নিজে বিয়ে করতে পারিনি বটে আব্বাকে তো বিয়ে করিয়েছি

  যুগান্তর ডেস্ক ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিজে বিয়ে করতে পারিনি বটে আব্বাকে তো বিয়ে করিয়েছি
কবি হেলাল হাফিজ

এই তো কিছুদিন আগে মে মাসের ঘটনা। একদিন রাত দশটায় যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি বন্ধুবর সাইফুল আলমকে মোবাইলে কানেক্ট করলাম। কবির নিত্য সহচর কবি আবদুল মান্নান খবর দিয়েছেন, উনার অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। সাইফুল আলমকে জানালাম, কবি হেলাল হাফিজ গুরুতর অসুস্থ। তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

আপনার আনুকূল্য দরকার। কবির বড় ভাই ও ভাতিজি সেখানে আছেন। তাদের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও হাসপাতালে যেতে রাজি হচ্ছেন না। সাইফুল বললেন, ঠিক আছে। আমি ব্যবস্থা করছি এক্ষুনি। তার ঝটিতি উদ্যোগে কিছুক্ষণের মধ্যেই কবির হোটেলে (তোপখানা রোডে, যেখানে কবির বসবাস) গিয়ে হাজির হল অ্যাম্বুলেন্স। মধ্যরাতে তাকে ভর্তি করা হল ল্যাবএইড হাসপাতালে। কয়েকদিনের ট্রিটমেন্টের পর সুস্থ হয়ে ফিরলেন। আবার কয়েকদিন পর যেতে হল হাসপাতালে। তারপর থেকে মোটামুটি ভালো আছেন। কবির নিজের ভাষায় ‘শরীরের কলকব্জা সব নড়ে গেছে। বেশি দিন আর নাই’।

আগামী ৭ অক্টোবর ২০১৯ কবির ৭১ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। জন্মদিনে তাকে পুষ্পিত অভিনন্দন। অজস্র শুভকামনা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। প্রথম দফায় একদিন হাসপাতালে কবিকে দেখতে গেছি। কমবয়সী এক ডাক্তার কবির রক্তচাপ মাপছিলেন। সেই ডাক্তারকে বলি, ভাই উনি কিন্তু বিখ্যাত রোগী। ভিআইপি। ডাক্তার মিষ্টি হেসে বলেন, ‘জানি। কষ্ট নেবে কষ্ট।’ অর্থাৎ এই তরুণ ডাক্তারটিও কবি হেলাল হাফিজের কবিতার অনুরাগী। জননন্দিত কবিতার উল্লেখ সেটাই প্রমাণ করে।

আসন্ন জন্মদিনের প্রাক্কালে কবি হেলাল হাফিজের সঙ্গে কবি হাসান হাফিজের আলাপচারিতার নির্বাচিত অংশ পত্রস্থ হল।

হাসান হাফিজ : আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ ও প্রকাশনাধীন নতুন বইটি সম্পর্কে জানতে চাইছি

হেলাল হাফিজ : ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ বের হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। বের করেছিল অনিন্দ্য প্রকাশন। অনিন্দ্যর পর বের করে আসছে দিব্যপ্রকাশ। এ পর্যন্ত বইটির বৈধ সংস্করণ হয়েছে ৩৬টি। বাংলাদেশে আর কোনো কবিতার বইয়ের এত বেশিসংখ্যক মুদ্রণ হয়নি। বইটির পাইরেটেড মুদ্রণের কথা আমি ঠিক বলতে পারব না। সেটা বলা অবশ্য সম্ভবও নয়। পাইরেসি হয়েছে বহুবার।

এখন কাজ চলছে আরও একটি বইয়ের। নাম রেখেছি ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। সেটি খুব শিগগিরই প্রকাশিত হবে, এমনটাই আশা করছি। এতে থাকছে মোট ৩৪টি কবিতা। ৩৪ নয়, অ্যাকচুয়ালি ৩৫টি কবিতা থাকবে ওতে। একটি কবিতা আমার আব্বা খোরশেদ আলী তালুকদারের লেখা। উনিও কবিতা লিখতেন। ছিলেন সাহিত্যের বিদগ্ধ শিক্ষক।

আপনার আব্বার কবিতা কেন অন্তর্ভুক্ত করছেন? কারণটা কী?

