিত তাই কখনই ছিল না। একেক সময় মনে হতো আর বোধহয় বাঁচব না। কিন্তু ওই যে, মৃত্যু বারবার কানের পাশ দিয়ে চলে গেছে আমার, মরিনি।

দুই

ক্লান্ত শরীর মাঝে মাঝে ছুটি চায়। ক্লান্ত বোধ করার অন্য একটা কারণ আছে আমার। গতকাল পর্যন্ত আমি ছিলাম কারও মা, কারও স্ত্রী, কারও পুত্রবধূ আরও কত কিছু। এসব পরিচয় আমাকে ক্লান্ত করে, ক্লান্ত করে, ক্লান্ত করে। তবে আজ থেকে আমি সম্পূর্ণ নিজের। সংসারের ঘূর্ণি থেকে মুক্তি মিলেছে। গেঁয়ো মেয়েটা গাঁয়ে ফিরল অবশেষে। ছুটিও মিলল। আর কী আশ্চর্য ষোলো ডিগ্রি সেলসিয়াসের সুশীল তাপমাত্রায় যে আমি পঁচিশ বছর ধরে ঘুমাতে পারিনি দুপুরে সে-ই কিনা আজ এ ঝামাল গরমের দুপুরে ঘুমোলাম টানা দু’ঘণ্টা। আজ কোনো উদ্বেগ দুশ্চিন্তা ক্লান্ত শরীরে হামলে পড়েনি। জানালার পাশে বটগাছের ছায়ায় বসে একটা কাক ডাকছিল একটানা স্বরে। সেই করুণ স্বরের সঙ্গে বেশ ঘুম ধরে গেল। ঘুম যখন ভাঙল, সূর্য মুখ লুকিয়ে ফেলেছে গাছের আড়ালে। শান্ত নির্মল চারদিক। এক চিলতে গোলাপি রোদ যেতে যেতে আটকে আছে উঁচু গাছের মাথায়। চাঁপা ফুল রঙের গোধূলি বেলা। বাতাসে মন্থর জায়গা বদল করছে জলভরা মেঘ। সূর্য কখনও মুখ লুকোতে চাইছে ঘন মেঘের আড়ালে। ঠিক এমন একটি সময়ে বাঁচতে ইচ্ছা করে খুব। নিজেকে বললাম, ভেবে দ্যাখো পারুল বেগম কতবার মৃত্যু তোমার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে। কতবার বাসে উঠতে গিয়ে পা স্লিপ করে গেছে কিন্তু তুমি বাসের নিচে পড়নি। কতদিন তোমার রিকশা আর বাস মুখোমুখি হয়েছে, মরতে গিয়েও মরিনি। কপাল জোরে বেঁচে গেছ। এই বেঁচে থাকা কি কপালের জোর নাকি কপালের ফের? সারা জীবন ধরে তো শুধু দুঃখ আর অপমান। নিজের অতীতের দিকে চেয়ে বেঁচে থাকাটাকে কোনো মতেই সৌভাগ্য বলে মনে হয় না। একটা ভুল জীবন একজন মানুষ কতদিন বয়ে বেড়াতে পারে। বড় সাদামাটা সাধারণ মেয়ে আমি। সেই বিয়ের দিন থেকে শুনে আসছি তুই বড় কপালি মেয়ে পারুল, তোর বর খুব ভালো, নামজাদা, জেল্লাদার, চোখ ধাঁধানিয়া। কিন্তু আমি তো এসবের কিছুই নই। তাই হয়তো স্বামীর পথের সঙ্গে আমার পথ কোনোদিন মিলল না। আমার স্বামী আশরাফ হোসেন মিশুক উৎসবপ্রবণ, বন্ধুবৎসল। পাশের বাড়ির গোলাপি গালের বাচ্চা থেকে শুরু করে রিটায়ার্ড চাচা সবার সঙ্গে তার বন্ধুত্বের কমফোর্ট লেভেল। পারুল বেগম একাকিত্বপ্রিয়, উৎসববিমুখ। শূন্য হতে হতে বিন্দুর মতো একা, এখন আর কেউ তার সঙ্গীও হতে পারে না এমনই নিঃসঙ্গ। অন্যদিকে আশরাফ হোসেন যখন যেটা করেন সেটাই খবর। এখন এ বয়সেও কী আশ্চর্য সম্মোহনের ক্ষমতা। কত যে তার ফ্যান। পঁচিশ ত্রিশ বছরের মেয়েরাও টপাটপ প্রেমে পড়ে, প্রেমাসক্ত সব এসএমএস পাঠায়। আশরাফ হোসেন অবশ্য কোনো মেয়ের নাম নোট করেন না। অবশ্য একেবারেই করেন না তাও নয়। এক্স-ওয়ান, এক্স-টু এভাবে করেন। মেয়েদের তিনি দারুণ খেলান। কোনো কোনো মেয়ে খেলতে খেলতে সিরিয়াসও হয়ে পড়ে। পরিচিতরা ফোন দিয়ে বলে আশরাফ, তোমার বউ যে মুখ লুকিয়ে থাকে এটা তার মস্ত ইনএফিশিয়েন্সি। যোগাযোগটাই হল আসল, বুঝলে? প্ল্যান করে কাজ এগোতে হয়। তা আমি ইনএফিশিয়েন্ট তো অবশ্যই।

