ছন্দই কবিতার প্রাণ : ফ্রাঙ্ক বিডার্ট
jugantor
ছন্দই কবিতার প্রাণ : ফ্রাঙ্ক বিডার্ট

  অনুবাদ- আকেল হায়দার  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সমসাময়িক ঘটনা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, বিচারিক ব্যবস্থা, আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা বিভিন্ন বিষয় সাবলীলভাবে উঠে আসে অ্যামেরিকান কবি ফ্র্যাঙ্ক বিডার্টের কবিতায়। ফলে সমাজের একজন সচেতন নাগরিক কবি হিসেবে তার রয়েছে আলাদা পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা।

১৯৬৫-২০১৬ সাল পর্যন্ত লেখা তার দীর্ঘ কবিতার সংকলন ‘হাফ-লাইট’ ২০১৮ সালে পেয়েছে পুলিৎজার প্রাইজ। পুলিৎজার ছাড়াও ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড (২০১৩), পেন অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ(২০১৭)-সহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ফ্র্যাঙ্ক বিডার্টের প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে গোল্ডেন স্টেট (১৯৭৩), দ্য স্যাক্রিফাইস (১৯৮৩), ডিজায়ার (১৯৯৭), মিউজিক লাইক ডার্ট (২০০২), ওয়াচিং দ্য স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল (২০০৮), স্টার ডাস্ট (২০০৫) ও মেটাফিজিক্যাল ডগস (২০১৩) উল্লেখযোগ্য।

ফ্র্যাঙ্ক বিডার্টের এ সাক্ষাৎকারটি দ্য ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনার পোয়েট্রি সেন্টার নিউজলেটারে ২০১৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন অ্যাশলি হ্যাচার।

অ্যাশলি হ্যাচার : চলতি বছরের টাক্সান পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যালের স্লোগান হল ‘কবিতা অসত্য বলে’ এ প্যানেলে অংশগ্রহণ এবং কবিতা পাঠ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

ফ্র্যাঙ্ক বিডার্ট : আমার কবিতায় অনেক রকমের গল্প লুকিয়ে থাকে সম্ভবত সেসব অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো সম্পর্কে আলোচনা করতেই আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যে কোনো কবিতায় চিরায়ত কিছু বিষয়, নাটকীয়তা, কল্পনা ও সৃষ্টির বিভিন্ন বিষয় থাকে। এমন অনেক কবিতা আছে যেগুলো সত্য বলতে উদ্বুদ্ধ করে। এটা ঠিক, সত্যি কথা বলতে অনেক সময় বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাই কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করে সেটাকে উপস্থাপন করতে হয়। কবিতায় জ্ঞানবোধের বিষয় নিহিত আছে সেই সঙ্গে তা অন্তদৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। কবিতা সবসময় একটা গতিশীল অবস্থার মধ্যে চলে। যেটা সত্য সেটা সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। তবে কিছু বিষয় থাকে অনুধাবনের তাই বলে সেটাকে মিথ্যা বলে সংজ্ঞায়িত করা মোটেও উচিত হবে না।

: তার মানে আপনি বলতে চাইছেন কবিতা হচ্ছে চিন্তা ও অনুভূতি প্রকাশের একটি প্রক্রিয়া- যেখানে মনের কথাগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। কবিতা অন্তরের অব্যক্ত ভাষা ও অনুভূতি প্রকাশের একটি মাধ্যম বা অদৃশ্য কারও সঙ্গে বাদানুবাদ। আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন কবিতার যে ফর্মটি আপনি ব্যবহার করছেন সেই অভিব্যক্তিটি এমন হতে পারে যাতে মনে হবে আপনি সবকিছু সত্যি বলছেন?

