গল্প

লাশ

  সাদিকুল নিয়োগী পন্নী ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক.

টাকা পরিশোধ না করলে লাশ দেয়া যাবে না। এটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান। আমার কিছুই করার নেই। আপনি এখন যেতে পারেন। আমাকে কাজ করতে দেন।

চাচা মারা গেছে কয়েক ঘণ্টা হয়েছে। বাড়িতে নিয়ে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি টাকাটা পরে এসে দিয়ে যাব।

দয়া করে বিরক্ত করবেন না। এখানে সময় নষ্ট না করে আপনি বরং টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করেন।

প্রাইভেট হাসপাতালের হিসাবরক্ষক আজিজ সাহেবের কথায় বিমর্ষ হয়ে আবার লাশের কাছে ফিরে গেলেন মজনু।

নিথর দেহ। সাদা কাপড়ে ঢাকা। যে মানুষটির আশপাশে স্বার্থের জন্য সবাই মৌমাছির মতো ভনভন করত আজ তার পাশে কেউ নেই। প্রাণহীন দেহের মতো অমূল্য কিছু নেই। কত বিশেষণ দিয়ে যে নামটি মানুষ উচ্চারণ করত, আজ তার একটি একমাত্র পরিচয় ‘লাশ’। টাকার অভাবে এটি এখন বেওয়ারিশ লাশ। এমন হাজার কথা ঘুরপাক খাচ্ছে মজনুর মাথায়। মজনুকে চুপচাপ লাশের পাশে বসে থাকতে দেখে একজন আয়া জিজ্ঞাসা করলেন, এই লোক আপনার কী হয়?

মজনু বিরক্তি নিয়ে বললেন, কিছু হন না।

ভাই এভাবে বসে থেকে লাভ নেই। টাকা ছাড়া ওয়ার্ড থেকে লাশ বের করতে দিবে না। সময়মতো টাকা পরিশোধ করতে না পারলে বেওয়ারিশ হিসেবে হিমাগারে পাঠিয়ে দিবে।

আয়ার কথায় মজনু বলল, এত টাকা আমি পাব কোথায়?

আয়া বলল, ভাই এখানে টাকা ছাড়া কিছুই করতে পারবেন না। এমন কত দেখছি। চোখের সামনে লাশ হিমাগারে নিয়ে গেছে।

মজনু কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে লাশের পাশে বসে রইল। চোখ দিয়ে তার এখন আর কোনো পানি ঝরছে না। বেশি শোকে আর বিপদে পড়লে মানুষ হয়তো এমন হয়ে যায়।

দুই.

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায়। মজনু কখনও লাশের পাশে আবার কখনও বাইরে এসে পায়চারী করছে। মাথায় একটাই চিন্তা টাকা পাবে কোথায়? মনসুর মাস্টারের ছেলে-মেয়ে কেউ নেই। যে বিশাল সম্পত্তি ছিল তা অনেক আগেই দুই ভাতিজাকে লিখে দিয়েছেন। ভিটে মাটিটুকুও রাখেননি। মজনু চিন্তা করল বড় ভাতিজা রাসেলকে ফোন দিলে হয়তো কাজ হতে পারে। সে এখন লাখ টাকা বেতনের চাকরি করে। তাছাড়া রাসেলকে মনসুর মাস্টার নিজেই কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন। প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির ব্যবস্থাটাও তিনি এক বন্ধুর মাধ্যমে করে দিয়েছিলেন।

মজুন অনেক আশা নিয়ে রাসেলকে ফোন দিল। রাসেল কেটে দিল। রাসেল সহজে মজনুর ফোন ধরে না। রাসেলের ধারণা মজনুর ফোন মানেই টাকার আবদার। তারপরও হাল ছাড়ল না মজনু। কয়েকবার ব্যর্থ হয়ে ক্রমাগত ফোন দিতে থাকল। রাসেল ফোন ধরেই বলল, আবার কী ঝামেলা হয়েছে? চাচার অসুখ নাকি? চিকিৎসার টাকা পাঠাতে হবে?

জি না ভাইজান।

তাহলে বারবার ফোন দিচ্ছিস কেন?