তিন

পারুল, দুধে বলক উঠতে তো দশ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়, কোথায় তুমি? পারুল এখনও বেডরুমের বিছানা এলোমেলো কেন? পারুল, ডাইনিংয়ে বাসি রুটি-তরকারি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কেন? পারুল, এখনও বাচ্চাদের টিফিন তৈরি হল না? অথচ পঁচিশ বছর আগে যে বাড়িতে সে ঢুকেছে সেটা নাকি এ এলাকার সবচেয়ে বনেদি বাড়ি। ড্রইংয়ে ডাইনিংয়ে কারুকাজ করা শ্বেত পাথরের টেবিল, ছত্রি দেয়া সেগুন কাঠের বিশাল পালঙ্ক। ঘরে ঘরে মেহগনির আসবাবের আভিজাত্য। বারান্দায় চীনা লণ্ঠনের মৃদু মায়াবী আলো। কিন্তু যেসব কাজ পারুলদের নিুমধ্যবিত্ত পরিবারে গৃহকর্মীরা করে, এখানে এসে তাকে তাই করতে হয়েছে। তারপরও টেলিফোনে ফিসফিস। আশরাফ তুমি দুর্ভাগ্যবশত বিয়ের মতো লংটার্ম প্ল্যানিংয়ে পারুলকে পাত্রী নির্বাচন করে গোড়ায় গণ্ডগোল বাধিয়ে ফেলেছ। রোটারি প্রেসিডেন্ট এইচএস চৌধুরী বলেন, আশরাফ আমার বউ তো তোমার গানের বিশাল ফ্যান। পহেলা বৈশাখে ক্লাবের অনুষ্ঠানে ও তোমার নাম রেকমেন্ড করেছে। কেউ বলেন, তুমি এত পদক পাও আশরাফ, আমরা তো তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনন্দনও জানাতে পারি না, হিমশিম খেয়ে যাই। তো প্রতিদিনের এসব শংসা বচন আশরাফ হোসেনকে ভেতরে ভেতরে হয়তো ক্ষুব্ধ করে তুলেছে পারুল বেগমের প্রতি। ততদিনে পারুল বেগমের আত্মবিশ্বাস শূন্যের কোঠায়। বারবার মনে হয়েছে এমন কী আছে তার যে স্বামী তাকে ভালোবাসবে? ভোরে আশরাফ হোসেনের দিন শুরু হতো আমির খাঁর গৌর সারংয়ের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে প্রাণায়াম দিয়ে। আজ ক্লাসিক্যাল মিউজিক কনফারেন্সে যোগ দিচ্ছেন তো কাল চলে যাচ্ছেন বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের কোনো ট্যুরে। জগতটাও আশরাফ হোসেনের অনেক বড়। অন্তত পারুলের তুলনায় তো বটেই। খেলুড়ে আশরাফ হোসেন পারুলকে বিয়ে করেই বোধহয় একটি কাঁচা ক্যাচ হাতে তুলে নিয়েছিলেন। পারুল বড় সাধারণ। তার জীবনের বেশিরভাগ দিন কেটেছে রান্নাঘরে। আশরাফ হোসেন অসাধারণ। তার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে দেশ-বিদেশের কনফারেন্স হলে।

