সেই গল্পটা না লিখতে পারলে আমি আর কিছুই লিখতে পারতাম না: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

  সাইফুর রহমান ০২ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাইফুর রহমান
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাইফুর রহমান

বর্তমান বাংলা সাহিত্যের জীবন্ত কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর, বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহে। তাদের আদিনিবাস ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে।

ময়মনসিংহে তার জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তার পরিবার কলকাতা চলে যান। এ সময় রেলওয়েতে চাকরিরত পিতার সঙ্গে তিনি আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তার জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কুচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

পরে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।

তার প্রথম গল্প ‘জলতরঙ্গ’ শিরোনামে ১৯৫৯ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পর ওই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে ‘ঘুণ পোকা’ নামক তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়।

ছোটদের জন্য লেখা তার প্রথম উপন্যাস ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’সহ অসখ্য জনপ্রিয় শিশুতোষ গল্প-উপন্যাস রয়েছে। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৮৫ সালে বিদ্যাসাগর পুরস্কার, ১৯৭৩ ও ১৯৯০ সালে দু’বার আনন্দ পুরস্কার, ১৯৮৮ সালে ‘মানবজমিন’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার এবং সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০১২ সালে বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন।

সম্প্রতি এ কৃতী সাহিত্যিকের সঙ্গে সাহিত্য এবং তার জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশের এই সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল গল্পকার

সাইফুর রহমানের। সেই আলোচনার অংশবিশেষ যুগান্তর পাঠকের জন্য পত্রস্থ হল। বি.স.

সাইফুর রহমান : আপনার স্কুল জীবনের লেখালেখির বিষয়ে কিছু বলুন। স্কুলের পত্রিকার সম্পাদক সনৎ চট্টোপাধ্যায় আপনার লেখালেখির গোপন খাতা থেকে একটা গল্প ছিঁড়ে নিয়ে ছেপে দিলেন। ছাপা গল্প আর ছাপা নাম দেখে আপনার বিস্ময়াবিষ্ট শিহরণ আর ফুরোয় না। এরপর ওই সময়ে আর কোনো গল্প ছাপা হয়নি কোথাও? এরপর কীভাবে ধিরে ধিরে লেখক হয়ে উঠলেন আপনি সে গল্প যদি শোনাতেন আমাদের।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় : স্কুল ম্যাগাজিনে সেই একবারই ছাপা হয়েছিল। তারপর যখন কলেজে ভর্তি হই, কুচবিহারে সে সময়কার ভিক্টোরিয়া কলেজে দু’বছর পড়েছিলাম। তখন ওখানে দু’বছরে দুটো গল্প লিখেছিলাম কলেজ ম্যাগাজিনে।

গল্প দুটোর নাম কি আপনার মনে আছে?

: না, কিচ্ছু মনে নেই এখন। ছেলেমানুষি গল্প। সেসব কি আর মনে আছে!

রিণত বয়সে আপনার প্রথম গল্প ছাপা হয়েছিল ‘দেশ’ নাকি ‘একতা’ নামের পত্রিকায়।

: একতায় ছাপা হয়েছিল। একতা মানে আমাদের ইউনিভার্সিটি ম্যাগাজিন। সেখানে ছাপা হয়েছিল। গল্পের নাম ছিল ‘বিকালের মৃত্যু’। সেটাতে একটা বিদেশি গল্পের সামান্য ছায়াও ছিল। তারপর আমি যখন দেশ পত্রিকায় গল্প পাঠালাম, তখন প্রথম দুটি গল্প রিজেক্টেড হয়। তারপর তৃতীয় গল্পটা আমার মনোনীত হল। গল্পের নাম ছিল ‘জল তরঙ্গ’।

তাহলে কি একতা’য় ছাপা গল্পটা-ই আপনার প্রথম গল্প হিসেবে ধরা যায়?

: প্রথম গল্প হিসেবে ধরা যায়। তবে সেটি ইউনিভার্সিটি ম্যাগাজিন।

একতা আর দেশ পত্রিকায় কি কাছাকাছি সময়ে ছাপা হয়েছিল?

: না, না, না। একতা ইউনিভার্সিটি ম্যাগাজিন। অনেক আগে। পরে ছাপা হয়েছে দেশ পত্রিকায়।

আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহে কিন্তু আপনাদের পৈতৃক নিবাস বিক্রমপুরের বানিখারা গ্রামে। এরপর শৈশব কৈশোর ও যৌবনকালজুড়ে বারবার ঠাঁইনাড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুরের মতো বড় শহরে আবার জয়দেবপুর, মেহের কালীবাড়ি, মুক্তাগাছা শহরে। একমাত্র উজান উপন্যাসটি ছাড়া সেসব স্থান কিংবা অভিজ্ঞতার কথা কি উঠে এসেছে আপনার অন্য আর কোনো গল্প কিংবা উপন্যাসে ?

