বাংলাসাহিত্যে গোয়েন্দা গল্প
jugantor
বাংলাসাহিত্যে গোয়েন্দা গল্প

  অরুণ কুমার বিশ্বাস  

৩১ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা ভাষায় প্রথম গোয়েন্দা কাহিনী কে লিখেছেন তা নিয়ে বেশ মতভেদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন ১৮৯৩ সালে কলকাতার নবজীবন পত্রিকায় প্রকাশিত গিরিশচন্দ্র বসুর ‘সেকালের দারোগার কাহিনী’ বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম গোয়েন্দা গল্প। ধারাবাহিকভাবে বছরখানেক চলার পর বই হিসেবে প্রকাশিত হয় ১৮৯৬ সালে। অবশ্য অনেকে বলতে চান গিরিশবাবুর এ লেখাটি আদতে গোয়েন্দা গল্প নয়, তবে সেখানে রহস্যের ছোঁয়া অবশ্যই ছিল। আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমসের মতো পেশাদার গোয়েন্দা না বলে বরং ‘গোয়েন্দা গন্ধযুক্ত’ গল্প বলা যায়।

সেই একই বছর প্রকাশিত হয় প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখা গোয়েন্দা গল্পের বই ‘দারোগার কাহিনী’। এ দুটো অখ্যান থেকে একটি বিষয় মোটামুটি পরিষ্কার হয়, তখনকার দিনে বাংলা ভাষায় যারা গোয়েন্দা ধাঁচের গল্প লিখতেন, তারা প্রাইভেট ডিটেকটিভ নয় বরং সরকারি কর্মচারী বা পুলিশ-দারোগাকেই প্রাধান্য দিয়ে গল্প রচনা করতেন। এর পেছনে সম্ভবত দুটো কারণ থাকতে পারে। এক. গল্পকাররা হয়তো মানতে চাইতেন না যে, মামুলি সৌখিন গোয়েন্দা পুলিশের চেয়ে বেশি দক্ষ বা সত্যানুসন্ধানে বেশি পারঙ্গম হতে পারেন। আর দ্বিতীয় কারণটা একেবারেই রাজনৈতিক। তখন ব্রিটিশ সরকার দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজ করছেন ভারতবর্ষে। কার ঘাড়ে কটা মাথা যে সরকারি পুলিশ-দারোগার সমান্তরাল আরেকজন প্রাইভেট গোয়েন্দাকে হিরো বানাবেন!

সে যাক, প্রিয়নাথবাবুর অনুকরণে ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয় শরৎচন্দ্র দেবের ‘গোয়েন্দা কাহিনী’। এই প্রথম আমরা দেখতে পাই, দারোগার চেয়েও বেশি প্রখর ও বুদ্ধিদীপ্ত একজন প্রাইভেট গোয়েন্দা পুরো গল্পজুড়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছেন এবং মনস্বী পাঠকের মনে স্থান গেড়ে বসেছেন। আরও দু’বছর পর অর্থাৎ ১৮৯৯ সালে ‘গোয়েন্দার গ্রেপ্তার’ নামক মাসিক পত্রিকায় প্রথম পাঁচকড়ি দে’র মায়াবিনী উপন্যাস ছাপা হয়। বলতে নেই, সেখানেই বাংলা ভাষার পাঠকরা প্রকৃত গোয়েন্দা গল্পের আস্বাদ লাভ করেন। অর্থাৎ এ কথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, পাঁচকড়ি দে-ই মূলত বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক গোয়েন্দা উপন্যাস রচনা করেন। আমরা সেখানে দেখা পাই একজন দাপুটে সত্যান্বেষী গোয়েন্দা চরিত্রের, যার নাম দেবেন্দ্র বিজয়। পাঁচকড়ি দে তার গোয়েন্দা উপন্যাস ‘মনোরমা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করেছিলেন।

