হুমায়ূন আহমেদ

অসামান্য সেই জাদুকরকথক

  হাসান হাফিজ ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসের কথা। হুমায়ূন আহমেদ ঠিক করলেন, তার গ্রামের সব লোককে এক বেলা খাওয়াবেন। নেত্রকোনায় কুতুবপুর তার নিজের গ্রাম। তার জন্ম অবশ্য মাতুলালয়ে, ময়মনসিংহের মোহনগঞ্জে। যারা তাকে চেনেন (চিনতেন বলতে চাচ্ছি না), তারা জানেন তিনি অসম্ভব হুজুগে মানুষ। ‘উঠল বাই তো কটক যাই’ স্বভাবের মানুষ তিনি। হুজুগে বললে কম বলা হয়। তিনি হলেন অঘটনঘটন পটিয়সী টাইপের ব্যক্তিত্ব। কোনো কিছু না ঘটাতে পারলে তার শান্তি স্বস্তি নাই। কিছু না ঘটলে বোধকরি আলুনি লাগে জীবন। তো, নেত্রকোনা যাওয়া হবে। দলবেঁধে। বিরাট দল। এক বাসভর্তি লোক। অন্য কয়েকটি গাড়িও আছে এই বহরে। যাত্রী তার স্বজন, সুহৃদ, শুভানুধ্যায়ী। রোমান্টিক অভিযান এক প্রকার।

বেশ কয়েকজন যাচ্ছেন সপরিবারে। আমিও এই কাতারের। আমার স্ত্রী শাহীন আখতার, সাত বছর ছুঁই ছুঁই আমার শিশুপুত্র গৌরবও আছে এই দলে। বাস ভাড়া করা হয়েছে। হুমায়ূন ভাই তখন থাকতেন এলিফ্যান্ট পার্কের সাত তলার ফ্ল্যাটে। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ডাকসাইটে প্রফেসর। জননন্দিত কথাসাহিত্যিক। অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাট্যকার। সবার সঙ্গে মিশতে পারেন অবলীলায়। শিশুদের সঙ্গেও। অতি দ্রুত আড্ডা জমিয়ে ফেলেন। অসাধারণ কথক এই কথাশিল্পী। কথার জাদুকর। যেমন বলনে, তেমনি লেখায়। রাজযোটক যেন। সবাই মুগ্ধ হয়ে শোনে তার কথা। কথা নিয়ে লেখালেখির জাদু নয়, আসল জাদুশিল্পেও তার আগ্রহ, নিষ্ঠা ও নৈপুণ্য ছিল। ম্যাজিক দেখানোর কসরত রপ্ত করেছিলেন অনেক দিনের সাধনায়। এ সংক্রান্ত অনেক দামি দামি উপাদানও ছিল তার সংগ্রহে। জোগাড় করেছিলেন নিরন্তর প্রচেষ্টায়। অনেক দামেও। চোখে দেখা যায় না, এমন সুতোর অস্তিত্বও যে এই ধরাধামে আছে, এটা ক’জনা জানেন? ম্যাজিশিয়ান হুমায়ূন আহমেদের কল্যাণে জেনেছি। ঘরোয়া আসরে জাদুবিদ্যা প্রদর্শন করেছেন বহুবার। তার নিকটজনরা জানেন, সফল জাদুকর ছিলেন তিনি। অবিশ্রাম প্র্যাকটিসের কারণে সেটা সম্ভবপর হয়েছিল। মূলকথা হচ্ছে, বেসিক্যালি তিনি অত্যন্ত মেধাবী মানুষ ছিলেন। সেজন্য যেটাতেই হাত দিয়েছেন, সোনা ফলেছে। চলচ্চিত্র নির্মাণ, গীত রচনা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও। সৌভাগ্যের বরপুত্র ছিলেন। তবে সারা জীবনে অনেক লড়াই সংগ্রাম তাকে করতে হয়েছে। হেরে যাননি। লড়াই করে গেছেন। এক জীবনে গ্লানি অপমান, বঞ্চনা লাঞ্ছনা, দুঃখ নির্যাতন ভোগও কম ছিল না। বিষ পান করে নীলকণ্ঠ হতে হয়েছিল তাকে।