: আমরা বরং আনুষ্ঠানিক কবিতা প্রসঙ্গে ফিরে যাই। যাকে আমরা উন্মুক্ত ফর্ম বলে থাকি সে বিষয়ে কথা বলি। মেরিলের ‘দ্যা ব্রোকেন হোম’ পরিবার নিয়ে একটা দারুণ কবিতা এবং সনেট সিরিজ। আমি মনে করি ছন্দ কবিতার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কবিতা কোন ফর্মে লেখা সে বিষয়ের চেয়ে এতে ছন্দের কতটা অলঙ্করণ হয়েছে, বিষয়বস্তু কি রয়েছে সে বিষয়গুলো মুখ্য বলে মনে হয়। ছন্দের কাজ হল কবি ও কবিতার মাঝে গভীরতম আবেগের সংযোগ স্থাপন করে পাঠকের অন্তরে তার রেশ ছড়িয়ে দেয়া।

এখন বলুন আপনার সাহিত্যে ছন্দ কীভাবে অনুরণিত হচ্ছে?

: মূলত আমি যেটা করি তা হল আমার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকা বিভিন্ন বিষয়গুলোকে শব্দ ও ছন্দের মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করি। আমি শব্দের গতি প্রকৃতিতে পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয়গুলোর সেতুবন্ধ তৈরি করি।

আপনার ‘সেল্ফ পোট্রেট (১৯৬৯), সনেটটি প্রথম কবিতার একপেশে ধারাকে পরিবর্তিত করে মুক্তরূপ দেয় সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

: রিলকে’র কবিতা ‘সেল্ফ পোট্রেট ১৯০৬’ মূলত এ কবিতার মডেল। এটি বিষয়ভিত্তিক ঘটনা অলঙ্করণের একটি ভিন্ন সংস্করণ। আমি লেখকদের একটি ছোট ঐতিহ্যগত বিষয় নিয়ে ভেবে এ ধারার লেখায় হাত দিয়েছি। আমার কাছে ভাবনির্ভর কবিতা অসম্পূর্ণ একটি রূপ। এটি রুদ্ধ দ্বারের মতো কাজ করে যেখানে অনুভূতি বদ্ধ প্রাচীরের ভেতর পালিয়ে বেড়ায়। ব্যাপারটা ঠিক এ রকম যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আংশিক নিজের চেহারা দেখার মতো। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই পরিবর্তনের সহজাত স্বভাব রয়েছে। কেবল একজনের চেতনা সবকিছু নয়। চেতনার আয়নায় একজনের ভেতর আরেকজনের প্রতিচ্ছবি কী হতে পারে সেটা অনুমান করে পাঠকের সামনে তুলে ধরাটাই আসল।

জেন মিলার বলেছিলেন সত্তরের দশকে কবিতার একটা সংকট ছিল এবং আমি কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম। এখন আবার কবিতার সুদিন ফিরে এসেছে। আপনার প্রথম বইয়ের ‘সেল্ফ পোট্রেট, ১৯৬৯’ কবিতা থেকে বলি অ্যামেরিকান কবিতায় সত্তরের দশকের সংকট ও নব্বইয়ের দশকে তার পুনরুত্থানে আপনার নিজ সাহিত্যকর্মকে কীভাবে বিচার করবেন?

: নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে আমার অনেক সংশয় আছে। আমার কবিতায় আমি সবসময় নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারিনি। আমার কাছে কবিতা পরিবারের মতো আর আমি তার একটা অংশ। আমিই সেই ব্যক্তি যার একটা অতীত আছে, যে নির্ধারিত কোনো সময়ে অবস্থান করে নির্ধারিত কিছু বিষয় পাঠকের কাছে তুলে ধরে। লেখার সময় আমি পদ্ধতি, গঠনশৈলী ও বিষয়বস্তুর দিকে খুব নজর দিই। একপেশে বক্তব্যের কবিতাগুলো অনেক বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।

এ ছাড়া আত্মজীবনীমূলক কবিতাগুলোয় জীবনের প্রকৃত অনেক বিষয় স্থান পায়। নিজের কথা বলার সময় পুরোপুরি একীভূত হয়ে বলা উচিত। আপনি সেই মানুষটি নন যিনি একটু আগে কবিতার মাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন এবং যা লিখেছেন তা অসত্য।

