মৃত্যুমুখে ভারতের ৬০০ ভাষা

  গণেশ নারায়ণ দেবী ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গণেশ নারায়ণ দেবী। ভারতের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচক। তিনি ভারতের ভাষা মানচিত্র তৈরির কাজ করেছেন। ২০১০ সালে ভারতের ভাষা জরিপ করার সময়ে তিনি মোট ৭৮০টি ভাষার সন্ধান পেয়েছেন, একইসঙ্গে জানিয়েছেন প্রায় ৬০০ ভাষা এখন মৃত্যুমুখে এবং গত ৬০ বছরে প্রায় ২৫০ ভাষা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

ডেইলি হিন্দুস্তান এক্সপ্রেসকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে ভারতের প্রাচীন ভাষাগুলো, মৃত ভাষা, মৃত্যুমুখে ভাষা ও ভাষার প্রান্তিকীকরণ- এসব নিয়ে কথা বলেছেন গণেশ নারায়ণ দেবী। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন আদিল মাহমুদ। বি.স।

হিন্দুস্তান এক্সপ্রেস : আমরা জানি আপনি ভারতের ভাষা মানচিত্র তৈরির কাজ করেছেন। আমরা এই বিষয়ে আপনার একটি সাক্ষাৎকার নিতে চাচ্ছি। আপনি কি আমাদের একটু সময় দেবেন?

গণেশ নারায়ণ দেবী : সময় তো আছে। তবে সাক্ষাৎকার কতটুকু দিতে পারব জানি না। চেষ্টা করব।

ভারতের মৃত ও মৃত্যুমুখে ভাষাগুলো কী কী?

: আমরা সবাই জানি, ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী যে ভাষায় ১০ হাজারের কম মানুষজন কথা বলেন, সে ভাষাকে মৃত ভাষা বলা হয়। ১৯৭১ সালের জনসংখ্যা গণনার সময় ভারত সরকার স্থির করেন, ১০ হাজারের কম মানুষ যে ভাষায় কথা বলবেন, তা নথিভুক্ত করা হবে না। যার কারণে ১০ হাজারের কম মানুষ যে ভাষা ব্যবহার করত, তা ভারতের নথিভুক্তই হয় না এবং ইউনেস্কোর কাছে তা মৃত ভাষা।

আমার অনুসন্ধান ও হিসাবে, ভারতে ৭৮০টি ভাষা ছিল। এর মধ্যে এখন প্রায় ৬০০টি ভাষা মৃত্যুমুখে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের জনসংখ্যা গণনায় দেয়া হিসাব অনুযায়ী মোট ভাষার সংখ্যা ১২২। ফলে বাকি সব ভাষাকেই মৃত ভাষা বলে ধরে নেয়া যায়। গোল্লা, গিসারি, ওয়াডারি, কোলহাটি ইত্যাদি মৃত্যুমুখে থাকা ভাষার কয়েকটি উদাহরণ। তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অঞ্চলের যাযাবর প্রজাতির মানুষজন এ ভাষাগুলোতে কথা বলে থাকেন। এছাড়াও রয়েছে হলদি, মারচি, পাউরি, কোরকু, ইত্যাদি উপজাতিদের ব্যবহৃত ভাষা। আসামে রয়েছে আইটন, মোরান, তাংসা। গত ৬০ বছরে ২৫০টির বেশি ভাষা হারিয়ে গেছে। গাল্লু হেলগো, কাটাগি, আধুনি, দিচি, এসব ভাষায় মানুষ একসময় কথা বলত। আন্দামানে ব্যবহৃত ‘বো ভাষা’ ২০১০ সালে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সিকিমের ‘মাঝি ভাষা’ বিলুপ্ত হয়েছে ২০১৫ সালে।

তবে একথাও মনে রাখতে হবে, যে কোনো একটা ভাষার নির্দিষ্ট মৃত্যুর সময় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ভাষা কোনো একটা জৈবিক ব্যবস্থার মতো নয়। ভাষা একটা বৃহত্তর চিহ্নব্যবস্থা। কোনো একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে চিহ্ন ভেঙে পড়ে না। এ ঘটনা ঘটতে থাকে দীর্ঘ সময়জুড়ে।

একটা ভাষার মৃত্যু হয়ে গেলে ঠিক কী হয়, কিংবা কী ঘটে?

: একটা ভাষার মৃত্যু হয়ে গেলে সে ভাষায় কথা বলা মানুষগুলো অভিচারী হয়ে যান। প্রথমে তারা ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করেন, তারপর তারা বাস্তবিকই ভিন জায়গায় চলে যান।

দ্বিতীয়ত যেটা হয়, তা হল, এ মানুষগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাপন কিছুটা নিুগামী হয়ে পড়ে। তাদের যদি কোনো বিশেষ নিজস্ব যোগ্যতা-দক্ষতা থাকে, তা-ও লুপ্ত হয়ে যায়।

তৃতীয়ত, একটি ভাষার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে একটি বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিসমাপ্তি হয়। কারণ আমরা জানি, পৃথিবীর সব ভাষারই একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে।

মৃত্যুমুখে থাকা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কী পদক্ষেপ, পদ্ধতি নেয়া যেতে পারে?

