গল্প

কিশোর গ্যাং

  মাহবুবা হোসেইন ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মা বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিশোরও বেরিয়ে যায়। সে শুধু জানে মা দিনের বেলায় একটা ওষুধের দোকানের সেল্স গার্ল, রাতে একটা রেস্টুরেন্টের ক্যাশে বসে। কোন রেস্টুরেন্ট কে কি এসব জানার তার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। যে বাবা-মা নিয়াজের বাবা মায়ের মতো একটা হুন্ডা কিনে দিতে পারে না তাদের খবর রেখে তার কী লাভ? নিয়াজ চাইতে না চাইতেই পেয়ে গেল ঝা চকচকে হুন্ডা সিবিআর ১৫০-আর। ওটা নিয়ে নিয়াজ যখন মাস্তি করে বেড়ায়, গাটা তার জ্বলে যায়। নিয়াজের বাবা ওয়াসার ইঞ্জিনিয়ার। বিস্তর টাকা। দামি মোবাইল, সুন্দরী বান্ধবী, নামিদামি রেস্টুরেন্টে ট্রিট এসব নিয়াজের জন্য কোনো ব্যপারই না। বাবা হলে এমনই হওয়া দরকার, নিয়াজের পকেট সব সময় গরম, সেই গরমে সে যেন তেলেগু ঘূর্ণি। ওর গ্যাংটার নামও জব্বর ‘টর্নেডু সাগা’, সাগরেদও অনেক। ইস তার যদি ওর মতো একটা হুন্ডা থাকত দেখিয়ে দিত তাকত কিন্তু বাসায় কথাটা তুলতেই ঘেন্না হয়, সেই তো তেচৈতি বাপ, মুরুদ নেই এক ঘটি পানি কেনার আবার হুন্ডা? ব্যবসায় মার খেয়ে সেই যে ঘরে বসেছে নট নড়নচড়ন। পারার মধ্যে পারে শুধু খিস্তি। মাঝে মাঝে মনে হয়...।

পরিবারের কিছুই এখন আর তাকে টানে না। আগে আগে বাবার রক্ত চক্ষু কিছুটা ভয় পেত, এখন ড্যাম কেয়ার। কে করবে কেয়ার। কী দিয়েছে পরিবার? শীতলতা অথবা নিষ্ঠুরতা ছাড়া? বাবা মার সম্পর্কটা সব সময় চরম- হয় শীতল নয় গরম। যখন শীতল- তখন যার যার তার তার, তৃতীয় পক্ষ তখন গৌণ কিন্তু যখন গরম- মারামারি ফাটাফাটি, উত্তপ্ত বাষ্প নিষ্কাশনের জন্য তখন তৃতীয় পক্ষ দরকার, তাই তার এবং তার ছোট বোন অরুনীর পিঠের চামড়া সুকতালার মতো শক্ত। কিশোর এখন আর কেয়ার করে না। অরুনী এখনও করে কারণ সে এখনও ছোট।

আজকের ঘটনাটাই বা কী? সন্ধ্যাও তো পেরোয়নি। বন্ধের দিন। মা সেজেগুজে কোথায় বেরোচ্ছে। বাবা বললেন- ‘এই ভর সন্ধ্যায় কোথায় বেরোচ্ছ?’

মা রেগে বললেন- ‘যেখানে খুশি। কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি?’

-হ্যাঁ দিতে হবে।

-কেন?

-কারণ আমি তোমার স্বামী।

-উঁ স্বামী? কত না? খাওয়া দেয়ার মুরোদ নাই, স্বামী?

-কী কী বললে? ও খাওয়া পরা জোগাড় করতেই যাওয়া হচ্ছে বুঝি? সেই নাগররাই আজকাল তোমাকে খাওয়াচ্ছে?

-হ্যাঁ তাই। শুধু আমাকে নয় তোমাকেসহ।

বলেই গডগড করে বেরিয়ে গেল মা।

বাবা রাগে গরগর করতে লাগল। এদিক ওদিক তাকিয়ে কিশোরকে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে তেড়ে এলো। কিশোর ঘুরে কটমট করে তাকাল। তার চোখে কী ছিল কে জানে বাবা স্তম্ভিত হয়ে সেখানেই স্থির হয়ে রইল। কিশোর আপসে বেরিয়ে এলো।

