কবিতা আমার যুদ্ধক্ষেত্র ভাষাই হাতিয়ার

মাহমুদ দারবিশ

  যুগান্তর ডেস্ক    ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাহমুদ দারবিশ। ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি। ১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ ফিলিস্তিনের গালিলি প্রদেশের আল-বিরওয়াহ গ্রামে জন্ম। ১৯৪৮ সালে ইসরাইলিদের আক্রমণের ফলে মাত্র ছয় বছর বয়সে গভীর রাতে সপরিবারে লেবাননের পথে রওনা করেন। এরপর থেকে আমৃত্যু কোথাও স্থির থাকতে পারেননি। কখনও মিসর, কখনও বৈরুত, কখনও প্যারিস, কখনও কায়রো, কখনও তিউনিস, আবার কখনও খোদ প্যালেস্টাইনে নিজভূমে পরবাসী হয়ে। সর্বশেষে ২০০৮ সালের ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে মৃত্যুবরণ করেন। শৈশব থেকে মাহমুদ দারবিশ কবিতাচর্চা শুরু করেন। আরবি কবিদের মধ্যে যারা সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও দেশের কবিতার জন্য খ্যাত ছিলেন তিনি তাদেরই অন্যতম। শুধু ফিলিস্তিন নয়, গোটা আরবজুড়েই তার সুখ্যাতি। সাহিত্য জগতে তাকে আরব বিশ্বের কণ্ঠস্বর বলা হয়। মৃত্যুর অল্প আগে আরবি পত্রিকা ‘আল-জাদিদ’-এ প্রকাশিত তার একটি সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ পত্রস্থ হল। বি. স। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন নূরী আল-জাহার।

আপনার ঘরবাড়ি এখন কোথায়?

মাহমুদ দারবিশ : আমার আসলে কোনো ঘরবাড়ি নেই। আমি এত ঘন ঘন ঘরবাড়ি পাল্টাই, একটু গভীরভাবে বললে বলতে হয়, আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই। আপনি বাসাবাড়ি তাকেই বলবেন, যেখানে আপনি ঘুমান, খাওয়া-দাওয়া করেন, লেখাপড়া করেন, ইত্যাদি। আর সেটা তো যে কোনো জায়গাতেই হতে পারে। আমি এ পর্যন্ত ২০ বারেরও বেশি বাসা বদল করেছি। প্রতিবারই বাসায় আমার বইপত্র, ওষুধ, কাপড়-চোপড় ফেলে এসেছি। আমি আসলে পালিয়ে বেড়াই। আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই।

আপনার কি পরিবার বলে কিছু নেই? মানে স্ত্রী-সন্তান?

: আমার বন্ধুরা আমাকে মাঝে মধ্যে স্মরণ করিয়ে দেয় আমি দু’বার বিয়ে করেছি। কিন্তু আমার কাছে সেরকম মনে হয় না। আমার কোনো ছেলেমেয়ে নেই। এজন্য আমার কোনো আফসোসও নেই; পরিবারের জন্য কোনো টান নেই। পরিবার, ছেলেমেয়ে থাকলে হয়তো ভালো হতো, আবার না-ও হতে পারত। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, এসবের কারণে আমার কোনো আফসোস নেই।

তাহলে একাকিত্ব কি আপনার পছন্দ?

: জি, খুব পছন্দ। আমাকে যখন কোনো ভোজসভায় বা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করা হয়, তখন আমার কাছে মনে হয়, আমাকে বুঝি কোনো অপরাধের শাস্তি দিতে আমন্ত্রণ করা হয়েছে।

ঠিক কবে থেকে কবিতা লেখা শুরু করেন?

