বই আলোচনা

মোহাম্মদ সাদিকের তিন সত্যি

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যখন ক্লান্তিতে ভর দিয়ে বসি অথবা দূর সীমান্তে নিজেকে রেখে দৃষ্টির সন্ধিতে আবদ্ধ হই- তখন মনে হয় মোহাম্মদ সাদিকের কবিতা ভ্রমণে আছি। সাদিকের কবিতা আধুনিক জীবনদর্শন আর সুফিবাদের যৌথ প্রকাশ। এর প্রকাশটি ঐতিহ্যের গন্ধমাখা, দূর দিগন্তে চেয়ে থাকা একটা উড়ন্ত নীল পাখির মতো সম্মুখগামী। যাকে কখনও মনে হবে আকাশ কখনও মনে হবে সমুদ্র। কখনও মনে হবে অন্য আরেক পৃথিবীর হাতছানি। আমি জানি না এসব বিশেষণ মোহাম্মদ সাদিককে বড় কবি মনে করায় কিনা। আমার বিবেচনায় কবি বড় ছোট হয় না, হয় প্রিয়, হয় আশ্রয়, হয় বটবৃক্ষের ছায়া। আলোচ্য গ্রন্থ্যের কয়েকটি পঙ্ক্তি উল্লেখ করছি- ‘কোন বাহনে চলেন তিনি কেমন মহাজন

একরাতেই একশ গান প্রকাশ করে মন’,

‘লোকে বলে আজব দেশে আজব রকম ঘর

পরের মানুষ আপন এখন আপন মানুষ পর’,

‘পথ ছিল না পথের ওপর পথের ছবি দেখে

তিন পৃথিবীর সবাই এসে নিজের নামটি লেখে’,

‘হাতে হাতে পৌঁছে যাবে নদীর বাড়িঘর

নদীর কাছে নদীর নারী নদীর শাপে বর’,

‘তোমার চোখে উজান দেখি তোমার চোখে ভাটি

তোমার চোখেই আকাশ আবার তোমার চোখেই মাটি’,

‘থাকেন তিনি কোথায় এখন কেমন বাধেন ঘর

কার দোকানে সদাই করেন কে তার আপন পর’, ‘হঠাৎ করে সূর্য এসে সুরমা নদীর তীরে

পরান মাঝির ভাঙা নৌকা দেখেন ফিরে ফিরে’, ‘চোখের কোণে অশ্রু আসে কেমন করে মন

জীবন মানে কাঁদতে মানা জীবন মানে বন’,

‘এখন তুমি বাড়ি যাবে বাড়ির কথা মনে

বাড়ির কাছে নদীর ঘর তোমার ঘর যে বনে’

সম্প্রতি মোহাম্মদ সাদিকের ‘তিন সত্যি ও বিবিধ কবিতা’ নামের কাব্যগ্রন্থ ধ্রুবপদ প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে। নতুন বইয়ের কবিতাগুলোর বিষয় এবং আঙ্গিকেও নতুনত্ব আছে। ‘মানচিত্র’ শিরোনামের প্রথম কবিতাটি উল্লেখ করছি-

মনের কথা রইল মনে মনের খবর নেই

তোমরা যাকে মন বলছ মন কি তবে সেই

একটি কথা বলার জন্যে একটি জীবন যায়

এক জীবনের মনের কথা চড়ুই পাখি খায়

বনমোরগের ডাকে যখন সকাল নামে বনে

মনের কথা বলতে তিনি হাঁটেন মনে মনে

সাতশ কোটি মানুষ দেখো এই পৃথিবীর বাঁকে

একটি মানুষ খুঁজতে গিয়ে খুঁজছ তবে কাকে

বাণীর মধ্যে কালির ছোঁয়ায় অনেক কথা লেখা

মনের কথা রইল মনে মন হল না দেখা

আমার কাছে আছে মানুষ তাকে নিতে চাও

হাত বাড়িয়ে এবার তবে অশ্রুফোঁটা দাও

চোখের জলে ভাসেন তিনি চোখ তো ডুবে যায়

কোথায় আছেন মনের মানুষ কোন সে ঠিকানায়

রাত জেগেছে দিন ঘুমিয়ে মনের দেখা নেই

মানুষবিহীন মানুষ যে জন আসল মানুষ সেই।

শিল্পী পৃথিবীর সব কিছুকেই আকৃতি দিতে পারেন, কিন্তু, মনকে কী দৃশ্যমান করা যায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে সম্ভবত লেখক-পাঠক থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রের মানুষই বলবেন; না, সেটা করা যায় না। তবুও কবিরা চেষ্টা করেন। কবিরা এমন অবাস্তবের ছবি আঁকেন যা নিশ্চিত অবাস্তব জেনেও বাস্তব মনে করতে হয় কখনও কখনও। এখানেই কবি অনন্য। কোরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, কবিরা মিথ্যাকে সত্যের মতো করে উপস্থাপন করতে পারে। কবিদের কাছ থেকে সাধারণকে দূরে থাকতেও বলা হয়েছে। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবিদের বিতাড়িত করার কথা ভাবা হয়েছিল। যা হোক সেই দূরে থাকতে বলার বা বিতাড়িতের চিন্তায় অন্য কারণ অন্য প্রেক্ষাপট আছে। তা হয়ত তাদের দিক থেকে যৌক্তিকও। তবে কবির ক্ষমতার প্রমাণ আমরা এসব বক্তব্যের মধ্য থেকেও পেতে পারি।

