গল্প

অশ্রুগাছ

  সাদিয়া সুলতানা ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জনশ্রুতি আছে, এই গাছের কাণ্ড বা শাখায় কেউ কোপ দিলে তার অনিষ্ট হয়। ঘোরতর বিপদ নেমে আসে জীবনে। অতিউৎসাহী কেউ কেউ অতিরঞ্জন করে বলে, গাছের সামান্য একটা ডাল ভাঙলেও নাকেমুখে রক্ত উঠে দাপাতে দাপাতে মারা যায় মানুষ। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানে বুজরুক মাহদীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের সাবেক দফাদার দুলাল বাসফোড়।

দুলাল দফাদারের কঙ্কালসার শরীরের চামড়া হাড়ের সঙ্গে লেগে থাকায় তাকে পাতাঝরা শুকনা ডালের মতো দেখায়। খরখরা শরীরে সে যখন গাছটিকে জড়িয়ে ধরে থাকে তখন তাকেও গাছের বাকল বলে ভ্রম হয়। গাছের সঙ্গে তার পলকা শরীর একাকার করে সে গাছের কাণ্ডে কান পেতে নানা গোপন কথা শোনে। পাতারা বাতাসের তরঙ্গে কেঁপে কেঁপে দুলাল দফাদারের সঙ্গে কথা বলে। গায়েবি কথোপকথন সেরে গলায় ঝুলানো বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে জোরে জোরে সে হাঁক দেয়, ‘হুশিয়ার, সাবধান।’ কোনো ভয়ংকর বিপদ ধাই ধাই করে এগিয়ে আসছে সেই আগাম বার্তা পেয়ে দুলাল দফাদার দিগি¦দিক ছোটে।

রাত নামলে ছেলেভুলানো গল্পের মতো রসিয়ে রসিয়ে হাটফেরত পথচারীকে দুলাল দফাদার নানা কাহিনী শোনায় আর ক্ষণে ক্ষণে হাঁক দেয়, ‘সাবধান। হুশিয়ার।’ চলতি পথে চৌকিদার জয়নুলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে আকাশের দিকে আঙুল তোলে, ‘দ্যাখ, দ্যাখ, ওই যে ওই আসমানে উইড়া যায় নীলকণ্ঠ পাখি।’ চৌকিদার জয়নুল দুলাল দফাদারের কথা শুনে অশরীরী ভয়ে চমকে ওঠে, মাথার ওপরে কারও ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পায়, ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও গাছের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়।

জমিদার হেমেন্দ্রকুমার দেহ রাখার পর তার আত্মা নীলকণ্ঠ পাখি হয়ে ওই গাছে বাসা বেঁধেছে। ফড়ফড়ে ডানার ছোট্ট সেই পাখি আজও এডালে ওডালে উড়ে বেড়ায়। সন্ধ্যা নামার পর থেকে গাছের নিচে লোকজন ভিড়ে না। রাতে জরুরি কাজে কেউ এ গাছের ধারের রাস্তা অতিক্রম করতে বাধ্য হলে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে ডাকতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। লোকে বলে জমিদারের ভূত গাছে থাকে। শুধু দুলাল দফাদার না, প্রায় সবাই জানে এই জমিদারবাড়ির বংশলতিকায় অতিকায় বৃক্ষের ভূতলভেদী শেকড়ের মতো শতশত কর্ম-অপকর্ম গ্রোথিত আছে। তাই অতৃপ্ত আত্মার দায় মেটানোর আশঙ্কায় বুজরুক মাহদীপুরের বাসিন্দারা এখনও কমবেশি তটস্থ থাকে।

এ জনপদের সমান বয়স গাছটির। যদিও জনপদটির পত্তন হয়েছে কোনকালে সে বিষয়ে কোনো চাক্ষুস সাক্ষ্য নেই। বর্তমান বাসিন্দাদের কেউ যেমন এ লোকালয়ের জন্ম হতে দেখেনি তেমনি এ গাছের আয়ুরও সঠিক হিসাব নেই কারও কাছে। আকাশের দিকে মুখ করে বিপুল গাম্ভীর্যে বেড়ে ওঠা প্রাচীন গাছটির জন্মদাতারও কোনো হদিস নেই। এ ধরিত্রীই তার ধারক আর সে ধারক এই বুজরুক মাহদীপুর এলাকার মানুষের ঐতিহ্যের। সরকারি রাস্তার ধারে থাকায় মালিকান-শরীকান বিরোধ নেই গাছটি ঘিরে। মাঝে মাঝে তবু এ গাছকে ঘিরে নানা সংকটের উদ্ভব হয়।