প্রসঙ্গত, আধুনিককালে প্রথম গোয়েন্দা গল্প লেখা হয় ইংরেজিতে নয়, বরং ফরাসি ভাষায়। ফ্রাঁসোয়া ইউজিন ভিদক (১৭৭৫-১৮৫৭, প্যারিস)-এর লেখা ‘লাইফ ইন প্যারিস’ অথবা ‘অ্যাডভেঞ্চারস অফ অ্যা মারকুইস’ তখনকার তরুণ পাঠকদের মন জয় করে নেয়। তাদের মধ্যে ছিলেন বিশ্বজয়ী লেখক বালজাক, ভিক্টর হুগো, ইউজিন সু এবং আলেকজান্ডার ডুমা।

আর ইংরেজি ভাষায় প্রথম সার্থক গোয়েন্দা গল্প লেখেন এডগার অ্যালান পো। তার সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র অগাস্ট দু্যঁপা শুরুতেই বাজিমাত করে দেয়। ১৮৪১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য মার্ডারস ইন দ্য রু মর্গ’ লিখে দারুণ জনপ্রিয়তা পান অ্যালান পো। পো-পরবর্তী ইংরেজি গোয়েন্দা সাহিত্যে আরেকটি নাম ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে। তিনি হলেন আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস। বলা হয়ে থাকে, সারা বিশ্বে এখন অব্দি বাইবেলের পরে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বই আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস সিরিজ। ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল মজা করে বলতেন, তিনি খুব ভাগ্যবান যে তার জন্ম কোনান ডয়েলের জন্মের পরে হয়েছে। নইলে তিনি শার্লক হোমসের মতো একটি প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত গোয়েন্দা চরিত্রকে হারাতেন। তার কোনো কোনো বই দশ দিনে কুড়ি হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। বলে রাখা ভালো, আর্থার কোনান ডয়েলের শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা গল্প ‘দ্য হাউন্ড অফ বাস্কারভিলস’ প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে। তারই পথ অনুসরণ করে আসে আরেকটি নাম- আগাথা ক্রিস্টি, যিনি কিনা ‘ক্রাইম কুইন’ নামেই বেশি পরিচিত। তার প্রথম গোয়েন্দা গল্প প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। তিনি বই লিখেছেন একশ’র কাছাকাছি। প্রতিটি বই রহস্যামোদি পাঠকের মনোযোগ কেড়েছিল।

আসুন, আবার বাংলাসাহিত্যে ফেরা যাক। পাঁচকড়ি দে’র গোয়েন্দা গল্প মানেই নিপাট গোয়েন্দা কাহিনী নয়, সেখানে প্রায়ই তিনি জুড়ে দিতেন হিপনোটিজমের মতো বিষয়। তার কিছু কিছু গল্পে তান্ত্রিক বা গুণিনের দেখাও পাই। অবশ্য একজন গোয়েন্দা লেখক হিসেবে আমি মনে করি, ডিটেকটিভ স্টোরি নিপাট এবং নিখুঁত হওয়া চাই। সেখানে রহস্য বা অজানা ভয় ঢুকিয়ে দিলে গোয়েন্দাগিরির আমেজ নষ্ট হয়। পাঁচকড়ি দে’র পরে আসেন দীনেন্দ্রকুমার রায়। তার গোয়েন্দা চরিত্র রবার্ট ব্লেক বাঙালি পাঠকের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিল। অবশ্য তিনি মৌলিক লেখার পাশাপাশি অনুবাদও করতেন। তাই হয়তো তার গোয়েন্দাটি বাঙালি নয়, বরং ব্লেক হয়ে উঠেছিল। নাকি দিতি ভাবতেন, ইংরেজ জামানায় বাঙালি গোয়েন্দার কদর কেউ বুঝবে না!