কেউ অবশ্য বলতে পারেন, কোলন ক্যান্সার তাকে পরাস্ত করেছে। আমরা বলব, না। এটি আবেগের কথা না। তিনি লক্ষ মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। স্বপ্নের সঞ্চার করেছেন। এই স্বপ্ন মাল্টিপ্লাইড হয়ে বেঁচে থাকবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। বাংলা সাহিত্যের ক’জন লেখকের ভাগ্যে এটা জুটেছে? হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের তরুণদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন। বইমনস্ক করতে সক্ষম করেছেন। এই চ্যালেঞ্জ ছিল পর্বতপ্রমাণ। সেই এভারেস্ট তিনি জয় করেছেন বহু বহু বার। সে এক অসাধ্য সাধন নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশের প্রকাশনা জগৎ এক অসামান্য উচ্চতায়, মর্যাদার আসনে স্থাপিত হয়েছে তার একক ও দীর্ঘকালীন অবদানে। টিভি নাটক, চলচ্চিত্রকে তিনি মহিমান্বিত করেছেন, নিজস্ব এক স্টাইলে। সেই স্টাইল অবশ্যই চিরঞ্জীব। একই সঙ্গে অননুকরণীয়। হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের আত্মায়, লোকজীবনে, প্রকৃতি, নদীপ্রবাহে, ঘাসফুলে, জোছনার øিগ্ধতায়, ভোরের পবিত্রতার সঙ্গে লীন হয়ে আছেন। কার সাধ্য তাকে সেসব থেকে বিচ্ছিন্ন করে।

কথা হচ্ছিল নেত্রকোনা প্রসঙ্গে। সফর শুরু হওয়ার একটুক্ষণ আগেকার ঘটনা। একে একে যাত্রীরা এসে জড়ো হচ্ছেন। এমন সময় তিনি আমার শিশুপুত্রকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। ক্ষুদে সফরসঙ্গীকে কি ভেবে তিনি প্রশ্নটা করলেন, বোঝা মুশকিল। ওই প্রশ্নটা এলেবেলে ধরনের না। একটু সিরিয়াস টাইপেরই বলতে হবে। তিনি জানতে চাইলেন, বলো তো গৌরব, আমি কেমন ধরনের মানুষ? আমার ছেলে অকপটে বলল, আংকেল আপনি হচ্ছেন পাগলা কিসিমের মানুষ। অট্টহাসি হেসে আশপাশের সবাইকে চমকে দিলেন আরেক শিশু হুমায়ূন আহমেদ। বলে উঠলেন, এটা তুমি ঠিক বলেছ গৌরব। আমি আসলেই পাগলা কিসিমের লোক। তুমি ঠিক ঠিক আমাকে ধরতে পেরেছ।

আমার মতো অনেকেই জানেন, হুমায়ূন ভাইয়ের যে সত্তা, তার মধ্যে যুক্তিবাদী মিসির আলি ছিল, পাগলা টাইপের হিমুও ছিল। আরও ছিল শুভ্র। মিসির আলি ও হিমু দু’জন দুই মেরুর মানুষ। কিন্তু তারা তাদের স্রষ্টার সত্তায় যুগপৎ মিশ্রিত। গভীর মমতা ও যত্নে তিনি তাদের লালন করেন, বিকশিত করেন। লেখকের নিজের মধ্যে তাদের যে উপস্থিতি, সেই পার্সেন্টেজটা ফিফটি ফিফটি। কখনও তিনি মিসির আলি, কখনও তিনি হিমালয় ওরফে হিমু। বুঝতে পারি, তার মধ্যে যে অবিশ্রাম ও কালজয়ী সৃষ্টিশীলতা ছিল, তার মধ্যে পাগলামির উপাদান থাকা অপরিহার্য ছিল। তীব্র আবেগ, তীক্ষ্ণ মেধা, গভীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ শক্তি, বিজ্ঞানমনস্ক বিশ্লেষণের ক্ষমতা না থাকলে তিনি এতটা জননন্দিত হতে পারতেন না। সবচেয়ে বড় কথা হল, খুব সহজ করে সহজ কথাটি তিনি বলতে পারতেন। মনোগ্রাহী কৌতুক, রঙ্গব্যঙ্গ করতে পারা, মানুষকে হাসাতে পারার অতি দুর্লভ গুণ ছিল তার। সেটি একেবারেই সহজাত, জন্মগতই বলা চলে। কোনো ধরনের চেষ্টার দ্বারা অর্জিত নয়, এটি ছিল অনায়াসে আয়ত্ত। নদীস্রোতের মতো সাবলীল। তার সৃষ্টি সম্ভারে এসব গুণাবলীর সার্থক প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই। সহজ করে বলার যে মুনশিয়ানা, তা খুব অল্প মানুষের মধ্যেই থাকে। এটি যে অতীব শক্ত একটা কাজ, তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। না হলে কী আর কবিগুরু বলতেন, ‘সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে/সহজ কথায় যায় না লেখা সহজে।’