‘মানচিত্র’ কবিতার রুপকগুলো অদ্ভুত রকমের জীবন্ত- ইঙ্গিতে এবং সরাসরি প্রয়োগে, অথচ সমান্তরালে বয়ে চলছে। রুপকের ছন্দে হৃদমে নদীর ঢেউ খেলা করে-

‘মনের কথা রইল মনে মনের খবর নেই

তোমরা যাকে মন বলছ মন কি তবে সেই’

মন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে যাকে সেও মন। যে জিজ্ঞেস করছে সেও আরেক মন। এইসব চিরন্তন বাণীর মতো কবির হৃদয় থেকে নির্বিঘ্নে প্রবাহিত কথামালা। যা সচেতনভাবে তৈরি করা না। একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত। অমূল্য। হিরক খণ্ডের মতো পঙ্ক্তিমালা।

জীবনই তো সব। এ কবিতায় জীবনের কথা বলা হয়ছে আরেকটি জীবনের মাধ্যমে। অথচ সেই বৃহৎ প্রেক্ষাপটটির চেয়ে চড়ুই পাখির জীবনও বিবেচনার বাইরে না। অথবা ছোট বড় করার ক্ষেত্রও আর থাকছে না। চড়ুই পাখি যখন একটা জীবন খুঁটে খেয়ে ফেলতে পারে, তখন আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের দিকে ফিরতেই হয়। জগতের সব কিছুই জীবনের পরিপূরক। যা সামগ্রিক জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করে। আমরা তখন ধ্বংসাত্মক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আরও বেশি সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন হতে উৎসাহ নিতে পারি।

মোহাম্মদ সাদিকের কবিতায় প্রবেশের পথটা সহজ-স্বাভাবিক। হালকাভাবে হাতছানি দেবে, কিন্তু ভেতরে গেলে কবিতাটি শেষ করে বেরিয়ে আসতে অনেক সময় লাগে। এর প্রায় প্রত্যেকটি কবিতার মধ্যে একেকটি উপন্যাস/মহাকাব্য ঢেলে দেয়া।

কবিতা দুভাবেই তার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে। প্রথমত ছোট্ট-সামান্য কোনো বিষয়কে উপমা চিত্রকল্পের মাধ্যমে পাঠক হৃদয়ে নাড়া দেয়ার মতো দাঁড় করানো। অন্যটি হচ্ছে একফোঁটা অশ্রুর মধ্যে সমুদ্র নিয়ে আসা অথবা একটা পাখির উড়ালে সমস্ত আকাশ জুড়ে দেয়া। সাদিকের কবিতায় দ্বিতীয় বিষয়টিই বেশি লক্ষ করা যায়। আমার মনে হয় এটা প্রথমটির তুলনায় কষ্টের এবং শক্তির প্রমাণ বহন করে। ‘বারবার ফিরে যাই’, ‘স্পর্শ চিকিৎসা’, ‘অরূপকথা’, ‘একে শূন্যে দশ’, ‘নিদ্রামগ্ন’, ‘তিন সত্যি’, ‘নিুবর্ণ’ ‘প্রতিদিন তার মৃত্যু হয়’, কিংবা ‘চলে যাব’ শিরোনামের কবিতাগুলো তার দৃষ্টান্ত।

‘বৃষ্টি ও ব্যান্ডেজ’ শিরোনামের কবিতাটি এই বইয়ের অন্য কবিতাগুলো থেক আলাদা। এখানে পারিপার্শ্বিক সামাজিক জীবনের অনেক রূঢ় সত্য উঠে এসেছে; তবে, কবিতাকে ছাপিয়ে ব্যক্তি কবির উপস্থিতি বেশি দৃশ্যমান হওয়ায় কাব্যিক সৌন্দর্য বিঘ্নিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। অনেক শক্তিশালী কবিতার মধ্যে কিছু চমৎকার ছড়ারও সন্নিবেশন বইয়ে বৈচিত্র্য এনেছে হয়তো, কিন্তু গ্রন্থের থিম অব ইউনিটি নষ্টও করেছে। একটা কবিতার বইয়ে ৩০/৪০, ৫০/৬০টি কবিতা থাকতে পারে। থাকতে পারে তার বেশি অথবা কমও। তার পরও কবিতাগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়েও বইয়ের নামটিকে ধরে একই কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। যেতে হয়। কিছুটা এ’ও মনে হতে হয় যে- একটি কবিতারই খণ্ড খণ্ড রূপ। এটা মনে হতে হয় বইটিকে একটা বই হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য। বইটি পড়তে গিয়ে সেই অভাবগুলো চোখে লেগেছে। এ বিষয়গুলো আশা করি কবি চিন্তা করবেন।

কামাল হোসেন

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×