বছর সাতেক আগে একবার গাছটির প্রকাণ্ড কাণ্ডে করাতের দাগ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। গাছ কাটতে আসা সেই দুই মজুরের নির্মম পরিণতি ঘটেছিল। যদিও সেদিন দুর্ঘটনার আভাস পেয়ে দুলাল দফাদার চেয়ারম্যান সাহেবের হাতে পায়ে ধরে মিনতি করেছিল- তিনি যেন সরকারি লোকজনকে গাছ কাটতে নিষেধ করেন। চেয়ারম্যান সাহেব রাজি হননি। বেগতিক দেখে দুলাল দফাদার পড়িমরি করে নিজেই ঘটনাস্থলে ছুটেছিল। কিন্তু হোমরাচোমরা সরকারি কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়ে আসা লোকজন একটা আধপাগলা মানুষের নিষেধ শুনবে কেন। এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে গাছের নিচে সটান দাঁড়িয়ে দুলাল দফাদার রহস্যমাখা হাসি হেসেছে আর বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে হাঁক মেরেছে, ‘হুশিয়ার, সাবধান।’

এরপর সেই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটেছিল। যার সাক্ষী ছিল সমগ্র বুজরুক মাহদীপুরবাসী। দুজন জোয়ান তাগড়া মজুর ধারালো করাতের দুমাথা ধরে আধঘণ্টা টানাটানি করেও সেদিন গাছের বাকলে সামান্যতম আঁচড় দিতে পারেনি। তবে ওইদিন রাতে মজুর দুজনের বাড়িতে কান্নার রোল পড়েছিল। রোগহীন শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় দাপাতে দাপাতে মুখে ফেনা উঠেছিল তাদের। এর পর রাত পেরিয়ে ভোর না আসতেই তাদের স্ত্রীরা বিধবা হয়েছিল।

দফাদার দুলাল বাসফোড় সব জানে। দায়িত্বে নিষ্ঠাবান দুলাল দফাদার আজও দিন মানে না, রাত মানে না, গলায় বাঁশি ঝুলিয়ে পথে-ঘাটে টইটই করে ঘুরে বেড়ায়। এ ওয়ার্ডের প্রতিটি বাড়িঘর, ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা, পাখপাখালি, গাছগাছালির খোঁজখবর রাখে সে। বিশ্বাস করে এ গাছের মৃত্যু ডেকে আনার সাধ্য নেই কারও।

সেই ঘটনার বছর পাঁচ পরে কালবৈশাখী ঝড়ে গাছটির প্রাচীন একটা ডাল ভেঙে পড়ে পথচারী আহত হওয়ার ঘটনায় গাছ কাটা জরুরি হয়ে পড়লেও সে আয়ুষ্মান হয়েছে পুনরায়। তৎকালীন বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারি গাছগুলোর নিলাম ডাক নিয়ে দুর্নীতি বিষয়ে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেবার ফেসবুকে শতশত পরিবেশবাদী মানুষ মুহুর্মুহু স্ট্যাটাস প্রসব করেছিল। এলাকার স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীসহ জেলা শহর থেকে সাংবাদিকরা দলবেঁধে এসে গাছের নিচে হাতে হাত রেখে মানববন্ধন করেছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে বন বিভাগের অফিসপ্রধানের বদলির আগেই অগুণতি ফাইলের ভিড়ে চাপা পড়েছিল এই বৃক্ষনিধন কর্মসূচির ফাইল।

উল্টো গাছটিতে ‘শতবর্ষী মেঘশিরিষ’ নেমপ্লেট লাগিয়ে তার বিস্তৃত শেকড় ঘিরে ইট-সিমেন্টের গোলাকৃতি বেদি নির্মাণ করা হয়েছিল। যদিও দুলাল দফাদার গাছটির আন্দাজি বয়স বলে তিনশ বছর। শৈশবে দাদার কাছ থেকে শোনা আড়াইশ বছরের সঙ্গে নিজের প্রকৃত বয়স যোগ করে সে গাছের বয়স নির্ধারণ করে। দাদার কাছ থেকে শুনেছে সে, জমিদার হেমেন্দ্র কুমারের পিতা সুরেন্দ্রকুমার ভারত থেকে যে পাঁচটি গাছের চারা এনে তার কাচারি বাড়ির সীমানায় লাগিয়েছিলেন সেগুলোই এখন বুজরুক মাহদীপুরের দৃশ্যমান আদিম প্রাণ।