এ ক্ষেত্রে দীনেন্দ্রকুমার রায়ের সঙ্গে আরও কিছু নাম উচ্চারণ করা যায়। যেমন সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। এখানে বলে রাখা ভালো, হাস্যরসের লেখক শিবরাম চক্রবর্তীও কিন্তু গোয়েন্দা গল্প লিখেছেন, অবশ্য মজা করে। তার চরিত্রের নাম ছিল কল্কে আর কাশি। এরা দুজন রহস্য যতটা না ভেদ করতেন, তারচেয়ে বেশি মনোযোগ ছিল তাদের পাঠকদের মনোরঞ্জনের দিকে। সেই অর্থে শিবরামের এ রচনাটিকে ‘ডিটেকটিভস অফ হিউমার’ বলা যায়। অর্থাৎ হাস্যকর বা হাস্যরসের গোয়েন্দা। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও কিন্তু গোয়েন্দা গল্পের প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল। তিনি ‘ডিটেকটিভ’ শিরোনামে একটি গল্পও লিখেছিলেন। শিবরামের কল্পেকাশির দেখাদেখি হুকোকাশিকে নিয়ে গোয়েন্দা গল্প লেখেন মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। এর পরপরই আবির্ভাব ঘটে আরেক গোয়েন্দা চরিত্র কিরীটি রায়ের। এর স্রষ্টা নীহাররঞ্জন গুপ্ত। তিনি দু’হাতে লিখেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একশ’র কম নয়।

বিশ্বের প্রায় সব গোয়েন্দাই ছিলেন পাঠকের ধরাছোঁয়ার বাইরে। অর্থাৎ তারা মোটেও সাধারণ্যে বাস করতেন না। মনেই হতো যে তারা কেবল গল্পের গোয়েন্দা। সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সী। তিনি অসম্ভব বুদ্ধিমান, তুখোড় বিশ্লেষণ ক্ষমতা, খরচোখে সব দেখতে পান ব্যোমকেশ। আবার তিনি তার স্ত্রী ও বন্ধু অজিতকে নিয়ে একযোগে সত্যানুসন্ধান করেন। সব মিলিয়ে ব্যোমকেশের জনপ্রিয়তা অন্য অনেকের চেয়ে বেশি, এমনকি, এখনও তিনি সমানভাবে রাজ করছেন পাঠকের মনে।

তবে পাঠক হিসেবে আমি কিন্তু সত্যজিৎ রায়কেই এগিয়ে রাখব। তিনি লিখেছেন কম, তবে যা লিখেছেন তা নিমিষে পাঠকের মন জয় করেছে। তার প্রথম বই ‘বাদশাহী আংটি’ বেরোয় ১৯৬৯ সালে। নিন্দুকেরা বলে, তার বেশকিছু লেখায় শার্লক হোমসের ছায়া দেখা যায়। সত্যজিতের ফেলুদা, জটায়ু আর তোপসের নাম জানে না, এমন কিশোর বা বৃদ্ধ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ফেলুদা শুধু গোয়েন্দাগিরি করেননি, বরং দরকার পড়লে নিজেই পিস্তল হাতে নেমে পড়েছেন মাঠে। প্রসঙ্গত, আমরা তার কৈলাসে কেলেঙ্কারি বা গোরস্থানে সাবধানের নাম করতে পারি।

এবার অসুন এপার বাংলায় ফেরা যাক। প্রথম প্রশ্ন, বাংলাদেশে সেভাবে কোনো গোয়েন্দা চরিত্র কি এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে! জানি, অনেকেই এপাশ ওপাশ মাথা নাড়বেন, অর্থাৎ না সূচক উত্তর। কেউ কেউ আবার মৌলিক ও অনুবাদের তফাৎ না বুঝেই তিন গোয়েন্দা বা মাসুদ রানা সিরিজের কথা বলবেন। মানছি এসব বই তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল; কিন্তু সে যেন অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবার মতো। বিলিতি বা বিদেশি গল্পই দেশি ছাঁচে ঢেলে পরিবেশন করা হয়েছে। অনুবাদ-প্রসাদের জোরে উতরেও গেছে সেসব, আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। তবে স্বীকার করতেই হবে, আমরা এখনও ব্যোমকেশ, হোমস, কিরীটি বা ফেলুদার মতো কেনো চরিত্র উপহার দিতে পারিনি।