: শৈশব-কৈশোরে আমি শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল ছিলাম। খেলাধুলা করার মতো শক্তিও ছিল না। ফলে লেখালেখিতে সময় দেয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। এছাড়া শৈশবে বড়দের সঙ্গে সময় কাটাতেও ভালো লাগত। আমার দাদাসহ প্রতিবেশী বয়োবৃদ্ধরা প্রায়ই প্রাচীন লোকগাথা পাঠ করতেন। সেখানে আমার সমবয়সী কেউ থাকত না; কিন্তু আমি নিয়মিতই উপস্থিত থাকতাম। ওইসব শুনে ধীরে ধীরে কবিতার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলাম। অবশ্য কেন হলাম তা জানিনা। শুধু জানতাম, কবিতার টুপটাপ ধ্বনি আমাকে বিমোহিত করে। কবি হওয়ার স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। ভাবতাম, কবি মানেই একটি রহস্যজনক চরিত্র। যার হরেকরকম মানবীয় গুণ ও শক্তি আছে। যার কারণে ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি শুরু। অবশ্য তখন বুঝতাম না, যা লিখছি তা কবিতা হচ্ছে কিনা। বাবা-মা ও শিক্ষকদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি বেশ। যেহেতু কবিতা ছাড়া করার কিছু ছিল না, তাই চেষ্টা বাড়িয়ে দিলাম। লেখালেখি আমার ছেলেবেলার খেলাধুলা হয়ে গেল। তারপর কবিতাই হয়ে উঠল আমার যুদ্ধক্ষেত্র, ভাষা হাতিয়ার। যখন ১২ বছর বয়স, তখন স্কুলের অনুষ্ঠানে একটি স্বরচিত কবিতা পড়েছিলাম। পরের দিন ইসরাইলি আদালতে আমাকে হাজিরা দিতে হয়েছে।

আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম কী? কবে প্রকাশিত হয়? মোট কাব্যগ্রন্থ কয়টি?

: আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আসাফির বিলা আজ্নিহা’। প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। মোট কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৩০টির মতো হবে।

গদ্য লিখেছেন কখনও?

: গদ্য আমার খুব পছন্দ। কিন্তু সময় বড্ড কম এবং কবিতার কাজ এখনও অসমাপ্ত। যার কারণে আমার মধ্যে গদ্য বনাম পদ্যের একটি দ্বৈত লড়াই চলতে থাকে। কিন্তু আমার হৃদয়ের পাল্লা বারবার কবিতার দিকেই ঝুঁকে যায়।

কবে থেকে নিজেকে সত্যিকারের কবি ভাবতে শুরু করলেন?

: তা জানি না। তবে আমি মন থেকে যা বেছে নিয়েছি, তা হচ্ছে- কবিতা। আমার কবি হয়ে ওঠার পেছনে ইসরাইলি এক গভর্নরের সম্পর্ক আছে। বলা যায়, তিনিই আমার কবিতার প্রথম সমালোচক এবং শিখিয়েছেন কবিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমার বয়স যখন ১২। তখন আমাকে ক্লাসের ভালো ছাত্র হওয়ায় ইসরাইলের বিজয় দিবস উপলক্ষে কিছু আবৃত্তি করতে বলা হয়। আমি স্বরচিত একটি কবিতা আবৃত্তি করলাম। পরের দিন সেখানকার সামরিক গভর্নর আমাকে তলব করেন এবং এমন কবিতা লেখা ও আবৃত্তি করার জন্য ধমকা-ধমকি দেন। যতদূর মনে পড়ে, কবিতায় যা লিখেছিলাম তা সত্য ভেবেই লিখেছিলাম। এতটাই অবুঝ ছিলাম যে, কী বলতে হবে তা-ও বুঝতে পারিনি। তখন ভেবে খুব অবাক হলাম, সামান্য কবিতাকে এত ভয় পায় বিরাট এই ইসরাইল! বুঝতে পারলাম কবিতা কত প্রভাবশালী একটি কর্ম।

আপনি কি পরের দিন গভর্নরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন?