কিশোরকে এখন আর পরিবারকে কেয়ার করতে হয় না। কিছু কিছু টাকা-পয়সা আসছে হাতে। শ্যামলদা পঞ্চাশ টেবলেটের একটা থলি ধরিয়ে দিলেন, দিব্যি সন্ধ্যের মধ্যে বিক্রি হয়ে গেল। টেন পারসেন্ট কমিশন। মন্দ নয়। তিনি বলেছেন হাত পাকলে আরও বড় চালান নিশ্চিত। এখন দরকার দলটাকে ভারী করা। কিশোর একা নয়। নয়ন, রিফাত, মান্নান, ধলা রফিক, পিচ্চি হান্নান, কালো মানিক, অনন্তও টুপাইস ভালোই কামাচ্ছে। পুলিশ থেকে একটু সাবধানে থাকতে হয় এই যা। ধরলেও অবশ্য তেমন কিছু হয় না। আঠারোর নিচে বলে পুলিশ একটু ব্যাটন ধোলাই দিয়ে ছেড়ে দেয়। পুলিশের ব্যাপারটা শ্যামলদারাই সামলায়। এদিকটায় তাদের তেমন চিন্তা নেই। তাদের আসল শত্রু ভি- রোজ, ব্ল্যাক নাইট, স্টর স্টার সিক্স গ্রুপগুলো। ক্ষমতার লড়াইয়ে হেরে গেলেই চিত্তির। তাদের গ্রুপটারও একটা নাম আছে, ‘কিশোর বয়েজ।’ আপসে আপ হয়ে গেছে নামটা। প্রথমে আড্ডার গ্রুপ ছিল। দলবেঁধে ভিডিও গেম খেলত। মাঝে মাঝে এটা ওটা সেটা টেস্ট করা, ব্লু-টুলু দেখা এই আরকি।

দলের মধ্যে কিশোরের সাহসই সব থেকে বেশি। অন্যেরা তাকে নেতাই মানে। ‘কিশোর বয়েজ’ বললে তাদের মুখটাই ভেসে ওঠে যারা তার নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বাপ্পি। ও এখন দলছুট। নিজেই আলাদা গ্যাং করেছে। কিশোররা তাকে ফিদাই করে দিত যদি তার বড় ভাই একটা ক্ষমতাধর দলের নেতা না হতো। ভাগ্যটা বাপ্পির ভালোই বলতে হবে।

কিশোরদের দলটা আজকাল ছিনতাই করে কিছু। এ কাজে কালো মানিক বেশ চোস্ত। ওর টার্গেট একেবারে নিখুঁত।

আরেকটা বিষয়ও কয়েকদিন থেকে কিশোরের মাথায় ঘুরছে। গ্যাংয়ের অন্যদের সঙ্গে আলাপ করে ফাইনাল করবে ভাবছিল কিন্তু আজকে বাসার ঘটনাটা মেজাজ খিচরে দিয়েছে। এখন মাথা কাজ করবে না। তারপরও মালিবাগ চৌরাস্তার মাথায় বাম পাশের ফুটপাতের পাশে খোলামতো জায়গাটার অস্থায়ী চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে যেখানে রোজ ওরা আড্ডা দেয় সেদিকেই পা বাড়াল কিশোর। তখন রাত ঘেঁষা সন্ধ্যা। চায়ের দোকানটায় একশ পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছে। চা ছাড়াও কাচের বাক্সে ঠাণ্ডা সিঙ্গাড়া সমুচা এসব বিক্রি হয়। দড়িতে কিছু পাওরুটি বন আর কলা ঝোলে। ফ্রেশই সব খুব বিক্রি হয় তাই বাসি হওয়ার সুযোগ কম। দূর থেকে বেঞ্চে বসা লোকগুলোকে ছায়া ছায়া দেখাচ্ছে। হান্নানকে চেনা যায় মোটো বলে, অন্যগুলো কে কে জানে? গ্যাংয়ের ওরাই হবে, এ সময় প্রায় সবাই এসে যায়। আসতে না চাইলে ফোন করে ডেকে আনা হয়। না এলে পেনাল্টি। এক পেট বিরিয়ানি সবাইকে। ছাড় নাই। কিশোরের আজ দেরি হচ্ছিল বলে এর মধ্যেই দশটা ফোন এসে গেছে। মন ভালো নেই তাই ধরেনি। দোকানের কাছে এসে দেখে নুতন দুটো ছেলেও আছে। রিফাত পরিচয় করিয়ে দিল পল্লব আর জেরিম। মিরপুরের ছেলে। রিফাতের আন্টির বাসা মিরপুরে ওখানেই পরিচয়। কিশোর হাত বাড়িয়ে দিল, সামান্য কোলাকুলিও করল তবুও কোথায় যেন আজ ছন্দ কেটে গেছে। অন্যদিন হলে ছেলে দুটোর প্রতি কৌতূহল হতো, পরিচয়টা বন্ধুতে পরিণত করতে দু’মিনিটের ব্যাপার মাত্র কিন্তু আজকে শুধু পরিচয় পর্যন্তই।

বিচ্ছিন্ন হয়ে একটু দূরে ফুটপাতের চাতালটাতে এসে বসল কিশোর। বাবার প্রতি একটা ঘৃণা উথাল-পাথাল করে দিচ্ছে তাকে। কোনো কিছু করার মুরোদ নেই কেবল চোটপাট। মায়ের প্রতি লোকটার কেন যে এত বিদ্বেষ? ছোট বেলা থেকে কম অত্যাচার দেখেনি। ইদানীং মা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মাকেও যে খুব সমিহ করে কিশোর তা নয় তারপরও তার প্রতিই কিছুটা কেমলতা অনুভব করে। মায়ের প্রফেশন নিয়ে তার সন্দেহ আছে তারপরও যাই করুক সে জানে তাদের জন্যই করে। উপায়হীন বলেই করে।