: গূঢ় কারণ একটা তো আছেই। ১৯৭২ সালের কথা। একদিন সকালবেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে নাস্তা খাচ্ছি। আমার সঙ্গে আছেন প্রিয় কবিবন্ধু আবুল হাসান। আব্বার লেখা একটা চিঠি আবুল হাসানকে দেখালাম। কোনো এক লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আমার একটি কবিতা উনার নজরে পড়েছিল। সেই দুঃখের কবিতা পড়ে আব্বা এই চিঠি লিখেছেন। পুনশ্চ-তে লিখেছেন দুটি অসাধারণ পঙ্ক্তি। তা হল : রেটিনার লোনাজলে তোমার সাঁতার/ পিতৃদত্ত সে মহান উত্তরাধিকার।

কবিতাটি পড়ে কবিবন্ধু আবুল হাসান উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিল। বুকে জড়িয়ে ধরেছিল আমাকে। বলেছিল, তোমার বাবার আর কিছু না লিখলেও চলবে। আবুল হাসান আমাদের সমকালের সেরা কবি। মৌলিক ও জাত কবি। আমি তেমনটাই মনে করি। একমাত্র ওকেই আমি ঈর্ষা করি। শৈল্পিক ঈর্ষা অবশ্য।

বলেছি, আমার আব্বা ছিলেন সাহিত্যের শিক্ষক। তার বন্ধু ছিলেন স্বনামখ্যাত সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী। দু’জনে মিলে সেই কালে নেত্রকোনার মতো ছোট্ট মফস্বল শহর থেকে সাহিত্য পত্রিকা ‘উত্তরাকাশ’ প্রকাশ করতেন। আব্বার ওই ছোট্ট অণু কবিতাটির শিরোনাম দিয়েছি ‘পিতার পত্র’।

‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’র কনটেন্ট নিয়ে কিছু বলুন

: দ্যাখো রে ভাই, প্রথম কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি যখন চূড়ান্ত করি, তখন দুই শ’র মতো কবিতা নিয়ে বসেছিলাম। নির্মমভাবে ছেঁটে ফেলতে হয়েছে। কারণ ওগুলো আমার বিবেচনায় দুর্বল কবিতা। এবারও তেমনই করছি। ৩৪টি রেখে বাকিগুলো ডেসট্রয় করে দেব।

এটা কেমনধারা কথা বললেন? যেসব কবিতা বাদ দিচ্ছেন, সেগুলোর জন্য মায়া বা কষ্ট লাগবে না? একটু কী অবিচার হয়ে যাবে না?

: না, কোনো মায়া নাই। থাকলে তো বইয়েই দিতাম। আমার বিবেচনায় ওগুলোকে দুর্বল বলে মনে হয়েছে। সে জন্য এমন সিদ্ধান্ত।

কবিতার নতুন বইটি তো একযোগে ঢাকা ও কলকাতা থেকে বের হচ্ছে। তাই নয় কি?

: হ্যাঁ, ঠিক তাই। বাংলাদেশে বইটির প্রকাশক মঈনুল আহসান সাবেরের দিব্যপ্রকাশ। আর, কলকাতার প্রকাশক হচ্ছে ‘উতল হাওয়া’। ওই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর নাম উল্লাস চট্টোপাধ্যায়। কলকাতার বইয়ের প্রচ্ছদ করছেন সেখানকার কোনো শিল্পী। আর বাংলাদেশে কভার ও ইলাস্ট্রেশন করছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। দুই দেশের বইয়ে প্রোডাকশনে তারতম্য থাকবে শুধু। অন্য সব কিছু এক।

এক জীবন কাটিয়ে দিলেন সন্ন্যাসে। গৃহী মানুষ হওয়া আর হয়ে উঠল না। এই জীবন নিয়ে আপনি কতটা তৃপ্ত কিংবা অনুতপ্ত?

: যাপিত জীবন নিয়ে আমি তৃপ্ত নয়। আবার, অনুতপ্তও নয়। দ্যাখো, কোনো প্রাপ্তিই কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে পূর্ণ প্রাপ্তি নয়। তৃষ্ণা যদি মিটেই যায়, তাহলে প্রবল তীব্র শিল্প-আকাঙ্ক্ষার কী হবে? অতৃপ্তিই সে জন্য বেশি বেশি দরকার। অনুশোচনার তো প্রশ্নই আসে না। এক জীবনে এত অল্প লিখে এত বেশি ভালোবাসা পেলাম মানুষের, সত্যিই তার কোনো তুলনা নেই। এ আমার অশেষ পাওয়া। আমার তীব্র একটি আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। সেটা হল : আমার কবিবন্ধু আবুল হাসানকে গ্লোরিফাই করা। সে শুধু কবিতার জন্যই বেঁচেছিল। যদিও তার আয়ু বেশি ছিল না। আমি নিজেও সেরকম চেষ্টা করেছি। আবুল হাসান কখনই কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। নিতও না। স্বভাবে চারিত্র্যে আমিও অনেকটা সেরকম।

আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন ও শ্রেষ্ঠ ব্যর্থতা কোনগুলো বলে আপনার মনে হয়?