এ বিষয়টি আমার কাছে খুব অদ্ভুত লাগে যখন স্পষ্টভাষায় কোনো কিছু লেখা হয়না বা লেখায় সরাসরি মনের প্রতিফলন ঘটে না- সে লেখাটি তখন তার পরিপূর্ণ রূপ থেকে বঞ্চিত হয়।

আমি আত্মবিশ্বাসী বা স্পষ্টটা নিয়ে বলতে চাই না, আমি বিষয়বস্তু নির্ণয়ে বর্তমান অগ্রগতির কথা বোঝাতে চেয়েছি। আপনার অনেক কবিতায় নিজের সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ সংলাপ রয়েছে যেখানে আপনার নিজস্ব অনেক কিছুর বর্ণনা আছে সে বিষয়ে কিছু বলুন।

: এটা ঠিক। একটা সাক্ষাৎকারে আমি এ কথা বলেছি আর এটা আমার কাছে কবিতার একটা মৌলিক বোধ। অন্যদের সঙ্গে যুক্তি নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি নিজেদের সঙ্গে নিজের যুক্তি মিশিয়ে কবিতা তৈরি করি। এসব যুক্তিতর্ক নিজের মাঝে চলতে থাকে অথবা নিজেদের কবিতার চরিত্রে মিশতে থাকে। কবিতায় ‘আমি’ একটি সত্তা যে নিজের সঙ্গে সারাক্ষণ নিজের বোঝাপড়া করে।

সেই বিবেচনায় আপনার কবিতা অন্য সত্তায় স্বীকারযোগ্য এই বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?

: এখানে আমরা বিভিন্ন মানুষের মতামত ও স্বীকারোক্তি নিয়ে কথা বলছি। আমার মতে কবিতায় নেতিবাচক দিক হল সেই বিষয় যদি তার মাধ্যমে কোনো কিছু প্রকাশ না পায়। নতুবা এটা অনর্থক প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো যার কোনো গুরুত্ব নেই। আমি আমার কবিতাকে সেভাবে দেখি না। তারা পতিত নয়, অসহায় নয় আর আমি নিজের কবিতাকে সেভাবে কখনও ভাবি না। কেউ যদি তার লেখা নিয়ে কোনো ভুল স্বীকার করে আমার কাছে দোষের মনে হয় না। সাহিত্য কারও জন্য ক্ষতিকর নয় কিংবা বিশ্বে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করে না। অগাস্টিনের অটোবায়োগ্রাফিকে বলা হয় একটি স্বীকারোক্তিমূলক লেখা। স্বীকারোক্তির ধারণা হল প্রকৃত বিষয়কে সাবলীল ও যথাযথভাবে উপস্থাপন করা। যদিও এ আলোচনা অনেকে অপ্রীতিকর বলে মনে করে। আমার কাছে এটা আত্মসমালোচনার মতো। ত্রুটি বিচ্যুতি হতেই পারে তাই বলে সেটা স্বীকার করার মানসিকতা কোনো অপরাধবোধের অনুষঙ্গ নয়। বরং এতে লেখকের উদার মনের পরিচয় বহন করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যদিও এর দ্বৈরথ রয়েছে। একজন মানুষকে অবশ্যই তার জীবন পরিপূর্ণ করার জন্য গন্তব্য খুঁজে বের করতে হবে, ঠিক তেমনি আরেকজন চায়না হতাশ হতে প্রতারিত হতে অথবা যাকে ভালোবাসে তাকে ব্যথিত করতে। আমি মায়ের সন্তান হতে চেয়েছিলাম অথচ আমি পারিনি তেমন মানুষ হতে যেমনটা আমার হওয়ার প্রয়োজন ছিল।

আত্মজীবনীমূলক কবিতা ও ড্রাম্যাটিক মনোলগের মধ্যে কিছু সামঞ্জস্য রয়েছে। সেই থিমের মধ্যে কোন জিনিসটি আপনাকে বেশি আকর্ষিত করে যেমন প্রত্যাখ্যান, জীবিকা নাকি সেক্স?