: কয়েকটাতে আছে। যেমন ‘দূরবীন’-এর মধ্যে ময়মনসিংহের কথা আছে একটা পার্টে। এটা তো টু পার্ট। একটা পার্টে ময়মনসিংহের কথা প্রচুর আছে।

আপনি তখনও পড়তে শেখেননি, আপনার মা দুপুরে আপনাকে পাশে শুইয়ে রেখে পড়ে শোনাতেন মহুয়া, পুরবী বা গীতাঞ্জলির কবিতা। বাড়িতে আসত ‘শনিবারের চিঠি’, ‘আনন্দবাজার’সহ আরও নানারকম পত্রপত্রিকা। আপনাদের বাড়িতে বইও ছিল অনেক। আপনি কি নিজে স্বপ্রণোদিত হয়েই বই পড়ায় মজেছিলেন না কি আপনার পরিবারের কেউ আপনার বই পড়ার নেশায় উৎসাহ জুগিয়েছিলেন?

: আমার পরিবারে এমনিতে পড়ুয়া সবাই। ঠাকুমা, দাদু, আমার বাবাও প্রচুর বই পড়ুয়া ছিলেন। আমার মাও বই পড়তেন। ফলে আমাদের বাড়িতে একটা পাঠ্যাভ্যাস বরাবরই ছিল। আমরা চার ভাইবোন। এর মধ্যে আমি ছাড়া তাদের কারও বই পড়ার খুব একটা নেশা ছিল না। আমার প্রচণ্ড নেশা ছেলেবেলা থেকেই ছিল। কেউ আমাকে উদ্বুদ্ধ করেনি। আমি গল্পের বই পড়তে খুব ভালোবাসতাম। তখন তো বাচ্চাদের গল্পই পড়তাম। আর বড়দের লেখাও পড়তাম। বাড়িতে আমাকে কেউ কিছু বলত না।

উজান আপনার অসামান্য একটি উপন্যাস। শৈশব স্মৃতির অনেকটাই ধরা আছে আপনার সেই উপন্যাসে। আপনার নাম তো শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তো উজান উপন্যাসে আপনার নাম মধুসূদন কেন?

: উপন্যাসটা তো পুরোপুরি আমার জীবন নিয়ে নয়। এখানে আমার জীবনের কিছু কথা আছে। পুরো উপন্যাসটা আত্মজীবনী নয়। তাই আমার নিজের নামটা দেয়া প্রয়োজন মনে করিনি।

মধুসূদন চট্টোপাধ্যায় নামটা কাল্পনিক নাকি এটাও...?

: নামটা কাল্পনিক, তবে চরিত্রটার মধ্যে আমি খানিকটা আছি। সবটা নেই।

লেখালেখির শুরুতে আপনাকে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। দেশ থেকে আপনার লেখা দু’বার ফেরত এসেছে। ‘পরিচয়’ পত্রিকা থেকেও আপনার লেখা ফেরত এসেছে। আপনার স্মৃতিকথায় লিখেছেন- আপনাকে ঘিরে তখন ফেরতের প্রেতনৃত্য। ১৯৫৯ সালে দেশ পত্রিকায় আপনার প্রথম গল্প ছাপা হয় ‘জলতরঙ্গ’ নামে। ওই সময়ে আপনার কোন লেখাটি প্রথম পাঠক সমাজে আলোচিত বা প্রসংশিত হয়েছি?

: আলোড়ন জাগানোর মতো কোনো লেখা আমার ছিল না। আমার লেখাগুলো একটু কঠিন ছিল বোঝার পক্ষে। সাইকো এনালাইসিসের মতো ব্যাপার থাকত। যে কারণে আমার লেখাগুলো প্রথম দিকে খুব জনপ্রিয় ছিল না। তো আমার কোনো লেখা একদম সাড়া পড়ে গেল এরকম কিছু হয়নি। অনেক পরে ঘুণপোকা, পারাপারের পরে কিছুটা পাঠক সাড়া পেয়েছি। আমার যা কিছু হয়েছে, তা খুব আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে একটু একটু করে হয়েছে। রাতারাতি আমি কোনো খ্যাতি অর্জন করতে পারিনি।