: শ্রেষ্ঠ অর্জন? এই আমার কয়েকটি কবিতা ছাড়া অন্য কোনো অর্জন নেই। অর্জন বললাম এই কারণে যে, কিছু কবিতার জন্য মানুষের যে ভালোবাসা আমি পেলাম, তাতে অন্য সব অপ্রাপ্তি, দুঃখ-কষ্ট সব ধুয়ে মুছে গেল। মাঝে মাঝে আমার মনে একটা সংকোচ কাজ করে। সেটা হল যে, এত ভালোবাসা বোধহয় আমার প্রাপ্য ছিল না। এটা এক ধরনের অতিবাস্তবতা কিনা বুঝি না। আমি তো সেই অর্থে প্রতিভাবান নই।

আলস্য আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ত্রুটি। ৭২ বছর বয়স হতে চলেছে। ধরো, যদি আরও ২০টা বই লিখতে পারতাম, তাহলে বেশ হতো। কিন্তু ওই যে আগেও বলেছি, এক বই নিয়ে ‘মিথ’ তৈরি হয়েছে, সেটা ভেঙে যেতে পারত। ভয়ে ভয়ে ছিলাম তাই। সংশয়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এমনও তো আছে, কেউ কেউ হাজার হাজার কবিতা লেখে। ৪০-৫০টা বই আছে এক একজনের। আমি নিজেকে সাধ্যমতো সংযত রেখেছি। এর জন্য যথেষ্ট কষ্টও কিন্তু হয়েছে। তবে এ কথাও ঠিক, আনন্দও পেয়েছি কম না। জিদ করিনি কখনও। আমার লেখালেখি বিষয়ে একটা বিজ্ঞাপনই তো তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেটি হল, অল্প লিখে হেলাল হাফিজ গল্প হয়েছেন।

সভা-সমিতি অনুষ্ঠান আপনি ইদানীং সাধারণত এড়িয়ে চলেন। এই যে বৈরাগ্য বা বিযুক্তি, এর মূল কারণটা কী?

: একেবারে সাহিত্য নিয়ে অনুষ্ঠানে আগে বেশ যোগ দিতাম। এখনকার মতো বিযুক্ত ছিলাম না। গত শতকের সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কবিতার অনুষ্ঠানে বহুবার গেছি। আজকাল দেখতে পাচ্ছি, কবিতার নামে অনেকের নানা ধান্দা কাজ করে। আমাদের যৌবনকালে কত নির্মল আড্ডা ছিল। সেসব ছিল নিছকই সাহিত্যকেন্দ্রিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন, নিউমার্কেটের ভেতরে মনিকো রেস্তোরাঁ, গুলিস্তানে রেক্স রেস্তোরাঁ, পুরনো ঢাকায় বিউটি বোর্ডিং- লেখক-কবিদের আড্ডা, মেলামেশার জন্য কত না আনন্দময় আকর্ষণের জায়গা ছিল সেসব।

এসব জায়গা ছাড়াও আড্ডা এবং প্রশ্রয়ের আরও জায়গা ছিল। আমরা তরুণ কবিরা ওইসব আড্ডায় হাজির হতাম। অগ্রজদের সঙ্গে প্রাণ খুলে মিশতাম। তারাও স্নেহের সঙ্গে আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের গ্রহণ করতেন। সে এক সোনালি সময় ছিল নিঃসন্দেহে।

পুরনো ঢাকায় শ্রীশ দাস লেনের বিউটি বোর্ডিংয়েই আমি পরিচিত হই কবি শামসুর রাহমান, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে। রেক্সে আলাপ হয় কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে। আমাদের সঙ্গে থাকতেন কবি হুমায়ূন কবির। তিনি আমার একটু সিনিয়র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের লেকচারার ছিলেন। বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ততার কারণে স্বাধীনতার পর আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। দৈনিক পাকিস্তান, স্বাধীনতার পরে দৈনিক বাংলায়ও আমরা কয়েকজন তরুণ কবি নিয়মিত যাতায়াত করতাম। বিশিষ্টজনের প্রিয় সঙ্গ উপভোগ করতাম। সেখানে কাজ করতেন কবি শামসুর রাহমান, কবি হাসান হাফিজুর রহমান।

ওই যে বলছিলেন, মানুষের এত এত ভালোবাসা পেয়েছেন। সেগুলো আপনার মধ্যে কীরকম সঞ্জীবনীর কাজ করত?

: মানুষজনের কাছ থেকে যত আদর ভালোবাসা আমি পেয়েছি, তা মোটেও মামুলি ধরনের না। সুপ্রচুরই বলতে হয়। তবে একটা কথা আমি জোর দিয়ে বলব, এসব আদর-ভালোবাসা আমাকে কখনও অহঙ্কারী করে তোলেনি। যেটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল। উদ্ভিদ ফলবতী হলে কিন্তু নত হয়। আমাদের দেশে দেখি উল্টা রীতি। একটু নাম যশ হলেই যেন মাটিতে পা পড়ে না। আসল কথা হল কী জান, খ্যাতি-প্রভাবের উত্তাপ সবাই হজম করতে পারে না।

তবে হ্যাঁ, কথা আরও আছে এ প্রসঙ্গে। সেই কথাটি হল : কবির কি অহঙ্কার থাকবে না একেবারেই? থাকবে নিশ্চয়। সেটা হল শৈল্পিক অহঙ্কার। নান্দনিক গর্ববোধ। সফিস্টিকেটেড। তার মধ্যে কোনো রকম ঔদ্ধত্য, রাফনেস থাকবে না। মানুষের গভীর আন্তরিক মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসার প্রাপ্তি আমাকে আরও বিনয়ী করেছে। এগুলোকে আমি বড় আশ্রয় হিসেবে মনে করেছি সব সময়। কাজটা খুবই কঠিন, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আপনার জীবনে কার কার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে?

: মোট তিনজনের কথা বলব এ ব্যাপারে। প্রথমত আমার আব্বা খোরশেদ আলী তালুকদার। তিনি শিক্ষক ছিলেন। জনপ্রিয় সুযোগ্য শিক্ষক। সবাই তাকে ভীষণ সম্মান দিত। নেত্রকোনার দত্ত হাইস্কুলে পড়াতেন। আমি নিজেও সে স্কুলের ছাত্র ছিলাম। আব্বার আদর্শ, পাণ্ডিত্য, সাহিত্যানুরাগ, বিনয়, সৌজন্যবোধ, সর্বোপরি সাধারণ সাদামাটা জীবনযাপন শৈশবের আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করত। এসব গুণ প্রত্যক্ষভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছে। আমি যে এক ধরনের বাউল জীবনযাপন করলাম, তা কিন্তু উনার প্রভাবেই।

দ্বিতীয়ত বলব, সবিতা সেন নামের এক স্কুল মিসট্রেসের কথা। আট-দশ বছর আগে তিনি মারা গেছেন। জীবন সায়াহ্নের ১০-১৫টি বছর তিনি কাটিয়েছেন এক আশ্রমে। দুর্দান্ত রূপসী ওই নারী সারা জীবন বিয়ে করেননি। এক মুসলিম তরুণের সঙ্গে প্রণয় ছিল তার। কিন্তু সেই গভীর প্রেম ব্যর্থ হয়। পরিণয়ে পরিণত হতে পারেনি শেষ পর্যন্ত।

সবিতা মিসট্রেস আমার মতো মাতৃহীন এক শিশুকে মাতৃস্নেহে লালন করেছিলেন। আমার মাতৃহীনতার বেদনা অনেকটাই ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। আমার কাব্যতৃষ্ণা, রুচি, বিনয়, সংযম, নিরহঙ্কার থাকতে পারা- সবই গড়ে উঠেছে তার প্রভাবে প্রত্যক্ষ লালনে। আঁচলের নিচে রেখে তিনি সন্তানের মতো পরিপুষ্ট করেছেন আমাকে। তবে এ কথাও ঠিক যে, পরবর্তীকালে আমাদের সম্পর্কে ফ্রয়েডীয় একটা ব্যাপার উঁকি দেয়। সম্পর্কটির এক রকম রূপান্তর ঘটে। তখন তিনি শুধুই জননী ছিলেন না আমার। ছিলেন প্রেমিকাও। সে এক অদ্ভুত রসায়ন। সবিতা মিসট্রেস আমার জীবনকে আগাগোড়া পাল্টে দিয়েছেন। এই মানবী আমার জীবনে ছায়ার মতো জড়িয়ে আছেন। আরেকজন হল কবি আবুল হাসান।

খোলামেলা কনফেশনের জন্য আপনাকে বিশেষ ধন্যবাদ। সবিতা মিসট্রেসের কথা যদি আরও একটু বলেন

: আমার সবিতাদি যাকে ভালোবাসতেন, তার নাম হক ভাই। তিনি থাকতেন নদীর ওপারে। নেত্রকোনা শহরে মগরা বলে একটা নদী আছে। সেই নদীর অন্য পারে, মোক্তার পাড়ায়। রাত ১১টার দিকে নৌকা পারাপার বন্ধ হয়ে যেত প্রতিদিন। এমনও অনেক সময় গেছে, হক ভাই প্রেমিকার সঙ্গে সময় কাটিয়ে পারাপারের জন্য নৌকা পাননি। অগত্যা সাঁতরে পার হয়েছেন নদী। কনকনে শীতের রাতেও ঘটেছে এমন ঘটনা। বোঝো, প্রেম কাহাকে বলে।

সবিতাদি কচুরিপানার ফুল ভালোবাসতেন। হক ভাই তার জন্য একটা করে ফুল নিয়ে আসতেন প্রতিদিন। একদিন সবিতাদি তাকে বললেন, শোনো কাল থেকে দুটো করে ফুল আনবে তুমি। একটা হেলালের জন্য। ও, সবিতাদির আরও কথা বলি। তৎকালীন সমাজ অতি রক্ষণশীল ছিল। নেত্রকোনার সবাই তাদের সম্পর্কের কথা জানত। ভীষণ বিদুষীও ছিলেন মহিলা। দারুণ ভজন গাইতেন। তার গুণগ্রাহী ও সঙ্গলিপ্সু মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের এলিট শ্রেণির মধ্যেই। চৌকশ, ডাকসাইটে আমলাও ছিলেন এই তালিকায়।

সবিতা মিসট্রেস আমার কাব্যরুচি, পরিমিতিবোধ, সংযম, অযথা বেশি বেশি না লেখার তালিম বা দীক্ষা আমাকে দিয়েছেন। বলতেন, যদি মানুষের মনে মগজে তিনটা কবিতাও ঢোকাতে পার, তাহলেই ব্যস। অতি শৈশবে মা হারানোর কষ্ট আমি কোনোদিনই ভুলতে পারিনি। যত বড় হয়েছি, তত প্রবল হয়েছে এই বিষাদ। মাতৃহীনতার বেদনাই আমাকে কবি করেছে। দুঃখ যদি উপভোগ করা যায়, তবে তার মতো আনন্দ আর নেই। শুধু কান্নাকাটি করলেই হয় না। এর শৈল্পিক রূপান্তর ঘটিয়ে তার মধ্য থেকে আনন্দ আস্বাদন করতে হয়।

আপনার পরিবার, সৎমা ও ভাইবোনের কথা বলুন

: আমার আপন এক ভাই আছে। আমার আব্বা দ্বিতীয় বিয়ে করেন আমার মা মারা যাওয়ার চার বছর পর। সৎমায়ের ঘরে তিন বোন, দুই ভাই আছে। সৎমা বেঁচে নেই। আমি ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ছিলাম নেত্রকোনায়। সৎমায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো-মন্দ মিলিয়েই ছিল। কম বয়স ছিল যখন, তখন মনে হতো সৎমা বুঝি খুবই খারাপ। এখন মনে হয়, ব্যাপারটা একতরফা ছিল না। আমারও দোষত্রুটি ছিল।

আমার আব্বার জন্য পাত্রী কিন্তু আমিই পছন্দ করেছি। আব্বা বলেছিলেন, ও যাকে পছন্দ করবে, তাকেই বিয়ে করব। আমি বরযাত্রীও হয়েছিলাম। নিজে বিয়ে করতে পারিনি বটে, আব্বাকে তো বিয়ে করিয়েছি। আমার আপন মায়ের চেহারা কেমন ছিল, তা একটুও স্মরণে নেই। কারণ, খুব ছোটবেলায়ই উনি মারা যান। আমার বয়স তখন আর কত, বড়জোর তিন। আমার নানা-নানি, অন্যান্য আত্মীয়স্বজনরা বলেন, আমি নাকি হুবহু আমার মায়ের মতো দেখতে হয়েছি। মায়ের রং পেয়েছি। কিন্তু হায়! মায়ের কোনো স্মৃতিই আমার নেই। চিরবঞ্চিত, চিরদুর্ভাগা আমি!