ভাইজান জরুরি কথা ছিল।

তোর আবার জরুরি কথা। তোর ফোন মানে টাকা। আমার হাতে টাকা নেই। গতকাল বউ বাচ্চাকে নিয়ে মালয়েশিয়া গেছে ঘুরতে। এক টাকাও পাঠাতে পারব না ফোন কেটে দিল রাসেল।

মজনু নির্বাক হয়ে আবার লাশের কাছে চলে গেল। তখন প্রায় সন্ধ্যা। সকালে মারা গেছেন মনসুর মাস্টার। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে লাশ অনেকটা ফুলে উঠেছে। আশপাশে মাছি ভনভন করছে। মনসুর তা হাত দিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

এবার একজন ওয়ার্ড বয় এসে বললেন, লাশের একটা ব্যবস্থা করেন। এখানে নতুন রোগী উঠানো হবে। মরা মানুষ হাসপাতালে এত সময় রাখতে নেই। দ্রুত ব্যবস্থা নিন। না হয় রাতেই লাশ হিমাগারে পাঠানো হবে। তখন আরও ঝামেলায় পড়তে হবে।

মজনু কোনো কথা না বলে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে আবার ওয়েটিং রুমে এলো। ফোনটা হাতে নিয়ে রাসেলের নম্বর ডায়েল করতে তার ভয় হচ্ছে। তারপরও শেষ চেষ্টা হিসেবে আবার ডায়েল করল।

রাসেল এবার প্রথমে রিসিভ করেই কড়া সুরে বলল, তোদের জ্বালায় আর বাঁচলাম না। তোকে বলেছি না টাকা নেই।

ভাইজান স্যার মারা গেছেন।

মারা গেছেন আমি কী তাকে জীবিত করতে পারব। দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করে ফেল। আমার ছুটি নেই। আসতে পারব না।

মজনু স্যার বলা শেষ না করতেই রাসেল চেঁচিয়ে বলল, দাফন-কাফনের টাকাও আমাকে দিতে হবে। বেঁচে থাকতেও জ্বালাইছে। মরেও জ্বালাচ্ছে। কারও কাছ থেকে নিয়ে দাফন-কাফন করে ফেল। পুকুরের পাড়ের বড় রেইনট্রি গাছটা বিক্রি করে সে টাকা দিয়ে দিস। আমার পক্ষে এক টাকা দেয়াও সম্ভব না। আর কল দিবি না। সারাদিন অফিসের অনেক কাজ করে ক্লান্ত। আমি এখন খেয়ে ঘুমাব।

তিন.

রাত ১১টা। লাশের পাশে বসা মজনু। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। রাতের মধ্যেই একটা বিহিত করতে হবে। তার কাছে শেষ অপসন মনসুর মাস্টারের ছোট ভাতিজা মিলন। সেও একটা কোম্পানিতে ম্যানেজারের পদে চাকরি করে।

রাসেলের চেয়ে সে কিছুটা নরম স্বভাবের হলেও টাকার ব্যাপারে দুই ভাই একই রকম। আর মিলন মনসুর মাস্টারের ওপর অনেক বেশি ক্ষোভ। কারণ তাকে জমির অর্ধেক অংশ দিলেও বাড়ির বেশি অংশ রাসেলের নামে লিখে দিয়েছেন মনসুর মাস্টার।

তারপরও শেষ আশা নিয়ে মজনু কল করল মিলনকে।

মজনু বলল, মিলন ভাই বড় বিপদ।...

মিলন মজনুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, টাকা ছাড়া তোদের তো আর কোনো বিপদ নেই। চাচি মারা যাওয়ার সময় দাফন-কাফন থেকে শুরু করে সব টাকা আমাকে দিতে হয়েছে। বড় ভাইজান একটা পয়সাও দেয়নি। চাচার কোনো দুঃসংবাদ থাকলে আমাকে না বললেও হবে।

ভাইজান আমার কথাটা শুনেন।

বললাম তো চাচা জানের কিছু হয়ে থাকলে বড় ভাইকে ফোন দে। আমি টাকার গাছ লাগিয়ে রাখছি না যে ফোন করবি আর টাকা পাঠাব। আমারও একটা ভবিষ্যৎ আছে। আর ফোন দিবি না। রাতে বিদেশি কিছু মালের ডেলিভারি আছে। এখনই বের হতে হবে। ড্রাইভার বাসার নিচে অপেক্ষা করছে। বলে ফোন রেখে দিল মিলন।

মজনু কোনো কথা বলার সুযোগ পেল না। তার হাতে আর কোনো অপসন নেই।

মজনু ফোন রেখে লাশের কাছে যেতে চাইলে সিকিউরিটি গার্ড বাধা দিল। সে বলল, বারোটার পর ওয়ার্ডে অতিরিক্ত মানুষ থাকা যাবে না।

মজনু বলল, লাশের পাশে কেউ নেই।

সিকিউরিটি গার্ড বলল, ভাই লাশ হোক আর রোগী হোক যেতে পারবেন না। বড় স্যারের কড়া নিশেষ। আপনাকে ঢুকলে দিলে কেউ তা নালিশ করলে আমার চাকরি চলে যাবে। আপনি বারান্দায় কিংবা ওয়েটিং রুমের চেয়ারে গিয়ে বসেন। সকালে ডাক্তারদের রাউন্ড শেষ হলে আসবেন।

মজনু অসহায় হয়ে আবার ওয়েটিং রুমে না গিয়ে সিঁড়িতে গিয়ে বসল। তার কাছে পৃথিবীটাই নির্মম মনে হচ্ছে। সারাদিন না খাওয়া আর ক্লান্তিতে সিঁড়ির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল।

চার.

