নিজেকে দুটো ভাগে বিভক্ত করে নেয়া উচিত

পেটার হান্ডকে

  যুগান্তর ডেস্ক    ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পেটার হান্ডকের এ সাক্ষাৎকারটি জার্মান ভাষায় গ্রহণ করেছিলেন ইয়ান সে. বেমান (Jan C. Behmann) এবং ম্লাদেন গ্লাদিক (Mladen Gladic)। এটি প্রকাশিত হয়েছিল বার্লিনের Der Freitag নামক সাপ্তাহিক কাগজে, ২৩ আগস্ট ২০১৮-র সংখ্যায়। মূল জার্মান ভাষা থেকে সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ অনুবাদ করেছেন প্রাবন্ধিক গবেষক দেবব্রত চক্রবর্তী।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : আপনি যখন থাকবেন না, তখন এ বাড়িটার কী হবে?

পেটার : মালিক হওয়া খুব বিপজ্জনক, মানুষের তো দাবি থাকে তার ওপর, না? এই যে আমি আমার জমিজিরেত আর মেঝেটুকু ঠেকিয়ে রাখতে চেষ্টা করব, সেটাও তো খুব স্বাভাবিক! কারণ এ বাড়িতে কোনো কর-উপদেষ্টা বাস করুক, এ আমি চাই না। কী জানি হয়তো সেই লোকটাই একদিন আমার বাড়িতে এসে বাস করবে, কিন্তু তখন আর আমার কিছুই করার থাকবে না।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : রোগার ভিলেমসেন (Roger Wilemsen:1955-2016)-এর বাড়িতে কিন্তু এখন জলপানি দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। আগতরা লেখালেখির কাজ করতে পারেন ওখানে। ভাবতে পারেন ব্যাপারটা?

পেটার : না, আমার বাড়িতে শুধু আমিই লিখব। নবজাতকরা সব লিখবে অন্য জায়গায়। বাইরে, খোলা জায়গায়, নয়তো মায়ের কাছে বসে।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : এটা কী রকম ব্যাপার যে ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেলে তখন কেউ আর তাদের চিনতে পারে না?

পেটার : এটা একটা জঘন্য ব্যাপার।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পেটার : তাদের উচিত অন্য কোথাও সাঁতার কাটা। আমার এখানে এসে ঘণ্টা বাজানো উচিত নয় তাদের। আমার কাছে তাদের পাওয়ার কিছু নেই।

নিজেকেই দুটো ভাগে বিভক্ত করে নিতে হয়। এটা মানুষের উচিত। ইবসেন হলে একটা চমৎকার নাটক লিখতে পারতেন।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : এরকম দ্বৈধ নিয়ে কোনো টেক্সট আছে?

পেটার : লিখতে চাইলে নাটক লেখাটাই ভালো। যাদের মনে প্রেম আছে, তারা বাবা হিসেবে, মা ও শিশু হিসেবে মনে একটুও অপরাধবোধ না রেখে যেন নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখে!

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : কোনো বিদ্রোহ না করেই?

পেটার : হ্যাঁ, যেমন ম্যাক্সিম গোর্কি-র একটা উপন্যাসে, শেষে ছায়ার সঙ্গে কুস্তি করার মতো অবস্থা হয়।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : কেন, ওর মধ্যে কোনো সারবস্তু নেই বলে?

পেটার : এটাই হেঁয়ালি (Aporia)। আর কোনো পথ নেই। সবাই ভাবে কত বড় ব্যাপার এটা জীবনে। তা কোথায় থাকে সেই বড় বড় ব্যাপার?

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : বেশিরভাগ লোকেরই চেষ্টা করা উচিত এসব বোঝার।

পেটার : ঠিক কথা। ও বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চয় আছেন, আবার ফাঁকফোকরও আছে। ঠিক।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : কেন, তাতে সুবিধা?

