‘প্রতিরোধই বেঁচে থাকার সর্বোত্তম উপায়’

  মেজবাহ উদদীন ১৬ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো

ঔপন্যাসিক, তাত্ত্বিক, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সম্পাদক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর জন্ম ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি কেনিয়ায়। আফ্রিকার সাহিত্যের প্রথম দিকের লেখকদের সঙ্গে উপনিবেশোত্তর কালের লেখকদের সেতুবন্ধ তৈরি করেছেন নগুগি। তার লেখায় প্রাধান্য পেয়েছে আফ্রিকার ঔপনিবেশিক অবস্থা থেকে উত্তর ঔপনিবেশিক অবস্থায় স্থানান্তর কালের টানাপোড়েন এবং আধুনিক মানুষের জীবন জটিলতার চিত্র। বর্তমানে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি এবং তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে আছেন। ২০১০ সালের পর থেকেই সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় হলে তার নাম বেশ জোরেশোরেই শোনা যায়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তার ভাগ্যে সে সম্মান জোটেনি। ১৯৭৮ সালে তাকে বিনাবিচারে কারাগারে বন্দি রাখার বিষয়টি যখন আবার আলোচনায়, তখন তিনি অবিচারের প্রতিবাদ করার প্রয়োজন সম্বন্ধে গার্ডিয়ানের সঙ্গে আলোচনায় মেতেছেন।

নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো কল্পনাতে বিশ্বাস করেন। সম্ভবত সে কারণেই তাকে কেনিয়ার সবচেয়ে শোভিত ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, শিক্ষাবিদ বলে প্রতীয়মান হয়, যিনি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বই প্রকাশ করে আসছেন। কিন্তু কল্পনা এবং সব শিল্প তার জন্য, সৃজনশীলতার একটি রূপ নয়; বরং প্রতিরোধের একটি রূপ। তার ক্ষেত্রে, একবার তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য কারাবাস, একটি পাশবিক পরিবেশে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে বিবেচিত। কেন তিনি এখন তার কারাবাসের সেসব স্মৃতি নিয়ে এ আপডেটেড সংস্করণ প্রকাশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রতিরোধের থিম এবং জেলের ভেতরে লেখা, এসবই শাশ্বত।

কারাগারে আটক থাকার সময় তিনি অনেক প্রতিরোধমূলক কাজ করেছিলেন; কিন্তু স্মৃতিকথায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি দিক হল: তার উপন্যাস ‘ডেভিল অন দ্য ক্রস’ লেখা হয়েছে জেলখানার টয়লেট পেপারে। বইয়ের কিংবদন্তি এর কাহিনী, যেখানে একজন অল্প বয়স্ক কেনিয়ান মহিলা জাতিগত এবং লিঙ্গ নিপীড়নের সঙ্গে লড়ছে। তার ভাষায় উপন্যাসটি ছিল আধ্যাত্মিকতায় বেঁচে থাকার একটি রূপ।

‘দশ বছর পর এটা নিয়ে আমি কী প্রতিক্রিয়া দেখাব তা বলা ছিল কঠিন। কিন্তু আমি কীভাবে বেঁচে থাকব, সেই বিষয়ে আমি সচেষ্ট ছিলাম। আমি ভাবতে ছিলাম আমি ‘গিকুউতে’ উপন্যাসটি লিখব। এক্ষেত্রে আমি জনতাম না কতদিন লাগবে। যদি এটি একটি বছর নেয়, আমি ভাবছিলাম এরপর তা ইংরেজিতে অনুবাদের জন্য আরেকটি বছর নেব। আমি তখন এমনই পরিকল্পনা করছিলাম।’

কেনিয়ার সমাজের অসাম্য নিয়ে লেখা ‘আই উইল ম্যারি হোয়েন আই ওয়ান্ট’ নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার পরপরই নগুগিকে আটক করে বিনাবিচারে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। তাকে কারাগারে রাখাই ছিল রাষ্ট্রের লক্ষ্য, যার মাধ্যমে স্পষ্টভাষী বুদ্ধিজীবীদের জন্য একটি উদাহরণ সৃষ্টি করা যায়। প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী ছিলেন তিনি। স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, রাষ্ট্র যদি এ প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদকে ভেঙে ফেলতে পারে, যদি তারা কারাগার থেকে প্রগতিশীল চিন্তার মানুষদের মেরুদণ্ডহীন করে বের করে আনতে পারে, আর ‘আমার সব পাপের জন্য আমি দুঃখিত’, বলাতে পারে; যেভাবে একজন নীতিহীন মানুষ সত্যায়ন করে, তবে রাষ্ট্র নিজেদের নিরাপদ মনে করে’।