আপনি বলেছেন- আপনার উপন্যাস ‘ঘুণ পোকা’র নায়ক শ্যামের সঙ্গে আপনার জীবনের কিছু কিছু মিল আছে। সে প্রসঙ্গে বলতে হয় লেখক মাত্রই বিশেষ একটা দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনকে দেখেন এবং তার লেখা শিল্পকর্মের মধ্যে সেই কারণেই একটা স্বাতন্ত্র্য লক্ষ করা যায়। বিখ্যাত লেখক রবার্ট ব্রিজেস্ হয়তো এ কারণেই বলেছেন যে- কাজ বা সাহিত্য হচ্ছে লেখকের নিজের জীবনেরই প্রতিধ্বনি। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

: খানিকটা থাকে, সবটা নয়। আত্মজীবনী ছাড়া নিজের লেখার মধ্যে খানিকটা হয়তো নিজের কথা লেখা থাকে। অল্প হলেও থাকে। তবে আমার সব লেখায় কিন্তু তা নেই, সব লেখায় আমার ছায়া পাবেন এমন না। মোটামুটিভাবে কোনো কোনো লেখায় আছে।

আপনার প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণ পোকা’ প্রকাশের পর সে সময়ে পাঠক সমাজে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া (ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক) হয়েছিল? প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, আপনার সতীর্থ লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’ প্রকাশিত হওয়ার পর বুদ্ধদেব বসু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে বলেছিলেন- লেখকের নাম সুনীল আবার উপন্যাসের নায়কের নামও সুনীল। এটা কেমন কথা? সুনীলের সেই উপন্যাস তার তেমন একটা পছন্দ হয়নি। অন্যদিকে আপনার আরেক সতীর্থ লেখক সমরেশ মজুমদারের প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’ পড়ে সে সময়ের আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক সন্তোষকুমার ঘোষ প্রশংসা করেছিলেন। আপনার উপন্যাসের ক্ষেত্রে তেমন কিছু প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইছি।

: আমার ‘ঘুণ পোকা’র প্রতিক্রিয়া খুব কম হয়েছিল। মুষ্টিমেয় কয়েকজন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। বন্ধুরা তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। ভালো লেখা না খারাপ লেখা, কেমন লাগল, এসব তেমন কেউ জানায়নি। অনেক দিন খুব উন্মুখ ছিলাম কিন্তু তেমন কোনো রিঅ্যাকশন আমি পাইনি।

আপনার তো নদীর ধারে জন্ম। নদী নিয়ে আপনার অনেক আক্ষেপও আছে। নদী নিয়ে আপনি অনেক স্মৃতিচারণও করেছেন। তো নদী নিয়ে একটা উপন্যাস হতে পারত কিনা! যেমন: পদ্মা নদীর মাঝি, তিতাস একটি নদীর নাম। এ ধরনের কেন উপন্যাস আপনি লেখেননি, ভবিষ্যতে লেখার কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?

: না। আমার উজান উপন্যাসে আমি খানিকটা নদীর কথা বলেছি। আর নদী জিনিসটা জীবনের একটা প্রতিরূপ। জীবনের একটা প্রবাহ। এক জায়গা থেকে শুরু হয়ে সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে। পুরোটাই জীবনের সঙ্গে একটা মিল আছে। আর সমুদ্রের চেয়েও নদী আমার প্রিয়। কারণ নদী তো ছোট, অত বড় নয়, আর সে এত ভয়ংকর নয় এবং নদীতে জল-বাহন ও চলে। এসব নানা কারণে নদী আমার খুব প্রিয়।

আচ্ছা আপনি তো বলেছেন, আপনি আপনার জীবনে সবসময় অস্থিরতার মধ্যে থাকেন। আমার প্রশ্ন হল- সে অস্থিরতাগুলো কি আপনার লেখার পেছনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নাকি অনুপ্রেরণা জোগায়?

: কখনও কখনও বাধা সৃষ্টি করে আবার কখনও কখনও অনুপ্রেরণা জোগায়। আর আমার মাথার ওপর যার ছবিটা রয়েছে তিনি আমার গুরুদেব ঠাকুর অনূকুল চন্দ্র। তার কাছে গিয়ে আমি মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম।

তারপর আমি তার ছত্রছায়ায় চলতে থাকি। হ্যাঁ, কখনও কখনও খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পড়ি, কিন্তু আমি তার সঙ্গে মোকাবেলা করি। আবার সেই খারাপ পরিস্থিতিটা চলেও যায়। এটা আসা-যাওয়ার মধ্যেই আছে। আর এই মানসিক কষ্টতেই আমি ঠাকুরকে পেয়েছিলাম। যন্ত্রণাও পেয়েছি-ঠাকুরকেও পেয়েছি। সুতরাং বলা যায় যন্ত্রণা না পেলে ঠাকুরকেও পেতাম না।

তার মানে মাঝে মাঝে আপনাকে অনুপ্রেরণাও দেয় আবার মাঝে মাঝে আপনাকে পেছনেও টেনে ধরে?