শ্রদ্ধেয় আলী ইমামের পিকু এবং ফরিদুর রেজা সাগরের ছোটোকাকুর কথা উল্লেখ করা যায়। জনপ্রিয় চরিত্র, গোয়েন্দা ধাঁচের, তবে তারা সেই অর্থে পেশাদার গোয়েন্দা কেউ নয়। কারণ তাদের একজন (পিকু) বয়সে কিশোর। ছোটোকাকু সোমত্ত হলেও রীতি মেনে গোয়েন্দাগিরি করেন না, বরং বলা যায় তিনি থ্রিলো-ডিটেকটিভ।

একটি চরিত্র এপার বাংলায় সবে উঁকিঝুঁকি মারছে। তিনি হলেন আমার নির্মিত চরিত্র অলোকেশ রয়, প্রাইভেট ডিটেকটিভ। একসময় সরকারি চাকরি করতেন, কিন্তু নটা-পাঁচটা বাধাধরা কাজ ভালো না লাগায় তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন পুরোদস্তুর গোয়েন্দা। পাঁচফুট আট, বয়স আটত্রিশ, মেধাবী, চৌকস ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এই গোয়েন্দার সহযোগী মূলত দুজন আর্কিটেক্ট উর্বী এবং ক্রাইম রিপোর্টার শুভজিত। অলোকেশ মনে করেন শুধু চেয়ে থাকার নাম দেখা নয়, মন ও মগজ দুটোই একসঙ্গে করে দেখতে হয়। তাহলেই কেবল জটিল রহস্যের গিঁট খোলা যায়। আগ্নেয়াস্ত্রের বদলে মগজের ব্যবহারে বিশেষ পারঙ্গম এই গোয়েন্দা। দৃশ্যমান ঘটনার আড়ালে যে নিগূঢ় গল্প লুকিয়ে থাকে, সেখানে আলো ফেলতেই বেশি আগ্রহী গোয়েন্দা অলোকেশ রয়।

দুটো বিষয় এখানে উল্লেখ করা যায়। এই প্রথম বাংলাসাহিত্যের কোনো প্রাইভেট গোয়েন্দা একটি মেয়েকে তার সক্রিয় সহযোগী হিসেবে বেছে নিলেন। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গোয়েন্দা চরিত্র যদিও নারী, তবে সেখানকার কম্বিনেশন এরকম নয়। গোয়েন্দা অলোকেশ মূলত ফেলুদা ও শার্লক হোমসের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত। তিনি মনে করেন, সাধারণ কারও সঙ্গে গোয়েন্দার বাহ্যত কোনো পার্থক্য নেই। ফারাকটা হল পর্যবেক্ষণ, জানাশোনা এবং কগনিটিভ বা যৌক্তিক বিশ্লেষণ ক্ষমতার। ঘটনা বুঝতে কখনও কখনও অপরাধীর চোখ দিয়েও দেখতে হয়। রহস্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে অলোকেশ ভাগ্য বা নেহাতই কাকতালকে গুরুত্ব দিতে রাজি নন, কেননা, ওটা গুণিন নয়তো জ্যোতিষীর কাজ, গোয়েন্দার নয়। তিনি মেঘমুক্ত মন নিয়ে যুক্তির আলো ফেলে ঘটনার আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ করেন, পরিস্থিতি দেখেন। আগেই মনগড়া কোনো থিওরি নয় বরং যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা থিওরি বিনির্মাণ করেন। আর তাতেই তিনি সত্যের সন্ধানলাভ করেন এবং অপরাধীকে সপ্রমাণ শনাক্ত করতে সমর্থ হন।

আমার অলোকেশ রয়ের এযাবৎ প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে জলপিপি, কফিমেকার, আলিম বেগের খুলি, অথই আঁধার, অনল মিত্রের অপমৃত্যু। অন্যপ্রকাশ ও অনিন্দ্যপ্রকাশ থেকে বইগুলো প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সে রয়েছে কিশোর গোয়েন্দা চরিত্র ‘গুবলু সিরিজ’। শেষের আগে বলি, আমরা একটি যুক্তিনিষ্ঠ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে ‘ডিটেকটিভ ক্লাব’ নামে একটি সাহিত্যসোপান গড়ে তুলছি। আশা করি, এ ক্লাবের মাধ্যমে আমরা আমাদের কিশোর ও তরুণদের ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখব।