এ সবই আলোড়ন তুলছিল কিশোরের মনে। মান্নান এসে কাছে বসল। পা টান করে হাত দুটো পায়ের ভাজে গুঁজে দিতে দিতে বলল ‘দোস্ত এসব টুকটাকে আর চলছে না। বড় দান মারতে হবে। ছোঁচো মেরে হাত নোংরা করে কী লাভ? এয়সা দান লাগাব না জনমের তরে নিশ্চিন্ত।’

কিশোর নির্লিপ্ত গলায় বলল, ‘তো কী করতে চাস?’ মান্নান কিশোরের কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে কিছু বলল। কিশোরের চোখ চকচক করে উঠল। তাকে বেশ চাঙ্গা দেখাল। কিছুূদিন থেকে আরও চ্যালেঞ্জিং কিছু করার জন্য তার মন ছটফট করছিল।

মান্নান হাত ঝেড়ে হেসে বলল, ‘কী বুঝলি দোস্ত এক ঝাড়ে বড়লোক নাকি?’ কিশোর বুঝদার হাসি হাসল।

নয়ন রিফাত পিচ্চি হান্নান গত রাতে রেস্টুরেন্টটা ভালো করে রেকি করে এসেছে। সংবাদ হল রাত দশটার পর ক্যাশ ক্লোজ করা হয়। তখন অধিকাংশ কর্মচারী বাড়ি চলে যায়। যারা থাকে তারাও তিন তলায় যার যার রুমে উঠে যায়। ক্যাশে যে মহিলা বসে সে এ সময় ম্যানেজারকে টাকা-পয়সা বুঝিয়ে দেয়। ম্যানেজার পরের দিনের বাজারের টাকা রেখে বাকি টাকা রেস্টুরেন্টের নিজস্ব লকারে তুলে রাখে পরের দিন ব্যাংকে জমা দেবে বলে। দরজায় থাকে শুধু একজন গার্ড।

অপারেশন চালাতে হবে টাকাগুলো লকারে বন্দি হওয়ার আগে। তাদের মধ্য থেকে তিনজন চাইনিজ চাকু নিয়ে পুরো রেস্টুরেন্টটা কভার দেবে। বিল্লু অন্ধকারে মিশে পেছন থেকে গার্ডটাকে কাবু করবে। মাথায় ভারী কিছু দিয়ে বাড়ি দিয়ে অজ্ঞান করাই উত্তম। চিৎকার দেয়ার আগেই মুখ চেপে ধরতে হবে। এ জন্য ভালো দেখে একটা হাতুড়ি কেনা হয়েছে। আর চাকু তো কোনো ব্যাপার না।

সিদ্ধান্ত মতো গার্ডকে কাবু করে ফেলল হান্নান। ভেতরে ঢুকল কিশোর আর নয়ন। নয়নের হাতে চকচকে চাইনিজ চাকু। শ্যামল ভাইয়ের বন্ধু আলম ভাইয়ের রাখতে দেয়া একমাত্র রিভলভারটি কিশোরের হাতে। ছোট বলে কেউ সন্দহ করবে না ভেবে কিশোরকে রাখতে দিয়েছিলেন ওটি, এখন প্রয়োজন হলে দুটোই ব্যবহার করা হবে। নয়ন আর কিশোর দ্রুত এগিয়ে গেল ক্যাশ কাউন্টারের দিকে। রেস্টুরেন্টের ভেতরটা অন্ধকার। সাশ্রয়ের জন্য অধিকাংশ লাইট নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। শুধু ক্যাশ কাউন্টারের ওপরে দুটো মৃদু লাইট জ্বলছে। কাউন্টারে কেউ নেই তবে সংলগ্ন একটা রুম থেকে চাবি নাড়াচাড়া ও কথাবার্তার মৃদু আওয়াজ আসছে। কিশোর লাফ দিয়ে কাউন্টারে উঠে গেল। পেছনের দেয়ালে রেস্টুরেন্টের নিজস্ব ড্রেস পরা একজন পুরুষ ও একজন মহিলার প্রতিচ্ছায়া। ওরা তখন সারা দিনের সংগৃহীত টাকাগুলো লকারে তুলছে। রিভলভারটি সেদিকে তাক করে ভদ্রমহিলার ঠিক পায়ের কাছে ফাঁকা গুলি করে কিশোর চিৎকার করে বলল, ‘একদম নড়তে চেষ্টা করবেন না, যা আছে দিয়ে দিন। অন্য কিছু করার চেষ্টা করলে মাথার খুলি উড়ে যাবে।’ উত্তেজনায় কিশোরের মাথা কাজ করছে না, হাত মৃদু মৃদু কাঁপছে।

ভয় পেয়ে মহিলাটি মুখে মৃদু শব্দ করে চমকে তাকাল। তৎক্ষণাৎ আরেকজনও আমূল চমকে গিয়ে স্থির হয়ে গেল। বিস্মিত দুই জোড়া চোখ পরস্পরের দিকে বিস্ফারিত তাকিয়ে রইল। দুজনের কেউই যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এই ফাঁকে রিভলবারের উত্তপ্ত ধোয়া মাতা-পুত্রের মাঝে বিভাজিকার মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত