কাফারনা হুম

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘কাফারনা হুম’ আরবি ভাষার ১২৬ মিনিটের চলচ্চিত্র। লেবানিজ পরিচালক ও অভিনেত্রী নাদিনে লাবাকি চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য লিখেছেন এবং পরিচালনা করেছেন। চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন সিরিয়ার শরণার্থী শিশু অভিনেতা জায়ন আল-রাফিয়া।

সিনেমাটি শুরু হয় জেলখানায় বন্দি ১২ বছর বয়সী বালক জাইনকে দেখানোর মধ্য দিয়ে। ১২ বছর বয়সটা অবশ্য জেলখানার চিকিৎসকদের অনুমান। তার প্রকৃত জন্ম তারিখ কেউ জানে না। কারণ তার বাবা-মা এতই দরিদ্র ছিলেন, অর্থের অভাবে তার জন্মের রেজিস্ট্রেশনই করাতে পারেননি। আর তার ভাইবোনের সংখ্যাও এত বেশি কার জন্ম কত সালে হয়েছে বাবা-মায়ের পক্ষে মনে রাখা সম্ভব হয়নি। জাইনকে যখন আদালতে হাজির করা হয়, তখন বিচারকের সঙ্গে তার কথোপকথনের মাধ্যমে জানা যায়, কিছুদিন আগে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। বিচারক যখন জাইনের কাছে জানতে চান, কী কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে সে জানে কিনা, তখন বিন্দুমাত্র অনুতপ্তের বহিঃপ্রকাশ না ঘটিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে জাইন উত্তর দেয় ‘এক কুত্তার বাচ্চাকে হত্যাচেষ্টার কারণে আমাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে।’ পাঁচ বছর কারাভোগের পর জাইন আবার আদালতে হাজির হয়েছে। তবে এবার জাইন আদালতে আসার কারণ ভিন্ন। এবার সে নিজেই পাল্টা মামলা দায়ের করতে চায় তার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে। তার বাবা-মায়ের উপস্থিতিতেই আদালতে বৃদ্ধ বিচারক যখন তাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন সে তার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করতে চায়। জাইন উত্তর দেয় ‘আমাকে জন্ম দেয়ার জন্য, আমাকে জন্ম দেয়ার অপরাধে!’

‘কাফারনা হুম’ বর্তমান ইসরাইলের প্রাচীন একটি শহরের নাম। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী যে শহরটিকে যিশু খ্রিস্ট ‘অভিশপ্ত নরক’-এ পরিণত করেছিলেন। কালের বিবর্তনে শব্দটি ‘বিশৃঙ্খলা’ শব্দের সমার্থকে রূপান্তরিত হয়েছে। চলচ্চিত্রটি দেখা শুরু করার পর বুঝতে খুব বেশি দেরি হয় না, কেন চলচ্চিত্রের এই অদ্ভুত নামকরণ করা হয়েছে। ফ্ল্যাশব্যাকে যখন বৈরুতের একটি ঘিঞ্জি বস্তিতে জাইন এবং তার পরিবারের জীবনযাপনের চিত্র উঠে আসতে থাকে, তখনই দর্শকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠবে আসলেই তাদের জীবন, তাদের বাসস্থান অভিশপ্ত নরকে।

জাইনের বয়স ১২ বছর হলেও দেখতে তাকে আরও ছোট মনে হয়। কিন্তু তার ঘাড়ে এসে পড়া রাজ্যের দায়িত্ব তাকে পরিণত বয়সী এক টগবগে যুবকের মতোই দায়িত্বশীল করে তুলেছে। দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে বাঁচতে প্রতিদিন সকালে তাকে ভাইবোনদের নিয়ে বেরিয়ে যেতে হয় কাজ করার জন্য। বাড়িওয়ালার দোকানে মালপত্র আনা-নেয়া করা, রাস্তায় শরবত বিক্রি করা, এমনকি অবৈধভাবে ড্রাগ পাচার করাসহ এমন কোনো কাজ নেই, যা জাইনকে করতে হয় না। আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাকে আগলে রাখতে হয় তার ছোট ভাইবোনদের। বিশেষ করে তার আদরের ছোট বোন সাহারকে, যাকে বাড়িওয়ালার ছেলে আসাদ প্রায়ই জ্বালাতনের চেষ্টা করে।

একদিন যখন সাহারকে তার বাবা-মা জোর করে বাড়িওয়ালার ছেলে আসাদের সঙ্গে বিয়ে দেয়, তখন থেকেই যেন জাইনের জীবন মূল্যহীন হয়ে পড়ে। বাড়িঘর ছেড়ে অজানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে সে। এলোমেলোভাবে ঘোরার পর এক অ্যামিউজমেন্ট পার্কে গিয়ে সে আশ্রয় খুঁজে পায় এক ইথিওপিয়ান নারী রাহিলের কাছে। পরিচয়পত্রহীন অবৈধ অভিবাসী রাহিল তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায় তার বিবাহবহির্ভূত শিশুপুত্র ইউনেসকে দেখা শোনার দায়িত্ব দেয়ার জন্য। কারণ ইউনেসকে কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়া রাহিলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাহিলের বাসায় ইউনেসের সঙ্গে জাইনের বন্ধুত্বপূর্ণ দিন অতিবাহিত হতে থাকে। কিন্তু কয়দিন পর রাহিল যখন হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যায়, তখন ইউনেসকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়ে জাইন। ইউনেসকে সঙ্গে করে সে বৈরুতের পথে পথে ঘুরে বেড়াতে থাকে রাহিলের খোঁজে। চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাসগুলোর চরিত্রের মতো বিশাল এক শহরের রাস্তায় রাস্তায় নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে এগিয়ে যেতে থাকে জাইনের জীবন।

চলচ্চিত্রের শেষের দিকে একটা পর্যায়ে গিয়ে যখন জাইন ঘরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়, তখন আমরা জানতে পারি জাইন চলচ্চিত্রের শুরুতে কাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল এবং কেনই বা সে তার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। চলচ্চিত্রের শেষের দিকের অনেক দৃশ্য পাথরের মতো শক্ত হৃদয়ের দর্শকের হৃদয়কেও দ্রবীভূত করতে বাধ্য। ‘কাফারনা হুম’ নিঃসন্দেহে এই সময়ের সেরা সিনেমাগুলোর একটি। সিনেমাটিতে নাদিনে লাবাকি শুধু চিত্রনাট্য লিখেছেন এবং পরিচালনা করেছেন এমন নয়, বরং জাইনের উকিলের চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন তিনি। একই সঙ্গে অন্য দুজন চিত্রনাট্যকারের সঙ্গে মিলে এর চিত্রনাট্যও করেছেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর সময় নিয়ে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্যের জন্য গবেষণা করার স্বার্থে নাদিনে লাবাকি এবং তার দলকে বারবার ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল লেবাননের বস্তিগুলোয় এবং অবৈধ অভিবাসীদের ডিটেনশন সেন্টারগুলোয়। নাদিনে লাবাকি এর ‘কাফারনা হুম’ চলচ্চিত্রটি শুধু তার অতীতের সব কাজকেই ছাড়িয়ে গেছে এমন নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ের আরব বিশ্বের অন্য সব পরিচালকের কাজকেও ছাড়িয়ে গেছে। চলচ্চিত্রটি অস্কারে বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ক্যাটাগরিতেই শুধু নমিনেশন পায়নি, এটি একই সঙ্গে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মানজনক জুরি পুরস্কারসহ আরও দুটি পুরস্কার জিতে নিয়েছিল। কান উৎসবে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হওয়ার পর উপস্থিত দর্শকরা দীর্ঘ ১৫ মিনিট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে চলচ্চিত্রটিকে সম্মান জানিয়েছিলেন। নাদিনে লাবাকির সবচেয়ে বড় সাফল্য অপেশাদার কলাকুশলীদের কাছ থেকে তাদের সেরা অভিনয়টুকু আদায় করে নিতে পারা। চলচ্চিত্রটির অভিনয় শিল্পীদের কেউ জীবনে কখনও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াননি। জাইন চরিত্রে অভিনয় করা কিশোর জাইন আল-রাফিয়াকে কাস্টিং ডাইরেক্টর খুঁজে বের করেছেন সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা এক শরণার্থী শিবির থেকে। একইভাবে রাহিল চরিত্রে অভিনয় করা ইওরদানোস শিফরাও সত্যিই একজন ইথিওপিয়ান অবৈধ অভিবাসী। হয়তো বাস্তবেই দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার কারণেই তারা সিনেমার দুর্দশাময় জীবনকে সহজে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে।

চলচ্চিত্রটির কাহিনী কাল্পনিক। কিন্তু এটি যে একাধিক বিচ্ছিন্ন চরিত্রের সমন্বয়ে গঠিত, সে রকম চরিত্রের প্রায় সবই পরিচালক নাদিনের বাস্তব পরিচিত। প্রায় প্রতিটি ঘটনা নাদিনে তার গবেষণার সময় প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সেগুলোকে একত্রিত করেই তিনি এবং তার দল চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন। কাল্পনিক কাহিনী হয়েও চলচ্চিত্রটি সমাজের বাস্তব সমস্যাকেই তুলে ধরছে। নাদিনে লাবাকির মতে, জাইন যখন তার বাবা-মা’র বিরুদ্ধে মামলা করে, তখন বাস্তবে সে সমাজের অবিচারের বিরুদ্ধেই মামলা করে।

চলচ্চিত্রটি সমালোচক এবং দর্শক উভয়ের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। ওগউই-তে সিনেমাটির বর্তমান রেটিং ৮.৪। অন্যদিকে রটেন টম্যাটোস ওয়েবসাইটে সমালোচকদের দৃষ্টিতে এটি ৮৮ শতাংশ ফ্রেশ। নিউইয়র্ক টাইমস তাদের রিভিউতে বলেছে, ‘কাফারনা হুম’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি সচেতনতা সৃষ্টির উদাত্ত আহ্বান।

দারিদ্র্য কিংবা দুঃখ-দুর্দশাকে চলচ্চিত্রায়নের ব্যাপারে সবসময় একটা ঝুঁকি থাকে যে, মানুষ মনে করবে এখানে দারিদ্র্যকে ব্যবহার করা হয়েছে ভোক্তার সহানুভূতি আদায় করার উদ্দেশ্যে। আর এটা নির্মাতাদের জন্য উভয় সংকট। দারিদ্র্যকে যথাযথভাবে উপস্থাপন না করলে তা গ্রহণযোগ্যতা হারাবে, আবার মাত্রাতিরিক্ত আবেগের ব্যবহার করলে তা সমালোচিত হবে। কিন্তু এ দুইয়ের মাঝখানে যে সূক্ষ্ম ব্যবধানের সেতু আছে- নাদিনে লাবাকি অত্যন্ত সফলভাবে তার ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পেরেছেন।

নাদিনে লাবাকি চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘কোনো সমালোচক যদি ‘কাফারনা হুম’ এই চলচ্চিত্রটির এ রকম সমালোচনা (চলচ্চিত্রের দারিদ্র্যকে ব্যবহার করা হয়েছে ভোক্তার সহানুভূতি আদায় করার উদ্দেশ্যে) করেই, তবে তার উচিত হবে- যে নামিদামি ক্যাফেতে বসে তিনি সমালোচনাটি লিখেছেন বা করেছেন, সেই ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব জগতের দিকে তাকানো। কারণ নাদিনের মতে, চলচ্চিত্রটিতে তিনি যা দেখিয়েছেন, বাস্তব জীবনের দুঃখ, দুর্দশার ও দরিদ্রতার তুলনায় সেটা কিছুই না।’

লিখেছেন আদিল মাহমুদ

সূত্র : আরবি আলালাম টিভি নেট ও উইকিপিডিয়া।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×