এই যে বৃষ্টি পারুলের এত পছন্দ, বৃষ্টির সামান্য ঝিরঝির শব্দ শুনলে যে পারুল কিশোরী সুরে কলকলিয়ে ওঠে, বৃষ্টিতে ভিজে নিজেও বৃষ্টি হয়ে গেছে বলে ভাবে; এই ভাবনাও কি কম দোষের? আশরাফ হোসেন বলতেন, ছিঃ পারুল, তুমি একবার বোঝ না এই বৃষ্টিতে গরিব মানুষের ঘরের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে সব ভিজে যায়। ঝুপ ঝুপ মাটি ভেঙে পড়ে ঘরের দেয়ালের। ভিজে কাঠে আগুন ধরে না। রিকশাওয়ালা মুটে মজুররা কাজে বেরোতে পারে না। মানুষের কত কষ্ট পারুল। তোমার একটু মায়া নেই? কিন্তু পারুল বড় সাধারণ। তার নিজের জীবনের সব দুঃখই অমীমাংসিত। সারা দিন সবাই যখন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে গালি দেয় তখন বৃষ্টির কাছেই আশ্রয়। বৃষ্টির জলে কতদিন নিজের চোখের জল লুকিয়েছে। এ কারণেই বৃষ্টিকে এত আপন মনে হয়? হয়তো। পারুলের তো আপন বলে কেউ নেই। আশরাফ হোসেন অসাধারণ। তাই দলেবলে ভারী। যে গরিবদের জন্য এত সমাজকল্যাণ তারা যেন তার বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকতে না পারে তার জন্য ইলেকট্রিক কারেন্টওয়ালা মানুষ সমান উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছেন বাড়ি। হাত ছোঁয়ালেই নির্ঘাত মৃত্যু। কিন্তু পারুল তো সাধারণ। হঠাৎ উড়ে আসা এক টুকরো মেঘ ভারী হতে হতে যখন আর ভেসে থাকতে পারে না তখন কেমন করে মাধ্যাকর্ষণের টানে নেমে আসে পৃথিবীতে বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে; চোখ বুজে ভাবে পারুল। ভারী মেঘগুলোও তার দুঃখের মতো ভারী। চোখ বুজলে আরও কত কী দেখে পারুল। বট ফল পাকলে কেমন ঝাঁকে ঝাঁকে সবুজ আর পাটকিলে হরিয়াল এসে ভিড় করত তাদের জানালার পাশের বটগাছটিতে। ভরন্ত বিলে লগির মাথায় মাছের আশায় কেমন করে ঝিম ধরে থাকত মাছরাঙা। মনে পড়ে ভরা বর্ষায় হাওরের পানির তোলপাড়। সেসব কবেকার কথা? কত দিন আগের কথা?

চার

আবার পারুল ফিরে এসেছে সেই চেনা আশ্রয়ে। গেঁয়ো মেয়ে পারুল। মাঠের ঝোপঝাড়, উলুখড়, বনকলমি, সোঁদাল আর কুলগাছের মায়ায় আটকেপড়া পারুল। কলাপাতায় জমে ওঠা শিশিরে টুনটুনি পাখির স্নান দেখতে দেখতে বড় হওয়া পারুল। স্কুল পালিয়ে দূরের বিলের ঝোপঝাড়ে বুনোহাঁসের ডিম খুঁজতে যাওয়া পারুল, আবার সব কিছু শূন্য থেকে শুরু করবে, বুকচাপা বাস্তবতাকে সঙ্গী করে। আকাশ নীলের তারা খচা পথে বৃষ্টি পড়ে, চালতা ফুলে ফলের বাগান মদির করে। হা ঈশ্বর! আমি যদি না ফিরতাম, আমি কি জানতাম জীবনে যা আমি সহ্য করতে অপারগ তেমন আরও কত সত্য লুকিয়ে আছে আমার জীবনে? সত্যই বা কী? একমাত্র মৃত্যুর আগেই বলা সম্ভব কোনটা আমার শেষ সত্য।