বাংলাসাহিত্যে গোয়েন্দা গল্প

 অরুণ কুমার বিশ্বাস 
৩১ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা ভাষায় প্রথম গোয়েন্দা কাহিনী কে লিখেছেন তা নিয়ে বেশ মতভেদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন ১৮৯৩ সালে কলকাতার নবজীবন পত্রিকায় প্রকাশিত গিরিশচন্দ্র বসুর ‘সেকালের দারোগার কাহিনী’ বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম গোয়েন্দা গল্প। ধারাবাহিকভাবে বছরখানেক চলার পর বই হিসেবে প্রকাশিত হয় ১৮৯৬ সালে। অবশ্য অনেকে বলতে চান গিরিশবাবুর এ লেখাটি আদতে গোয়েন্দা গল্প নয়, তবে সেখানে রহস্যের ছোঁয়া অবশ্যই ছিল। আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমসের মতো পেশাদার গোয়েন্দা না বলে বরং ‘গোয়েন্দা গন্ধযুক্ত’ গল্প বলা যায়।

সেই একই বছর প্রকাশিত হয় প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখা গোয়েন্দা গল্পের বই ‘দারোগার কাহিনী’। এ দুটো অখ্যান থেকে একটি বিষয় মোটামুটি পরিষ্কার হয়, তখনকার দিনে বাংলা ভাষায় যারা গোয়েন্দা ধাঁচের গল্প লিখতেন, তারা প্রাইভেট ডিটেকটিভ নয় বরং সরকারি কর্মচারী বা পুলিশ-দারোগাকেই প্রাধান্য দিয়ে গল্প রচনা করতেন। এর পেছনে সম্ভবত দুটো কারণ থাকতে পারে। এক. গল্পকাররা হয়তো মানতে চাইতেন না যে, মামুলি সৌখিন গোয়েন্দা পুলিশের চেয়ে বেশি দক্ষ বা সত্যানুসন্ধানে বেশি পারঙ্গম হতে পারেন। আর দ্বিতীয় কারণটা একেবারেই রাজনৈতিক। তখন ব্রিটিশ সরকার দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজ করছেন ভারতবর্ষে। কার ঘাড়ে কটা মাথা যে সরকারি পুলিশ-দারোগার সমান্তরাল আরেকজন প্রাইভেট গোয়েন্দাকে হিরো বানাবেন!

সে যাক, প্রিয়নাথবাবুর অনুকরণে ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয় শরৎচন্দ্র দেবের ‘গোয়েন্দা কাহিনী’। এই প্রথম আমরা দেখতে পাই, দারোগার চেয়েও বেশি প্রখর ও বুদ্ধিদীপ্ত একজন প্রাইভেট গোয়েন্দা পুরো গল্পজুড়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছেন এবং মনস্বী পাঠকের মনে স্থান গেড়ে বসেছেন। আরও দু’বছর পর অর্থাৎ ১৮৯৯ সালে ‘গোয়েন্দার গ্রেপ্তার’ নামক মাসিক পত্রিকায় প্রথম পাঁচকড়ি দে’র মায়াবিনী উপন্যাস ছাপা হয়। বলতে নেই, সেখানেই বাংলা ভাষার পাঠকরা প্রকৃত গোয়েন্দা গল্পের আস্বাদ লাভ করেন। অর্থাৎ এ কথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, পাঁচকড়ি দে-ই মূলত বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক গোয়েন্দা উপন্যাস রচনা করেন। আমরা সেখানে দেখা পাই একজন দাপুটে সত্যান্বেষী গোয়েন্দা চরিত্রের, যার নাম দেবেন্দ্র বিজয়। পাঁচকড়ি দে তার গোয়েন্দা উপন্যাস ‘মনোরমা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করেছিলেন।

