শিল্পের আলোয় ব্যঙ্গের ভুবন

  সেলিনা হোসেন ৩০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্পের আলোয় ব্যঙ্গের ভুবন

আবুল মনসুর আহমদের সাতটি গল্প নিয়ে আয়না গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালে। গল্পগুলো আঙ্গিকে শ্লেষাত্মক, পর্যবেক্ষণে মননশীল, ভাষার প্রকাশে তীক্ষ্ণধী এবং বিষয়-বৈচিত্র্যে সমাজমনস্ক।

প্রতিটি গল্পের ধার সময়কে কেটেছে তীক্ষ্ণ চিন্তায় এবং সময়কে অতিক্রম করেছে মানবজীবনের বহমান স্রোতে, যেটা বর্তমান সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। লেখার সূচনা হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে। পঁচানব্বই বছরের কাছাকাছি সময় ধরে এ গল্পগুলো আজকের সময়ের পাঠক-সমালোচকের কাছে সেই চিন্তার উদ্রেক করে, যেখানে সাহিত্য মানবজীবনের বহমানতায় সম্পৃক্ত।

বইয়ের ‘আয়নার ফ্রেম’ শিরোনামে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘এমনি আয়নায় শুধু বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায়; কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে।

যেসব মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপ মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে। মানুষের মুখোশ পরা এই বহুরূপী বনমানুষের সবাইকে মন্দিরে, মসজিদে, বক্তৃতার মঞ্চেও, পলিটিকসের আখড়ায়, সাহিত্য-সমাজে যেন বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।’

কবি কাজী নজরুল ইসলাম গল্পের সূত্র ধরে তার পর্যবেক্ষণে মানুষের মুখোশ পরা বহুরূপী মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন। কবি তার দেখার প্রসঙ্গ ধরে এসব মানুষের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, তারা জনজীবনের চারপাশেই থাকে। এ চারপাশ গল্পে উঠিয়ে আনার মুনশিয়ানায় আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন দৃঢ়প্রত্যয়ী কথাশিল্পী।

আয়না’র প্রথম গল্পটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গল্পের আবহ নির্মাণে তিনি কত দক্ষ। গল্পটির নাম ‘হুযুর কেবলা’। এই একটি গল্প বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাবে সমাজের কিছু কিছু মানুষের নীতিবিবর্জিত আচরণ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে অন্যের জীবন এবং সরল ব্যাখ্যায় বলা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত করে সমাজব্যবস্থা। ব্যক্তিগত স্বার্থ, লোভ, ক্ষমতার আধিপত্য এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে স্বার্থ হাসিল মানবিক জীবনসত্যকে কীভাবে বিড়ম্বিত করে।

আবুল মনসুর আহমদ ব্যঙ্গের প্রকাশের মাধ্যমে এসব বিষয় অ্যাড্রেস করেছেন। বিদ্রূপ লেখকের হাতিয়ার। অন্যায়কে মোকাবেলা করার হাতিয়ার। এ হাতিয়ার শাণিত হয় ব্যঙ্গের প্রকাশে। এই প্রকাশ যেমন দৃশ্যমান থাকে, তেমনি অদৃশ্যমানও থাকে। অদৃশ্যমান বিষয়টি লেখকের অন্তর্গত যন্ত্রণা, যা প্রবলভাবে তাকে বিষণ্ণ করে রাখে।

তিনি যে সততার জায়গা থেকে অন্যায়কে বিদ্রূপ করছেন, সে জায়গাটি কলুষিত হতে দেখা তার একটি বিবেচনা হয়ে দাঁড়ায়। তখন সে ভার বহন করা কঠিন হয়ে যায়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় লেখকের আয়না গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে। তিনি বইটি উৎসর্গ করেছেন আবুল কালাম শামসুদ্দীনকে।

লিখেছেন, ‘বন্ধুরা বলেছেন, এই বইয়ে আমি সবাইকে খুব হাসিয়েছি। কিন্তু এই হাসির পেছনে যে কতটা কান্না লুকানো আছে, তা তুমি যেমন জান, তেমন আর কেউ জানে না।’ ‘কান্না’ শব্দটি এখানে নিছক শব্দমাত্র নয়, লেখক এই শব্দের মধ্যে প্রতিফলিত করেছেন সাহিত্যের দায়। যে কাঙ্ক্ষিত সমাজব্যবস্থা দেখলে তিনি পরিতৃপ্ত হতে পারতেন, সেই সমাজব্যবস্থা তার সামনে নেই। সেজন্য তার অন্তর্গত ক্ষরণ শেয়ার করেছেন পাঠকের সঙ্গে।

তার সাহিত্যে তিনি ব্যঙ্গের মাধ্যমে একে যেমন প্রতিরোধ করেছেন, তেমনি অনাগত দিনের মানুষের কাছে গচ্ছিতও রেখেছেন তার সময়ের নেতিকে। যেন মানুষ এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে শুদ্ধ করতে পারেন বেঁচে থাকার ব্যবস্থাকে। ধর্মের নামে কোনো কোনো মানুষের যে মিথ্যাচার তা আজ পর্যন্ত এই সমাজকে কলুষিত করে রেখেছে। আবুল মনসুর আহমদের আয়না গল্পগ্রন্থ সমকালীন চিত্রকে অতিক্রম করে আগামীকালকেও দীক্ষা দিচ্ছে।

এভাবে সাহিত্য মানবস্রোতকে বহমানতার জায়গা থেকে দীক্ষিত করে। মানুষের দায় তার ইতিটুকু গ্রহণ এবং নেতিটুকু বর্জন। সাহিত্য চিরকালীন সত্যের পটভূমিতে মানবিক দর্শনের বিশুদ্ধ ক্ষেত্র। শিল্পের জায়গা থেকে যেমন সত্য, তেমনি দর্শনের জায়গা থেকেও। আয়না গল্পগ্রন্থ এ সময়ের পাঠককে সেই সত্য অনুধাবনে সহযোগিতা করে। সেজন্য এই গ্রন্থটি সাহিত্যের ধারায় টিকে গেছে, চোরাবালিতে পথ হারায়নি।

আবুল মনসুর আহমদ তার গল্পে ধর্মান্ধতাকে মোকাবেলা করেছেন কঠোরভাবে। ধর্মের নামে ভন্ডামিকে দেখেছেন আপসহীনভাবে। নারীর আবেদনকে দেখেছেন নির্ভুলভাবে। রাজনীতির আধিপত্যকে দেখেছেন সমাজ বাস্তবতায়।

এত কিছুর মাঝে উঠে এসেছে ব্যক্তির সংকট, যে সংকট ব্যক্তিকে নিঃশেষ করেছে। ‘হুযুর কেবলা’ গল্পের এমদাদ ব্যক্তির সংকটে নিমজ্জিত। ধর্মের পথে যাওয়ার জন্য ‘সংসারের একমাত্র বন্ধন এবং অভিভাবক বৃদ্ধা ফুফুকে কাঁদাইয়া একদিন এমদাদ সুফি সাহেবের সঙ্গে পীর-জিয়ারতে বাহির হইয়া পড়িল।’ পীরের মুরিদ হয়ে সে যা দেখল তার সঙ্গে ওর চিন্তার সঙ্গতি থাকল না। পীর সাহেবের খাওয়া দেখে ভাবল, ‘পীর সাহেবের রুহানিশক্তি যত বেশিই থাকুক না কেন, তার হজমশক্তি নিশ্চয়ই তার চেয়ে বেশি।’ এমদাদ দেখল, পীর সাহেবের ‘স্ত্রীলোকদিগকে ধর্ম কথা বুঝাইতে একটু দেরি হইত।’ এমদাদ আরও দেখল, ‘বাড়িওয়ালার ছেলে রজবের সুন্দরী স্ত্রী কলিমন সম্বন্ধে পীর সাহেবের ধারণা ছিল অন্যরকম। মেয়ে-মজলিশে ওয়াজ করিবার সময় তিনি ইহারই দিকে ঘন ঘন দৃষ্টিপাত করিতেন।’

পীর সাহেবের হাত-পা টিপে দেয়ার প্রয়োজন হতো। কারণ ‘নূরে ইযদানি তার চোখের ওপর আসিয়া পড়িত।’ এমদাদ খেয়াল করল, মেয়েদের সামনে ওয়াজ করার সময় হাত-পা টিপে দেয়ার প্রয়োজন বেশি হতো। ‘এসব ব্যাপারে এমদাদের মনে একটু খটকার সৃষ্টি হইল। কিন্তু সে জোর করিয়া মনকে ভক্তিমান রাখিবার চেষ্টা করিতে লাগিল।’

কিন্তু শেষ রক্ষা হল না এমদাদের। হুজুর যেদিন কলিমনকে নিজের জন্য হালাল করলেন, সেদিন এমদাদের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। ‘রজব তার এক বছর আগে বিয়ে করা আদরের স্ত্রীকে তালাক দিল এবং কাপড়ের খুঁটে চোখ মুছিতে মুছিতে বাড়ির বাহির হইয়া গেল। কলিমনের ঘন ঘন মূর্ছার মধ্যে অতিশয় ত্রস্ততার সঙ্গে শুভকার্য সমাধা হইয়া গেল।’ এমদাদ ‘এক লাফে বরাসনে উপবিষ্ট পীর সাহেবের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া তার মেহেদি রঞ্জিত দাড়ি ধরিয়া হেঁচকা টান মারিয়া বলিল: রে ভন্ড শয়তান! নিজের পাপ-বাসনা পূর্ণ করিবার জন্য দুইটা তরুণ প্রাণ এমন দুঃখময় করিয়া দিতে তোর বুক কাঁপিল না?’

সংগত কারণে এমদাদের এই দ্রোহে অন্য মুরিদদের সায় ছিল না। তাকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়ার হুকুম দিলেন পীর সাহেব। গল্পটি এখানে শেষ।

গল্পটি পাঠকের ভাবনাকে আলোড়িত করছে কেন? অবশ্যই বলতে হবে এর মূল কারণ লেখকের রচনাশৈলীর মুনশিয়ানা। বিষয়কে কত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা যায়, এই গল্প তার প্রমাণ। এটি একটি ভিন্ন আঙ্গিকের গল্প।

বিষয় অনুয়ায়ী প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহারে ভাষার উপযুক্ততা তৈরি। ব্যঙ্গাত্মক রচনা-ফর্ম গল্পের শিল্পবোধকে তীক্ষ্ণ করেছে। এই বইয়ে আরও ছয়টি গল্প রয়েছে-‘গো-দেওতা-কা দেশ’, ‘নায়েবে নবী’, ‘লীডরে-কওম’, ‘মুজাহেদীন’, ‘বিদ্রোহী সংঘ’ ও ‘ধর্ম-রাজ্য’।

লেখক সামাজিক বৈষম্যকে দেখেন আপন জিজ্ঞাসায়। ‘মুজাহেদীন’, ‘বিদ্রোহী সংঘ’ ও ‘ধর্ম-রাজ্য’। প্রতিটি গল্পের নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। এখানেই আবুল মনসুর আহমদের শিল্পী সত্তা পাঠকের দরজায় করাঘাত করে জাগিয়ে রাখে পাঠককে।

গল্পশৈলীর আরেকটি ব্যাখ্যা আয়না গ্রন্থের প্রতিটি গল্পেই মূর্ত হয়েছে। তা হল এর ব্যঙ্গাত্মক আঙ্গিক। বাংলাসাহিত্যের এই জায়গাটিকে তিনি শাণিত করেছেন।

বিশ্বজুড়ে সাহিত্যের এই ধারা সম্পর্কে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বইয়ের ভূমিকায় বলেছেন, ‘শুধু ইংরেজি সাহিত্যে নয়, সমৃদ্ধিশালী সব সাহিত্যেই ব্যঙ্গ-সৃষ্টি অভিনন্দিত হয়েছে।...বাংলা ভাষায় ব্যঙ্গ-সাহিত্য খুব উন্নত হয়নি, তার কারণ, ব্যঙ্গ-সৃষ্টিতে অসাধারণ প্রতিভার প্রয়োজন। ও যেন সেতারের কান মলে সুর বের করা- সুরও বেরুবে, তারও ছিঁড়বে না। আমি একবার এক ওস্তাদকে লাঠি দিয়ে সরোদ বাজাতে দেখেছিলুম। সেদিন সেই ওস্তাদের হাত-সাফাই দেখে তাজ্জব হয়েছিলুম।

আর আজ বন্ধু আবুল মনসুরের হাত-সাফাই দেখে বিস্মিত হলুম। ভাষার কান মলে রস সৃষ্টির ক্ষমতা আবুল মনসুরের অসাধারণ। এ যেন পাকা ওস্তাদী হাত।’ আবুল মনসুর আহমদের এই ওস্তাদি হাত বিংশ শতাব্দী ছাড়িয়ে একবিংশ শতাব্দীতেও আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে।

ধর্ম প্রত্যেক মানুষের জীবনের পবিত্র বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসকে তাড়িয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা ধর্মের অবমাননা। যারা এই কাজটি করেন, তাদের ভন্ডামিকে তিনি তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন। ধর্মের নামে নারীর অবদমনকেও দেখিয়েছেন আঙুল তুলে।

সমাজের প্রতি লেখকের অঙ্গীকার এভাবে বিম্বিত হয়। লেখক সামাজিক বৈষম্যকে দেখেন আপন জিজ্ঞাসায়। পরিশুদ্ধ করতে চান আপন জ্ঞানে। মানুষের সামনে তুলে ধরেন প্রতিকারের আশায়।

এই অর্থে আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য-শিল্পের নিমগ্ন শিল্পী। নিমগ্নতা তার সমাজবীক্ষণ অনুধাবনে এবং ভাষার বিন্যাসে। বিষয়কে দেখেছেন নিজের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে। সমাজের অসঙ্গতিকে তিনি বিমূর্ত করেছেন শব্দের ক্যানভাসে। জিজ্ঞাসা অনুচ্চারিত রাখেননি।

তার এই শিল্পের সাধনা আমাদের কাছে খোলা দরজা- যে পথে প্রবাহিত হবে বাঙালির আবহমান শিল্পের উচ্চারিত সত্য।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×