গল্প

পিয়ানো বাদক

  মূল পাওলো কোয়েলহো, অনুবাদ সুদীপ্ত সালাম ১১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বন্ধু উরসুলাকে নিয়ে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই শপিংমলের এদিক-ওদিক ঘুরছি। আমার এই ভায়োলিন বাদক বন্ধুটির জন্ম হাঙ্গেরিতে। দুটি আন্তর্জাতিক অর্কেস্ট্রার প্রধান ভায়োলিন বাদক সে। হঠাৎ করেই উরসুলা আমার হাত চেপে ধরল! বলল, ‘শুনতে পাচ্ছ?’

আমি শোনার চেষ্টা করলাম, অনেকে কথা বলছে, একটি শিশু চিৎকার করছে, শপিংমলের ইলেকট্রনিক পণ্যের দিকটা থেকে টেলিভিশনের শব্দ ভেসে আসছে, উঁচু হিলের জুতো পায়ে হাঁটার শব্দ এবং গতানুগতিক সঙ্গীত- যা পৃথিবীর সব শপিংমলেই বাজানো হয়।

উরসুলা বলল, ‘ভারি মিষ্টি তাই না?’

আমি জানালাম, আমি মিষ্টি বা অস্বাভাবিক কিছু শুনতে পাচ্ছি না।

ও একটু বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আরে পিয়ানো বাজছে! দারুণ বাজায়!’

আমি বললাম, ‘নিশ্চয়ই রেকর্ড করা।’

বন্ধু বলল, ‘বোকার মতো কথা বলো না তো!’

আমি মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করলাম এবং বুঝলাম সত্যি কেউ একজন সরাসরি পিয়ানো বাজাচ্ছে। সে ফ্রেডেরিক চপিনের সোনাটার মূর্ছনা ছড়াচ্ছে। আমি এখন বুঝতে পারলাম, এই সঙ্গীত আমাদের আশপাশের শব্দের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। আমরা দুজন ভিড় ঠেলে, দোকানগুলো পেরিয়ে, মূল্য ছাড়ের ছড়াছড়ি এবং আরও কতকি এড়িয়ে যে এগিয়ে গেলাম তার হিসাব নেই। আমরা শপিংমলের খাবারের দিকটায় পৌঁছলাম। এখানে মানুষ খাচ্ছে, কথা বলছে, তর্ক করছে, সংবাদপত্র পড়ছে। সব শপিংমলের এই দিকটাতেই থাকে শপিংমলের বিশেষ আকর্ষণ। তবে এই শপিংমলে রয়েছে একটি পিয়ানো ও একজন পিয়ানো বাদক। পিয়ানো বাদক চপিনের আরও দুটি সোনাটা বাজিয়ে ধরলেন ফ্রানৎস শুবার্ট ও মোজার্টের কম্পোজিশন। তার বয়স তিরিশের কাছাকাছি। মঞ্চের পাশেই লেখা রয়েছে, সে জর্জিয়ার একজন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী। জর্জিয়া এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। নিশ্চয়ই সে চাকরির খোঁজে এদিক-ওদিক ঘুরেছে। শেষে আশাহত ও ব্যর্থ হয়ে এই শপিং মলেই আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। তা ছাড়া অন্য কোনো কারণ কি হতে পারে আমার জানা নেই। তার চোখজোড়া সেই জাদুময় দুনিয়ায় নিবদ্ধ যেখানে তার পরিবেশিত সঙ্গীতের জন্ম, তার হাত দুটো আমাদের সঙ্গে তার সব ভালোবাসা, তার আত্মা, তার উন্মাদনা, তার শ্রেষ্ঠত্ব, তার শিক্ষা, তার একাগ্রতা ও নিয়মানুবর্তিতা ভাগাভাগি করে নিচ্ছে।

বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে এখানে কেউই সঙ্গীত উপভোগ করতে আসেনি। শপিংমলে সবাই এসেছে কেনাকাটা করতে, খেতে, সময় কাটাতে, জিনিসপত্রের দাম দেখতে অথবা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে। এক দম্পতি আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে কথা বলছিল, পরে অন্যদিকে চলে গেল। পিয়ানো বাদকের কিন্তু সেদিকে নজর নেই- সে মোজার্টের দেবদূতদের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত। আমরা দুই শ্রোতা যে দাঁড়িয়ে আছি সেদিকেও তার খেয়াল নেই। দু’জনের একজন তো নিজেও জাতশিল্পী, সে সাড়া দিচ্ছে পিয়ানোর ঝংকারে, তার চোখে নীরব অশ্রুধারা।

মনে আছে, একবার এক চার্চে গিয়েছিলাম। সেখানে এক তরুণীকে পেলাম যে ঈশ্বরের জন্য সঙ্গীত করত। সেটা না হয় চার্চে- অনেক মানুষ আসে সঙ্গীত শুনতে। কিন্তু এখানে তো কেউ শুনছে না, এমনকি হয়তো ঈশ্বরও না।

নাহ, আসলে ঈশ্বর শুনছে। ঈশ্বর তার অন্তরে ও হাতে বিরাজ করে। কেননা, কে শুনছে কে শুনছে না, কত টাকা মিলবে- এসব বৈষয়িক চিন্তা না করে সে শুধু তার সেরাটা দিয়ে যাচ্ছে। এভাবে বাজাচ্ছে যেন সে মিলানের লা স্ক্যালার অপেরা হাউস অথবা প্যারিসের অপেরায় বসে বাজাচ্ছে। সে বাজাচ্ছে কারণ এ কাজটাই তার নিয়তি, তার আনন্দ, তার বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য।

কি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ জেগে উঠল আমার অন্তরের অন্তস্থলে। এই শিল্পীর জন্য, যে আমাকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সবক স্মরণ করিয়ে দিল, আমাদের প্রত্যেকের একটি করে ব্যক্তিগত গল্প থাকে, যা আমাদের শেষ করতে হয়, মানুষ হিসেবে আমাদের এটাই কাজ। শুধু গল্পটি সম্পূর্ণ করতে হয়, কে আমাদের সমর্থন করল, কে সমালোচনা করল, কে অগ্রাহ্য করল, কে সহ্য করল তাতে কিছুই যায় আসে না- আমরা কাজটি করছি কারণ পৃথিবীতে এটাই আমাদের লক্ষ্য এবং এটাই আমাদের সব আনন্দের উৎস।

পিয়ানো বাদক মোজার্টের আরও একটি কম্পোজিশন শোনাল এবং এই প্রথমবারের মতো সে আমাদের উপস্থিতি টের পেল। মাথাটা একটু নুইয়ে অভিবাদন জানাল, আমরাও তাই করলাম। তারপর সে আবার তার নিজের স্বর্গে ফিরে গেল, তাকে তার জগতে- পৃথিবী থেকে দূরে ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়, এমনকি আমরা হাততালি দিয়েও তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনি। সে আমাদের জন্য এক দৃষ্টান্ত। যখন মনে হবে, আমাদের কাজের দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না তখন এই পিয়ানো বাদকের কথা স্মরণ করব। সে তার কর্মের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করছিল, অন্য কোনো কিছু তার মাথায় ছিল না।

‘দ্য পিয়ানিস্ট ইন দ্য শপিংমল’-এর বঙ্গানুবাদ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×