আমার সৎমা খুবই রূপসী ছিলেন। তার রান্নার হাত ছিল চমৎকার। তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘাত কেমন হতো আমার? তা তো কম বেশি হতোই। শি ওয়াজ নাইস রাদার। আই ওয়াজ রং। কাঁচা বয়সে অমনটা হয়েই থাকে। ঘরে সৎমা থাকলে ওই যা যা হয় আর কি। টাস্ল হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বর্তমান কালের কবিতার মধ্যে মৌল পার্থক্য (বৈশিষ্ট্য, আঙ্গিক, বিষয়, শৈলী- সর্বার্থেই) কি কি বলে আপনার মনে হয়?

: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্য আমাদের চেয়ে একটু বেশি শক্তিমান। আমাদের কবিতা অধিকতর ভালো। ওদের কাব্যভাষার কথা যদি বলতে হয়, তাহলে বলব কেন জানি মনে হয় ওদের কবিতার সোল ইজ লস্ট। আমার মনে হয়, ওদের কাব্যভুবনে আত্মাটা অনুপস্থিত। তুলনামূলকভাবে আমাদের কবিতায় প্রাণ অনেক বেশি।

আপনার প্রিয় কবি কে কে (স্বদেশে, বিদেশে)?

: প্রিয় কবি কয়েকজন। সমকালীন বাংলা কবিতার কথাই বলি। শ্রেষ্ঠ ও প্রিয় কবি আবুল হাসান। যাকে একমাত্র ঈর্ষা করি কবি হিসেবে, তার নামও আবুল হাসান। বিদেশে? অনুবাদের মাধ্যমে যেটুকু পড়াশোনা করেছি, তাতে বলব কীটসের নাম। তার জীবন ও রোমন্টিকতা আমাকে খুব টানে।

আপনার এমন কোনো স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা কী আছে, যা এখনও পর্যন্ত পূরণ হয়নি?

: এমন ইচ্ছা, যা পূরণ হয়নি? সেটা হল মনের মতো ভালো কবিতা লিখতে পারলাম না আজো পর্যন্ত। অনেক দুর্বল কবিতা লিখে ভালোবাসা পেলাম। এই অপূর্ণতাটি আমার আছে। কোনো বৈষয়িক ব্যাপার আমাকে টানে না। সেসব নিয়ে কখনও ভাবিও না। সময়ের যে অপচয় জীবনব্যাপী করলাম, তার জন্য আমি সত্যিই লজ্জিত ও দুঃখিত। সে জন্য আমি কাব্যামোদি মানুষের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।

তবে, আরও লেখার চেষ্টা তো করতে পারতাম! সফল হোক বা না হোক। আবার এটাও তো ঠিক যে শিশুকাল থেকেই আমার ব্যক্তিজীবন এমনই এলোমেলো বিপর্যস্ত ছিল যে কখনই সুস্থিতি পাইনি। শৈশব থেকেই যে প্রতিকূলতার মুখোমুখি আমাকে হতে হয়েছিল, তা মামুলি নয়। বহুমাত্রিকও। সেসব তিক্ত অভিজ্ঞতা কষ্ট, নিঃসঙ্গতার। অভিমানেরও অনেকটা। সব সময়ই স্রোতের বিরুদ্ধে আমাকে চলতে হয়েছে। প্রথার বিপরীতে যে ধরনের জীবন আমি যাপন করে গেলাম, তার মধ্যে সুবিধার পাশাপাশি ক্ষতির দিকও কিন্তু নিতান্ত কম ছিল না।

আপনার অন্তিম ইচ্ছা সম্পর্কে জানতে চাইছি।

: জানি না শেষতক পরমায়ুতে কুলোবে কিনা। এমন কয়েকটা কবিতা লিখতে চাই, যেগুলো নিজেই বুঝে যেতে পারব যে আমার অন্তর্ধানের পর স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। এটাই সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা আমার। ইতিমধ্যে শরীর খারাপ হয়ে গেছে অনেক। আগেকার মতো সচল, স্বচ্ছন্দ, ঠিকঠাক নেই। একটা আত্মজীবনী লেখার চেষ্টা করব। যদি লিখতে পারি, তাহলে রেখেঢেকে লিখব না। সেটি লিখতে পারি যদি, আমার ধারণা, খুবই হৃদয়গ্রাহী হবে। তবে, শেষতক পেরে উঠব কিনা জানি না।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×