: হ্যাঁ। বলতে পার দুটোই।

গল্পের খোঁজে লেখকদের নানা জায়গায় যেতে হয়, নানা দেশে নানা পরিবেশে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার দিনলিপিতে লিখেছেন- সব ধরনের লোকের সঙ্গে মিশতে হয়। সামারসেট মম এসেছিলেন ভারতবর্ষে, পাড়ি দিয়েছিলেন চিনে। গ্রাহামগ্রিন গেলেন আফ্রিকায়। জ্যাক লন্ডন হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ালেন চরিত্রের সন্ধানে। হেমিংওয়ে গল্পের খোঁজে এসেছিলেন ফ্রান্সে। তাছাড়া বিখ্যাত রুশ লেখক ও নাট্যকার আন্তন চেকভ টাকা দিয়ে গল্পের প্লট কিনতেন। ছোট গল্প হলে ১০ কোপেক। উপন্যাসের প্লট ২০ কোপেক। আপনিও কি গল্পের খোঁজে ঘুড়ে বেড়ান। নাকি আপনার সব গল্পের উৎস আপনার মস্তিষ্ক ও কল্পনা।

: না, সেটা একেবারেই নয়। তার কারণ হচ্ছে, আমি যা মাঝে মাঝে লিখি তা মনেই থাকে না। আমি জীবন দেখতে ভালোবাসি, আমি যে সব পৃথিবী ঘুরেছি তা নয়। কিন্তু ঠাকুরের কাজে আমি গ্রামে গ্রামে ঘুরেছি। সুন্দরবন থেকে শুরু করে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আমি ঘুরেছি। বাংলাদেশে গিয়েছি, আসামে গিয়েছি, শিবচর গিয়েছি, ত্রিপুরায় গিয়েছি। ঠাকুরকে না পেলে এ ঘুরে বেড়ানো হতো না। এই যে ঘুরে বেড়ানোটা এটা ঠাকুরের কাজেই করি। এসবের মাধ্যমে, ঠাকুরের কাজের মাধ্যমে আমি খুব উপকার পেয়েছি। অনেক মানুষকে কাছে পেয়েছি। গ্রাম-গঞ্জের জীবনটাকে আমি অনেক কাছে থেকে দেখেছি। অনেক গল্প জেনেছি। এটা আমার জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে গেছে।

আপনি তো রাতেরবেলা লিখেন?

: না। এখন রাত জাগাটা অনেক কঠিন হয়ে গেছে বয়সের কারণে। এখন দিনেও লিখি, রাতেও লিখি।

এখন তাহলে দু’বেলায় লেখেন, এক সময় তো শুধু রাতেরবেলায়ই লিখতেন?

: হ্যাঁ। একসময় শুধু রাতেরবেলাই লিখতাম। রাত দশটার দিকে বসতাম এবং দুইটা তিনটা পর্যন্ত লিখতাম। এখন আর সেই বিলাসিতা সম্ভব নয়, বয়সের কারণেই এখন একটু সতর্ক থাকতে হয়।

বিখ্যাত ফরাসি লেখক বালজাক, জার্মান লেখক শীলার কিংবা মার্কিন লেখক জ্যাক কেরুয়াকও রাতেরবেলায়ই লিখতেন। লেখার চাপ বেশি হলে শীলার দিনেরবেলাতেও লিখতেন কখনও সখনও। তবে ঘরের সব পর্দা টেনে সম্পূর্ণ কক্ষটি অন্ধকার করে তবেই লিখতে বসতেন। জ্যাক কেরুয়াক আবার ইলেকট্রিক বাতি নিভিয়ে মোমের আলোয় লিখতেন। ঠিক যেমন কবি বিনয় মজুমদার তার আত্মপরিচয় বইটিতে লিখেছেন- আমার বাসস্থান আমার দিদির বাড়িতে বিদ্যুতের আলো ছিল। কিন্তু আমি বৈদ্যুতিক আলো না-জ্বেলে মোমবাতি জ্বালতাম। মাঝে মাঝে সরষের তেলের একটি মাটির প্রদীপও জ্বালতাম। এই আলোতেই লেখাপড়া করতাম। মোমবাতি জ্বেলে লিখলাম ‘আমার এই মোমবাতি...’ কবিতাটি। আপনার কি সে ধরনের কোনো বাতিক কিংবা রুটিন করে লেখার অভ্যেস আছে?