নেত্রকোনায় যাওয়া হল। তার নিজের বাড়ি। সঙ্গী সাথী অনেকেই আছেন। এক গাদা লোক এসেছেন ঢাকা থেকে। প্রচণ্ড শীত পড়েছে। মফস্বলের শীত ভয়াবহ পর্যায়ের। এই জাড়ের নিষ্ঠুর কামড় যারা না খেয়েছে, তারা বুঝতে পারবেন না। দুপুর বেলা নন্দিত কথাশিল্পী ঠিক করলেন, গোসল করবেন। যে শীত, তাতে নরমাল পানিতে গোসল করতে সাহস পাচ্ছেন না। গরম পানি দরকার। আমার কাছে লাজুক লাজুক কণ্ঠে বললেন, গোসল করতে চাই। একটু গরম পানি পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন না রে ভাই।

আমি একথা শুনে অবাক হলাম। ভারি অবাক। মুখ ফুটে সেটা বলেও ফেললাম। বললাম,

আশ্চর্য ব্যাপার তো হুমায়ূন ভাই। এটা আপনার নিজের বাড়ি। আমাকে বলছেন কিনা গরম পানির ব্যবস্থা করে দিতে। আপনি তো এখানে মেহমান না।

যা হোক, পানির ব্যবস্থা করে দিলাম। এই প্রসঙ্গটি এখানে উল্লেখ করলাম এই কারণে যে তিনি অসম্ভব আড্ডাপ্রিয় মানুষ হলেও ভেতরে ভেতরে ছিলেন প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ। চাপা স্বভাবের, আত্মমুখী, একা। প্রতিটি মানুষই তার নিজের ভেতরে একাকী, অপরিসীম নিঃসঙ্গ। কে জানে, সেই একাকিত্ব ভুলে থাকতেই হয়তো তিনি হৈ হুল্লোড়ে মেতে থাকতেন। তাও সব সময়ে না। জীবনের সায়াহ্নকালে তিনি নিজেকে অভিহিত করেছেন ‘গর্তজীবী মানুষ’ হিসেবে। নিভৃতি পছন্দ করতেন বলেই সভা সংঘে যেতেনই না প্রায়। ৬৪ বছরের জীবনে তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন দুই শতাধিক। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে তার বেশিরভাগই রয়েছে। অনেক বই তিনি উপহার দিয়েছেন আমাকে। আমাকে ও আমার স্ত্রী শাহীন আখতারকে উৎসর্গ করেছেন একটি উপন্যাস। সেটি যে বছর বেরোয়, বেস্ট সেলার হয়েছিল যথারীতি। এক বছরে ৪০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। বইটির নাম রবীন্দ্রনাথের গান থেকে নেয়া। নাম- ‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে’। এমন অনেক বইয়ের নামকরণে তিনি রবীন্দ্র শরণ নিয়েছেন। আমি যখন দৈনিক বাংলায় রিপোর্টার ছিলাম, তখন তাকে দিয়ে জোরজার করে কলাম লেখাতাম। সেটি বই আকারে বের হয়েছে পরে। সেটির নামকরণের ক্ষেত্রেও আমার ভূমিকা ছিল। উনার পছন্দ যেহেতু রবীন্দ্রসঙ্গীত, আমি তাই গীতবিতান নেড়েচেড়ে বেশ কয়েকটি নাম দিয়েছিলাম তাকে। তিনি পছন্দ করলেন যে নামটি, সেটি হল, ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’। বইটি বের করেছে কাকলী প্রকাশনী। সেই বইয়ের ভূমিকাটুকু এখানে উদ্ধৃত করে এই লেখার ইতি টানছি।

ভূমিকায় তিনি লিখেছেন...

লেখকদের কাছ থেকে লেখা আদায়ের অনেক রকম পদ্ধতি আছে। সবচেয়ে নিু শ্রেণীর পদ্ধতিটি হল- গলায় গামছা বেঁধে লেখা আদায়। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আমার কবিবন্ধু হাসান হাফিজ ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’র লেখাগুলো আমাকে দিয়ে লিখিয়েছেন। মাঝে মাঝে এমনও হয়েছে আমি ক্ষিপ্ত হয়ে ভেবেছি, বড় একটা ডাণ্ডা দিয়ে হাসান হাফিজের মাথায় শক্ত বাড়ি দেই। তারপর থানা পুলিশ যা হওয়ার হবে।

বই আকারে বের করার আগে লেখাগুলো পড়তে গিয়ে ভালো লাগল। মনে হল হাসান হাফিজকে সাময়িকভাবে ক্ষমা করা যায়।

আমি এর আগে একটি বই-এ লিখেছিলাম,- আত্মকথা জাতীয় লেখা আর লিখব না। এই বইটিতে কিছু সে রকম রচনা ঢুকে গেছে। পাঠক-পাঠিকারা আমার সে কথা না রাখার অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন- এই প্রার্থনা। বলতে ভুলে গেছি এই গ্রন্থের বেশিরভাগ লেখাই আমার প্রিয় পত্রিকা দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×