: আমি ক্যথলিক পরিবারে বড় হয়েছি তবে আমি ক্যথলিক নই। ক্যথলিকবাদের ক্ষেত্রে খুব মৌলিক কিছু বিষয় আছে যা আমি অনুধাবন করেছি। সেখানে শরীর ও মনের মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধ আছে। যদিও আমি ক্যথলিক নই তবুও আমি বিশ্বকে উপলব্ধি করি ও অভিজ্ঞতা অর্জন করি। বলাবাহুল্য সবসময় সবকিছু সাদৃশ্যপূর্ণ হয় না তাই এখানে সারাক্ষণ একটা স্নায়ুযুদ্ধ চলে। আত্মা ও শরীরের চাহিদার মধ্যে সারাক্ষণ একটা বৈষম্য আছে। শরীর আত্মাকে কী দিতে পারে কিংবা আত্মা শরীর থেকে কী পেতে পারে?

অ্যালেন ওয়েস্ট এই নাটকীয়তার চমৎকার বর্ণনা করেছেন। যুদ্ধের অবতারণা হবে এবং শরীরের অনিবার্যতা থাকবে। এ কথা এখন শীতল অ্যান্টিসেপ্টিকের মতো। তুমি বিষয় নির্বাচন করতে পারছ না, বিষয় তোমাকে নির্বাচিত করছে। বিষয় আমাকে আবর্তিত করছে। আমি সেসব বিষয়ের প্রতি প্রলুব্ধ হচ্ছি। অনুভূতিরা আমাকে ধরা দিচ্ছে তবে গল্পাকারে নয়। আমি অ্যালেন ওয়েস্টকে লিখিনি যেখানে অ্যানোরেক্সিয়ার মতো একটি অসুখের বিষয় আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। যেখানে খাওয়া বা না খাওয়ার বিষয় জড়িত ছিল। আমার কাছে সেসব বিষয় মুখ্য নয়। আমি সেসব বিষয় নিয়ে সেভাবে কবিতা লিখিনি। যখন আমি শরীর ও মনের নাটকীয় সংগ্রামের ব্যাপারগুলো জেনে যাই তখন কবিতারা আপনাআপনি এসে আমার কাছে ধরা দেয়।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক কবিতা লেখার ক্ষেত্রে আপনি কি পদ্ধতি অবলম্বন করেন? আগে বিষয়ের লক্ষ্যবস্তু ঠিক করেন নাকি কথাগুলো সাজিয়ে নিয়ে তারপর লেখা শুরু করেন।

: প্রথমত আমি কবিতার বিষয়বস্তুতে নিজেকে নিমগ্ন করি। অনেক বছর আগে আমি অ্যালেন ওয়েস্টকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলাম এবং তার ঘটনাটি আমি জানতাম। তারপর আমি দীর্ঘ সময় বিনসোয়াঙ্গারের সম্পর্কে জানলাম। যখন আমি নিজিনিস্কির চূড়ান্ত পাঠ্যসূচি শুনলাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে জানলাম তখন আমার মনে হল এটাই কবিতার মূল বিষয়বস্তু হতে পারে। আমার কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অনুভূতি ইত্যাদি সংগঠিত করার সব রকম উপাদানই সহজলভ্য ছিল। আমার মতে কবিতা কেবল নিজিনিস্কি কিংবা অ্যালেন ওয়েস্টের কণ্ঠস্বর নয়। এটা গদ্যের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত যা ভিন্নতর দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণিত হয় আবার সেই কথাগুলোই স্তবকের মাধ্যমে কবিতায় প্রকাশ পায়। কবিতা ডাক্তার কতৃক বর্ণিত কোনো গদ্য নয় কিংবা অ্যালেন ওয়েস্টের কোন পঙ্ক্তি নয়। এটা হল ভাব ও বিষয়ের এক পরিপূরক সংযোগস্থল। কবিতা বলতে আমি এভাবেই বুঝি।