সুরেন্দ্রকুমার অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন। তিনি দৃপ্ত পায়ে হেঁটে এসে যখন বাড়ির বাইরে দাঁড়াতেন তখন পুরো এলাকার মানুষের মাথা ভক্তিতে নত হয়ে যেত। ডান গালের লাল জরুলে হাত বুলাতে বুলাতে তিনি সবার সুখ-দুঃখের খবর নিতেন। এ বাগানের বেশিরভাগ গাছ তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে লাগিয়েছিলেন। এ মেঘশিরিষ গাছ তার তদারকিতেই বেড়ে উঠেছিল।

বহুদূর থেকে দেখা যায় এ অবেলায় গাছের নিচের পাকা বেদিতে বসে আছে একজন প্রাণহীন লোক; পরনে দুমড়ানো-মুচড়ানো ধূসর শার্ট, দুহাঁটুর মাঝে গোঁজা লুঙ্গি। গাছটির কাণ্ডের দিকে পিঠ দিয়ে খালি পা ঝুলিয়ে সে অনঢ় বসে আছে। লাল রঙা বেদির ওপরে তার দুই হাত পাতা। লম্বা লম্বা নখের ভেতরে কালো কালো ময়লা। দুহাতের বৃদ্ধাঙুলের আধভাঙা নখে ফাঙ্গাশ পড়া। ভাঙাচোরা শরীরের লোকটির হাত-পায়ের খসখসে চামড়ার পরত সাপের পরিত্যক্ত খোলসের মতো দেখায়। হেমন্ত বাতাসের শীতল স্পর্শে সামান্য কেঁপে ওঠে সেই অদ্ভুত খোলস।

দিনের বেশিরভাগ সময় এই গাছের নিচের বেদিতে বসে আকাশ দেখে লোকটা। ঝিম মেরে দেখে পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ির ভঙ্গুরদশা। বাড়িটির জায়গায় জায়গায় ইটের গাঁথুনি ধসে পড়েছে। দ্বিতল বাড়িটির ছাদের ওপর সুউচ্চ একটা হাওয়া ঘর। হাওয়ায় দুলতে দুলতে নির্জন হাওয়া ঘরে আজও মেঘ নেমে আসে। এ ঘরে ওঠার প্যাঁচানো লোহার সিঁড়িটির প্রায় পুরোটাই তুলে নিয়ে গেছে কেউ। সিঁড়ির ছুঁচালো রেলিং হাওয়ার তালে বেকায়দাভাবে ঝুলছে। বাড়ির উত্তরে মজে যাওয়া বিশাল পদ্মদীঘিতে মার্বেল পাথরের বাঁধানো ঘাট। বর্ষাকালে এই দীঘির সামনে দাঁড়ালে গা ছমছম করে। কোনো কোনো বিজন দুপুরে লাল শাড়ি পরিহিত এক নারী ঝুমুরঝুমুর মল পায়ে হেঁটে এসে ওই দীঘির ঘাটে পা ছড়িয়ে বসে থাকে। এক সময় চঞ্চল পায়ে সে দীঘিতে নামে, তাকে আর পাড়ে উঠতে দেখা যায় না। পদ্মদীঘির ঘাট নিথর নির্জন। এ দিকের গাছগুলোর একটা পাতাও কাঁপে না। দুষ্ট ছেলের দলও পদ্মদীঘির ঘাট এড়িয়ে চলে।

জমিদারবাড়ির সীমানা ঘিরে বড় বড় পাম, ডুমুর, অশ্বত্থ আর দেবদারু গাছ। বাড়ির সামনের বাগানে বিড়াল আঁচড়া, ফোস্কা বেগুন, জিরাকাটা আর চোরকাঁটার জঙ্গল। বাড়ির ভেতরে পায়ে হাঁটা পথজুড়ে নাম না জানা আগাছা আর উইয়ের ঢিবি। এমনই এক ঢিবি ভেদ করে একটা বাঁশের খুঁটিতে একটি কালো রঙের সাইনবোর্ড লাগানো, যাতে সাদা কালিতে লেখা, ‘এই জমি নিয়া অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালে মামলা চলমান। মামলা নম্বর ৯৯/১৩, দরখাস্তকারী নারায়ণকুমার, পিতা-স্বর্গীয় রবীন্দ্রকুমার, প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ সরকার।’