প্রসঙ্গত, আধুনিককালে প্রথম গোয়েন্দা গল্প লেখা হয় ইংরেজিতে নয়, বরং ফরাসি ভাষায়। ফ্রাঁসোয়া ইউজিন ভিদক (১৭৭৫-১৮৫৭, প্যারিস)-এর লেখা ‘লাইফ ইন প্যারিস’ অথবা ‘অ্যাডভেঞ্চারস অফ অ্যা মারকুইস’ তখনকার তরুণ পাঠকদের মন জয় করে নেয়। তাদের মধ্যে ছিলেন বিশ্বজয়ী লেখক বালজাক, ভিক্টর হুগো, ইউজিন সু এবং আলেকজান্ডার ডুমা।

আর ইংরেজি ভাষায় প্রথম সার্থক গোয়েন্দা গল্প লেখেন এডগার অ্যালান পো। তার সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র অগাস্ট দু্যঁপা শুরুতেই বাজিমাত করে দেয়। ১৮৪১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য মার্ডারস ইন দ্য রু মর্গ’ লিখে দারুণ জনপ্রিয়তা পান অ্যালান পো। পো-পরবর্তী ইংরেজি গোয়েন্দা সাহিত্যে আরেকটি নাম ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে। তিনি হলেন আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস। বলা হয়ে থাকে, সারা বিশ্বে এখন অব্দি বাইবেলের পরে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বই আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস সিরিজ। ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল মজা করে বলতেন, তিনি খুব ভাগ্যবান যে তার জন্ম কোনান ডয়েলের জন্মের পরে হয়েছে। নইলে তিনি শার্লক হোমসের মতো একটি প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত গোয়েন্দা চরিত্রকে হারাতেন। তার কোনো কোনো বই দশ দিনে কুড়ি হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। বলে রাখা ভালো, আর্থার কোনান ডয়েলের শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা গল্প ‘দ্য হাউন্ড অফ বাস্কারভিলস’ প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে। তারই পথ অনুসরণ করে আসে আরেকটি নাম- আগাথা ক্রিস্টি, যিনি কিনা ‘ক্রাইম কুইন’ নামেই বেশি পরিচিত। তার প্রথম গোয়েন্দা গল্প প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। তিনি বই লিখেছেন একশ’র কাছাকাছি। প্রতিটি বই রহস্যামোদি পাঠকের মনোযোগ কেড়েছিল।

আসুন, আবার বাংলাসাহিত্যে ফেরা যাক। পাঁচকড়ি দে’র গোয়েন্দা গল্প মানেই নিপাট গোয়েন্দা কাহিনী নয়, সেখানে প্রায়ই তিনি জুড়ে দিতেন হিপনোটিজমের মতো বিষয়। তার কিছু কিছু গল্পে তান্ত্রিক বা গুণিনের দেখাও পাই। অবশ্য একজন গোয়েন্দা লেখক হিসেবে আমি মনে করি, ডিটেকটিভ স্টোরি নিপাট এবং নিখুঁত হওয়া চাই। সেখানে রহস্য বা অজানা ভয় ঢুকিয়ে দিলে গোয়েন্দাগিরির আমেজ নষ্ট হয়। পাঁচকড়ি দে’র পরে আসেন দীনেন্দ্রকুমার রায়। তার গোয়েন্দা চরিত্র রবার্ট ব্লেক বাঙালি পাঠকের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিল। অবশ্য তিনি মৌলিক লেখার পাশাপাশি অনুবাদও করতেন। তাই হয়তো তার গোয়েন্দাটি বাঙালি নয়, বরং ব্লেক হয়ে উঠেছিল। নাকি দিতি ভাবতেন, ইংরেজ জামানায় বাঙালি গোয়েন্দার কদর কেউ বুঝবে না!

