হুমায়ূন আহমেদের অগ্রন্থিত রচনা

  হাসান হাফিজ ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হুমায়ূন আহমেদের অগ্রন্থিত রচনা

অসামান্য এক ধরনের জাদুকরি ক্ষমতা ছিল এই নন্দিত কথাশিল্পীর। লাখো পাঠকের মন জয় করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন আয়াসে।

১৩ নভেম্বর বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়, কৃতী কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। ১৯৪৮ সালে তার জন্ম। মৃত্যু ১৯ জুলাই ২০১২ খ্রিস্টাব্দ। শফিকুল ইসলাম ইউনুস সম্পাদিত সাপ্তাহিক ঢাকা পত্রিকায় (এখন দৈনিক) আশির দশকে কলাম লিখতেন হুমায়ূন আহমেদ।

খুব বেশিদিন লেখেননি অবশ্য। সেই কলামগুলো অদ্যাবধি গ্রন্থিত হয়নি। ঢাকা পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল ইসলামের সৌজন্যে পাওয়া গেছে এই লেখাটি। প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক ঢাকার

১১ বর্ষ ১২ সংখ্যায় (১৫ এপ্রিল ১৯৮৮)।

সেই লেখা এখানে...

এইসব দিনকাল

হুমায়ূন আহমেদ

কিছুদিন আগে সূর্যগ্রহণ হয়ে গেল। আকাশে চন্দ্র এবং সূর্য যখন আছে, তখন গ্রহণ হবেই। খবরের কাগজে তার খবরও ছাপা হবে। হয়েছেও তাই। আমি খবরের কাগজ থেকেই প্রাকৃতিক এ ঘটনার খবর জানলাম। তবে এর সঙ্গে বাড়তি কিছুও জানলাম। খবরের কাগজের লোকজন এস্ট্রোলজিক্যাল সোসাইটির বরাত দিয়ে গ্রহণের সময় আমাদের কী করণীয় অথবা করণীয় নয়, সে খবর ছেপে দিলেন।

ব্যাপারটা কী? আমরা কাদের কাছে কী জানতে চাচ্ছি? জ্যোতিষীদের কাছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের খবর? যাদের মূল কাজ গ্রহ নক্ষত্র মিলিয়ে মানুষের ভাগ্য বলা, তাদের কি আমরা বিজ্ঞানীদের দলে ফেলে দিচ্ছি? তাদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে জাতীয় দৈনিকে ছাপাচ্ছি। বিজ্ঞান এবং অপবিজ্ঞান এ দুইয়ের সীমারেখা আমরা কবে টানব? কতদিন এসব ভাগ্যবাদীদের লালন করব? রাস্তার পাশে টিয়া পাখি নিয়ে বসে থাকা লোকটির সঙ্গে এস্ট্রোলজিক্যাল সোসাইটির তফাতটা কোথায়?

তফাত একটা আছে। গালভরা নাম আছে। যে নামে বিজ্ঞান অন্ধ। নামের শেষে আছে সোসাইটি। সোসাইটির সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ লোকজন নিমন্ত্রণ পান এবং অতি অবশ্যই একজন (কোনো কোনো ক্ষেত্রে দু’জন) মন্ত্রী থাকেন প্রধান অতিথি বা বিশেষ অতিথি হিসেবে। আমাদের মন্ত্রীদের সোসাইটিপ্রীতি প্রশংসনীয়। যে কোনো সোসাইটির মিটিংয়ে তারা যান এবং বক্তব্য রাখেন।

এস্ট্রোলজিক্যাল সোসাইটির এ রকম একটি সম্মেলনে এক মন্ত্রী বলেছিলেন (নাম মনে করতে পারছি না। মন্ত্রীদের নাম কেন জানি আমার মনে থাকে না), এস্ট্রোলজিক্যাল সোসাইটির জন্য একটি আধুনিক মানমন্দিরের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। মন্ত্রীর এ বক্তৃতার পর কোনো হাততালি পড়েনি বলেই আমার ধারণা। এস্ট্রোলজিক্যাল সোসাইটির সদস্যরা নিশ্চয়ই অধিক শোকে পাথর হয়েছিলেন। মানমন্দির দিয়ে তারা করবেনটা কী? তাদের দৌড় জন্মলগ্নে বৃশ্চিক রাশি থাকলে কী হয়। মন্ত্রী মহোদয় হয়তো তা জানতেন না। তিনি এস্ট্রোলজি ও এস্ট্রোনমিকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। তারাই যদি গুবলেট করেন, আমরা কী করব?

টিয়া পাখিওয়ালারা যদি একটা সোসাইটি করেন এবং এ সোসাইটির মাধ্যমে খবরের কাগজে বিবৃতি পাঠান, তা হলে সেসব বিবৃতি কেন ছাপা হবে না? দেশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে টিয়া পাখির বিবৃতি ছাপা হবে। যেমন একদিন হয়তো ছাপা হল- টিয়া পাখি বলেছেন খালেদা-হাসিনা সই পাতাবেন।

অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে আমরা খুব জোরালো গলায় কখনও কিছু বলি না। অনেকের কাছেই বিজ্ঞান রহস্যময়, অপবিজ্ঞানও তাই। দুটিকে যারা আলাদা করতে পারেন না, তাদের কথা ছেড়েই দিই। সারা জীবন যারা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাদের হাতেও নানা ধরনের পাথরের আংটি দেখেছি। গ্রহ নক্ষত্রকে তারা তুষ্ট রাখতে চান। সেই কারণেই গ্রহ রত্ন ধারণ করেছেন। আমি পিএইচডি ডিগ্রিধারী জনৈক অধ্যাপককে জানি, যিনি একটি কবচ পানিতে ডুবিয়ে সেই পানি সকাল সন্ধ্যা পান করেন।

একটি জাতি কতটা সভ্য, তা টের পাওয়া যায় সেই জাতির প্রচলিত কুসংস্কার থেকে। অসভ্য জাতির কুসংস্কারগুলো অসভ্য ধরনের হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নরবলি, কন্যাসন্তান জ্যান্ত পুঁতে ফেলা বা লোহার জুতা পরিয়ে পা বিকৃত করার মতো কুসংস্কার এক সময় পৃথিবীতে চালু ছিল। আজ নেই। আমাদের গ্রামবাংলার কুসংস্কারগুলোর বেশিরভাগই মজার। বাঁ দিকে চোয়াল দেখা, দধি যাত্রা, রাতে সুচির কাজ না করা জাতীয়। শহুরে কুসংস্কারগুলো (যা দ্রুত প্রসার লাভ করছে) সেই তুলনায় ভয়াবহ। এ মুহূর্তে তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তা আমরা করছি না। জ্যোতিষী সম্মেলন হচ্ছে। কেউ হচ্ছেন মহাজ্যোতিষ, কেউ জ্যোতিষ সমুদ্র। বিখ্যাত সব ব্যক্তিদের তারা আমন্ত্রণ করছেন। গুণীজন সংবর্ধনার ব্যবস্থাও হচ্ছে। জাতে ওঠার চেষ্টার কোনো শেষ নেই।

অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাত দেখার একটি বিভাগ চালুর প্রস্তাব আছে। আমরা পেছন দিকে চলতে পছন্দ করি। সামনে এগোনোর অনেক সমস্যা। পেছনে চলাই নিরাপদ। কাজেই একদিন হয়তো দেখা যাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাত দেখা অনুষদ চালু হয়ে গেছে। আমরা হাত দেখার অনার্স ও মাস্টার্স এবং এমফিল দিচ্ছি। সেশন জটও শুরু হয়ে গেছে। সেই সেশন জট কীভাবে খোলা যায়, তার পদ্ধতি বের করার জন্য ভাইস চ্যান্সেলর সাহেবের হাত দেখা হচ্ছে। সব সমস্যা ও সমাধান যখন হাতেই আছে, তখন আর কষ্ট করে বাইরে যাওয়ার দরকারটা কী?

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×