রোদ-বৃষ্টিতে সাইনবোর্ডের অন্য কোনো শব্দ বা বর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও রবীন্দ্রকুমারের ‘র’ ফলাটি হারিয়ে গেছে, যেমন করে জমিদার হেমেন্দ্রকুমারের জ্যেষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রকুমার হারিয়ে গেছে। নিরুদ্দিষ্ট রবীন্দ্রকুমারের ওয়ারিশ মর্মে দাবি করে নারায়ণকুমারের আবির্ভূত হওয়ার প্রথম দিনেই এ বাগানে সাইনবোর্ডটি লাগানো হয়েছে। বুজরুকি কাণ্ডকারখানা দেখে অভ্যস্ত বুজরুক মাহদীপুরের লোকজন এত বছর পর রবীন্দ্রকুমারের ওয়ারিশ মর্মে দাবি করা নারায়ণকুমারের এমন আবির্ভাবে কোনো প্রশ্ন তোলেনি। প্রশ্ন তুললেও ধূর্ত নারায়ণকুমার তাদের নিজের হাতে থাকা কাগজের গোছা দেখিয়ে দিত।

জমিদারবাড়ির প্রবেশদ্বারের পশ্চিমে ভাঙা দেয়ালের পাশ দিয়ে প্রশস্ত রাস্তা তৈরি হয়েছে। এ গাছের নিচে বসলে সেই রাস্তায় সরাসরি চোখ যায়। প্রতিদিনের মতো লোকটার চোখ এবার সেই রাস্তায় আটকে যায়। আটকে যাওয়ার মতোই সেই পথ।

আজ একটি মনোলভা ছবি দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। জমিদারবাড়ির জঙ্গলে সাতটি চকচকে কাঁঠালিচাঁপা ফুল ফুটে আছে। সাদা পাপড়ির নিচ থেকে হলুদ রঙের ঘূর্ণি। সেই ঘূর্ণিতে প্রতিফলিত রোদে ফুলগুলো জ্বলজ্বল করছে। কারও নজরে পড়েনি, ফুলগুলোর মাঝখানে একটি পারুল ফুল অবাক বিস্ময়ে সূর্যমুখী হয়ে তাকিয়ে আছে। আশপাশের নির্জনতা ছাপিয়ে ছলছল করে বাতাসের স্রোত বইছে। বাতাসের ডানায় ভর করে তামাটে পারুল আর সাতটি চাঁপার অলৌকিক সুবাস নাকে এসে লাগতেই লোকটির মুখ প্রসন্ন হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে বাতাসের পালকস্পর্শে তার চোখে-মুখে অজস্র স্বপ্নরেণু লেগে যায়। নড়েচড়ে বসে মাথা তোলে সে।

পাতার জাল ভেদ করে সে দেখে গাছের অবিন্যস্ত শাখা-প্রশাখার ওপরে অদ্ভুত একটা আসমান ঝুলে আছে। সঙ্গে ঝুলে আছে শতকোটি হীরক রোদ। বিচ্ছিন্ন রোদের ফালি তীব্রবেগে ছুটে এসে তার দৃষ্টিকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়। পলক ফেলে দ্বিতীয়বার তাকাতেই চোখ আটকে যায় অগুণতি লালচে ফুলের ভুবনভুলানো রূপের দিকে। মেঘশিরিষের ফুলের পরাগকেশরগুলো জমিদারভঙ্গিতে ঊর্ধ্বমুখী। এবার হেমন্তেই ফুল এসেছে। অথচ তিন বছর আগেও গ্রীষ্মে ফুলে ফুলে ছেয়ে যেত এর সবুজ শাখা-প্রশাখা। সুবাসিত ফুলের মোহন রূপ দেখে মোহাবিষ্ট প্রেমিকের মতো হাসে সে। তাই দেখে পারুল আর চাঁপা ফুলেরাও গলা জড়াজড়ি করে হাসে, সহস্র সুখের কল্লোলে নাচে।