সময় দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

: আপনাকেও ধন্যবাদ।

ছন্দই কবিতার প্রাণ : ফ্রাঙ্ক বিডার্ট

 অনুবাদ- আকেল হায়দার 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সমসাময়িক ঘটনা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, বিচারিক ব্যবস্থা, আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা বিভিন্ন বিষয় সাবলীলভাবে উঠে আসে অ্যামেরিকান কবি ফ্র্যাঙ্ক বিডার্টের কবিতায়। ফলে সমাজের একজন সচেতন নাগরিক কবি হিসেবে তার রয়েছে আলাদা পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা।

১৯৬৫-২০১৬ সাল পর্যন্ত লেখা তার দীর্ঘ কবিতার সংকলন ‘হাফ-লাইট’ ২০১৮ সালে পেয়েছে পুলিৎজার প্রাইজ। পুলিৎজার ছাড়াও ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড (২০১৩), পেন অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ(২০১৭)-সহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ফ্র্যাঙ্ক বিডার্টের প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে গোল্ডেন স্টেট (১৯৭৩), দ্য স্যাক্রিফাইস (১৯৮৩), ডিজায়ার (১৯৯৭), মিউজিক লাইক ডার্ট (২০০২), ওয়াচিং দ্য স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল (২০০৮), স্টার ডাস্ট (২০০৫) ও মেটাফিজিক্যাল ডগস (২০১৩) উল্লেখযোগ্য।

ফ্র্যাঙ্ক বিডার্টের এ সাক্ষাৎকারটি দ্য ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনার পোয়েট্রি সেন্টার নিউজলেটারে ২০১৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন অ্যাশলি হ্যাচার।

অ্যাশলি হ্যাচার : চলতি বছরের টাক্সান পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যালের স্লোগান হল ‘কবিতা অসত্য বলে’ এ প্যানেলে অংশগ্রহণ এবং কবিতা পাঠ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

ফ্র্যাঙ্ক বিডার্ট : আমার কবিতায় অনেক রকমের গল্প লুকিয়ে থাকে সম্ভবত সেসব অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো সম্পর্কে আলোচনা করতেই আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যে কোনো কবিতায় চিরায়ত কিছু বিষয়, নাটকীয়তা, কল্পনা ও সৃষ্টির বিভিন্ন বিষয় থাকে। এমন অনেক কবিতা আছে যেগুলো সত্য বলতে উদ্বুদ্ধ করে। এটা ঠিক, সত্যি কথা বলতে অনেক সময় বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাই কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করে সেটাকে উপস্থাপন করতে হয়। কবিতায় জ্ঞানবোধের বিষয় নিহিত আছে সেই সঙ্গে তা অন্তদৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। কবিতা সবসময় একটা গতিশীল অবস্থার মধ্যে চলে। যেটা সত্য সেটা সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। তবে কিছু বিষয় থাকে অনুধাবনের তাই বলে সেটাকে মিথ্যা বলে সংজ্ঞায়িত করা মোটেও উচিত হবে না।

: তার মানে আপনি বলতে চাইছেন কবিতা হচ্ছে চিন্তা ও অনুভূতি প্রকাশের একটি প্রক্রিয়া- যেখানে মনের কথাগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। কবিতা অন্তরের অব্যক্ত ভাষা ও অনুভূতি প্রকাশের একটি মাধ্যম বা অদৃশ্য কারও সঙ্গে বাদানুবাদ। আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন কবিতার যে ফর্মটি আপনি ব্যবহার করছেন সেই অভিব্যক্তিটি এমন হতে পারে যাতে মনে হবে আপনি সবকিছু সত্যি বলছেন?