: না, আমার সে ধরনের কোনো বাতিক নেই। আমি চেয়ার-টেবিলে বসে লিখি। তবে এখন আর চেয়ার-টেবিলে বসে খাতা কলমে লিখি না। এখন আমি ট্যাবে লিখি। হাতের লেখাটা আগের চেয়ে খারাপ হয়ে গেছে।

অনেক লেখক আছেন যারা ভীষণ খুঁতখুঁতে। তাদের লেখালেখিতে সংশোধন ও পরিবর্তনের যেন আর শেষ নেই। ছাপা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কেবলই এখানে ওখানে অদল-বদল চলে। জেমস থারবার নামে একজন বিখ্যাত লেখক ছিলেন যিনি একটি গল্প নতুন করে বার পনেরো লেখেন। আবার কেউ কেউ পরিবর্তন ও সংশোধন পছন্দ করেন না। প্রথমবার যা লেখা হয়েছে মোটামুটি সেটাই থেকে যায়। তাদের মতে বারবার ঘষামাজা করলেই যে লেখার মান উন্নত হবে এমন কোনো কথা নেই। ফরাসি লেখিকা ফ্রাঁসোয়া সাগান লিখেছেন- ‘বজুঁর ত্রিসতেস’ এই বইয়ের সাতলক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে শুধু ফ্রান্সে। তার পরবর্তী বই A Certain Smile ও কম বিক্রি হয়নি। এই দুই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ একমাত্র আমেরিকায় বিক্রি হয়েছে কুড়ি লাখ কপি। অথচ সাগানের সংশোধন করবার ধৈর্য নেই। একবার যা লেখেন পাঠকদের হাতে প্রায় সেই লেখাই পৌঁছায়। আপনার পূর্বসূরি লেখক তারাশংকর কোনো কোনো লেখা দশ থেকে পনেরোবার নতুন করে লিখেছেন সে খবরও জানা যায় তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমার লেখক জীবন’ থেকে। আপনিও কি আপনার লেখার সংশোধন পরিবর্তন করতে পছন্দ করেন নাকি আপনার সংশোধন করার প্রয়োজন পড়ে না?

: না। আমি একবারেই লিখি। আর যা সংশোধন করার তা লেখার পাশাপাশিই করি। পুরো লেখার পর আর কাটাকাটি করি না। এমনকি লেখা পড়িও না। দ্বিতীয়বার আমার লেখার ওপর কলম চালাতে আমি পারি না।

বিখ্যাত লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তো আপনার শিক্ষক ছিলেন। আপনি কি কখনও তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন। আপনাকে নিয়ে তার কোনো উচ্চাশা কিংবা হতাশা এ ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া কি ছিল কখনও।

: না। তখনও তিনি জানতেন না যে আমি লেখালিখি করি। উনি মাত্র বায়ান্ন বছর বয়সেই মারা যান, কিন্তু মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে ওনার সঙ্গে একটা সেমিনারে আমার দেখা হয়। আমি বেশ লাজুক ছিলাম। আগে থেকে পরিচয় দিতাম না। তো উনি আমাকে ডাকলেন, আমার সঙ্গে কথা বললেন। শুনে মনে হল, উনি শুনেছেন যে আমি লেখালিখি করি এবং আমার নাম উনি আগেই শুনেছেন।

উপদেশ দিয়েছিলেন কিছু?

: না।

আপনার ‘হীরের আংটি’, ‘পাতালঘর’, ‘ছায়াময়’, ‘গয়নার বাক্স’, ‘গন্ধটাবেশ সন্দেহজনক’ প্রভৃতি লেখাগুলোয় দুর্দন্ত গল্প পাওয়া যায়। আবার অন্যদিকে আপনার অনেক লেখাতে কোনো গল্প নেই। আপনার শিক্ষক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন- ছোট গল্প যে জাতেরই হোক রাজনীতি, মনস্তত্ত্ব, দর্শন, অপরাধ, বৈজ্ঞানিক কল্পনা, যাই হোক তার অবলম্বন, মূলে গল্প একটা থাকতেই হয়। তার এ বক্তব্যের সঙ্গে আপনি কতটা একমত?

: গল্পটা আসলে মুডের ওপর নির্ভর করে। কখনও কখনও ছোট্ট একটা জিনিসকে বড় গল্প বানানো যায়। গল্পটা আসলে গভীরতার ওপর নির্ভর করছে। ঘটনার ওপরও নির্ভর করা যায়। দুনিয়াতে ঘটনা তো নতুন করে আর ঘটছে না। যা ঘটার সবই ঘটে গেছে। লেখাও হয়ে গেছে মোটামুটি সব।

আপনার কোনটা পছন্দ? গল্প থাকা, নাকি না থাকা?

: দু’বাই পছন্দ। থাকা এবং না থাকা।

‘স্বপ্নের ভিতর মৃত্যু’ গল্পটি লিখতে আপনার প্রায় পৌনে দু’বছর সময় লেগেছিল। আপনি নিজেই বলেছেন স্বপ্নের ভিতর মৃত্যু গল্পটি লিখতে গিয়ে আপনার নিজের লেখালেখির জীবনের মৃত্যু লক্ষণ ফুটে উঠেছিল। বারবার আপনার মনে হয়েছে আর কোনোদিন হয়তো আপনি লিখতে পারবেন না। এ ধরনের সমস্যা কিংবা অনুভূতি কি এখনও হয় মাঝে মধ্যে। একটি গল্প ও উপন্যাস লিখতে আপনার এখন গড়পড়তা কতটুকু সময় লাগে?

: না। এখন আর সে ধরনের কিছু হয় না। সেই গল্পটা আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। কারণ সেই গল্পটা আমি না লিখতে পারলে আমি আর কিছুই লিখতে পারতাম না। গল্পটা লিখতে পৌনে দুই বছর লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু যখন লেখা শেষ হল তখন আমার মনে হল, আমি যা লিখতে চেয়েছি তা লিখতে পেরেছি।

একটা গল্প বা একটা উপন্যাস লিখতে আপনার কত সময় লাগে?

: ঠিক নেই। উপন্যাস লেখার জন্য তো এখন তেমন সময় পাওয়া যায় না। উপন্যাস লেখার জন্য অনেক সময় প্রকাশকরা এক বছর সময় দেন, কিন্তু আমি তো অলস লোক তাই তাড়াহুড়া করি। দুই মাস আড়াই মাসে শেষ করি।

আর গল্প লিখতে কতদিন লাগে?

: ঠিক নেই। কখনও কখনও মাথায় থাকলে সঙ্গে সঙ্গেই লেখা হয়ে যায়। আর কখনও কখনও কষ্ট করে আনতে হয়। তখন সময় লাগে।

আপনাদের পূর্বসূরি একজন বিখ্যাত লেখক ছিলেন প্রেমাঙ্কুর আতর্থী নামে। তার একটি অসামান্য উপন্যাস ‘মহাস্থবির জাতক’ যখন ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছিল ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায়। সেই উপন্যাস পড়ে আপনার সেকি আশ্চর্য রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। স্থবির শর্মা নামে ছেলেটির সঙ্গে নিজের জীবনের আশ্চর্য মিল পেয়ে যাচ্ছেন প্রতি সংখ্যায়। সেই উপন্যাস পড়ে আপনি কত কেঁদেছেন। এ রকম আরও দু-চারটি গল্প উপন্যাসের নাম মনে পড়ে যা আপনাকে আলোড়িত ও উচ্ছ্বসিত করেছিল।

: ‘পথের পাঁচালি’, ‘আরণ্যক’, ‘ইছামতি’, দস্তেয়ভস্কির ‘ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাসগুলো মুগ্ধ হয়ে পড়েছি।

বাংলাভাষার আপনার প্রিয় লেখক কে? কোন লেখকের লেখা আপনাকে বেশি টানে।

: অনেকই আছেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আছেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ভালো লাগে। বিদ্যাসাগর আছেন, মাইকেল মধুসূদনের লেখা ভালো লাগে। রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই। জীবনান্দ দাশ, এঁদের লেখা ভালো লাগে।

বিদেশি লেখকদের মধ্যে কার লেখা আপনি পড়েন। অথবা যৌবনে পড়েছেন?

: আমি বরাবরই রুশ লেখক দস্তেয়ভস্কির ভক্ত। তার লেখা আমার ভালো লাগে। কাফকা আমার প্রিয়, ওনার গল্পগুলো খুব নৈরাশ্যবাদী, গল্পগুলোয় জীবনের হতাশা ফুটে উঠেছে। কামুর গল্পগুলোও একই ধরনের। এ ধরনের হতাশাজনক গল্প আমার সবসময় ভালো লাগে না। কিন্তু গল্প লেখার মুনশিয়ানায় ওনারা সেরা এ কথা মানতেই হয়।

তলস্তয়?

: হ্যাঁ। তলস্তয় অনেক পড়েছি। ‘আনা কারেনিনা’, ‘ওয়ার এন্ড পিস’। এগুলো আমার পড়া।

তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে কার লেখা আপনার বেশি ভালো লাগে?

: বিভূতিভূষণের লেখা বেশি ভালো লাগে।

বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’ ও ‘ইছামতি’ উপন্যাস দুটো নোবেল পেতে পারত এটা আপনি বিশ্বাস করেন?