: হ্যাঁ করেছিলাম। ১২ বছরের একটা শিশুকে গভর্নর ডেকেছেন। তা-ও আবার কবিতা আবৃত্তি করার অপরাধে। চিন্তা করা যায়!

বলা হয় আরবি সাহিত্যের বিখ্যাত কবি হিসেবে আপনার কবিতার কাব্যিকতায় নতুনত্ব উঠে এসেছে। এই নতুনত্বটা কীভাবে এলো?

: আমার মনে হয় আমার কবিতায় তেমন কোনো নতুনত্ব নেই। তবে কবিতায় নতুনত্ব থাকলে তা শুধুই কাব্যিক গঠনের পরিবর্তন। একক ছন্দের বাইরে কবিতা লেখার যে অপ্রচলিত ঘরানা তৈরি হয়েছে, সেটার শুরুর দিকের কবিদের আমি একজন।

এই ধরনের কাব্যিক পরিবর্তন আনার পেছনে কি কোন অনুপ্রেরণা কাজ করেছে? আর এই পরিবর্তন কবিতাকে কী উপহার দিয়েছে?

: ১৯৪৮ সালের পর থেকে আমরা এমন এক ফিলিস্তিনে বাস করেছি, যেটি আসলে ইসরাইলের কাছে হেরে যাওয়ার এক ছবি। এ কারণে আমাদের মনের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে পুরনো ধাঁচের কবিতা দিয়ে নিজের মনের ভাব বোঝানোর কায়দা কম আসতে শুরু করে। ফলে হৃদয়ের আসল ভাবনা প্রকাশে কবিতার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সময়ের দাবি ছিল। তাই সেটি সময়ের সঙ্গেই ঘটে যায়। আমার কবিতার নতুনত্ব আসাটা সুচিন্তিত কোনো বিষয় ছিল না। আর এ পরিবর্তনের কারণে কবিতাকে কী উপহার দিতে পেরেছি তা সঠিক জানি না।

আপনি কি লেখালেখির ক্ষেত্রে কঠোর কোনো নিয়ম মেনে চলেন?

: লেখালেখির ক্ষেত্রে আমার কিছু অভ্যাস আছে। সাধারণত আমি সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত লেখি। হাতেই লেখি, কারণ আমার কোনো কম্পিউটার নেই। ঘরে বসে দরজা বন্ধ করে লেখি। প্রতিদিন লেখি না; কিন্তু প্রতিদিন নিজেকে বাধ্য করে হলেও একবার লেখার টেবিলে বসাই। এখানে কোনো প্রেরণা আছে কিনা জানি না। কারণ আমি মনে করি না সবকিছুই প্রেরণা-অনুপ্রেরণা দিয়ে হয়। যদি থাকেও তাহলে উচিত হবে তখনই প্রেরণা জাগানো, যখন নিজে মূল্যহীন হয়ে যাব। মাঝে মধ্যে খুব সুন্দর লেখার প্লট আসে মাথায়; কিন্তু সেটা এমন জায়গায়, যা ভালো জায়গায় বলা যায় না। যেমন বাথরুমে, প্লেনে বা ট্রেনে। আসলে তোমাকে জানতে হবে, কীভাবে লেখার টেবিলে বসতে হয়। ভালো করে বসতে না জানলে তুমি লেখতেও পারবে না। এটাকেই শৃঙ্খলা বলা হয়।

কখন আপনার সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগে বা কোন জিনিস আপনাকে সুখ দেয়?

: প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠাই আমার কাছে আনন্দদায়ক। এক দৃষ্টিতে আমি মনে করি আনন্দ কোনো বস্তুগত আবিষ্কার নয়। আনন্দ হচ্ছে এমন কয়েকটি মুহূর্ত, যা প্রজাপতির মতো। আমার তখনই খুব আনন্দ হয় যখন কোনো কাজ সম্পন্ন করি। এর চেয়েও আনন্দময় সময় হল যখন মানুষ আমার কবিতা পড়ে, কবিতা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এবং আলোচনা-সমালোচনা করে। কারণ একজন কবি তো পাঠকদের নিয়েই বেঁচে থাকতে চান।

আপনি কি আপনার জন্মস্থান আল-বিরওয়াতে যেতে চান?

: না। আল-বিরওয়াহ কি আর এখন গ্রাম আছে! সে তো ধুধু মাঠে পরিণত হয়েছে। এখানে বসে বসে বিরওয়ার স্মৃতিচারণ করতেই আমার ভালো লাগে। কী বিশাল আর খোলা প্রান্তর ছিল! তরমুজ খেত, জলপাই গাছের সারি, বাদাম বাগান। এসবের স্মৃতিই মনে পড়ে। আর ঘোড়াটির কথাও মনে পড়ে, আমাদের উঠানের মালবেরি গাছে বাঁধা থাকত যেটা, আমি খুব চেষ্টা করতাম ঘোড়াটির পিঠে চড়তে; কিন্তু সেটা প্রতিবারই আমাকে ছুড়ে ফেলে দিত। মায়ের হাতের মার খাওয়াতো। মা প্রায়ই আমাকে পিটুনি দিতেন। তিনি মনে করতেন আমি খুব দুষ্টু। কিন্তু আমার মনে হয় না, আমি এতটা দুষ্টু ছিলাম। গ্রামের প্রজাপতিগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। যেগুলোর পেছনে ছুটে ছুটে মনে হতো পৃথিবীর সব প্রান্তর আমার জন্য উন্মুক্ত। আমাদের গ্রামটি ছিল খাড়া একটি পাহাড়ের ওপর। নিচে সবকিছুই ছিল সবুজ চাদরের মতো বিছানো। একদিন মাঝ রাতে আমাকে ঘুম থেকে জাগানো হল। মা বললেন, আমাদের পালাতে হবে। তখন যুদ্ধ বা এ জাতীয় হামলার ব্যাপারে কেউ কিছু বলেনি। আমরা তিন ভাই-বোন, মা-বাবা ও আরও অনেকে হেঁটেই রওনা দিলাম লেবাননের উদ্দেশে। আমার সবচেয়ে ছোট ভাইটি, যে কেবল হাঁটতে শিখেছিল, সে পুরোটা পথই কেঁদেছে। একবারের জন্যও থামেনি।

রামাল্লায় আছেন কত বছর থেকে?

: প্রায় পাঁচ বছর হবে।

বাড়ি হিসেবে কোথায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? রামাল্লা নাকি গালিলি?

: আমার বাড়ি হচ্ছে গালিলি। আমার ব্যক্তিসত্তার বিকাশও সেখানেই। আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠীরাও সব সেখানে। সে জায়গাটির জন্য আমার মন সবসময়ই কাঁদে। গালিলির প্রতিটি বৃক্ষ, পাহাড়, রক্তিম সূর্যাস্তের জন্য আমার মন কাঁদে। পুরো ফিলিস্তিনই আমার মাতৃভূমি। কিন্তু আমি তো আর সেখানে যেতে পারছি না। এই রামাল্লাতেই গৃহবন্দি হয়ে পড়ে আছি। প্রিয় গালিলি আর কোনোদিন আমার বাসস্থান হবে না।

আপনার কাছে আপনার লেখা প্রিয় দু-একটি কবিতার নাম বলুন?

: আমার সব কবিতাই আমার কাছে প্রিয়। তবে খুব অল্প বয়সে আমি কিছু কবিতা প্রকাশ করেছিলাম, সেগুলো অত্যন্ত কাঁচা ছিল। শিল্পের বিচারে খুবই নিম্নমানের। আফসোস হয় সেই দুর্বল ও কাঁচা শব্দাবলির জন্য। ওই কবিতাগুলো ছাড়া সব কবিতাই আমার কাছে প্রিয়।

অনুবাদ-গ্রন্থনা : আদিল মাহমুদ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×