হঠাৎ ওরা অবাক পাপড়ি প্রসারিত করে দেখে প্রাণপণে ছুটে আসছে দুলাল দফাদার। নিজের বয়সী ছায়ার সঙ্গে পেরে উঠছে না, তবু ছুটছে। মনে হচ্ছে তার শ্বাসকষ্টের টান উঠবে। অসময়ের বাতাসে ভেসে থাকা ফুলের রেণুতে তার শ্বাসের টান বাড়ে- সে কথা জানে না দুলাল দফাদার। বুক উজাড় করে শ্বাস নিতে গেলে তার পলকা শরীর বাতাসে দোলে। গায়ে চাপানো রঙচটা নীল সরকারি পোশাকটিতে তাকে কাকতাড়ুয়ার মতো দেখায়। হাঁপাতে হাঁপাতে গাছের নিচে বসা লোকটির সামনে থামে সে। সর্বশক্তি দিয়ে বাঁশিতে ফুঁ দেয়, ‘ছোটকর্তা, সাবধান, হুশিয়ার...। আবার ওরা গাছ কাটতে আসতেছে।’

দুলাল দফাদারের বাঁশিতে দেয়া প্রতি ফুঁয়ের সঙ্গে বেদনার শত টুকরা ঝরে পড়ে। ‘ও ছোটকর্তা, মাথা তোলেন। ও ছোটকর্তা...’ তার বাপ-দাদা জমিদার বাড়ির নুন খেয়েছে বহু কাল। সে নিজেও বাপের ভক্তি ছাড়েনি। হেমেন্দ্রকুমারের বংশবাতির নিবু নিবু শিখার সামনে সে নিজের দরদ ঢেলে দেয়, ‘ও ছোটকর্তা, মাথা তোলেন। ওরা নীলকণ্ঠ পাখির বাসা ভাইঙা দিব আইজ।’

মেঘশিরিষের একটা মোটা ডাল রাস্তার ধারের বৈদ্যুতিক তারের ওপরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আটচল্লিশ ঘণ্টা ধরে এ এলাকার বৈদ্যুতিক লাইন বন্ধ। দুলাল দফাদারের হাঁকডাকে গাছের নিচে বসা লোকটির কোনো ভাবান্তর নেই। দুলাল দফাদার তার কানের কাছে বারকয়েক বাঁশি ফোঁকে। ছোটকর্তা কি আজ তার ওপর নারাজ হয়েছে? না সত্যিই সে এই দেশে নেই?

সরকারি সেরেস্তায় নোট আছে, গঙ্গানারায়ণপুর মৌজার সিএস ৩৪ নম্বর খতিয়ানের প্রজা শ্রী হেমেন্দ্রকুমারের কোনো বাংলাদেশি উত্তরাধিকারী বা উত্তরাধিকারীর কোনো বাংলাদেশি বৈধ স্বার্থাধিকারী না থাকায় তার সব স্থাবর সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি গণ্যে ক তফসিলভুক্ত করা হল। এভাবে সরকারি কাগজে-কলমে লেখা হয়ে গেছে হেমেন্দ্রকুমার ভারতবাসী। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রকুমার, কনিষ্ঠ পুত্র দেবকুমার আর সর্বশেষ বাংলাদেশি উত্তরাধিকারী জিতেন্দ্রকুমারও ভারতবাসী। জমি অবমুক্ত করার মেয়াদও এখন তামাদি হয়ে গেছে। নিজেকে হেমেন্দ্রকুমারের ক্রমওয়ারিশ হিসেবে দাবি করার সময়কালও তামাদি।

দুলাল দফাদার যতই হাঁক তুলুক, ডাকুক, ‘ছোটকর্তা, মাথা তোলেন’, সে মাথা তোলে না। ডান হাত দিয়ে সে খসখসে গাল চুলকায়। গালের ঠিক মাঝখানে মাছির মতো বসে থাকা লাল জরুলটা খসে পড়তে গিয়েও বেমক্কা ঝুলে থাকে। হাওয়ায় ঝুলতে ঝুলতে পলকা শরীরের দুলাল দফাদার তার ছোটকর্তাকে ডেকেই চলে। সব বুজরুক মাহদীপুরবাসীর মতোন দুলাল দফাদারও জানে এক বোতল মদের বিনিময়ে এক বিঘা জমি লিখে দেয়া মানুষ জিতেন্দ্রকুমার ইন্দ্রিয়কে জয় করতে পারেনি। ইন্দ্রিয়ের স্বেচ্ছাচারিতায় বেসামাল ছোটকর্তা সাড়া দেয় না। দুলাল তবু তাকে জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে চলে।