: আমরা বরং আনুষ্ঠানিক কবিতা প্রসঙ্গে ফিরে যাই। যাকে আমরা উন্মুক্ত ফর্ম বলে থাকি সে বিষয়ে কথা বলি। মেরিলের ‘দ্যা ব্রোকেন হোম’ পরিবার নিয়ে একটা দারুণ কবিতা এবং সনেট সিরিজ। আমি মনে করি ছন্দ কবিতার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কবিতা কোন ফর্মে লেখা সে বিষয়ের চেয়ে এতে ছন্দের কতটা অলঙ্করণ হয়েছে, বিষয়বস্তু কি রয়েছে সে বিষয়গুলো মুখ্য বলে মনে হয়। ছন্দের কাজ হল কবি ও কবিতার মাঝে গভীরতম আবেগের সংযোগ স্থাপন করে পাঠকের অন্তরে তার রেশ ছড়িয়ে দেয়া।

এখন বলুন আপনার সাহিত্যে ছন্দ কীভাবে অনুরণিত হচ্ছে?

: মূলত আমি যেটা করি তা হল আমার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকা বিভিন্ন বিষয়গুলোকে শব্দ ও ছন্দের মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করি। আমি শব্দের গতি প্রকৃতিতে পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয়গুলোর সেতুবন্ধ তৈরি করি।

আপনার ‘সেল্ফ পোট্রেট (১৯৬৯), সনেটটি প্রথম কবিতার একপেশে ধারাকে পরিবর্তিত করে মুক্তরূপ দেয় সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

: রিলকে’র কবিতা ‘সেল্ফ পোট্রেট ১৯০৬’ মূলত এ কবিতার মডেল। এটি বিষয়ভিত্তিক ঘটনা অলঙ্করণের একটি ভিন্ন সংস্করণ। আমি লেখকদের একটি ছোট ঐতিহ্যগত বিষয় নিয়ে ভেবে এ ধারার লেখায় হাত দিয়েছি। আমার কাছে ভাবনির্ভর কবিতা অসম্পূর্ণ একটি রূপ। এটি রুদ্ধ দ্বারের মতো কাজ করে যেখানে অনুভূতি বদ্ধ প্রাচীরের ভেতর পালিয়ে বেড়ায়। ব্যাপারটা ঠিক এ রকম যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আংশিক নিজের চেহারা দেখার মতো। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই পরিবর্তনের সহজাত স্বভাব রয়েছে। কেবল একজনের চেতনা সবকিছু নয়। চেতনার আয়নায় একজনের ভেতর আরেকজনের প্রতিচ্ছবি কী হতে পারে সেটা অনুমান করে পাঠকের সামনে তুলে ধরাটাই আসল।

জেন মিলার বলেছিলেন সত্তরের দশকে কবিতার একটা সংকট ছিল এবং আমি কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম। এখন আবার কবিতার সুদিন ফিরে এসেছে। আপনার প্রথম বইয়ের ‘সেল্ফ পোট্রেট, ১৯৬৯’ কবিতা থেকে বলি অ্যামেরিকান কবিতায় সত্তরের দশকের সংকট ও নব্বইয়ের দশকে তার পুনরুত্থানে আপনার নিজ সাহিত্যকর্মকে কীভাবে বিচার করবেন?

: নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে আমার অনেক সংশয় আছে। আমার কবিতায় আমি সবসময় নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারিনি। আমার কাছে কবিতা পরিবারের মতো আর আমি তার একটা অংশ। আমিই সেই ব্যক্তি যার একটা অতীত আছে, যে নির্ধারিত কোনো সময়ে অবস্থান করে নির্ধারিত কিছু বিষয় পাঠকের কাছে তুলে ধরে। লেখার সময় আমি পদ্ধতি, গঠনশৈলী ও বিষয়বস্তুর দিকে খুব নজর দিই। একপেশে বক্তব্যের কবিতাগুলো অনেক বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।

এ ছাড়া আত্মজীবনীমূলক কবিতাগুলোয় জীবনের প্রকৃত অনেক বিষয় স্থান পায়। নিজের কথা বলার সময় পুরোপুরি একীভূত হয়ে বলা উচিত। আপনি সেই মানুষটি নন যিনি একটু আগে কবিতার মাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন এবং যা লিখেছেন তা অসত্য।

এ বিষয়টি আমার কাছে খুব অদ্ভুত লাগে যখন স্পষ্টভাষায় কোনো কিছু লেখা হয়না বা লেখায় সরাসরি মনের প্রতিফলন ঘটে না- সে লেখাটি তখন তার পরিপূর্ণ রূপ থেকে বঞ্চিত হয়।

আমি আত্মবিশ্বাসী বা স্পষ্টটা নিয়ে বলতে চাই না, আমি বিষয়বস্তু নির্ণয়ে বর্তমান অগ্রগতির কথা বোঝাতে চেয়েছি। আপনার অনেক কবিতায় নিজের সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ সংলাপ রয়েছে যেখানে আপনার নিজস্ব অনেক কিছুর বর্ণনা আছে সে বিষয়ে কিছু বলুন।

: এটা ঠিক। একটা সাক্ষাৎকারে আমি এ কথা বলেছি আর এটা আমার কাছে কবিতার একটা মৌলিক বোধ। অন্যদের সঙ্গে যুক্তি নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি নিজেদের সঙ্গে নিজের যুক্তি মিশিয়ে কবিতা তৈরি করি। এসব যুক্তিতর্ক নিজের মাঝে চলতে থাকে অথবা নিজেদের কবিতার চরিত্রে মিশতে থাকে। কবিতায় ‘আমি’ একটি সত্তা যে নিজের সঙ্গে সারাক্ষণ নিজের বোঝাপড়া করে।

সেই বিবেচনায় আপনার কবিতা অন্য সত্তায় স্বীকারযোগ্য এই বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?

: এখানে আমরা বিভিন্ন মানুষের মতামত ও স্বীকারোক্তি নিয়ে কথা বলছি। আমার মতে কবিতায় নেতিবাচক দিক হল সেই বিষয় যদি তার মাধ্যমে কোনো কিছু প্রকাশ না পায়। নতুবা এটা অনর্থক প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো যার কোনো গুরুত্ব নেই। আমি আমার কবিতাকে সেভাবে দেখি না। তারা পতিত নয়, অসহায় নয় আর আমি নিজের কবিতাকে সেভাবে কখনও ভাবি না। কেউ যদি তার লেখা নিয়ে কোনো ভুল স্বীকার করে আমার কাছে দোষের মনে হয় না। সাহিত্য কারও জন্য ক্ষতিকর নয় কিংবা বিশ্বে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করে না। অগাস্টিনের অটোবায়োগ্রাফিকে বলা হয় একটি স্বীকারোক্তিমূলক লেখা। স্বীকারোক্তির ধারণা হল প্রকৃত বিষয়কে সাবলীল ও যথাযথভাবে উপস্থাপন করা। যদিও এ আলোচনা অনেকে অপ্রীতিকর বলে মনে করে। আমার কাছে এটা আত্মসমালোচনার মতো। ত্রুটি বিচ্যুতি হতেই পারে তাই বলে সেটা স্বীকার করার মানসিকতা কোনো অপরাধবোধের অনুষঙ্গ নয়। বরং এতে লেখকের উদার মনের পরিচয় বহন করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যদিও এর দ্বৈরথ রয়েছে। একজন মানুষকে অবশ্যই তার জীবন পরিপূর্ণ করার জন্য গন্তব্য খুঁজে বের করতে হবে, ঠিক তেমনি আরেকজন চায়না হতাশ হতে প্রতারিত হতে অথবা যাকে ভালোবাসে তাকে ব্যথিত করতে। আমি মায়ের সন্তান হতে চেয়েছিলাম অথচ আমি পারিনি তেমন মানুষ হতে যেমনটা আমার হওয়ার প্রয়োজন ছিল।

আত্মজীবনীমূলক কবিতা ও ড্রাম্যাটিক মনোলগের মধ্যে কিছু সামঞ্জস্য রয়েছে। সেই থিমের মধ্যে কোন জিনিসটি আপনাকে বেশি আকর্ষিত করে যেমন প্রত্যাখ্যান, জীবিকা নাকি সেক্স?

: আমি ক্যথলিক পরিবারে বড় হয়েছি তবে আমি ক্যথলিক নই। ক্যথলিকবাদের ক্ষেত্রে খুব মৌলিক কিছু বিষয় আছে যা আমি অনুধাবন করেছি। সেখানে শরীর ও মনের মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধ আছে। যদিও আমি ক্যথলিক নই তবুও আমি বিশ্বকে উপলব্ধি করি ও অভিজ্ঞতা অর্জন করি। বলাবাহুল্য সবসময় সবকিছু সাদৃশ্যপূর্ণ হয় না তাই এখানে সারাক্ষণ একটা স্নায়ুযুদ্ধ চলে। আত্মা ও শরীরের চাহিদার মধ্যে সারাক্ষণ একটা বৈষম্য আছে। শরীর আত্মাকে কী দিতে পারে কিংবা আত্মা শরীর থেকে কী পেতে পারে?

অ্যালেন ওয়েস্ট এই নাটকীয়তার চমৎকার বর্ণনা করেছেন। যুদ্ধের অবতারণা হবে এবং শরীরের অনিবার্যতা থাকবে। এ কথা এখন শীতল অ্যান্টিসেপ্টিকের মতো। তুমি বিষয় নির্বাচন করতে পারছ না, বিষয় তোমাকে নির্বাচিত করছে। বিষয় আমাকে আবর্তিত করছে। আমি সেসব বিষয়ের প্রতি প্রলুব্ধ হচ্ছি। অনুভূতিরা আমাকে ধরা দিচ্ছে তবে গল্পাকারে নয়। আমি অ্যালেন ওয়েস্টকে লিখিনি যেখানে অ্যানোরেক্সিয়ার মতো একটি অসুখের বিষয় আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। যেখানে খাওয়া বা না খাওয়ার বিষয় জড়িত ছিল। আমার কাছে সেসব বিষয় মুখ্য নয়। আমি সেসব বিষয় নিয়ে সেভাবে কবিতা লিখিনি। যখন আমি শরীর ও মনের নাটকীয় সংগ্রামের ব্যাপারগুলো জেনে যাই তখন কবিতারা আপনাআপনি এসে আমার কাছে ধরা দেয়।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক কবিতা লেখার ক্ষেত্রে আপনি কি পদ্ধতি অবলম্বন করেন? আগে বিষয়ের লক্ষ্যবস্তু ঠিক করেন নাকি কথাগুলো সাজিয়ে নিয়ে তারপর লেখা শুরু করেন।

: প্রথমত আমি কবিতার বিষয়বস্তুতে নিজেকে নিমগ্ন করি। অনেক বছর আগে আমি অ্যালেন ওয়েস্টকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলাম এবং তার ঘটনাটি আমি জানতাম। তারপর আমি দীর্ঘ সময় বিনসোয়াঙ্গারের সম্পর্কে জানলাম। যখন আমি নিজিনিস্কির চূড়ান্ত পাঠ্যসূচি শুনলাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে জানলাম তখন আমার মনে হল এটাই কবিতার মূল বিষয়বস্তু হতে পারে। আমার কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অনুভূতি ইত্যাদি সংগঠিত করার সব রকম উপাদানই সহজলভ্য ছিল। আমার মতে কবিতা কেবল নিজিনিস্কি কিংবা অ্যালেন ওয়েস্টের কণ্ঠস্বর নয়। এটা গদ্যের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত যা ভিন্নতর দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণিত হয় আবার সেই কথাগুলোই স্তবকের মাধ্যমে কবিতায় প্রকাশ পায়। কবিতা ডাক্তার কতৃক বর্ণিত কোনো গদ্য নয় কিংবা অ্যালেন ওয়েস্টের কোন পঙ্ক্তি নয়। এটা হল ভাব ও বিষয়ের এক পরিপূরক সংযোগস্থল। কবিতা বলতে আমি এভাবেই বুঝি।

সময় দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

: আপনাকেও ধন্যবাদ।