আদিত্য নজরুলের কবিতা
jugantor
আদিত্য নজরুলের কবিতা

  সরকার আবদুল মান্নান  

২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক কবিতা নিয়ে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ অনেক পুরনো। আজকের দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা অত্যন্ত সহজ-সরল মনে হলেও এ রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধেও দুর্বোধ্যতার অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তীকালে এ অভিযোগ আরও ঘনীভূত হয়। দুর্বোধ্যতার এ অভিযোগ সবসময় যে অবান্তর তা নয়। বরং যারা ইচ্ছা করে কবিতাকে দুর্বোধ্য করার চেষ্টা করেছেন, পাঠক তাদের চিনতে ভুল করেননি। একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে অনেকেই এ সমস্যা প্রকট করে তুলেছেন। আদিত্য নজরুল উলটো রথের যাত্রী। তার বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ তো উঠবেই না বরং সারল্যের অভিযোগ উঠতে পারে। জীবনকে দেখার ভঙ্গিটাই তার সরল। তিনি প্রেমে সরল, প্রকৃতিতে সরল, দ্রোহে সরল, আনন্দে সরল, বেদনায় সরল, বঞ্চনায় সরল, একাকিত্বে সরল। এক কথায় জীবন ও জগৎকে তিনি সহজ-সুন্দর বোধে অনুভব করতে অভ্যস্ত। তার এ বোধের জগৎ ও কাব্যভাষা তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

ইতিমধ্যে আদিত্য নজরুলের আটটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর পরিবার পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘ছুঁয়ে যাও না ছোঁয়ার ভান করে’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থ । সর্বশেষ এ কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন কবি এভাবে : সব কিছু নিম্নমুখী/আর সব প্রবঞ্চনা/জলও প্রবহমান/প্রভাও পালিয়ে যায় অন্ধকারে

তুমি যা দিয়েছো পূজনীয়/এই দীর্ঘশ্বাস চিরকাল ঊর্ধ্বমুখী

খুব ছোট একটি প্রেমের কবিতা। দুর্বোধ্যতা নেই কোথাও। কিন্তু ভাবনার যে স্থাপত্য নির্মিত হয়েছে তা অনুভব করতে কষ্ট হয় না। এবং সেই অনুভবের মধ্যে মাহাত্ম্য আছে, কবির নিজস্ব একটি দর্শন আছে- অতি সহজ-সাধারণ দর্শন। কিন্তু নির্বাচিত শব্দের মধ্যে তিনি ছন্দের যে প্রবাহকে আহ্বান করেছেন তা বোধের গতিময় স্বাভাবকে তৃপ্ত করে। খুব ছোট একটি কবিতা। কিন্তু সুন্দর। গড়নে সুন্দর, বলায় সুন্দর, না বলায় সুন্দর, বোধে সুন্দর, বেদনায় সুন্দর এবং বিশেষ করে সর্বশেষ পঙ্ক্তি দুটি সুন্দরতম।

এ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটির নাম ‘একটি কথার অঙ্কুরোদগম’। প্রেমের কবিতা।

কবিতাটি থেকে কিছু অংশ উল্লেখ করি-

একটি কথা বুকের মাঝে/জ্বালাচ্ছে বেশ;/একটি কথা ঠোঁটের কাছে

আনতেই শেষ।

কী করে হায় বলবো বলো/সেই কথাটা/বুকের মাঝে ঠোঁটের ভাঁজে/কুলুপ আঁটা।

আদিত্য নজরুলের উদ্ধৃত কবিতাংশ বিবেচনা করলে তাঁর প্রজন্মের এই জীবন-ঘনিষ্ঠতা অনুভব করা যায়। প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত অতি সাধারণ শব্দ দিয়ে কবিতা লেখার জন্য অনেক শক্তি ও সাহসের দরকার হয়। আদিত্য নজরুলের কবিতায় সেই শক্তি ও সাহসের পরিচয় আছে। প্রেম ও দুঃখবোধের একটি চিরায়ত অনুভব বাংলা কবিতার প্রাণ। আশাবাদী কবি, নিঃসঙ্গতাবাদী কবি, প্রেমের কবি, অপ্রেমের কবি, জনতার কবি, নির্জনতার কবি সবাই প্রেমের কবিতা লিখেছেন এবং সেই প্রেম দুঃখবোধকে অতিক্রম করে নয়। আত্যি নজরুলের সাম্প্রতিক সময়ে লেখা একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি এ রকম :

দুঃখ দিতে সবাই কি আর পারে/দুঃখ হলো শিল্পে বোনা বাবুই পাখির বাসা/দুঃখ হলো চরকা কাটা তাঁত/দুঃখ হলো ব্যর্থ প্রেমের গোপন মাতৃভাষা।

এই হলো এই সময়ের একজন কবির প্রেম ও দুঃখবোধ। এই বোধের মধ্যে এমন একটি সহজতা আছে, সারল্য আছে যা আমাদের প্রেমের অনুভবকে এবং কষ্টের অনুভবকে আলোড়িত করে তোলে।

কবিতার বা কবিদের কোনো দলে আদিত্য নজরুল আছেন কিনা তা আমার জানা নেই। যদি থাকেন তা হলে ভালো এবং না থাকলেও মন্দ নয়। কেননা তিনি কবিতাময় এক জীবনযাপন করেন। নিরন্তর কর্মের মধ্যে থেকে, জীবনের বিচিত্র টানাপোড়েনের মধ্যে থেকে দীর্ঘ কবিতা লেখা প্রায় দুঃসাধ্য। ফলে তিনি বেছে নিয়েছেন ছোট কবিতার ছোট ছোট প্লট। ‘প্লট’ শব্দটি আমি সচেতনভাবেই ব্যবহার করেছি। তিনি তার ছোট ছোট কবিতাগুলোর মধ্যে সংগোপনে পুরে দেন গল্পের ভেতরগত দ্যোতনা। গল্পের ভেতরগত এ দ্যোতনাকেই আমরা বলতে চাই ‘প্লট’ বা আখ্যান। নজরুল খুব সচেতনভাবেই এ কাজটি করেন বলে আমার বিশ্বাস। ফলে তার কবিতার মধ্যে আখ্যানে আস্বাদ পাওয়া যায়। কাব্যভাষা, কবিতা ও আখ্যান এবং আখ্যানের বৈচিত্র্য এবং সহজতা একাকার হয়ে আদিত্য নজরুলের কবিতা যে রূপ পরিগ্রহ করে তাকে হৃদয়গ্রাহী বলতে হবে। এবং এই রূপাবয়বের অন্তরালে রহস্যময়তার সৌন্দর্য তার কবিতাকে শক্তিমান করে তুলেছে।

আদিত্য নজরুলের কবিতা

 সরকার আবদুল মান্নান 
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক কবিতা নিয়ে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ অনেক পুরনো। আজকের দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা অত্যন্ত সহজ-সরল মনে হলেও এ রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধেও দুর্বোধ্যতার অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তীকালে এ অভিযোগ আরও ঘনীভূত হয়। দুর্বোধ্যতার এ অভিযোগ সবসময় যে অবান্তর তা নয়। বরং যারা ইচ্ছা করে কবিতাকে দুর্বোধ্য করার চেষ্টা করেছেন, পাঠক তাদের চিনতে ভুল করেননি। একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে অনেকেই এ সমস্যা প্রকট করে তুলেছেন। আদিত্য নজরুল উলটো রথের যাত্রী। তার বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ তো উঠবেই না বরং সারল্যের অভিযোগ উঠতে পারে। জীবনকে দেখার ভঙ্গিটাই তার সরল। তিনি প্রেমে সরল, প্রকৃতিতে সরল, দ্রোহে সরল, আনন্দে সরল, বেদনায় সরল, বঞ্চনায় সরল, একাকিত্বে সরল। এক কথায় জীবন ও জগৎকে তিনি সহজ-সুন্দর বোধে অনুভব করতে অভ্যস্ত। তার এ বোধের জগৎ ও কাব্যভাষা তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

ইতিমধ্যে আদিত্য নজরুলের আটটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর পরিবার পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘ছুঁয়ে যাও না ছোঁয়ার ভান করে’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থ । সর্বশেষ এ কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন কবি এভাবে : সব কিছু নিম্নমুখী/আর সব প্রবঞ্চনা/জলও প্রবহমান/প্রভাও পালিয়ে যায় অন্ধকারে

তুমি যা দিয়েছো পূজনীয়/এই দীর্ঘশ্বাস চিরকাল ঊর্ধ্বমুখী

খুব ছোট একটি প্রেমের কবিতা। দুর্বোধ্যতা নেই কোথাও। কিন্তু ভাবনার যে স্থাপত্য নির্মিত হয়েছে তা অনুভব করতে কষ্ট হয় না। এবং সেই অনুভবের মধ্যে মাহাত্ম্য আছে, কবির নিজস্ব একটি দর্শন আছে- অতি সহজ-সাধারণ দর্শন। কিন্তু নির্বাচিত শব্দের মধ্যে তিনি ছন্দের যে প্রবাহকে আহ্বান করেছেন তা বোধের গতিময় স্বাভাবকে তৃপ্ত করে। খুব ছোট একটি কবিতা। কিন্তু সুন্দর। গড়নে সুন্দর, বলায় সুন্দর, না বলায় সুন্দর, বোধে সুন্দর, বেদনায় সুন্দর এবং বিশেষ করে সর্বশেষ পঙ্ক্তি দুটি সুন্দরতম।

এ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটির নাম ‘একটি কথার অঙ্কুরোদগম’। প্রেমের কবিতা।

কবিতাটি থেকে কিছু অংশ উল্লেখ করি-

একটি কথা বুকের মাঝে/জ্বালাচ্ছে বেশ;/একটি কথা ঠোঁটের কাছে

আনতেই শেষ।

কী করে হায় বলবো বলো/সেই কথাটা/বুকের মাঝে ঠোঁটের ভাঁজে/কুলুপ আঁটা।

আদিত্য নজরুলের উদ্ধৃত কবিতাংশ বিবেচনা করলে তাঁর প্রজন্মের এই জীবন-ঘনিষ্ঠতা অনুভব করা যায়। প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত অতি সাধারণ শব্দ দিয়ে কবিতা লেখার জন্য অনেক শক্তি ও সাহসের দরকার হয়। আদিত্য নজরুলের কবিতায় সেই শক্তি ও সাহসের পরিচয় আছে। প্রেম ও দুঃখবোধের একটি চিরায়ত অনুভব বাংলা কবিতার প্রাণ। আশাবাদী কবি, নিঃসঙ্গতাবাদী কবি, প্রেমের কবি, অপ্রেমের কবি, জনতার কবি, নির্জনতার কবি সবাই প্রেমের কবিতা লিখেছেন এবং সেই প্রেম দুঃখবোধকে অতিক্রম করে নয়। আত্যি নজরুলের সাম্প্রতিক সময়ে লেখা একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি এ রকম :

দুঃখ দিতে সবাই কি আর পারে/দুঃখ হলো শিল্পে বোনা বাবুই পাখির বাসা/দুঃখ হলো চরকা কাটা তাঁত/দুঃখ হলো ব্যর্থ প্রেমের গোপন মাতৃভাষা।

এই হলো এই সময়ের একজন কবির প্রেম ও দুঃখবোধ। এই বোধের মধ্যে এমন একটি সহজতা আছে, সারল্য আছে যা আমাদের প্রেমের অনুভবকে এবং কষ্টের অনুভবকে আলোড়িত করে তোলে।

কবিতার বা কবিদের কোনো দলে আদিত্য নজরুল আছেন কিনা তা আমার জানা নেই। যদি থাকেন তা হলে ভালো এবং না থাকলেও মন্দ নয়। কেননা তিনি কবিতাময় এক জীবনযাপন করেন। নিরন্তর কর্মের মধ্যে থেকে, জীবনের বিচিত্র টানাপোড়েনের মধ্যে থেকে দীর্ঘ কবিতা লেখা প্রায় দুঃসাধ্য। ফলে তিনি বেছে নিয়েছেন ছোট কবিতার ছোট ছোট প্লট। ‘প্লট’ শব্দটি আমি সচেতনভাবেই ব্যবহার করেছি। তিনি তার ছোট ছোট কবিতাগুলোর মধ্যে সংগোপনে পুরে দেন গল্পের ভেতরগত দ্যোতনা। গল্পের ভেতরগত এ দ্যোতনাকেই আমরা বলতে চাই ‘প্লট’ বা আখ্যান। নজরুল খুব সচেতনভাবেই এ কাজটি করেন বলে আমার বিশ্বাস। ফলে তার কবিতার মধ্যে আখ্যানে আস্বাদ পাওয়া যায়। কাব্যভাষা, কবিতা ও আখ্যান এবং আখ্যানের বৈচিত্র্য এবং সহজতা একাকার হয়ে আদিত্য নজরুলের কবিতা যে রূপ পরিগ্রহ করে তাকে হৃদয়গ্রাহী বলতে হবে। এবং এই রূপাবয়বের অন্তরালে রহস্যময়তার সৌন্দর্য তার কবিতাকে শক্তিমান করে তুলেছে।