: হ্যাঁ অবশ্যই।

আপনার এক সাক্ষাৎকারে পড়েছি একবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নাকী কি একটা কারণে ভীষণ রেগে গিয়ে শক্তিকে থাপ্পড় মেরেছিলেন। এ প্রসঙ্গে দুই নোবেল বিজয়ী লেখক মার্কেজ ও মারিও ভার্গাস ইয়োসার কথা মনে পড়ে গেল। নারী ঘটিত বিষয়ে ইয়োসা একবার সজোরে ঘুষি মেরেছিলেন মার্কেজের মুখে। সে এক ইতিহাস। আমরা জানি শক্তি ও বুদ্ধদেব বসুর কন্যা মীনাক্ষীর মধ্যে তখন প্রেম চলছিল অন্যদিকে সুনীলও নাকি মীনাক্ষীকে দারুণ পছন্দ করতেন। সেসব বিষয় ও কফি হাউসের আড্ডা বিষয়ে যদি কিছু বলতেন।

: আড্ডা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম হতো। আর এমনিতে শক্তি সেদিন একটু মাতলামি করেছিল। সুনীল তো ভালো মানুষ। চট করে সে লোকের গায়ে হাত তোলে না। মানে শক্তি মাঝে মাঝে একটু উল্টাপাল্টা করত বলেই হয়তো থাপ্পড় মেরেছিল। আমরা মাঝে মধ্যে সবাই একসঙ্গে বসতাম, আবার মাঝে মাঝে আলাদা আলাদাও বসতাম।

বিখ্যাত লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, মুস্তফা সিরাজ এরা তো আপনার কাছের ছিলেন

: আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ ও বন্ধু ছিল মুস্তফা সিরাজ।

আপনার ভূতের গল্পগুলোয় একটা প্যাটার্ন লক্ষ করা যায়, সেটা হল আপনার গল্পের ভূতগুলো হয় ভালো ও উপকারি। ‘গোঁসাইবাগানের ভূত’, ‘গন্ধটা বেশ সন্দেহজনক’, ‘চকদিহির তেনারা’ কিংবা ‘কালাচাঁদের দোকান’ প্রভৃতি গল্পগুলোয় আমরা দেখি উপকারি সব ভূত। তো আপনার ভূতের গল্পগুলো এরকম কেন?

: আমি ভূতের গল্প সাধারণত ভয় দেখানোর জন্য লিখি না। আনন্দ দেয়ার জন্যই লিখি।

এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে আপনি ভূত বিশ্বাস করেন। আপনি নাকি ভূত দেখেছেনও। ভূত দেখার সেই অভিজ্ঞতাটা যদি শেয়ার করতেন।

: ভূত দেখা নয়, ভূতের উপস্থিতি টের পাওয়া। সেটা হল, আমাদের বাড়িতে আমার ছোটবেলায় কাঠের একটা বার্মাটিক টেবিল ছিল। ডাইনিং টেবিল। টেবিলটা অনেক ভারী ছিল। সেটা আমরা এক ইংরেজ সাহেবের কাছ থেকে কিনেছিলাম। বাবা ইংরেজ সাহেবের কাছ থেকে অল্প দামে কিনেছিলেন। প্রায় প্রায়ই রাত একটা কিংবা দেড়টার দিকে এই টেবিলের চারপাশে একজন ম্যাম সাহেব ঘুরতেন। মেমসাহেব সম্ভবত সেই ইংরেজ সাহেবের স্ত্রী ছিলেন। তার হিলের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেতাম। একদিন হয়নি, দুই দিন হয়নি, বরং চার পাঁচ বছর ধরে চলেছিল এ কাণ্ড। এবং এটা আমার স্বপ্ন নয় বরং স্বচক্ষে দেখেছিলাম। প্রথম প্রথম আমি খুব ভয় পেতাম কাউকে ডাকতাম না। রাত একটা কিংবা দেড়টার দিকে হঠাৎ করেই আমার ঘুম ভেঙে যেত এবং আমি টের পেতাম যে মহিলাটা এসেছে এবং টেবিলের চারপাশে ঘুরছে। মাসে দু’তিন দিন হতো এমন। আমি কাউকে ডাকতাম না। চুপ করে থাকতাম। আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে গেল। জল ভাতের মতো।

তখন আপনার কত বছর?