মগ্ন চৈতন্যে হাবুডুবু খাওয়া লোকটাকে দেখে বোঝা যায়, সে আসলেই এ দেশে নেই। ছোটকর্তার সাড়া না পেয়ে আবার ছুটতে শুরু করে দুলাল দফাদার। মুহুর্মুহু বাঁশি ফোঁকে আর হুংকার দেয়, ‘সাবধান, হুশিয়ার...।’ পথচারীরা হাসে, ‘চাকরি নাই, তবু দিন-রাত দফাদারি।’ ভ্রুক্ষেপহীন দুলাল দফাদার পথে-পথে ছোটে।

মেঘ ভার মন নিয়ে বেলা বাড়তে থাকে। হুট করে বুজরুক মাহদীপুরের সব রোদ হারিয়ে যায়। সেই সঙ্গে পথ হারায় নাম না জানা পাখির দল। একটি, দুটি...বিশটি পাখি। পাখিদের নতুন রেখাচিত্রে শামিল হতে দেখে আদুল আসমানে নতুন রঙ ফোটে। নীল রঙ। সেই নীলের বিষে আকাশ জরাগ্রস্ত হয়। মেঘের হৃৎপিণ্ডধ্বনি স্তিমিত হয়ে আসে। এবার দিকনিশানাহীন আলো গ্রাস করে নেয় লোকটির চোখের দুটি নীল মার্বেল। আলোর আঘাতে তার দৃষ্টি কাতর হয়ে ফের নতুন আবদারে আকাশমুখী হয়। এ এক মজার খেলা। সে জানে, বৃষ্টি নামবেই।

পতনোন্মুখ মেঘ উঁকি দিয়ে বুজরুক মাহদীপুরের নীরবতা দেখে। হঠাৎ সব নীরবতা বিদীর্ণ করে একটা খোলা জিপ এসে গাছের নিচে দাঁড়ায়। ব্যস্ত পায়ে যান্ত্রিক বাহনটি থেকে পাঁচ-ছয়জন মানুষ নেমে আসে। এদের মধ্যে স্যুট-টাই পরা সাহেব গোছের মানুষটি অন্যদের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে আদেশের কণ্ঠে বলে, ‘আশপাশের লোকজন সরিয়ে ভেঙে পড়া ডালটি ভালো করে দেখে নাও।’ গুরুগম্ভীর মানুষটির রাশভারি কণ্ঠ উপেক্ষা করে অদূরে দুলাল দফাদারের বাঁশি মুহুর্মুহু বাজে, ‘সাবধান, হুশিয়ার...।’ বাঁশির কর্কশ শব্দে চমকে উঠতে উঠতে লোকগুলো জিপ থেকে সাজসরঞ্জাম নামায়। এরপর ভীতু চোখে পদস্থ কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে তারা পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করতে থাকে।

এ দ্বিপ্রহরে সন্ধ্যার আলো শরীরে জড়িয়ে গাছের নিচে বসে থাকা লোকটিও অপেক্ষমাণ, গাছের মতো স্থিরস্তব্ধ। ক্রমশ লোকটির মাথার ওপরে গাছের পাতায় পাতায় জমা হতে থাকে তরল অন্ধকার। মৃদু হাওয়া বয়। হাওয়ার তালে সবুজে সবুজে দোলা লেগে অবিরাম অশ্রুবিন্দু ঝরতে থাকে। অশ্রুর সঙ্গে মেঘশিরিষের লাল লাল ফুল টুপটাপ ঝরে পড়ে। পরাগকেশরে লেগে থাকা আলগা লাল রঙ তুলোপরশে লোকটির উশকোখুশকো চুলে, অমসৃণ ত্বকে লেগে যায়। তার গালের লাল জরুলটি এখন আরও লাল দেখায়।

গাছের নিচে একাকী বসে রং আর জলে ভিজতে থাকে দুলাল দফাদারের ছোটকর্তা। অলৌকিক জলধারায় স্নাত শরীরে তার অলীক শিহরণ জাগে, সাপের খোলস আর্দ্র হয়। অদূরে সাত ভাই চাঁপার পারুল বোনটি হঠাৎ আলোর নিশানা হয়ে জেগে ওঠে বলে, ‘ভাই, ওই গাছের আরেক নাম অশ্রুগাছ।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×