‘কারাগারে তারা এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করত কেন আমি বন্দি। যেটা ছিল খুবই বিরক্তিকর। তারা স্বীকারোক্তি নেয়ার চেষ্টা করতে লাগল। তারা আমাকে আমার পাপ স্বীকার করাতে চেয়েছিল, যদিও রাজনৈতিক অর্থে স্বীকার করার মতো কোনো পাপই ছিল না আমার’। তার বই, রেডিও, কলম, কাগজ ব্যবহারের অনুমোদিত ছিল না; তাকে দেয়া খাদ্যও ছিল অপর্যাপ্ত। তাকে ২৩ ঘণ্টাই রুমের মধ্যে থাকতে বাধ্য করা হতো, যাতে করে তাকে মানসিক এবং বিশ্বাসের দিকে দিয়ে দুর্বল করা যায়। যেই বিশ্বাস ব্রিটিশদের কাছ থেকে কেনিয়ার স্বাধীনতায় অর্জনের মাধ্যমে এসেছে, জনগণের নিজস্ব সীমানায় বসবাসের অধিকার।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নগুগি তার নিজের মনের অস্থিরতাকে উপনিবেশহীনতার কাজে ন্যস্ত করেন; সেইসঙ্গে ইংরেজিতে লেখাও বন্ধ করে দেন। যে বিষয়টা নিয়ে মানুষ এখনও তাকে প্রশ্ন করে। “যদি আমি একজন ইংরেজ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করি এবং সে বলে, ‘আমি ইংরেজিতে লিখি,’ আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি না ‘আপনি ইংরেজিতে কেন লিখছেন?’ আমি যদি একজন ফরাসি লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি না, ‘তুমি কেন ভিয়েতনামিজ ভাষায় লিখো না?’ কিন্তু আমাকে বারবার জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘কেন তুমি গিকুউতে লিখছ?’ আফ্রিকানদের জন্য অভিমত অনেকটা এরকম যে, আফ্রিকার ভাষায় লেখা তাদের জন্য ভুল। তবুও নগুগি দীর্ঘ সময় ধরে আফ্রিকান লেখকদের তাদের মাতৃভাষায় লেখাকে সমর্থন করে আসছেন। কারণ তিনি বুঝতে পারেছেন, ভাষা-সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের জন্য কতটা অবিচ্ছেদ্য। ‘আফ্রিকার সম্পত্তির শতকরা নব্বই শতাংশই পশ্চিমের দখলে চলে গেছে; কিন্তু কীভাবে যেন এর শব্দভাণ্ডারটি অন্যদিকে ফিরে এসেছে। খুব অল্প কিছুই প্রত্যাবর্তনশীল ছিল আফ্রিকানদের দিকে, আর আফ্রিকানরা এটাকে বলত ‘এইড’। এভাবেই আফ্রিকা পশ্চিমাদের চিরন্তন দাতায় পরিণত হয়েছে। এ বিশেষ উপায়েই বিশ্ব অস্বাভাবিক তাকে স্বাভাবিক করেছে’, বলেই মনে করেন নগুগি।

তিনি আরও বলেন, ‘যদি আপনি একজন মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তার একটি অর্থ এমন যে, আপনার এমনকি কোনো পুলিশ বাহিনীর প্রয়োজন নেই’। এখানে ফিরে আসে মানুষের নিজের ভাষায় কথা বলা, নিজের সংস্কৃতি চর্চা করা, নিজের সহজাতরূপের কাছে নিজেকে বিনিয়োগ করা, মিথ্যাভাবে যেটা আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে সেটা নয়। সারা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত মানুষ শিখেছে: যে ঔপনিবেশিক বাহিনী চায় আপনার উৎপাদিত পণ্যকে, আপনাকে না।

যদিও নগুগির কারাদণ্ড তার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতাগুলোর অন্যতম ছিল, তবুও তিনি এখান থেকে নেয়া ভালো কিছু শেয়ার করেছেন- জেলে যাওয়ার কারণেই তিনি গিকুউতে লেখার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন; তার রচিত উপন্যাস ‘ডেভিল অন দ্য ক্রস’ হবে তার ভাষায় লেখা প্রথম কোনো উপন্যাস। চাপের কারণেই হীরকের জন্ম, তাই বলে যান; এবং স্বৈরশাসনের প্রতিরোধ অন্য কিছু তৈরি করে: নগুগি নিজেকে যেভাবে বর্ণনা করেছেন, যদি আপনি ভাগ্যবান হয়ে থাকেন, তবে মুক্তির একটি সুযোগ রয়েছে। ‘প্রতিরোধই হল বেঁচে থাকার সর্বোত্তম উপায়। যদি আপনি সত্যিই মনে করেন যে, আপনি ঠিক আছেন, তাহলে আপনি আপনার বিশ্বাসের সঙ্গে লেগে থাকুন, আর তারাই আপনাকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে’। হ

সূত্র : গার্ডিয়ান অনলাইন

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.