ফজরের আজানে ঘুম ভাঙল মজনুর। সারা রাত নানা স্বপ্ন দেখেছে মজনু। মজনুর মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা মনসুর মাস্টারের কাছে তাকে রেখে গিয়েছিল। কয়েকদিন পর মারা যায় তার বাবা। তারপর থেকে মজনু এই বাড়িতে বড় হয়েছে। মনসুর মাস্টার কখনও তাকে কাজের ছেলের মতো দেখেনি। সন্তানের স্নেহেই তাকে বড় করেছে। তার দুই ভাতিজার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মজনুর বিয়েটাও বেশ ধুমধাম করে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, মজনুর বউয়ের জন্য কয়েক ভরি স্বর্ণও দেয়া হয়েছি। মজনুর হঠাৎ মনে হল বউয়ের সেই অলঙ্কার বিক্রির টাকা দিয়ে হাসপাতালের টাকাটা দিলেই চাচার লাশ নেয়া যাবে। মজনুর আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করেই তার বাড়ির দিকে ছুটে গেল।

মজনুকে দেখে তার বউ রেশমা বলল, এত সকালে এলে। কোনো সমস্যা হল নাকি?

মজনু কোনো উত্তর না দিয়ে বলল, তোমার গয়নাগুলো আমাকে দাও? কোনোদিন টাকা হলে আমি বানিয়ে দিব?

কী হয়েছে বল?

মজনু আর আবেগ ধরে রাখতে পরল না। হাউমাউ করে কেঁদে বলল, মাস্টার চাচা মারা গেছেন। হাসপাতালে লাশ রয়ে গেছে। টাকার জন্য লাশ আনতে পারছি না।

রেশমাও এই সংবাদ শুনে ডুকরে কেঁদে মজনুকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ শুরু করল। রেশমাকেও মনসুর মাস্টার নিজ পুত্রবধূর মতো øেহ করত। বিয়ের পর মজনুকে বউসহ থাকার জন্য একটা ছোট ঘরও বানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। রেশমা আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে বলল, তুমি দাঁড়াও আমি ট্রাঙ্ক থেকে এখনই আনছি।

রেশমা সব গয়না নিয়ে মজনুর হাতে দিয়ে বলল, আমিও যেতে চাই তোমার সঙ্গে।

তোমার যেতে হবে না। তুমি বাড়িতে অপেক্ষা কর। আমি দুপুরের মধ্যে লাশ নিয়ে আসছি। আর আশপাশের কেউ হয়তো খবরটা জানে না। তুমি পারলে তাদের খবরটা দিও। এই বলে মজনু ছুটল কাছের একটি বাজারের স্বর্ণকারের দোকানে। সেখান তা বিক্রি করে আবার রওনা দিল হাসপাতালে।

পাচ.

দুপুর ১টা। হাসপাতালের দেনা মিটিয়ে একাউন্সের ছাড়পত্র নিয়ে ছুটে গেল ওয়ার্ডেও সেই বেডে। কিন্তু সেখানে লাশ নেই। নতুন একজন রোগী। মজনু আয়াকে বলল, এই বেডের লাশ কোথায়? তারপর কাগজ দেখিয়ে বলল আমি টাকা পরিশোধ করে এসেছি।

আয়া বলল, সকাল পর্যন্ত কাউকে না পেয়ে লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে হিমাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে যোগাযোগ করেন।

মজনু ছুটে গেল হিমাগারে। কাজগপত্র দেখানোর পর হিমাগারের দায়িত্বরত লোক বলল, এখানে অনেক লাশ আছে। বাক্সগুলো খুলে আপনি শনাক্ত করতে পারলে নিতে পারবেন।

মজনু একটার পর একটা লাশ দেখে যাচ্ছে। অধিকাংশ লাশের চেহারা বিক্রিত একটাও চেনার উপায় নেই। আর মনসুর মাস্টারও সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে তাকে হাসপাতলে ভর্তি করা হয়েছিল। বাসের একটা চাকা তার ওপর দিয়ে চলে গিয়েছিল। হাসপাতালে আনার কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হয়। থেঁতলে যাওয়া চেহারা মজনু চিনতে পারছে না।

দায়িত্বরত লোক মজনুকে বলল, ভাই এখানে বেশি সময় থাকা যাবে না। না চিনতে পারলে চলে যান। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত হলে নিয়ে যাবেন।

কিন্তু মজনু সে দিকে খেয়াল না করে একটার পর একটা লাশের মধ্যে মাস্টার চাচাকে খুঁজে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×