: তখন আমার ছয় কি সাত বছর। তারপর যখন জয়দেবপুরে ভাড়া বাসায় ছিলাম। তখনও কিছু ভৌতিক ঘটনা ঘটেছিল। বাড়িওয়ালার মেয়ে সুইসাইড করেছিল। শুধু আমি নই আমার স্ত্রীও ভূতের সেই উপস্থিতি টের পেত।

লেখক খ্যাতি পেতে বুদ্ধদেব বসুর মতে একজন লেখকের নাকি অনেক লেখা উচিত। অন্যদিকে প্রাশ্চত্য দেশগুলোয় দেখা যায় তারা খুব বেশি লেখেন না। বরং তারা অনেক সময় নিয়ে লেখেন। ভিক্টর হুগো ২০ বছর ধরে লিখেছিলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘লা মিজারেবল’। ফরাসি লেখক আঁদ্রে জিদ সিঁমেন হয়তো একটু ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি স্বনামে দেড়শ ও ছদ্মনামে লিখেছেন ৩০০’রও বেশি উপন্যাস।

আমি জানতে চাইছি বুদ্ধদেব বসুর মতের সঙ্গে আপনি একমত কিনা

: এমন বলা যায় না যে, একজন লেখককে অনেক লিখতে হবে। বঙ্কিম অনেক কম লিখেছেন। আরও অনেকেই অনেক কম লিখেছেন। লেখালিখির বিষয়টা সম্পূর্ণ নির্ভর করে লেখকের নিজের ওপর।

আপনি হুমায়ূন আহমেদ পড়েছেন?

: হুমায়ূন আহমেদের কিছু বই একজন প্রকাশক আমাকে দিয়েছিল। আমি অনেক লেখা পড়েছি ওর। সব লেখা পড়েছি এমন নয়। নাম মনে নেই। লেখা ভালোই লাগে। কিন্তু সায়েন্স ফিকশনগুলো অনেক ভালো। আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তো আপনার একবারই দেখা হয়েছিল?

: হ্যাঁ। আমি একবার হুমায়ূনের বাড়িতে গিয়েছিলাম। প্রায় জোর করেই একজন প্রকাশক নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে, না জানিয়েই। আমার ভালোই লেগেছিল।

সে তো আপনাকে গুরু বলে সম্বোধন করত?

: হ্যাঁ।

আপনি বলেছিলেন, লেখালিখির ক্ষেত্রে প্রত্যেক লেখককে নিজস্ব একটা স্টাইল তৈরি করতে হয়। কমলকুমার মজুমদারের লেখা কি আপনার পছন্দ হয়?

: তিনি কৃত্রিম গদ্য লিখতেন। স্বাভাবিক গদ্য লিখতেন না। কথা হচ্ছে যে, কিছু লেখা অনেক ভালো যেমন- অন্তজর্লী যাত্রা। আবার ওনার সব লেখাই যে ভালো এমন নয়।

সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, যে লেখায় রস থাকে না, সেই লেখাকে তিনি পদবাচ্য বলে মানেন না

: হ্যাঁ। রস তো অনেক রকম আছে। সবার সব রকমের রস ভালো লাগে না। যেমন কমলকুমার মজুমদারের লেখা আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু সবার ভালো লাগবে এমনটা আশা করা ঠিক নয়।

আপনি এক জায়গায় বলেছিলেন সন্দীপের গদ্যের টেকনিক ভালো। কিন্তু প্রাণ নেই। একটু ব্যাখ্যা করবেন?

: ওর লেখায় আসলে গল্প থাকে না। থাকলেও গল্পগুলো খুব পুরনো গল্প। তবে লেখার কায়দাটা নতুন। ওর গল্পগুলো গল্প হিসেবে খুব দুর্বল। তবে সে বেশ বুদ্ধি করে লিখেছে। স্টাইলটা নতুন। ওর লেখার চেয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার অনেক গভীরতা আছে। একটা নতুন আঙ্গিক সন্দীপন তৈরি করেছে।

আপনার জন্ম ২ নভেম্বর ১৯৩৫। সামনের নভেম্বরে ৮৪ বছর। দীর্ঘ জীবনের এই পথচলায় কোনো পূর্ণতা কিংবা অপূর্ণতা আছে কি? যদি বলতেন?

: পূর্ণতা ও অপূর্ণতা আসলে এমনিতে থাকে না এ রকম। কিন্তু বিষয় হচ্ছে যে, জীবনযাপন করতে গিয়ে নানারকম জিনিস শিখছি। আরও কত জিনিস শেখার আছে। কতকিছু শেখা হল না।

কোনো হতাশা?

: না। কোনো হতাশা নেই। যৌবনকালে আমাকে অনেক লড়াই করতে হয়েছিল দরিদ্রতার সঙ্গে। জীবনের শুরুতে। আমার শিক্ষকতার শুরুতে। তারপর আস্তে আস্তে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×