পেটার : তা তো বটেই। সবকিছুরই একটা এলাকাভিত্তিক বাজার আছে, তাই না? হ্যাঁ, সুবিধা তো আছেই, তবে এমনি এমনি কাজে আসে না, বিষয়ের মধ্যে গিয়ে ঢুকতে হয়। সেইজন্যই তো কেউ একজন লেখক। বিষয়টার ভেতরে ঢুকে যাও, যা আসছে আসতে দাও, ব্যাখ্যার দরকার নেই, কোনো যুক্তি তক্কো দেখিয়ে কাজ নেই। তবে তাতেও যে কিছু হয়, তা না। কোন্ জিনিসটা যন্ত্রণা নিয়ে আসে? সে নিজের প্রতিই নিজের ঘৃণা, বা নিজের প্রতি নিজের রাগ।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : রাগ ও ঘৃণা কি দুই পৃথক বস্তু?

পেটার : রাগ ভালো। রাগ ভালোবাসারই প্রকাশ। রাগ একটা আকৃতি। ঘৃণার কোনো আকৃতি নেই। ষ্পিনোৎসা (Baruch Spinoya:1632-1677) থাকলে এদিক ওদিক ভালো করে বুঝিয়ে দিতেন। নাহ্ রাগ সত্যিই একটা চমৎকার জিনিস।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : তাহলে কি এই বাড়িতেই থেকে যেতে চাইছেন?

পেটার : এই একটা উভয় সংকট। মাঝে মাঝে ভাবি, বাড়িটা বিক্রি করে দেব। দিয়ে তিরিশ বছর আগেকার সেই যাযাবর বৃত্তি নেব। মাঝে মাঝে আফ্রিকা আমাকে খুব টানে। কিন্তু সেটার কোনো মানে হয় না এখন। ওখানে এখন আমি যেন একটা নতুন মানুষ। আরে, এই বাড়ি খালি করে দেয়াটা কি চাট্টিখানি কথা? কীভাবে বইগুলো সব পড়ে আছে, ফটোগুলো পড়ে আছে, ফেলে দেয়ার মতো ক্যামেরাও পড়ে আছে। আমার শিল্পী বন্ধুদের ছবিগুলো তো আবার টাঙানো নেই, পড়ে আছে সব মেঝেতে।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : শহরে থাকতে চান না?

পেটার : কোনোদিন না। ওই কোলাহলের মধ্যে, মাপ করবেন, একদম না। গোলমাল সহ্য করতে পারি না আমি। যারা পারে তাদের আমি মানুষ বলে মনে করি না।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : তবু প্যারিসে যেতে বুঝি ভালো লাগে?

পেটার : হ্যাঁ, প্যারিস তো শহরের মধ্যে জাহাঁবাজ একটা শহর।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : আপনার কি কোনো প্রিয় জায়গা আছে সেখানে?

পেটার : হ্যাঁ, ১৫ নম্বর আরোঁদিসমঁ আর পঁ মিরাবো। অ্যাপোলোনিয়ার-এর একটা সুন্দর কবিতা আছে না, ‘মিরাবো সেতুর নিচে সেন নদী বয়ে যায়’ (Sous le pont Mirabeau coule la Seine) আর ‘আমাদের ভালোবাসা সেও’( et nos amours)। আমি ওখানে চলে যাই, গা লাগিয়ে দিই, এদিক ওদিক ঘুরি।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : খোয়ারি-র মতো?

পেটার : না না। রোলফ ডিটার ব্রিংকমান-এর ভাষায় ‘কে যেন টোকা মারে।’ তার আকারটাও কেমন একটা খটখট খটখট। থলথলে চেহারা, দানবের মতো। লীরিক-এর অরসন ওয়েলস। মাঝে মাঝে ভাবি, ‘তোর বাপু কপি রাইটার হওয়া উচিত ছিল।’

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : কাগজ পড়েন এখনও?