এ ক্ষেত্রে দীনেন্দ্রকুমার রায়ের সঙ্গে আরও কিছু নাম উচ্চারণ করা যায়। যেমন সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। এখানে বলে রাখা ভালো, হাস্যরসের লেখক শিবরাম চক্রবর্তীও কিন্তু গোয়েন্দা গল্প লিখেছেন, অবশ্য মজা করে। তার চরিত্রের নাম ছিল কল্কে আর কাশি। এরা দুজন রহস্য যতটা না ভেদ করতেন, তারচেয়ে বেশি মনোযোগ ছিল তাদের পাঠকদের মনোরঞ্জনের দিকে। সেই অর্থে শিবরামের এ রচনাটিকে ‘ডিটেকটিভস অফ হিউমার’ বলা যায়। অর্থাৎ হাস্যকর বা হাস্যরসের গোয়েন্দা। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও কিন্তু গোয়েন্দা গল্পের প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল। তিনি ‘ডিটেকটিভ’ শিরোনামে একটি গল্পও লিখেছিলেন। শিবরামের কল্পেকাশির দেখাদেখি হুকোকাশিকে নিয়ে গোয়েন্দা গল্প লেখেন মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। এর পরপরই আবির্ভাব ঘটে আরেক গোয়েন্দা চরিত্র কিরীটি রায়ের। এর স্রষ্টা নীহাররঞ্জন গুপ্ত। তিনি দু’হাতে লিখেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একশ’র কম নয়।

বিশ্বের প্রায় সব গোয়েন্দাই ছিলেন পাঠকের ধরাছোঁয়ার বাইরে। অর্থাৎ তারা মোটেও সাধারণ্যে বাস করতেন না। মনেই হতো যে তারা কেবল গল্পের গোয়েন্দা। সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সী। তিনি অসম্ভব বুদ্ধিমান, তুখোড় বিশ্লেষণ ক্ষমতা, খরচোখে সব দেখতে পান ব্যোমকেশ। আবার তিনি তার স্ত্রী ও বন্ধু অজিতকে নিয়ে একযোগে সত্যানুসন্ধান করেন। সব মিলিয়ে ব্যোমকেশের জনপ্রিয়তা অন্য অনেকের চেয়ে বেশি, এমনকি, এখনও তিনি সমানভাবে রাজ করছেন পাঠকের মনে।

তবে পাঠক হিসেবে আমি কিন্তু সত্যজিৎ রায়কেই এগিয়ে রাখব। তিনি লিখেছেন কম, তবে যা লিখেছেন তা নিমিষে পাঠকের মন জয় করেছে। তার প্রথম বই ‘বাদশাহী আংটি’ বেরোয় ১৯৬৯ সালে। নিন্দুকেরা বলে, তার বেশকিছু লেখায় শার্লক হোমসের ছায়া দেখা যায়। সত্যজিতের ফেলুদা, জটায়ু আর তোপসের নাম জানে না, এমন কিশোর বা বৃদ্ধ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ফেলুদা শুধু গোয়েন্দাগিরি করেননি, বরং দরকার পড়লে নিজেই পিস্তল হাতে নেমে পড়েছেন মাঠে। প্রসঙ্গত, আমরা তার কৈলাসে কেলেঙ্কারি বা গোরস্থানে সাবধানের নাম করতে পারি।

এবার অসুন এপার বাংলায় ফেরা যাক। প্রথম প্রশ্ন, বাংলাদেশে সেভাবে কোনো গোয়েন্দা চরিত্র কি এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে! জানি, অনেকেই এপাশ ওপাশ মাথা নাড়বেন, অর্থাৎ না সূচক উত্তর। কেউ কেউ আবার মৌলিক ও অনুবাদের তফাৎ না বুঝেই তিন গোয়েন্দা বা মাসুদ রানা সিরিজের কথা বলবেন। মানছি এসব বই তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল; কিন্তু সে যেন অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবার মতো। বিলিতি বা বিদেশি গল্পই দেশি ছাঁচে ঢেলে পরিবেশন করা হয়েছে। অনুবাদ-প্রসাদের জোরে উতরেও গেছে সেসব, আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। তবে স্বীকার করতেই হবে, আমরা এখনও ব্যোমকেশ, হোমস, কিরীটি বা ফেলুদার মতো কেনো চরিত্র উপহার দিতে পারিনি।

