বই আলোচনা

অপমানের দিন

একটি নতুন ধারার গল্পগ্রন্থ

  সজল কুমার দত্ত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার মাসুদ কবি হিসেবেই অধিক পরিচিত। তবে গল্প লেখক হিসেবেও তার বিশেষত্ব আছে। এ পর্যন্ত সরকার মাসুদের তিনটি গল্পগ্রন্থ বের হয়েছে। দ্বিতীয় গল্প গ্রন্থের নাম ‘আওরাবুনিয়র কাঁটা’, এ বইয়ের অসাধারণ গল্প দুটি হল ‘অরুন্তদ সময়’ এবং ‘ক্ষুদিরামের যুদ্ধ’। গল্পগুলো গল্পকারের প্রতি মনোযোগী করে তোলে। তৃতীয় গল্পগ্রন্থ ‘অপমানের দিন’। বইটি পড়া শেষে পাঠক যে গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসবেন এমনটি নয়, তবে লেখকের ভাষা ব্যবহারের পারঙ্গমতায়, বর্ণনায় মুগ্ধ হবেন এবং কাহিনিনির্ভর গল্পের বিপরীতে নতুন ধারার গল্প পাঠের রস আস্বাদনে বঞ্চিত হবেন না।

‘অপমানের দিন’ গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘ভেতরে বাইরে’। এটি একটি গ্রাম্য রেস্টুরেন্টের গল্প। রেস্টুরেন্টে বসে থাকা একজন ভদ্রলোকের পর্যবেক্ষণ, নির্বাচনি প্রচারণা, সাধারণ মানুষের কথাবার্তা, বিশ্বাস লেখক দক্ষতার সঙ্গে ক্যামেরাবন্দি করছেন। রেস্টুরেন্টে বসে সময়ের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। লেখকের ভাষায়, ‘পিছনে ভরা খাল বয়ে যাচ্ছে। পিছনের বেঞ্চে জানালা বরাবর বসলে কান পাততে হয় না, এমনিতেই শোনা যায় ওই প্রবহমান সময়ের মর্মধ্বনি- কুল-কুল... কুল-কুল... কুল কুল...।’ রেস্টুরেস্টে চা বানায় সে লোকটা তার নাম আক্কাস গোরাপি। ‘তার মাথার ওপর পেরেকে ঝুলছে পচা রক্তের মতো কালচে লাল জামা।’

এমন নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ছাড়াও গল্পটিতে আছে গ্রামের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক মনোভঙ্গি। যেমন, ‘আগে বিএনপি করছি তো, অহন নৌকার লাইগা ভোট চাইতে শরম করে! তাচ্ছিল্যের অদ্ভুত হাসি দিয়ে অপর ব্যক্তি জানায়, কত বড় ন্যাতারা দল বদল করতাছে! হ্যাগো শরম করে না, তোর শরম করে!’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সতীর্থ বন্ধুর গল্প ‘একদিন সুব্রত।’ সুব্রত রাজশাহী শহরের ছেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ছাত্র। তবে ‘সুব্রত কেবল রাজ্যের বই-পুস্তকে ডুবে থাকে না, কবিতাও লেখে।’ গল্পে পদ্মা নদীর কিঞ্চিৎ অথচ চুম্বক বর্ণনা আছে। ‘এখন বসন্তের মাঝামাঝি।... পানি অনেক নিচে নেমে গেছে। সামনের দিকে বেশ খানিকটা জায়গা সি-বিচের মতো। দেখতে দারুণ লাগে। মাঝে মধ্যে পাল তোলা নৌকা চলে যায়। ওপারে চরের পায়ে হাঁটা পথ ধরে লাইন হয়ে মানুষ আসে। আবার দূরে চলে গেলে মানুষের অবয়ব ক্রমে বিন্দুতে পরিণত হয়। সুব্রত এ দৃশ্য অনেকটা সময় ধরে দ্যাখে।’ গল্পের ছোট আয়নায় পাঠক সুব্রত, তার বাবা দাদু পিসি এবং তাদের বাড়ির ভেতরটা দেখতে পাবেন। ‘সুব্রতর বিছানার শিথান বরাবর হাতখানেক ওপরে একটা জানালা।... কিন্তু জানালা না বলে ওটাকে বড় সাইজের ঘুলঘুলি বলাই ভালো। পাশের বাড়ির ক্যাসেটে প্রায় সারা দিনই ‘মানিকগঞ্জের বড় মিয়া’ টাইপের সস্তা গান বাজে।... এসবের মধ্যেই ছেলেটা পড়াশোনা করে। অভ্যাস হয়ে গেছে। সুব্রত পড়তে পড়তে কখনও মুখ তুলে ওই ছোট্ট জানালাটি দিয়ে এক টুকরো স্বচ্ছ নীল আকাশ দেখে।’

বইটির নাম গল্প ‘অপমানের দিন’। ঢাকা শহরে কপর্দকশূন্য দুই লেখক বন্ধুর একদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা এ গল্পে বর্ণিত হয়েছে। বিপদের দিনে বন্ধু চেনা যায়- এ গল্পে তা আবার সত্য হয়ে ওঠে। বন্ধুর ব্যবহারে ‘‘মুজিব একবার নিচু স্বরে ছি বলল। দ্বিতীয়বার জোরে উচ্চারণ করল ছি। এই সজোর ‘ছি’ এর সঙ্গে এক ফুসফুস ঘৃণা বেরিয়ে মুহূর্তে মিলিয়ে গেল বাতাসে।’’ পেটে দাউ দাউ ক্ষুধা নিয়ে বন্ধুর সাহায্যের জন্য প্রতীক্ষা বর্ণিত হয়েছে এভাবে- ‘তবু অপেক্ষা করি, কেননা... ক্ষুধায় ক্লান্তিতে অপমানে ধিক্কারে আমরা মাটির ভেতর সেঁধিয়ে যেতে থাকি। দোকানপাট, যানবাহনের সারি, আশপাশের ভবনগুলো সব কিছু এ মুহূর্তে ধোঁয়া ধোঁয়া। সবকিছু অতি ভঙ্গুর, যেন টোকা দিলেই খসে পড়বে সিগারেটের লম্বা ছাই।’

এ বইয়ের সেরা গল্পগুলোর একটি ‘আতঙ্কের রাত’। অনেকটা আর্ট ফিল্মের কায়দায় গল্পটি বর্ণিত হয়েছে। ‘মনুর আম্মা এই সময় একবার বাথরুমে যায়। বাথরুম থেকে ফিরেই মশারি তুলে ভেতরে ঢুকতে যাবে, ঠিক সেই সময় কানে এল খট-খট... খট-খট... খট-খট...।’ অর্থাৎ রংপুর শহরে পাকমিলিটারি নামে। এটা মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিককার কথা। পাকমিলিটারির বুটের শব্দে আতঙ্কগ্রস্ত জনপদের ভাষিক চিত্রায়ণ পাওয়া যায় এই গল্পে। ‘‘মাথার ওপর খোলা তলোয়ার ঝুলিয়ে রেখেছে সারাক্ষণ, আবার আশা করছে সবকিছু ‘স্মুথলি’ চলবে। এহ! আমরা যেন তোমার বাপের গোলাম।’’ রংপুর পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসের আবাসিক এলাকার স্ত্রীদের এত দিনকার ‘মহিষের পিঠে বসে দুলতে দুলতে চলে যাওয়া বালক রাখালের মতো’ জীবন আর থাকে না। ‘সারাক্ষণ মাথার ভেতর টেনশনের চোরা স্রোত টের পাচ্ছে মহিলারা। মনের ভেতর কাঁটা নিয়ে মুখে রসের ফুল ফোটাবে কী করে? তাদের আলাপের গতি-প্রকৃতিও তাই, এ সময় অন্যরকম।...

গৌতমের মা আবার বলে, ‘দিদি কী কই আপনাক! আমার তো দম বন্ধ হয়্যা আইসে। খালি মনে হয় এই বুঝি আর্মি বাসায় ঢোকে। ও ভগবান! আমি খালি বুটের শব্দ শুনি- খট-খট... খট-খট... খট-খট... সারা রাইত ঘুমাইতে পারি না। একটু পরে পরে উঠি; জল খাই...।’ ২৫ মার্চের পরে শহরের অবস্থা আরও খারাপ হয়। প্রতিবেশীরা এক ঘরে ঘুমায়। ‘মনুর আব্বা কিন্তু জেগে আছে। তার চোখে ঘুম নেই। মোম পুড়ছে। মোম পোড়ার কোনো শব্দ হয় না, সামাদ ভাবে, কিন্তু অন্য সব বস্তু পোড়ার শব্দ হয়। সামাদ আরও ভাবে, মানুষের হৃদয় পোড়ারও কোনো শব্দ নাই!... অদূরে কোথাও মিহিস্বরে কুকুর ডাকছে। সামাদের মনে পড়ল তার বাবার কথা, ‘কুত্তা কাইন্দলে বুঝবু মাইনসের বিপদ সন্নিকটে।’ তার মাথার ভেতরটা চুলবুল করে, চুলবুল করতে থাকে। মগজের ভেতর দৌড়াদৌড়ি করে নেংটি ইঁদুর।’ ‘আধো ঘুম আধো জাগরণের ভেতর মনুর আব্বা শুনতে পাচ্ছে ভারি বুটের শব্দ।... জোড়া জোড়া বুটের শব্দ। বুক হিম হয়ে আসে তার। কিছু একটা বলতে চায়। বোধ হয় স্ত্রীকে ডাকতে চায়। একবার একটু ডাকেও। কিন্তু ঠোঁট দিয়ে শব্দ বেরোয় না। তার বদলে বেরোয় হালকা বাষ্প। ...হতভম্ভ দাঁড়িয়ে থাকে দরজার পাশে।...

তারপর নিরূপায় হতাশ মনে বেতের সোফার ওপর ধপাস করে বসে পড়ে।’ বুটের শব্দ যখন ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হতে থাকে। মনুর আব্বার সঙ্গে পাঠকও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।

সবদিক বিচার করলে এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ গল্প ‘আলেয়ার কথা’, শুধু এই বইয়ের কথাই বলি কেন, আধুনিক বঙ্গসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্পের বিচারিক নিক্তিতে উঠার দাবি রাখে এ গল্পটি। ‘আলেয়ার কথা’ গ্রামের এক দুঃখী নারীর জীবনগাথা। কাহিনীটি পুরনো। কিন্তু লেখক গল্প বর্ণনায়, চরিত্র নির্মাণে আধুনিক সৃষ্টিশীল মেধার পরিচয় দিয়েছেন পুরোদমে। পুরনো কাহিনিই তিনি আধুনিক পাঠকের কাছে নতুনভাবে নতুন টেকনিকে হাজির করেছেন। গল্পের শুরুতেই আলেয়ার স্বামীর মৃত্যু সংবাদ পাই। ‘আলেয়ার ঝলমলে আলো ওইদিন একেবারে নিভে গিয়েছিল যেদিন সাদির গাঁও থেকে কালো, চোখ-মুখ বসা, টিং টিংয়ে চেহারার একটা লোক কবিরাজ পাড়া গ্রামে ঢুকেছিল দুঃসংবাদ নিয়ে।’ আলেয়ার প্রথম স্বামীর নাম শাহজামাল। “মুকুলের খুব মনে আছে, আষাঢ় মাসের দিনে শাহজামাল শ্বশুরবাড়ি এসেছে। দক্ষিণদুয়ারী ঘরে টেবিলের ওপর একপ্লেট কাটা আম। শাহজামাল মাথার পেছনে হাত দিয়ে মুখ ভার করে শুয়ে আছে। লোকটা আছে তো আছেই। আলেয়া এখন বলে ‘আউ! ওঠেন না? আমগুলাত মাছি পইড়বার নাইগছে।’ মুকুল তখন হাতল অলা চেয়ারে বেসে ভুলভুলা পাকা আমের গায়ে ছিদ্র করে চুষছে। হাফ প্যান্ট পরা মুকুল, দশ বছরের চালাক ছেলে মুকুল কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্কের আড়ালে গজিয়ে ওঠা ব্যাঙের ছাতা বিষয়ে কিছুই বোঝে না, বুঝার কথাও না। সে কেবল অবাক হয়। চেয়ারে পা ঝুলিয়ে আম চুষতে চুষতে ভাবে, শাহজামাল ফুপা এরকম করে কেন!” শাহজামালের মৃত্যুর পর তাদের সতেরো মাসের সন্তান বাদলকে নিয়ে যায় শাহজামালের বাবা। আলেয়া বাদলকে দিতে চায়নি। ‘সবাই বোঝাল, পাঁগলি! বাপের বাড়িত থাকপু চেরকাল! ফের বিয়াশাদি হবার নয়? মনডা শক্ত কর, বুকের দুধতো আর খায় না। বড় হইলে আপনে আইসপে মাক দেইখপার।’

নিটোল গল্প পাঠের ক্ষুধা নিয়েই অধিকাংশ পাঠক গল্প পড়েন। কিন্তু বাস্তব জীবন কি সব সময়ই নিটোল গল্প তৈরি করে? এসব গল্পে সেই বাস্তব জীবনকে সাহিত্যের ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। নতুন গল্পের স্বাদ যারা পেতে চান তারা সরকার মাসুদের গল্পগুলো পড়তে পারেন। তবে পাঠককে মনোনিবেশের সংকল্প নিয়ে পড়তে হবে। একটু ভাবলেই বোঝা যায়, যা আমাদের মনোযোগ দাবি করে না, তার কোন মূল্যই থাকতে পারে না। হ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×