পেটার : না, শুধু আঞ্চলিক কাগজ দেখি, যেমন পারিসিয়ঁ আর লেকুইপ। শেষেরটা খেলার কাগজ।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : টেলিভিশন বা রেডিও?

পেটার : না। তবে কখনও কখনও, খেলা থাকলে। তাও একলা কখনও দেখি না। আমার একটা টেলিভিশন আছে, পাঁচ বছর হল সেটা খারাপ হয়ে পড়ে আছে। বাহাদুরি না। কোনো বিশেষ ভাবাদর্শের ব্যাপার নেই।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : খবরের কাগজ পড়েন না কেন?

পেটার : আমি তো খবরের কাগজের নেশাড়ু ছিলাম! ভয়ংকর! এখন আর নেই। পাতা ওলটালে মন খারাপ হয়ে যায়। শরীর খারাপ করে।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : এটা কি এজন্য যে মিডিয়া আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিল?

পেটার : এটার জন্য আপনি একজন মনোবিজ্ঞানীকে জিজ্ঞেস করুন। আমার নিজের মনোবিজ্ঞান আমাকে বরং বলে, ‘না।’

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : সে মনোবিজ্ঞান কি আপনাকে নিয়ে খুশি?

পেটার : সবসময় না।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : মনোবিজ্ঞানে কি আগ্রহ আছে আপনার?

পেটার : খেলার মতো আমোদ আছে ওতে। ঠিকুজি কুষ্ঠির মতো। পারিসিয়ঁ কাগজে আবহাওয়ার খবরের পেছনে রাশিচক্র থাকে। আমার মধ্যে ‘নীতি ব্যাপারটা সবসময় দোলাচল।’

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : রাজনীতিতে আপনার আর আগ্রহ নেই?

পেটার : রাজনীতিতে সত্যি সত্যি কোনোদিনই আমার আগ্রহ নেই, কাঁচা লোক। অস্ট্রিয়াতে কী ঘটছে, খবরই রাখি না আমি।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : জার্মানির খবর?

পেটার : একটু বেশি রাখি।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর তো খুব তরুণ।

পেটার : হ্যাঁ, তার মুখখানা ঠিক মুখোশের মতো। সেটা বাচ্চারা আবার পড়েও, পড়লে দেখায় ঠিক ব্যাংক-ডাকাতের মতো।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : ফ্রান্স কি আপনার স্বদেশ?

পেটার : না, তা-ও না। মানুষের কোথাও কোনো ঘর নেই। গ্যোয়েটের ঘর হতো মাঝে মাঝে নারীদের স্তনের ওপর। না হওয়ার কী আছে, মুহূর্ত কয়েকের জন্য তো! স্বদেশ শব্দটার প্রয়োগ খাটে না ঠিক কোথাও।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : কেন?

পেটার : ব্যাপারটা ব্যাকরণ সম্পর্কিত। একটা মানুষের একটা বিস্ময়চিহ্ন থাকতে পারে, ‘ওহ্ এই দেখো, এই যে আমার স্বদেশ!’ কিন্তু স্বদেশ নিয়ে একটা ভাবাদর্শ তৈরি করা বোধ হয় সবচেয়ে জঘন্য। অস্ট্রিয়াতে আমার এ অভিজ্ঞতা ছোটবেলা থেকে। স্বদেশ সম্পর্কে ভাবাদর্শটা হল নাৎসিতন্ত্রের একটা অংশের মতো। ‘অ্যাই, স্বদেশ কাকে বলে তুই বুঝিস না, যাঃ’-এইরকম চাপ দিয়ে ‘ব্ল্যাকমেলিং’ করা।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : পলাতকের মতো?

পেটার : হ্যাঁ। ফরাসি দার্শনিক সিমোন ভাইল (Simone Weil :1909-1943) বলেছেন, অন্য মানুষকে ছিন্নমূল করার মতো অপরাধ সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ।

কিন্তু নিজেকে ছিন্নমূল করা, এটা একটা অর্জন। মাঝে মাঝে আমার নিজেরও কতকগুলো বায়বীয় মূল দেখতে পাই। আবার কতকগুলো মর্ত্যরে মূলও বটে; কিন্তু সেসব চোখের বা মনের ভুল।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : বোঝেন যে স্বদেশ হারানোর আতঙ্ক মানুষের মধ্যে খুব কাজ করে?

পেটার : হ্যাঁ। জমিটা তারা হারায়। মানুষ তো তার জায়গা নিয়েই বেঁচে থাকে? মাঝে মাঝে দেখি শহরতলিতে কিছু ফরাসি বাস করছে, যেখানে স্রেফ কিছু আরবরাই বাস করে। তাদের নিয়ে বামপন্থী কাগজগুলো সব মজা করে আর বলে ‘ওগুলো সব লে-পেন দলের (ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটা দূর-ডানপন্থী দল) লোক।’

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : ওরা কি সব লে-পেন দলের লোক নয়?

পেটার : না। কথাটা হল জায়গা নিয়ে, যে জায়গায় আপনি থাকেন, যেখানে কাজ করেন, যেখানে আপনি আপনার ছেলেবেলা কাটিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই জায়গাটা একটা বাঁশির ফুঁয়ে আপনার কাছ থেকে উড়ে গেল বাঁশির আওয়াজও আর কখনও আপনার ভালো লাগবে না, তাই না? ওটা তখন আপনাকে ধাক্কা মারবে। লোকগুলোকে আমি ঠিক বুঝি না বটে, কিন্তু সহমর্মী আমি ওদের বটেই।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : আপনার অনুভূতিটা কী?

পেটার : পিতৃভূমিই বলুন আর মাতৃভূমিই বলুন, যাকে ঘিরে রাগ আর হতাশা থাকে, সে দুটি তখন লোপ পেয়ে যায়। ফরাসি ভাষায় স্বদেশের কোনো প্রতিশব্দ নেই। সবই হল জায়গা। একটা কবিতায় গ্যোয়েটে বলেছেন, বড় সাংঘাতিক লীরিক-কবি ছিলেন তিনি, প্রেম দিয়ে একটা স্থানমাত্রা (space)কে একটা জায়গায় (place) পরিণত করা যায়। এ শুধু অভ্যাসের নিরিখে নয়, ভালোবাসার দিক থেকেও। আজকের বড় নাটক এটাই। আসলে একজন নাট্যকারকে এমন একজন মানুষকে নিয়ে নাটক লিখতে হবে যে তার বাগানটা হাতছাড়া হয়ে গেছে বলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। অবশ্য বাগানই যে হতে হবে শুধু তা নয়।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : জার্মানিতে বোধ হয় এই লোকটাকে বলা হবে নাৎসি?

পেটার : ঠিক। এইভাবেই হয়তো ব্যাপারটাকে দেখানো হবে। কিন্তু নাট্যকার যদি খাঁটি নাট্যকার হন, যদি তিনি প্রকৃত অনুভব করতে পারেন সত্যিকারের ন্যায়টা কী, তাহলে আর লোকে দ্বিরুক্তি করবে না। শুধু ওপর ওপর একটা মন্তব্য করার জন্য তো পথেঘাটে লোক পাওয়া যায়। এরাই সংখ্যায় বেশি।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : জার্মানিতে এখন লোকের একটা আতঙ্ক শুরু হয়েছে, দেশহীন যেসব মানুষকে তারা আশ্রয় দিয়েছে, তারাই একদিন তাদের জায়গা কেড়ে নেবে।

পেটার : আমাকে ওজালে জড়াবেন না। আমি ওর মধ্যে ঢুকতে চাই না। আসলে কয়েকজন ফরাসি মানুষের প্রতি আমার সমবেদনা আছে, যারা মূলত ব্যক্তিবিশেষ, কিন্তু একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয়ে একটা দলের আশ্রয় খোঁজেন, যদিও সেই দলের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি একেবারেই সহমত নন। ফ্রন্ট ন্যাশনালের অনেকেই, কিংবা তাকে তিনি এখন যাই বলুন না কেন, দলের সঙ্গে তাদের মোটে সংশ্রব নেই; কিন্তু প্রতিবাদ জানার জন্য তারা তাদের ভোট দেন।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : অনেকে তো AfD(Alternative fn...r Deutschland, AfD)-কে নির্বাচন করেন।

পেটার : সেটা আপনারা জেনে নেবেন। আমি বলব, আমার সামনে অন্তত কারও উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : তারপর?

পেটার : এটা পূর্বপরিকল্পিতের মতো মঞ্চে তোলা ঠিক হবে না। হঠাৎ পাওয়ার মতো হতে হবে।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : এই ঘৃণাটা আসে কোথা থেকে?

পেটার : ঘৃণা তো জীবনের একটা চিহ্ন।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : ট্রাফিক জ্যাম-এ দাঁড়িয়ে থাকতে হলে কেমন লাগে?

পেটার : ওটা ঘৃণা নয়। ওটা একটা বিতৃষ্ণা গোছের। ঘৃণা ঘৃণাই। একটা বিরল অভিজ্ঞতা। বিতৃষ্ণাটা হয়তো জানেন আপনি। একটা অপ্রীতিকর অনুভূতি।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : আপনি কি ঈশ্বর বিশ্বাসী?

পেটার : হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি নিয়মিত ঈশ্বর আরাধনা করি।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : আপনি কি ক্যাথলিক?

পেটার : আমি ঈশ্বর আরাধনার কৃত্যে বিশ্বাস করি। কিন্তু যখন কনফেশনাল ফেইথের কথা আসে, তখন আর আমি নেই।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : তখন আপনি কিসে বিশ্বাস করেন?

পেটার : এটা একটা অদ্ভুত রকম। প্রতিটি অণু পরমাণু আমার সঙ্গে চলে।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : একটা কোন সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে?

পেটার : অবশ্যই। আমরা এখানে কালোদের সঙ্গে মেলায় যাই। একটা সরল আনন্দের ব্যাপার আর কী। ‘অ্যাটম’ জেগে ওঠে।

‘পুলিশেরা ঠিক মহিলাদের মতো। ওদের যখন দরকার, তখন আপনি ওদের হাতের কাছে পাবেন না, আবার ওদের যখন চাই না, তখন ওরা আপনার পাশে ঘুরঘুর করছে।’

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : এর মধ্যে কোনো ধর্মীয় আচার বা পদ্ধতি মানা হয়?

পেটার : না। মানুষ যা, তার সবটুকুই ওর মধ্যে সরলভাবে আছে। লোকে জানে না পর মুহূর্তে কী হবে, কিন্তু এই মুহূর্তে যা চলছে তা ঠিকই আছে। আমার ‘ফলচোর মেয়েটি’ (Die Obstdiebin oder Einfache Fahrt ins Landesinnere, :2017) বইতে খোলা আকাশের নিচে একটা মেলার কথা আছে। সেখানে আছে শতবর্ষী মানুষের দল, একজন যুবতীও এসেছে সেখানে, আর শতায়ুরা এত মেতে আছে, যে একজন আর একজনের পাছায় আনন্দে চাপড় মারছে, মহিলারা পুরুষদের পেছনে চপেটাঘাত করছে। কিন্তু তিন ঘণ্টা পর একটা কুকুর গাড়িতে করে গ্রামের রাস্তায় ছুটে গিয়ে অনেক মানুষকে হত্যা করল।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : সন্ত্রাসবাদীরা এমন গাড়িতে করেই সবসময় আক্রমণ করে, এমনকি এখানেও।

পেটার : যাবেন কোথায়? এইরকমই সব। লোকে ভোলে না। কিন্তু সারা দিন ধরে তো আর এই নিয়ে চিন্তা করলে চলে না!

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : পুলিশের ভূমিকাটা কী মনে হয় আপনার?

পেটার : ভালো না।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : পুলিশকে ভয় পান?

পেটার : না, তবে আমি ওদের পছন্দ করি না। দূর থেকে ভালোই লাগে। সবমসয়ই বলি, পুলিশরা ঠিক মহিলাদের মতো।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : জরুরি অবস্থা তো বলতে গেলে মানুষের প্রতি মুহূর্তেই।

পেটার : ঠিকই তো তাই। যাচ্ছেতাই অবস্থা?

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : আপনি কি প্রেমে বিশ্বাসী?

পেটার : আমি একজন এপিকিউরিয়ান- আমোদপ্রিয় মানুষ, সদর্থে। গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাস বলেছিলেন, বন্ধুত্ব পৃথিবীর চারদিকে নৃত্য করছে। কিন্তু আমি বন্ধুত্বের চেয়ে প্রেমে আস্থা রাখি বেশি। বন্ধুত্বটা একটা ধাপ্পাবাজির মতো। বন্ধুত্বের জন্য একটা নির্বাচন করতে হয়। প্রেম একজনের কাছ থেকে আর একজনের কাছে চলে যায়- আমেরিকান পপ গায়িকা কনি ফ্রান্সিস (Connie Francis : R. 1938) যেমন একবার একটা গানে গেয়েছেন, ‘ভালোবাসা এক বিরল মধুর খেলা/এক থেকে তার বহু অভিমুখে চলা/নিয়েছে সে কম দিয়েছেই ঢের, মেলা?’

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : আজকের প্রজন্ম তাদের জীবনটাকে অনেক হিসাব করে পরিকল্পনা করে।

পেটার : বয়েসটা অল্প থাকলে মানুষ ভাগ্যে বিশ্বাস করে, কিন্তু ভাগ্য প্রবঞ্চনাই করে। আনন্দটা বরং অন্য জিনিস। দুই মাত্রার শব্দ (Freude=Avb›`) এক মাত্রার শব্দের (luck=ভাগ্য) চেয়ে বেশি সুন্দর।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : কিন্তু সবাই তো একটা জায়গায় পৌঁছতে চায়।

পেটার : অবশ্যই চায়, চাওয়াটাও সঠিক। আমি আনুগত্যের সপক্ষে, এক টেকসই অংশীদারে বিশ্বাসী, কিন্তু জীবনে সফল হইনি কখনও।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : এটা কি একটা ব্যর্থতা?

পেটার : না, আমি ব্যর্থ হইনি মোটেই। আমি দুর্বল, মানুষ দুর্বল তো থাকেই। যে সবল, সেও দুর্বল হয়।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : শেষ কবে আপনি দুর্বল হয়েছেন?

পেটার : আজ হইনি, কিন্তু গতকালই হয়েছি!

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : গতকাল কী হয়েছিল?

পেটার : ভুলে গেছি। ও হ্যাঁ, আমি এক প্রতিবেশীনির দিকে চেয়ে গর্জন করে উঠেছিলাম, অমন কুকুর ছিল তার, মুখে গাঁজলা উঠিয়ে চিৎকার করেছিলাম ফরাসি ভাষায় বলেছিলাম, বিষ্ঠা।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : যৌনতার ধরন-ধারণ নিয়ে লোকে তার ওপর কি রকম গুরুত্ব দেয়? সমকামী (Gay) বা সমকামিনী (Lesbian) এই নিয়ে?

পেটার : এসব সংজ্ঞায় কী আসে যায়? আমার তো মাথায় সবসময় এই কথাটাই আসে যে কিছু শব্দ আছে গুণবাচক, কতকগুলো আছে প্রধান শব্দ বা বিশেষ্য ও কতকগুলো সময়সূচক শব্দ। ‘লেসবিয়ান’ কথাটা একটা গুণবাচক শব্দ। কিন্তু আমি দিব্যি কল্পনা করতে পারি যে একজন নারীর সঙ্গে অন্য একটি নারীর একটাই সময়সূচক শব্দ বা ক্রিয়াপদ থাকে : সেটা হল ভালোবাসা। আমার ক্ষেত্রের সঙ্গে অবশ্য বিরাট পার্থক্য।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : কী পার্থক্য?

পেটার : আমি একটা কথাই বলি, আমি লেখক নই, আমি লিখি। মাঝে সাঝে লিখি। আমার ক্ষেত্রে সবকিছুই সময়সূচক শব্দের ভেতরে থাকে।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : আর বিশেষণ?

পেটার : সেটা প্রশ্নাত্মক। ‘হোমোসেক্সুয়াল’ কথাটা খুব হাস্যকর। তাহলে কি আমি বলব, ‘আমি হেটারোসেক্সুয়াল?’ এ এক ধরনের ঠেঁটামি, ভাষার অপব্যবহার।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : আপনি কি অস্ট্রিয়ান নন?

পেটার : এটা ভালো প্রশ্ন। মাঝে মাঝে যখন অস্ট্রিয়ার মাথায় চাঁটি দিয়ে নামিয়ে দেয়া হয়, তখন আমি বলি আমি অস্ট্রিয়ান। দেশপ্রেমিক হিসেবে বলি। দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদের মধ্যে আমি পার্থক্য করি।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : সেটা কী?

পেটার : আমার দেশ যদি আক্রান্ত হয় তাহলে আমি বলি, ‘আমি অস্ট্রিয়ান।’ ফরাসি ফুটবলের এক কোচ ছিলেন বিখ্যাত ফুটবল কোচিং ক্লাব AJ Axuerre (১৯০৫-এ প্রতিষ্ঠিত)-এর। তিনি বলতেন, ‘অস্ট্রিয়া সবসময়েই হিটলারের সঙ্গে ছিল এবং তার ভূমিকাতেই খেলেছিল’- আমি বলেছি, ‘আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেব?’ কিন্তু কেউ না জানতে চাইলে আমি বলি না আমি অস্ট্রিয়ান। লোককে এইভাবে কোণঠাসা করে দিতে চাই না?

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : একজন দেশপ্রেমিকের অনুভূতিটা কী?

পেটার : যখন আমি টের পাই আমি অস্ট্রিয়ান, তখন আমার মনে পড়ে লেখক গ্রিলপারৎসার এর কথা, ইঙেবর্গ বাখমান (Ingeborg Bachmann:1926-1973), পাওল সেলান (Paul Celan:1920-1970)-এর কথা এমনকি হাইমিটো ফন ডোডেরার (Heimito von Doderer:1896-1966)-যদিও দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে তিনি নাৎসি ছিলেন।

ডেয়ার ফ্রাইটাগ : মৃত্যুর ভয় নেই আপনার?

পেটার : আলবাৎ আছে। সোজা কথা? ভয়ংকর, বাবা! অনেক সময় লোকে ভাবে, এই তো এইবার কিছু ঘটবে; কিন্তু তখন দেখা যায় যেটা ঘটার সেটা ঘটল না। কেউ ভাবল, আচ্ছা এবার ঘটলেই তো ভালো হয়, তো যে আসার সে এল না আমার ভাগ্যটা খুব ভালো। কিন্তু আমি অন্যদের কথা ভাবি। অন্যদের তুলনায় আমি বরং দেবতাদের বেশি প্রিয়।

তখন ভাবি : তুমি কেন জীবনপুরের অতিথির মতো যাও না- সেই অতিথির মতো, যার কিনা ষোলকলা পূর্ণ হয়ে গেছে? কাজ হয় না। তুমি জীবনপুরের অতিথি। মাঝে মাঝে এই কথাটাই ভাবি। বারবার কেউ একজন আসে। সে গ্যোয়েটে হোক না হোক। আমার ভয়, হয়তো গ্যোয়েটেই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×