: খুব সহজ উপায় আছে। মৃত্যুমুখের ভাষায় যারা কথা বলেন, তাদের জীবিকা টিকিয়ে রাখার জন্য সহায়তা করা। নিজেদের ভাষার মধ্যেই যদি কেউ জীবিকা নির্বাহের উপায় খুঁজে পান, তাহলে কেউই ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করবেন না। আর অবশ্যই বেশি বেশি ভাষার চর্চা করতে হবে।

আমরা সাধারণত দেখি, যখন কিছু ভাষা জনপ্রিয়তা অর্জন করে, সে সময়েই অন্য কিছু ভাষার মৃত্যু ঘটে। আর একটা ভাষা কীভাবে সহজে জনপ্রিয় হয়?

: একটা ভাষা সহজে জনপ্রিয় হওয়ার কয়েকটা বড়সড় কারণ আছে। প্রথম কারণ হল, বাক্যবিন্যাস। যে ভাষার বাক্যবিন্যাস সহজতর, সে ভাষা জনপ্রিয়। হিন্দি ভাষার বাক্যবিন্যাস ইংরেজি ভাষার বাক্যবিন্যাসের তুলনায় সহজতর। এটা একটা বড় কারণ, তবে একমাত্র কারণ নয়। দ্বিতীয়ত, সমাজে ক্ষমতাশালী জনগোষ্ঠী যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষা সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রাচীনকালে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহারকারীরা সমাজে ক্ষমতাশালী হওয়ার কারণে সে সময়ে সংস্কৃত ভাষা জনপ্রিয় হয়েছে। আবার, ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে জনপ্রিয় হয়েছে ইংরেজি ভাষা।

তৃতীয়ত, কোনো ভাষা যদি বাজারে চালু হয়, সে ভাষা বেশি জনপ্রিয় ও দামি হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতে একজন মানুষ নিজের বাড়িতে এক ভাষায়, কর্মক্ষেত্রে আরেক ভাষায় ও বাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে অন্য আরেকটি ভাষায় কথা বলতে পারেন। দিল্লির কোনো এক বাসিন্দা নিজের পরিবারে পাঞ্জাবি বা বাংলায় কথা বলতে পারেন, অফিসে ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন, সেই তিনিই যখন বাজারে যান, সেখানে তিনি হিন্দি ভাষায় কথা বলতে স্বচ্ছন্দবোধ করতে পারেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা, বাজারের ব্যবহার এবং বাক্যবিন্যাস- এই তিন কারণের কোনো একটি কারণে সহজে ভাষা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

ভারতীয় ভাষার ওপর উপনিবেশিকরণের কী প্রভাব আছে, বা কোনো প্রভাব পড়েছে?

: এক্ষেত্রে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে ভাষার উপনিবেশিকরণের ফলে অন্য ভাষা সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে; কিন্তু ভারতে তেমনটা ঘটেনি, দেখা যায়নি। আমাদের ভাষারা বেঁচে থেকেছে। ঔপনিবেশিক সময়ে ছাপার প্রযুক্তি এসেছে, তবে খুব কম ভারতীয় ভাষাই ছাপার মুখ দেখেছে। যেহেতু আমাদের দেশে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সেজন্য যেসব ভাষায় ছাপার কাজ হয়েছে, সেসব ভাষা নিজস্ব রাজ্য পেয়েছে। যেসব ভাষা রাজ্য পায়নি, সেসব ভাষাগুলো সরকারি ভাষার স্বীকৃতিও পায়নি এবং তার কারণে সেসব ভাষা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের হয়ে আছে।

আমরা যে ভাষায় কথা বলি তার সঙ্গে বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির যোগাযোগ কী?

: আমরা যে ভাষা শিখি, কথা বলি, ব্যবহার করি, তা পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের পরম নিশ্চিত এক আখ্যান শেখায়, ব্যতিক্রমহীনভাবে সর্বক্ষেত্রে। এর কোনো বৈপরীত্য নেই। একটি ভাষার বিশ্ব বর্ণনার একটি নিশ্চিত ক্ষমতা রয়েছে এবং চেতনা পৃথিবীর অভ্যন্তরে ততটুকুই প্রবেশ করতে পারে, বাস্তবতার অভ্যন্তরে প্রবেশ করার যতটুকু ক্ষমতা সেই ভাষার রয়েছে।

একটি ভাষার যদি রং বর্ণনা করার জন্য শুধু সাতটি নাম থাকে, তাহলে সে ভাষা ব্যবহারকারী পৃথিবীকে শুধু সাতটি রঙেই দেখতে পারবেন। অন্যদিকে যদি কোনো ভাষার আরও বেশি রং বর্ণনার ক্ষমতা থাকে, তাহলে সেই ভাষার ব্যবহারকারী পৃথিবীকে দেখবেন আরও বহুরঙে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মারাঠি ভাষায় ‘কিরমিজি’ নামে একটি রঙকে বর্ণনা করা হয়, যার কোনো ইংরেজি প্রতিশব্দ নেই। এটা কিছুটা বাদামি, কিছুটা সবজেটে, কিছুটা নীলচে। এটা অনেকটা যেন জোনাকির মতো। এ উপলব্ধিটার অবিকল প্রতিরূপ ইংরেজি ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। আবার ইংরেজি ভাষায় নেভি ব্লু বা স্কাই ব্লু রয়েছে, যার যথার্থ অনুবাদ হয়তো অন্য কোনো ভাষায় সম্ভব নয়। এভাবেই কোনো ভাষা পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতে দেয় অথবা দেয় না।

আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন- এই কামনা।

: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×