শ্রদ্ধেয় আলী ইমামের পিকু এবং ফরিদুর রেজা সাগরের ছোটোকাকুর কথা উল্লেখ করা যায়। জনপ্রিয় চরিত্র, গোয়েন্দা ধাঁচের, তবে তারা সেই অর্থে পেশাদার গোয়েন্দা কেউ নয়। কারণ তাদের একজন (পিকু) বয়সে কিশোর। ছোটোকাকু সোমত্ত হলেও রীতি মেনে গোয়েন্দাগিরি করেন না, বরং বলা যায় তিনি থ্রিলো-ডিটেকটিভ।

একটি চরিত্র এপার বাংলায় সবে উঁকিঝুঁকি মারছে। তিনি হলেন আমার নির্মিত চরিত্র অলোকেশ রয়, প্রাইভেট ডিটেকটিভ। একসময় সরকারি চাকরি করতেন, কিন্তু নটা-পাঁচটা বাধাধরা কাজ ভালো না লাগায় তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন পুরোদস্তুর গোয়েন্দা। পাঁচফুট আট, বয়স আটত্রিশ, মেধাবী, চৌকস ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এই গোয়েন্দার সহযোগী মূলত দুজন আর্কিটেক্ট উর্বী এবং ক্রাইম রিপোর্টার শুভজিত। অলোকেশ মনে করেন শুধু চেয়ে থাকার নাম দেখা নয়, মন ও মগজ দুটোই একসঙ্গে করে দেখতে হয়। তাহলেই কেবল জটিল রহস্যের গিঁট খোলা যায়। আগ্নেয়াস্ত্রের বদলে মগজের ব্যবহারে বিশেষ পারঙ্গম এই গোয়েন্দা। দৃশ্যমান ঘটনার আড়ালে যে নিগূঢ় গল্প লুকিয়ে থাকে, সেখানে আলো ফেলতেই বেশি আগ্রহী গোয়েন্দা অলোকেশ রয়।

দুটো বিষয় এখানে উল্লেখ করা যায়। এই প্রথম বাংলাসাহিত্যের কোনো প্রাইভেট গোয়েন্দা একটি মেয়েকে তার সক্রিয় সহযোগী হিসেবে বেছে নিলেন। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গোয়েন্দা চরিত্র যদিও নারী, তবে সেখানকার কম্বিনেশন এরকম নয়। গোয়েন্দা অলোকেশ মূলত ফেলুদা ও শার্লক হোমসের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত। তিনি মনে করেন, সাধারণ কারও সঙ্গে গোয়েন্দার বাহ্যত কোনো পার্থক্য নেই। ফারাকটা হল পর্যবেক্ষণ, জানাশোনা এবং কগনিটিভ বা যৌক্তিক বিশ্লেষণ ক্ষমতার। ঘটনা বুঝতে কখনও কখনও অপরাধীর চোখ দিয়েও দেখতে হয়। রহস্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে অলোকেশ ভাগ্য বা নেহাতই কাকতালকে গুরুত্ব দিতে রাজি নন, কেননা, ওটা গুণিন নয়তো জ্যোতিষীর কাজ, গোয়েন্দার নয়। তিনি মেঘমুক্ত মন নিয়ে যুক্তির আলো ফেলে ঘটনার আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ করেন, পরিস্থিতি দেখেন। আগেই মনগড়া কোনো থিওরি নয় বরং যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা থিওরি বিনির্মাণ করেন। আর তাতেই তিনি সত্যের সন্ধানলাভ করেন এবং অপরাধীকে সপ্রমাণ শনাক্ত করতে সমর্থ হন।

আমার অলোকেশ রয়ের এযাবৎ প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে জলপিপি, কফিমেকার, আলিম বেগের খুলি, অথই আঁধার, অনল মিত্রের অপমৃত্যু। অন্যপ্রকাশ ও অনিন্দ্যপ্রকাশ থেকে বইগুলো প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সে রয়েছে কিশোর গোয়েন্দা চরিত্র ‘গুবলু সিরিজ’। শেষের আগে বলি, আমরা একটি যুক্তিনিষ্ঠ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে ‘ডিটেকটিভ ক্লাব’ নামে একটি সাহিত্যসোপান গড়ে তুলছি। আশা করি, এ ক্লাবের মাধ্যমে আমরা আমাদের কিশোর ও তরুণদের ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখব।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন